Wednesday, March 15th, 2017
কী ছিলো ‘অপারেশন বিগ বার্ড’?
March 15th, 2017 at 11:23 am
কী ছিলো ‘অপারেশন বিগ বার্ড’?

ডেস্ক: ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানী বাহিনী মুক্তিকামী বাঙালি ওপর ইতিহাসের যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল তার অফিসিয়াল নাম ছিল, “অপারেশন সার্চলাইট”। এ অপারেশনের উদ্দেশ্য ছিল ঢাকাসহ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান শহরগুলিতে বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতা ও ছাত্র নেতৃবৃন্দ এবং বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের গ্রেপ্তার ও প্রয়োজনে হত্যা, সামরিক আধা সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর বাঙালি সদস্যদের নিরস্ত্রীকরণ, অস্ত্রাগার, রেডিও ও টেলিফোন এক্সচেঞ্জ দখলসহ প্রদেশের সামগ্রিক কর্তৃত্ব গ্রহণ। সে রাতেই গ্রেপ্তার করা হয় মুক্তিকামী বাংলার অবিসংবদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তারের অপারেশনটির নাম ছিল ‘অপারেশন বিগ বার্ড’।

সেই কালোরাতে যেভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে

বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তারের অপারেশনটির নাম ছিল ‘অপারেশন বিগ বার্ড’। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এ ঘটনার নায়ক ছিল ব্রিগেডিয়ার (অব.) জহির আলম খান। একাত্তরে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থার্ড কমান্ডো ব্যাটেলিয়নের দায়িত্বে ছিলেন জহির। ২৩ মার্চ তিনি ঢাকায় আসেন চীফ অব স্টাফ অফিসে দেখা করে কমান্ড সংক্রান্ত একটা ঝামেলার সুরাহা করতে। বিমানবন্দরে তার অপেক্ষায় ছিলেন মেজর বিল্লাল। জহিরকে জানানো হয় প্রধান সামরিক প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়ে যেতে এসেছেন তিনি। সেখানে কর্ণেল এসডি আহমেদের সঙ্গে দেখা করতে হবে। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে যাওয়ায় কর্ণেলের বাসভবনে যান দুজন। সেখানে জহির জানতে পারেন ২৪ কিংবা ২৫ মার্চ শেখ মুজিবর রহমানকে গ্রেপ্তার করতে হবে তাকে। প্লেন থেকে নেমে ঢাকার উত্তপ্ত অবস্থাটার আঁচ পেয়েছিলেন জহির। সেই রাতে মেজর বিল্লাল, ক্যাপ্টেন সাঈদ ও ক্যাপ্টেন হুমায়ুনকে নিয়ে ধানমণ্ডি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বাড়ি রেকি করতে যান তিনি। পরদিন সকালে আশেপাশের রাস্তাঘাটগুলো চেনার জন্য আবারও দলবল নিয়ে ধানমণ্ডি গিয়েছিলেন জহির।

তার পরদিন সকাল বেলা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর সঙ্গে দেখা করার নির্দেশ পান জহির। সকাল ১১টায় এই সাক্ষাতকারে চীফ অব জেনারেল স্টাফ তাকে নিশ্চিত করেন ২৫ মার্চ রাতেই মুজিবকে গ্রেপ্তার করতে হবে। নির্দেশনা নিয়ে বেরিয়ে আসার আগে ফরমান তাকে থামান। জিজ্ঞেস করেন, কিভাবে করবে জানতে চাইলে না? বলেন যে বেসামরিক গাড়িতে একজন অফিসারকে সঙ্গে নিয়ে মুজিবকে গ্রেপ্তার করতে হবে। আগের দিনই মুজিবের বাড়ীর আশপাশে বিশাল জনতার সমাবেশ চোখে পড়েছিলো জহিরের। তাই এই নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানিয়ে কমপক্ষে এক প্লাটুন সৈন্য দাবি করেন তিনি। ব্যাপারটা যে বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে বুঝেছিলেন জহির। ফরমানের রোষ থেকে বাঁচতে তাই সাময়িক আত্মগোপন করলেন। সন্ধ্যায় গেলেন বিমানবন্দরে পিআইএর একটি ফ্লাইটে ঢাকা নামলেন মেজর জেনারেল মিঠা। কমান্ডিং অফিসারকে সব কিছু খুলে বললেন জহির।

এরপর জেনারেল হামিদের মধ্যস্ততায় নিষ্পত্তি হয় এই ঝামেলার। হামিদ তাকে বলেন মুজিবকে জীবিত গ্রেপ্তার করতে হবে এবং কোনো কারণে মুজিব মারা গেলে এজন্য ব্যক্তিগতভাবে জহিরকেই দায়ী করা হবে। সেখান থেকে আবার ফরমানের কাছে গেলেন জহির- জানালেন তার কী কী লাগবে, আর্মি সেনাবহনের জন্য তিনটা ট্রাক আর বাড়ির নকশা চাইলেন। ফরমান জহিরকে বাড়ীর প্ল্যানটা দিয়ে বলেন গাড়ী সময়মতো পাওয়া যাবে। জহির জানতে চাইলেন শেখ মুজিবর রহমানের পেছনের বাসাটাই জাপানী রাষ্ট্রদূতের। যদি উনি সেখান আশ্রয় নেন তাহল আমার কী করণীয়। জেনারেল ফরমান বললেন জহিরকে বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে সিদ্ধান্ত নিতে।

সন্ধ্যার পর কোম্পানিকে অভিযানের নির্দেশনা বুঝিয়ে দেন জহির। কোম্পানিকে তিনভাগে ভাগ করা হয়। নেতৃত্ব দেওয়া হয় যথাক্রমে ক্যাপ্টেন সাঈদ, ক্যাপ্টেন হুমায়ুন ও মেজর বিল্লালের ওপর। তিনটি দলের মিলিত হওয়ার স্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হয় এমপি হোস্টেলের দিকে মুখ করে থাকা তেজগাঁ বিমানবন্দরের গেট। ঠিক হয় বিমানবন্দর থেকে সংসদ ভবন ও মোহাম্মদপুর হয়ে ধানমণ্ডি যাবেন তারা। রাত ৯ টার দিকে জহির এয়ারফিল্ডে পৌঁছলেন।

২৫ মার্চ রাত ১১টায় জহিরের নেতৃতে এয়ারফিল্ড থেকে জিপ নিয়ে সাথে ৩টি ট্রাক বের হলো শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করতে। সাংসদদের হোস্টেল থেকে মোহাম্মদপুরের রাস্তায় কোনো বাতি নেই।

ক্যাপ্টেন হুমায়ুনের দল পাশের একটি বাসায় ঢুকে দেয়াল টপকে নামলো মুজিবের আঙ্গিনায়। এসময় গোলাগুলিতে একজন নিহত হয়। বাড়ির বাইরে পুর্ব পাকিস্তান পুলিশের সদস্যরা তাদের ১৮০ পাউন্ড ওজনের তাবুতে ঢোকে, সেগুলো খুটিসহ তুলে নিয়ে ঝাপ দেয় ধানমণ্ডির লেকে। সংলগ্ন এলাকার নিরাপদ দখল শেষ। ঘন কালো আধার চারদিকে। মুজিব ও তার প্রতিবেশী কারো বাসাতেই বাতি নেই। তল্লাশী চালানোর জন্য এরপর একটি দল ঢুকলো। প্রহরীদের একজনকে বলা হলো রাস্তা দেখাতে। কিছুদূর যাওয়ার পর তার পাশে থাকা সৈন্যকে দা দিয়ে আক্রমণ করতে গিয়েছিলো সে, কিন্তু জানতো না তার উপর নজর রাখা হচ্ছে। তাকে গুলি করে আহত করা হয়। এরপর সিড়ি বেয়ে ওপরে উঠলো সার্চপার্টি। একের পর এক দরজা খুলে কাউকে পাওয়া গেলো না। একটা রুম ভেতর থেকে আটকানো ছিলো।

এরপর গ্রেনেড বিস্ফোরন ও তার সাথে সাব-মেশিনগানের ব্রাশফায়ার। তারা ভেবেছিল কেউ হয়তো শেখ মুজিবকে মেরে ফেলেছে। বাধা দেয়ার আগেই বারান্দার যেদিক থেকে গুলি এসেছিলো সেদিকে গ্রেনেড ছোড়ে একজন সৈনিক। এরপর সাবমেশিনগান চালায়। গ্রেনেডের প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলির আওয়াজে বদ্ধ সে রুমের ভেতর থেকে চিৎকার করে সাড়া দেন শেখ মুজিব এবং বলেন তাকে না মারার প্রতিশ্রুতি দিলে তিনি বেরিয়ে আসবেন। নিশ্চয়তা পেয়ে বেরিয়ে আসেন তিনি। বেরুনোর পর হাবিলদার মেজর খান ওয়াজির (পরে সুবেদার) তার গালে চড় মারেন।

শেখ মুজিবকে জহির বলেছিল সঙ্গে আসতে। শেখ মুজিব জানতে চাইলেন পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নিতে পারবেন কিনা। জহির তাকে তা জলদি সারতে বলেছিল। এরপর তারা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। এরমধ্যে সদরে রেডিও বার্তা পাঠিয়ে দিয়েছিল জহির যে, আমরা শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করেছি।

মাঝের ট্রাকে মুজিবকে বসিয়ে ক্যান্টনমেন্টের পথ ধরলো জহিরের দল। এসময় তার মনে হলো মুজিবকে গ্রেপ্তার করার পর কোথায় রাখতে হবে, কার কাছে হস্তান্তর করতে হবে তা তাকে বলা হয়নি। তাই সংসদ ভবনে মুজিবকে আটকে রেখে পরবর্তী নির্দেশনা জানতে ক্যান্টনমেন্ট রওয়ানা দিলেন। সংসদের সিড়িতে বসিয়ে রাখা হয় মুজিবকে।

লে. জেনারেল টিক্কা খানের সদর দপ্তরে গেলেন মেজর জহির। সেখানে চীফ অব স্টাফ ব্রিগেডিয়ার জিলানীর সঙ্গে দেখা করে তাকে জানালেন মুজিবকে গ্রেপ্তারের কথা। জিলানী তাকে টিক্কার অফিসে নিয়ে গেলেন এবং বললেন রিপোর্ট করতে। টিক্কা সম্ভবত আগেই খবর জেনেছেন, তাই তাকে বেশ খোশমেজাজে পাওয়া গেলো। আনুষ্ঠানিকভাবে শোনার অপেক্ষা করছেন শুধু। সিদ্ধান্ত হলো আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় যে কক্ষটিতে ছিলেন, সেখানেই রাখা হবে মুজিবকে। এরপর ১৪ ডিভিশন অফিসার্স মেসে স্থানান্তরিত হলেন তিনি। একটি সিঙ্গল বেডরুমে তাকে রেখে বাইরে প্রহরার ব্যবস্থা করা হলো।

পরদিন মেজর জেনারেল মিঠা শেখ মুজিবকে কোথায় আটকে রাখা হয়েছে জানতে চাইলেন। শোনার পর উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন পরিস্থিতি সম্পর্কে একদমই ধারণা নেই সংশ্লিষ্টদের। অফিসার্স মেস থেকে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা খুব সহজেই নিতে পারবে কেউ। এরপর একটি স্কুল ভবনের (আদমজী ক্যান্টনমেন্ট) চারতলায় মুজিবকে সরিয়ে নেওয়া হলো। সেখান থেকে কয়েক দিন পর করাচি।

নিউজনেক্সটবিডি/পিএ


সর্বশেষ

আরও খবর

পাহাড়-বনাঞ্চলে রোহিঙ্গাদের নতুন বসতি

পাহাড়-বনাঞ্চলে রোহিঙ্গাদের নতুন বসতি


ত্রাণ বিতরণে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা

ত্রাণ বিতরণে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা


‘ভাই আমাকে মেরে ফেলেন’

‘ভাই আমাকে মেরে ফেলেন’


জনগণের কাছে পৌঁছতে ত্রাণকে প্রাধান্য দিচ্ছে বিএনপি!

জনগণের কাছে পৌঁছতে ত্রাণকে প্রাধান্য দিচ্ছে বিএনপি!


ইসি’র সংলাপে সারা দিবে ২০ দলীয় জোট

ইসি’র সংলাপে সারা দিবে ২০ দলীয় জোট


প্রস্তুত হচ্ছে গাবতলী পশুর হাট

প্রস্তুত হচ্ছে গাবতলী পশুর হাট


ডাস্টবিন নেই, পরে আছে লোহার দণ্ড

ডাস্টবিন নেই, পরে আছে লোহার দণ্ড


অস্তিত্ব সংকটে ৩ শতবর্ষী ‘মেরাদিয়া হাট’

অস্তিত্ব সংকটে ৩ শতবর্ষী ‘মেরাদিয়া হাট’


তুফান সরকারের উত্থান কাহিনী

তুফান সরকারের উত্থান কাহিনী


খালেদার ব্রিটেন সফর নিয়ে সরব আ.লীগ-বিএনপি

খালেদার ব্রিটেন সফর নিয়ে সরব আ.লীগ-বিএনপি