Tuesday, August 8th, 2017
অপরাজিতা মেয়ের পরাজয়ের গল্প
August 8th, 2017 at 4:54 pm
অপরাজিতা মেয়ের পরাজয়ের গল্প

কাজি ফৌজিয়া: অনেকদিন হয় লিখিনা বা লিখতে পারিনা। আমার কখনো কখনো মনে হচ্ছিলো আর বোধহয় লিখতে পারব না!! মানে আমার লিখার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছি। এই কয়দিন মন এত বেশি বিক্ষিপ্ত ছিল আর কাজের চাপ এত বেশি ছিল যে আমি ভুলেই গিয়েছিলাম মন কিভাবে একত্রিত করে লিখার মনোযোগ তৈরি করতে হয়। লিখা নিয়ে এত ভুমিকা তৈরি করার কারণ, অনেক সুহৃদ লিখার জন্য তাগিদ দিচ্ছিল আমিই সময় বের করে লিখতে পারছিলাম না এই ভুমিকা তাদের জন্য আমার কৈফিয়ত।

লিখার নাম দেখে বুঝতেই পারছেন এটা একজন মেয়ের জীবন সংগ্রামের গল্প। মেয়েটির নাম নাদিয়া মাহফুজ সুমি, গত দুই বছর পূর্বে আমাদের এক মেম্বার এর মাধ্যমে সুমির সাথে পরিচয় হয় আমার পরে সে আমাদের সংগঠনের সদস্য হয়। আমাদের সদস্য হওয়ার পরে সে কয়েকবার বাচ্চাকে সাথে নিয়ে মিটিং’এ আসে। যতবার আমি নাদিয়া কে দেখেছি বা কথা বলেছি অনেক সংগ্রামী মেয়ে মনে হয়েছে। আমাদের মাসিকসভা গুলোতে অনেক পলিটিকাল বিষয় নিয়ে আলোচনা হত যতবার সে এসেছিল অনেক সক্রিয় আলাপ হয়েছে তার সাথে। আমি নাদিয়ার সাথে কথা বলে জানতে পারি তার স্বামী স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে রিহ্যাব সেন্টারে আছে, সংসারে আয় উপার্জনের কেউ নেই ছোট বাচ্চা নিয়ে সে বিপদে আছে। একদিন সে আমাকে অনুরোধ করল তার সাথে সোশ্যাল সিকউরিটি অফিসে যেতে, নাদিয়া চায় তার স্বামী যেহেতু কোমায় আর বাচ্চাটি যেহেতু আমেরিকান সিটিজেন তাই সোশ্যাল অফিস যেন তাকে বাড়িভাড়া ও কিছু সংসার খরচ দেয়। আমি আর নাদিয়া সারাদিন দেন দরবার করেও তাদের মন গলাতে পারলাম না, কারণ নাদিয়ার গ্রিনকার্ড আছে পাসপোর্ট নাই। অনেক বুঝানোর পরে তারা মাসে ১০০ ডলারের মত দিতে চাইল। তারা নাদিয়াকে বলল তুমি কাজ করলে তোমাকে বেবি সিটার দিব কিন্তু মাহফুজকে সপ্তাহে সপ্তাহে দেখতে যাওয়া ও ছেলে সামিন এর কথা চিন্তা করে সে রাজি হলনা।

সেদিন সে সারাদিন তার জীবনের অনেক কথা শেয়ার করল বিয়ের পরে নাদিয়া মাহফুজের সাথে অনেক সুখেই ছিল, সামিন হওয়ার পরে সে সুখ দুইগুণ হল। কথায় বলে সুখের পরেই দুঃখ ওত পেতে থাকে কি করে ঝাঁপিয়ে পরবে। তেমনি গত দুই বছর পূর্বে মাহফুজ হঠাৎ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে প্যারালাইসিস হয়ে যায়। কিছুদিন হসপিটালে থাকার পরে তাকে রিহ্যাব’এ নিয়ে যায়। মাহফুজের জীবনে নাদিয়া অনেক দিনের নয় আর মাহফুজের আয় এর স্বর্ণযুগ নাদিয়া দেখেওনি, মাহফুজের জমা পুঁজি তেমন ছিলনা। স্বামীর জীবনের আয়’র সিংহভাগ যাদের জন্য ব্যয় করেছে তারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, সংসার চালানোর জন্য দিশেহারা নাদিয়া মাহফুজের বন্ধুদের কাছেও হাত পেতেছে। আমাদের সমাজে একজন সুন্দরী মেয়ে যদি একলা হয় তো তার জীবন নরক বানানোর জন্য পুরুষরা হা করে বসে থাকে। আজ আমি সামাজিক ধস এর ভয়ে যদিও মুখ না খুলি তবুও আমি নাদিয়ার অভিজ্ঞতা জানি আর কি অবস্থায় সে টিকে থাকার লড়ায়টা চালিয়ে যাচ্ছিল তা অনুভব করি। তার গল্পে এক সংগ্রামী নারীর দৃঢ় প্রত্যয় ফুটে উঠত। আমি অনেক সময় অবাক হয়ে ভাবতাম মেয়ে তোমার জীবনী শক্তির তারিফ করি চালিয়ে যাও হেরে যেওনা কোনদিন।

গত রোববার রাতে প্রবাস সম্পাদক সায়ইদ ভাই আমাকে বলল কাজি আপা আমাদের সকলের পরিচিত মুখ মাহফুজের স্ত্রী আত্মহত্যা করেছে আমি একটু দুঃখ করে বললাম অহ সরি!! কোন মাহফুজ? উনি চেষ্টা করল আমাকে চিনাতে। আমি গিয়েছিলাম ওয়ালি ভাইকে সমবেদনা জানাতে সমসময়ে উনার ছেলের অকাল মৃত্যুতে, আমার অনুভব ওয়ালি ভাই’র দুঃখের প্রতি ব্যথিত রইল। আমি বুঝতেই পারলামনা কি ঘটে গেছে। পরেরদিন সাংবাদিক ইমরান আনসারির ফোন কল থেকে বুঝলাম আমাদের নাদিয়া নেই সে আত্মহত্যা করেছে। দুনিয়াতে এর চেয়ে খারাপ কি খবর হতে পারে বা পারত আমার জানা নেই, আমি ইমরান, সায়মা আপা সকলের চিন্তা ছেলে সামিন কই? খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারলাম সামিন খুলনা সমিতির লিটু ভাই আর হ্যাপি ভাবির কাছে আছে। রাতে দেখতে গেলাম, সামিন হাত ভাঙ্গা, বিছানা থেকে লাফ দিয়ে হাত ভেঙ্গেছে সে। মনটা হা হা করে কেঁদে উঠল যে সামিনকে বেবিসিটার এর কাছে দিতে চাইত না তাকে একা ফেলে তার সামনে মরে গেল সুমি বা নাদিয়া!!

যা জানা গেল লোকের মুখে, কোন এক প্রতারককে বিশ্বাস করে তার প্রতি দুর্বল হয়ে গেছিল নাদিয়া, পরবর্তীতে ঐ লোকের বউ নাদিয়াকে মানসিক টর্চার করা শুরু করে ঐ লোক আর তার বউ মিলে নাদিয়াকে সামাজিক লজ্জার ভয় দেখায় অবস্থা এমন হয় যে নাদিয়ার মত লড়াকু মেয়েটিও জীবনের আশা ছেড়ে দিয়ে সামিন কে অকুলে ভাসিয়ে চলে যায়!!

আমার এই লিখা সমাজের কাছে নাদিয়ার কাছে নাদিয়ার মত আমাদের অন্য মেয়েদের কাছে। আমি কাউকে ছোট করার জন্য এই লিখা লিখি নাই। আমার প্রশ্ন সমাজের সকল খারাপের জিম্মা কি মেয়েদের? নাদিয়া লড়ায় সংগ্রামে ক্লান্ত হয়ে যদি বন্ধু ভেবে কারো প্রতি দুর্বল হয় এতে দোষের কি ছিল? এ দায় কি তার একার ছিল? পুরুষ মানুষটি কি দায়ী ছিল না? কেন সকল সময় আমাদের মেয়েদের নীতি, আদর্শের, ধর্মের, অধর্মের ঠিকা একলা নিতে হয়? মানুষ হিসাবে অসহায় সময়ে সমবেদনা জানানো কারো প্রতি দুর্বল হওয়া কি স্বাভাবিক নয়? কেন তার অপরাধ বোধকে এতটা আঘাত করা হয় যে সে জীবনটাই দিয়ে দেয়। আমরা মেয়েরা এক জীবনে কত আর মূল্য চুকাব এই সমাজের সকল নিয়ম ধরে রাখতে? যে সব পুরুষ তাকে সমবেদনার নামে তার মনটা নিয়ে খেলেছে তাকে মৃত্যু পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছে আমরা কি তাকে বা তাদের ছেড়ে দিব? ভুয়া মানসম্মান’র নামে বা ঐ পুরুষের জীবন সংসারে এর প্রভাব পরবে সেই ভয়ে। যে সমাজ নাদিয়াকে অসহায়ত্ব আর প্রতারণা ছাড়া কিছুই দেই নাই, সেই সমাজ ঠিক করবে কি ভুল আর কি ঠিক? আমি সমাজের কাছে প্রশ্ন করব মাহফুজের সামাজিক অবদানের পুরস্কার তার সংসার আর আপনারা কি দিয়েছেন? অসহায় মাহফুজকে নিয়ম করে দেখতে যেত এই নাদিয়া, সামিন যাতে পিতার স্পর্শ পায় সেইজন্য বারবার ছুটে যেত তার পাশে এই নাদিয়া। নাদিয়া যে কোনো মূল্যে মাহফুজের জন্য শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চেয়েছিলো। তাকে দয়া দেখানোর নামে যারা তাকে ভেঙ্গে দিয়েছে আমার অন্তরের ঘৃণা তাদের জন্য। যদি ইনসাফ বা ন্যায়বিচার বলে পৃথিবীতে কিছু থাকে তবে বিচার তাদের হবেই। অন্যায়কে না বলার আর অবিচার এর বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার শক্তি আমার আছে নাদিয়া তাই তোমাকে মাটির নিচে রাখার পূর্বেই এ আমার প্রতিবাদ! আমি জানি সামিনকে পাওয়ার জন্য মাহফুজের পরিবার উঠে পরে লাগবে এই দেশের আইনকানুন জানবেও না তারা তোমার আর তোমার সামিন’র সাথে কি করেছে! তোমার আপনজনদের মধ্যে কেউ এই দেশে থাকেনা তোমার বোন এসেছে তাকে দিবে কি না!

আমি একজন পুরুষের অবহেলা আর ঘৃণাকেই মনে করতাম আমার জীবনের সব!! আজকের আমি জীবনের সার্থকতা খুঁজে পেয়েছি মানবতার কল্যাণে একজন বা একশজন পুরুষও আমাকে আর আমার লক্ষ্য থেকে সরাতে পারেনা। একলা জীবনে আমি একলাই একশ’ হয়ে চলি আমার সুখ আর দুঃখ আমি নির্ধারণ করি। আমি এই লিখা তক্ষনি সার্থক মনে করব যখন একটা মেয়েও এই লিখা পরে জীবন সম্পর্কে ইতিবাচক চিন্তা করবে বাঁচার প্রেরণা পাবে। আর সমাজকে আবারো বলব একটা মেয়েকে জীবন দিতে পারনা ভাল কিন্তু তার মৃত্যুর কারণ হইও না।

লেখিকা: মানবাধিকারকর্মী


সর্বশেষ

আরও খবর

হয়ত শাকিব অপুও থাকবে না

হয়ত শাকিব অপুও থাকবে না


পাঠ প্রতিক্রিয়া: ফরিদপুরে বিতর্ক চর্চা

পাঠ প্রতিক্রিয়া: ফরিদপুরে বিতর্ক চর্চা


একটি আত্মহত্যা ও কিছু প্রশ্ন

একটি আত্মহত্যা ও কিছু প্রশ্ন


বাঙালির দ্বি-মুখী লড়াই: হিন্দুত্বের সাথে এবং মুসলমানিত্বের সাথে

বাঙালির দ্বি-মুখী লড়াই: হিন্দুত্বের সাথে এবং মুসলমানিত্বের সাথে


দ্রোহের গুঞ্জন: সংস্কৃতি ও রাজনীতি

দ্রোহের গুঞ্জন: সংস্কৃতি ও রাজনীতি


কেউ কষ্টের কথাগুলি বলতে চায় না

কেউ কষ্টের কথাগুলি বলতে চায় না


আমগো যা কওয়ার ছিলো; তাই কইতাছে বাংলাদেশ: সাঈদী

আমগো যা কওয়ার ছিলো; তাই কইতাছে বাংলাদেশ: সাঈদী


শ্রমিক আর সংবাদকর্মী: সবাই আজ শোষিত

শ্রমিক আর সংবাদকর্মী: সবাই আজ শোষিত


বাজিলো কাহারো বীণা

বাজিলো কাহারো বীণা


নানীর পহেলা বৈশাখ: ভায়লেট হালদার

নানীর পহেলা বৈশাখ: ভায়লেট হালদার