Saturday, August 13th, 2016
‘আমি সব দেশ, সব রাষ্ট্রের।’
August 13th, 2016 at 9:19 pm
‘আমি সব দেশ, সব রাষ্ট্রের।’

নিলিমা দোলা, ঢাকা :

শিবু কুমার শীল এক আশ্চর্য মানুষ, নগরীর নোনা ধরা রাজপথে নির্বাণ নির্বাণ ডেকে যাওয়া ‘কাঁচপোকা’ কবিয়াল। তিনি যখন কথা বলেন, মনে হয় পরিমিত অভিব্যক্তির ভেতরে আবছায়া বিপন্ন বিষ্ময়। এই শিল্পী তার জীবনের দীর্ঘ সময় ধরে কখনো ছবি এঁকে, কখনো কবিতা লিখে, কখনো গান গেয়ে— শুনিয়ে যাচ্ছেন রোজকার রূপকথা। তার আরো একটি পরিচয় তিনি জনপ্রিয় বাংলা ব্যান্ড ‘মেঘদল’ এর ভোকাল।

বুড়ো সূর্যের দানে পাওয়া এক বিষাদগ্রস্থ দিনের রেলগাড়ি বিকেলে শিবু কুমার শীলের কাছে আমরা (নিউজনেক্সটবিডি ডটকম) গিয়েছিলাম তার সঙ্গীত জীবন, অভিমান আর করোটির ভেতরে জমাট অন্ধকারের গল্প শুনতে। আজিজ সুপার মার্কেটের দুইতলার একটা রেস্তোরার ‘শূন্যতার শোকসভায়’ তিনি শোনালেন বৃক্ষের ক্রন্দন। চলুন শুনে আসি সেই বিপর্যস্ত সময়ের গল্প—

দাদা, কেমন আছেন? 

কি দরকার বলোতো এইসব ফরম্যাল ইন্টার্ভিউয়ের দোলা? এমনিই তো ভালো ছিলাম। কেনো যে এইসব? আছি ভালোই। দাড়াও কথা শুরুর আগে চা দিতে বলি।

আপনার কাজকে সম্মান করি তাই এই ক্ষুদ্র আয়োজন। আপনার ছেলেবেলা নিয়ে শুনতে চাই। বলুন?

আমার ছোটবেলা কেটেছে ঢাকাতেই। বেগমগঞ্জ, একটা পুরোনো শহর। এই কারণেই হয়তো পুরোনো আমাকে এতো টানে। ছোটবেলা থেকেই আমার অনেক আলো ভালো লাগে, অনেক মানুষ, রেস্তোরার আলো, অনেক মানুষ ঝাল-ঝাল কাবাব খাচ্ছে এই সমস্ত দৃশ্য বেশ লাগে। এগুলো আমার বেড়ে ওঠার সাথে ছিলো সবসময়ই। আর ভীষণ ভাবে বাঙালি আমি। ইলিশ তাই সব থেকে প্রিয় খাবার।

চলে আসি আপনার কাজের জায়গায়। মেঘদলকে নিয়ে বলুন, তাদের সাথে আপনি কেমন আছেন?

আমি মেঘদলকে না, মেঘদলই আমাকে জন্ম দিয়েছে। আমার  ‘জ্ঞানচক্ষু আর গানচক্ষু’ দুটোই খুলে দিয়েছে মেঘদল। এই পথচলাটা ভীষণ ভালো। মেঘদল হলো একটা রাস্তা। মেঘদল অনেক অব্যক্ত প্রেম, ভালোবাসা, বেদনা, শূন্যতা নিয়ে কথা বলবে সবসময়ই।  

IMG_8201

মেঘদলের লিরিক  দুর্বোধ্য, এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। এ ব্যাপারে কিছু বলবার আছে?

দেখো, কমল মজুমদার যখন লিখে গেছেন, তখন অনেকেই পড়েননি। কম লোক তাকে পড়লো বলেতো সে হারিয়ে গেলো না, তাই না? বিশেষ কিছু পাঠকের কাছে সবসময়ই সমাদৃত ছিলো। 

মেঘদল কি তাহলে অডিয়েন্স টার্গেট করে গাইছে? 

নাতো! অভিযোগ— অনুযোগ মিলিয়েই তো সৃষ্টি। গানে যে লিরিক এসেছে, যে সুর দেয়া হয়েছে সেসব ঘটনা তো ল্যাবরেটরীতে ঘটেনি। ঘটেছে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই। পুরোটাই একটা মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। তাছাড়া সবকিছুতেই অল্প- বিস্তর ভাগ আছে। কোন কিছুই তো সকলের জন্য নয়।

মেঘদলের গানে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র প্রভাব অনেক বেশী। সেটা নিয়ে কিছু বলুন? 

আমি গাইতে গাইতে প্রায়ই চাই যে, আমার একটা গান যদি মহীনদের মতোন হতো। এতো চেষ্টা করি, কিন্তু হয় না। আমি তো তাদের মতো গাইতেই চাই।  

শিল্পের কি বড়লোক বা ছোটলোক আছে? কি মনে হয় আপনার? 

তেমনটা না হলেও, শ্রেণী ডিটেক্ট করে যে, কি শুনবেন আর কি শুনবেন না। ধনীলোক তার ড্রয়িংরুমে বসে ফোক গান শুনতে পারে। চাইলেই পারে। কিন্তু সে শুধু এইটুকু জানে যে, এটা শুনতে হয় বা এটা অরিজিনাল। কিন্তু সেকি আদৌ সেই গান কে রিলেট করতে পারে? 

বেশ। নিজের কাজ নিয়ে বলুন। কি করছেন বা কি করতে চান? 

আমার গান নিয়ে আমি চূড়ান্ত এক্সপেরিমেন্টের ভেতর দিয়ে যেতে চাই। হোক ভাল কাজ, হোক পরিশ্রম, হোক ফাঁকিবাজি। আমি কেনো গাইছি, কি গাইছি, কোথা থেকে আসছে সেগুলোকে আমার আরো জানবার- বুঝবার আছে। সঙ্গীতের সাথে আমার এতোদিনের সহবাস’ খতিয়ে দেখা জরুরী। এখন আমি সেটাই করবো। সময় নেবো, হয়তো নেবো না গেয়ে ফেলবো। যেকোন রকমের হতে পারে। 

মেঘদলের অ্যালবাম নিয়ে বলুন, সকলে উন্মুখ হয়ে আছে। 

মেঘদলের অ্যালবামের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষের দিকে। আসলে মেঘদলে আমরা কেউই  রুটিরুজির জন্য গান করি না। জোর করে তো আর কিছু হয় না। বাকি কাজটুকু ধীরে সুস্থে শেষ করতে চেষ্টা করছি। শেষ হলেই অ্যালবাম আসবে। 

সোশ্যাল মিডিয়া, ইন্টারনেটের ভালো-খারাপ দিক গুলো নিয়ে বলুন। গানের ক্ষেত্রে প্রভাব কেমন? 

সোশ্যাল মিডিয়া ভালো, আগে মানুষ একটা গান গেয়ে, কবিতা লিখে কোন পত্রিকার সম্পাদক বা অডিও প্রতিষ্ঠানের পেছনে ঘুরে বেড়াতো। সেই অবহেলার জায়গা গুলো কমে গেছে। মানুষ চাইলেই নিজের কাজ দেখাতে পারছে, শোনাতে পারছে। আর এগুলো তো আসলে নয়া বাস্তবতা। যার কারণে কিছু খারাপ প্রভাব আছে। 

আপনাকে মনে রাখতে হবে, ইন্টারনেট কিন্তু আপনাকে বিপদে ফেলছে না। বিপদে ফেলছে যমুনার পারের ওই ছেলেটাকে যার অক্ষরজ্ঞান একেবারেই কম বা এই আধুনিকতাবাদ যাকে এখনো স্পর্শই করেনি। তার কাছে এটা ‘আগুন’ এর মতো। সে কিন্তু ইন্টারনেট নামের আগুন নিয়ে খেলছে। অথচ এর প্রভাব সে কখনোই জানতে পারবে না।  

আর গানের ক্ষেত্রে একটু স্পেশালি যেটা বলবো, লোকের ভাববার সময় কমে যাচ্ছে। একটা গান নিয়ে কেউ বেশী সময় ভাবছে না। যার কারণে মানুষের অস্থিরতা বাড়ছে, ম্যাচুরিটি কমে যাচ্ছে। আর কিছু আবেগের জায়গাও হারাচ্ছে। যেমন, আমি যখন ছোট ছিলাম তখন একটা ক্যাসেট কিনবার জন্য পয়সা জমাতাম, স্কুল ফাঁকি দিয়ে কিনতে যেতাম। আর কেনার পর একধরনের উত্তেজনা কাজ করতো যে, কতক্ষণে সেটা চালিয়ে শুনবো। এই আবেগের জায়গাগুলো আসলে এখন আর নেই-ই। আর এমনিতে যেটা বলতে চাই, পরিমিতিবোধ থাকা জরুরী। আমাদের সেই বোধটা লোপ পাচ্ছে। কোথায় কি করতে হয়, কতোটুকু বলা যায় বা যায় না, কতোটুকু ব্যবহার করতে হবে, সেগুলো আমরা ভুলতে বসেছি।  

একটা গল্প ছিলো এমন, ‘একলোক বিয়ে করে এনেছেন। তার বউ খুবই ভদ্র। তো যে আসে বাড়িতে, তাকেই ওইলোক বলেন যে, এইটা আমার বউ, ভদ্র বউ। একদিন এমন এক আত্মীয়া তার বাড়িতে বেড়াতে এলেন এবং যথারীতি তিনি বললেন, আমার ভদ্র বউ দরজায় দাঁড়ানো। আত্মীয়া শুনলেন ‘ভাদ্র বউ’। আর যাবে কোথায়? ভদ্র বউ গ্রামে— পাড়ায় রটে গেলেন ‘ভাদ্র বউ’ নামে’। তো, আমাদের আসলে বুঝে কাজ করবার, শুনে জ্ঞান করবার, ভালো মতোন খেয়াল করে পা ফেলবার সময়টা উপস্থিত হয়েছে। চিলে কান নিয়ে গেলো বলে দৌড় দেয়া সংস্কৃতি নিয়ে আর কতোদিন? এবার ভাববার সময় এসেছে।  

সাম্প্রতিক একটা বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করতে চাই। ফসিলস বা মাইলসের যে কাঁদা ছোড়াছুড়ি এটাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?  

আমার কাছে মনে হয়, রুপম ইসলাম যা করেছেন সেটা সমস্ত সভ্যতা আর ভব্যতা কে হার মানায়। তাদের ভঙ্গিটা এমন যে, আমরা তাদের অনুসরণ করি। আদতে সেটা নয়। কারণ মহীনের ঘোড়াগুলি পরবর্তী কোন ব্যান্ডই সেভাবে কলকাতার রক মিউজিককে উপস্থাপন করতে পারেনি। এতোটা ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ খুবই অসৌজন্যমূলক। আর হামিন বা সাফিনের বক্তব্যকেও আমি সমর্থন করি না। বিশেষ করে শাহবাগ আন্দোলনের সময় তাদের কিছু বক্তব্য বেশ আপত্তিকর লেগেছে। বর্তমান ইস্যুতে তাদের দায়ভারও কম নয়। 

আপনি একজন শিল্পী, আপনি সব দেশ, সব রাষ্ট্রের। এভাবে ভাবতে পারেননা কেনো?  শ্রোতাদেরকেও এইসব বিষয়ে তাদের অবস্থান পরিষ্কার রাখা উচিৎ। আজ আপনি একজনের হয়ে বলে, কাল তাকেই মাটিতে ফেলে দিচ্ছেন। এতে কিন্তু আপনার দ্বিমুখী ব্যাক্তিত্বই প্রকাশ পাবে। সুতরাং সব ব্যাপারেই মতামত প্রকাশে যত্নশীল হউন।

এই অস্থিরতা নিয়ে নিয়ে বলুন, শিল্পীদের কি করনীয়? 

পৃথিবীর সব দেশেই শিল্পী বা শিল্পের নিজস্ব ভাষা থাকে। সেই ভাষায় কথা তো বলতেই হবে। কিন্তু সমস্যা কি জানো? আমরা সবাই কোন না কোনভাবে লেজুড়বৃত্তি করি। আর আমাদের দুর্ভাগ্য যে, রিপ্রেজেন্ট করবার মতোন শিল্পের চর্চা খুবই কম। যার কারণে, আওয়াজ তুলতে অনেকেই অপারগ।  

IMG_8196

সমসাময়িক শিল্পীদের কথা বলুন, যাদের কাজ অনুপ্রাণিত হবার মতোন? 

কফিল আহমেদের কথা বলতে চাই। তার কাজ বাংলা গান মনে রাখবে। অর্ণব এর কাজও মনে রাখবার মতোন। কিন্তু তেমন কোন গ্রোথ নাই। বরং রহস্য জনক ভাবে মার্কেট আউট!  

নতুনদের ভেতরে কাদের কাজ আপনার কাছে ভালো লাগছে? 

রাজুর কাজ বেশ ভালো লাগে। ব্যান্ড হিসেবে সহজিয়া আমার পছন্দের তালিকায়। এছাড়াও প্রবর রিপন, চিৎকার , আহমেদ সানী এদের কাজও ভীষণ প্রশংসনীয়।  

শিল্পীর তো নিজের কাছে কিছু জায়গা তৈরী হয়, নিজের কাছে নিজেকে কিভাবে দেখেন আপনি? 

অগ্রণী ব্যাঙ্কের সেই ছাপোষা কেরানী; যিনি রাত্তিরে স্ত্রী-পুত্র ঘুমাবার পরে, গোপন ট্রাংক থেকে ইউনিভার্সিটির খুব পুরোনো হলুদ খাতাটা বের করে। তারপর একটা ফুল আঁকে, পাখি আঁকে। আমি হচ্ছি ওই লোকটি। ওই নিজেকে খুঁজে পাবার যে আনাড়ি চেষ্টা, সেটাই আমি। আমি ওই আনাড়ি হাতে আঁকা ফুলটি, পাখিটি। আমি অনেক কাজ করতে চাই। তবে তাক লাগিয়ে দিয়ে না, করতালি পাবার জন্য না। আমি নিজেকে ভালোবেসে কাজ করতে চাই। আমি রাখালের বা কৃষকের হাতের কাস্তে বা দড়ি হতে চেয়েছি সবসময়।

কিছুদিন আগে, ভৈরব বেড়াতে গেছিলাম। সেখানে হুট করে আমার ঘুম ভাঙ্গে সমগীতের শব্দে। আমি ক্যামেরা হাতে খুঁজতে বের হলাম যে কে বা কারা। হুট করে মনে হলো, আমি আবার স্বপ্ন দেখিনিতো? ভাবতে ভাবতেই সেই সমগীতের শব্দ আবার কানে এলো। আমি শব্দের উৎস খুঁজে কাছে গিয়ে দেখি, পাঁচজন গ্রাম্য মহিলা গোল হয়ে আদিম একটা সুরে গাইছেন। আমি জানতে চাইলাম, এটা কি গান? তখন তারা আমাকে বললো, এটা ‘পঞ্চসখী’র গান। দেখো, তাদের কেউ চেনে না, কেউ জানে না, তারা কারোর জন্য গায় না। শুধু নিজের জন্য গাইছিলো তারা। আমি ঠিক ওইভাবেই আমার কাজ করে যেতে চাই। মোহ মুক্তিটাই তো জরুরী।

ছবি: জীবন আহমেদ

নিউজনেক্সটবিডি ডটকম/এনডি/টিএস


সর্বশেষ

আরও খবর

হুমায়ূন আহমেদের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ

হুমায়ূন আহমেদের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ


মাইকেল জ্যাকসনের বাবার মৃত্যু

মাইকেল জ্যাকসনের বাবার মৃত্যু


বিশ্ব সংগীত দিবসে শিল্পকলা একাডেমির বর্ণাঢ্য আয়োজন

বিশ্ব সংগীত দিবসে শিল্পকলা একাডেমির বর্ণাঢ্য আয়োজন


না ফেরার দেশে অভিনেত্রী তাজিন

না ফেরার দেশে অভিনেত্রী তাজিন


পেডোফিলিক রাজনীতিকদের নিয়ে আমরা কী করবো!

পেডোফিলিক রাজনীতিকদের নিয়ে আমরা কী করবো!


আত্মপ্রবঞ্চনা নয় বরং আত্মসমালোচনা

আত্মপ্রবঞ্চনা নয় বরং আত্মসমালোচনা


‘লাইফ টাইম অ্যাওয়ার্ড’ পাচ্ছেন আলমগীর

‘লাইফ টাইম অ্যাওয়ার্ড’ পাচ্ছেন আলমগীর


মুক্তি পাচ্ছে শাকিব খান অভিনীত ছবি ‘চালবাজ’

মুক্তি পাচ্ছে শাকিব খান অভিনীত ছবি ‘চালবাজ’


বড় পর্দায় অভিষেক হলো রাকা বিশ্বাসের

বড় পর্দায় অভিষেক হলো রাকা বিশ্বাসের


জামিন পেলেন বলিউডের ‘ভাইজান’ সালমান খান

জামিন পেলেন বলিউডের ‘ভাইজান’ সালমান খান