Tuesday, January 3rd, 2017
‘এই পরবাস অপমানের’
January 3rd, 2017 at 5:08 pm
‘এই পরবাস অপমানের’

ঢাকা:

জঙ্গি হুমকির মুখে সম্প্রতি দেশ ছেড়েছেন লেখক ও সাংবাদিক হুমায়ুন রেজা। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতার সাথে জড়িয়ে থাকা এই মুক্তচিন্তক দেশ ছাড়ার আগে নিজের দীর্ঘশ্বাসগুলোকে অনুবাদ করেছেন দীর্ঘ এক চিঠিতে। যেখানে উঠে এসেছে তার সংগ্রাম, সংসার ও সন্তানের প্রতি তীব্র টান থাকা সত্ত্বেও শেকড়হীন হয়ে যাওয়ায় প্রবল হতাশা। নিউজনেক্সটবিডি ডটকম’র পাঠকদের জন্য হুমায়ুন রেজা’র চিঠিটি হুবহু তুলে ধরা হলো।


গত তিনদিন ধরে লেখার চেষ্টা করছি — কিন্তু কিছুই লিখতে পারছি না। ভয়ে? আতঙ্কে? এ এক অদ্ভ’ত কষ্ট আর যন্ত্রণা। অথচ এই আমিই কি অবলীলাতেই না লিখে গেছি পাতার পর পাতা। রিপোর্ট, ফিচার, সাক্ষাৎকার; দীর্ঘ দু’যুগেরও বেশি সময় ধরে। বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রগতিশীল আর সামনের সারির সংবাদমাধ্যমগুলোতে লিখেছি। সেই ছাত্রজীবনে, আজকের কাগজ থেকে শুরু করে চাকরিসূত্রে ভোরের কাগজ, প্রথম আলো, বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর ডটকমে। এমনকি জার্মানিতে ডয়েচে ভেলেতেও দিনে সাত/আটটা পর্যন্ত লেখা লিখেছি— আমার সে সময়ের সহকর্মী সুপ্রিয়, সঞ্জীব বর্মণের অনুরোধে। ভারত ও বাংলাদেশের নির্বাচিত কবিদের যৌথ সংকলনে কবিতার বই সহ আমার লেখা ছয়টি বই প্রকাশিত হয়েছে। অথচ আজ জঙ্গি হুমকির মুখে আমার কুড়ি বছরেরও বেশি পেশাগত জীবন, সংসার সবকিছু উপড়ে ফেলে শেকড়হীন হয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসার কথাটাই লিখতে পারছি না।

ভোরের কাগজে ২০০৭ সালের ডিসেম্বরের শুরুর দিন থেকে টানা এক মাস প্রতিদিন লিখেছিলাম ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ, যুদ্ধাপরাধী আর এর বিচারিক বাস্তবতা নিয়ে। বাংলাদেশে এর আগে এভাবে আর কোনো কাগজ এমন সাহস দেখায়নি। সে সময় তিন থেকে চারটি রিপোর্ট প্রকাশিত হ্ওয়ার পরই পেয়েছিলাম— না লেখার জন্য নির্দেশ জানিয়ে হত্যার হুমকি। তখন ঠাট্টা করেছি, হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম এসব। আমি ভালবাসি এই ছাপ্পান্ন হাজার বর্গ মাইলকে। বিশ্বাস করতাম ওরা ১৯৭১ সালে যা পেরেছিল, তা আর কখনো ঘটাতে পারবে না কিংবদন্তির এই বাংলাদেশে। কিন্তু এই ২০১৬ সালেও যে সেই মৃত্যু পরোয়ানার ভুত আমার পিছু নেবে তা স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি।

দুমাস আগে, নভেম্বরের শুরুর দিকে প্রথমবার টেলিফোনে হুমকি পাওয়া শুরু করি। তখন বিষয়টি হালকা ভাবেই নিই। নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর- এ দুই মাসে আমাকে ৫/৬ বার টেলিফোনে হুমকি দেওয়া হয়েছে। মাঝ রাতে অপরিচিত সব নাম্বার থেকে ফোন করে বলতো, ইউ আর নেক্সট। বলতো, তোর সময় শেষ; মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হ। ফোনে এসব হুমকি পেয়ে স্তব্ধ নির্বাক হয়ে পড়েছিলাম। চোখের সামনে স্পষ্ট ভেসে উঠেছিল জঙ্গীদের হাতে দেশের তরুণ সব প্রগতিশীল লেখকদের নির্মমভাবে চাপাতি আর ছুরির আঘাতে নিহত হ্ওয়ার ছবিগুলো। ভেসে উঠেছিল আমার দুই আত্মজার ফুটফুটে নিরপরাধ অসহায় মুখ, ক্যানসার সার্ভাইভার প্রিয়তম স্ত্রী ও মায়ের চেহারা।

এখন বাংলাদেশে প্রগতিশীলদের প্রতিনিধিত্বকারী সরকার। ১৯৭১ সালে তাদের নেতৃত্বেই তো এই আধুনিক জঙ্গিদের পূর্বসূরিদের পরাজিত করেছিল বাংলাদেশের সাহসী মানুষেরা। আমারতো ভয় পাওয়ার কথা না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে — এ সরকারের চোখের সামনেই একের পর এক লেখকদের হত্যা করেছে জঙ্গীরা। রীতিমতো ঘোষণা দিয়ে। বাজারের ফর্দের মতো তালিকা করে। একটি হত্যারও কোনো বিচার হয়নি। আজবধি কোনো হত্যার বিচার করা তো দুরের কথা, হত্যাকারীদের ধরতেও ব্যর্থ হয়েছে পুলিশ। আমাকে ভাবতে হয়েছে বিচারহীনতার এই দেশে আমার বা আমার পরিবারের জীবনের নিরাপত্তা সরকার কি করে দেবে।

খুব কাছের দুই একজন ছাড়া কাউকেই বিষয়টা বলতে সাহস পাইনি। পুলিশের কাছে যেতে চেয়েও শেষ মুহূর্তে যাইনি। গিয়ে যে কাজ হবে, সে আস্থাই পাইনি। পুলিশের কাছে গেলে যে কোনো কাজ হয় না; এই অপ্রিয় সত্যটি বাংলাদেশের সবাই জানেন। পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে, নিরাপত্তা নিয়েও জঙ্গীদের হাত থেকে রেহাই পাননি অনেকেই। মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সাবেক সহকারী জুলহাসকে তার কলাবাগানের সুনিরাপদ বাসায় ঢুকে কুপিয়ে হত্যা করেছে ওরা। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের ফোনের পরও জুলহাস হত্যার কোনো সুরাহা করতে পারেনি এদেশের পুলিশ প্রশাসন। ব্লগার ও লেখক রাজীব, বাবু, নিলাদ্রী এমন অসংখ্য নাম আজ হয়ত অনেকে ভুলেও গেছেন। পরিসংখ্যানের জন্য, রেফারেন্সের জন্য তথ্যব্যাঙ্কে পড়ে আছে জঙ্গীদের হাতে নিহত এই সব লেখকদের নাম আর হত্যাকাণ্ডের নির্মম বর্ণনা।

ঢাকা দিনে দিনে আরো তিলোত্তমা হয়ে উঠছে। এখানে এখন একের পর এক ফ্লাইওভার হচ্ছে, মেট্রোরেল হচ্ছে, উন্নতি হচ্ছে সবকিছুরই। কিন্তু বিচারহীনতার একটি সংস্কৃতিও প্রবহমান রয়েছে পাশাপাশি। লেখক নিলাদ্রি চট্টোপাধ্যায়ের নাম কয়জন মনে রেখেছে? ২০১৫ সালের ৭ আগস্ট দুপুরে নিলাদ্রির স্ত্রী আশা আর স্বজনদের সামনেই এই তরুণ লেখককে নির্মমভাবে জবাই করে জঙ্গীরা। নিলাদ্রিকে শিরোচ্ছেদ করে তাকবীর ধ্বনি দিতে দিতে বেরিয়ে যায় খুনিরা।

আমার মতো নিলাদ্রিও হুমকি পেত। সে পুলিশের সহায়তাও চেয়েছিল। আমাদের পুলিশ প্রশাসন সেসব অভিযোগ আমলেই নিতে চায়নি। একটি সাধারণ অভিযোগ দায়েরের নুন্যতম নাগরিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়েছিল নিলাদ্রি। তার হত্যাকারীরা আজও ধরা পড়েনি। বুড়িগঙ্গার স্রোতের মতো এই নির্মম হত্যার বিচারের দাবিও হারিয়ে যাবে একসময়। তার অসহায় স্ত্রীর পাশে কেউ কি দাঁড়িয়েছে? স্বামী হত্যার বিচার এই জীবনে সে দেখে যেতে পারবে – এমন নিশ্চয়তা রাষ্ট্রযন্ত্র দিতে অপারগ। নিলাদ্রির স্ত্রী তাহলে এখন কোথায় যাবে? কার কাছে যাবে?

হুমায়ুন আজাদ হত্যাকাণ্ডের (অথবা হত্যা চেষ্টা – যাই বলা হোক না কেন) বিচার হয়েছে আজ পর্যন্ত? জাতীয় পুরষ্কার প্রাপ্ত, গীতিকার ও সুরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের ভাইকে যে হত্যা করা হল, তার কি কোন কিনারা হবে কখনো? গত কয়েক বছরে যত লেখক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী হত্যা হয়েছে, তার সবগুলোর পরিণতি একই রকমের।

দেশ ছেড়েছি বলে আমাকে যারা কাপুরুষ বলবেন তাদের বলছি, আমি হয়তো আবেগের বশে সাহস দেখিয়ে থেকে যেতে পারতাম দেশে। এসব হুমকি উপেক্ষা করতে পারতাম — নিজেকে সাহসী সাংবাদিক হিসেবে প্রমাণের চেষ্টায়। পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে আবেদনও করা যেত। তারপর কি? একদিন ওরা হয়তো আমাকে সত্যিই মেরে ফেলত। আমার স্ত্রী ও সন্তানরা তখন কার কাছে যেত? আমি এভাবে নিজেকে পরাজিত হতে দিতে চাই না। ঘাতকের চাপাতির নিচে আত্মাহুতি দিয়ে মহান হওয়াটা আমার কাছে দেশপ্রেম মনে হয় না। বরং এসব হত্যা হুমকিকে এড়িয়ে প্রবল ভাবে বেঁচে থাকতে পারা, কলম চালিয়ে যেতে পারাটাই বিজয়ের।

অনেক যুদ্ধ করেছি নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে। অনেক লিখেছি। যখন লেখার জন্য, কবিতার জন্য, স্বজনদের জন্য বেঁচে থাকাটা হুমকির মুখে, তখন এদেশে বসবাস বোকামি। অন্ধকারে ঘাপটি মেরে থাকা আততায়ীর ছুরি আমাকে যতটা ভীত করে, তার চাইতেও বেশি আতঙ্কিত করে রাষ্ট্র যন্ত্রের অসহায়ত্ব।

আমি ক্ষুব্ধ, ক্লান্ত, অসহায়, হতাশ। বাংলাদেশের বাস্তবতা আমাকে আজ দেশান্তরি হতে বাধ্য করেছে। এই অসহায়ত্ব, এই পরবাসী হওয়াটা বড়ই অপমানের। প্রশান্ত পাড়ের অজানা অচেনা এই অস্ট্রেলিয়ায় দুই কন্যা সন্তান আর অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে, প্রিয়জনদের ছেড়ে, আমার স্বদেশকে পেছনে ফেলে উদ্বাস্তু কপর্দকহীন অবস্থায় কি করে বাঁচবো জানি না। একটি অনিশ্চিত অন্ধকার ভবিষ্যতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি। তবু, স্বাভাবিকভাবে যে কটা দিন বাঁচব, তার পুরোটা সন্তান-স্ত্রী আর স্বজনদের জন্য এ পৃথিবীতে নিরাপত্তায়-আনন্দে-প্রতিবাদে কাটিয়ে যেতে চাই। আমার পরবাসী জীবনের কথা ভেবে স্বজনরা যেন বলতে পারে, থাক; ও তো অন্তত বেঁচে আছে, আমার পাঠকরা যেন আমার প্রতিটি লেখায়, প্রতিটি কবিতায় জেগে উঠতে পারে।

যুগে যুগে জীবিত হুমায়ুন রেজারাই এসব হন্যমান জিঘাংসু জঙ্গিদের ভয়ের কারণ। অসহায় শোকার্ত স্ত্রী-কন্যাদের সামনে জঙ্গীদের হাতে নিহত নিথর-নীরব কবি ও সাংবাদিক হুমায়ূন রেজার চাইতে জীবিত কবি ও লেখক, পিতা ও স্বামী হুমায়ূন রেজা অনেক বেশি ধারালো, শক্তিশালী ও সম্ভাবনাময়।

প্রকাশ: তুহিন


সর্বশেষ

আরও খবর

লাল-সবুজের ফেরিওয়ালাদের গল্প

লাল-সবুজের ফেরিওয়ালাদের গল্প


রাজধানীতে বাড়ি ভাড়ায় নৈরাজ্য 

রাজধানীতে বাড়ি ভাড়ায় নৈরাজ্য 


হয়ত শাকিব অপুও থাকবে না

হয়ত শাকিব অপুও থাকবে না


পাঠ প্রতিক্রিয়া: ফরিদপুরে বিতর্ক চর্চা

পাঠ প্রতিক্রিয়া: ফরিদপুরে বিতর্ক চর্চা


শত বছরের ঐতিহ্যবাহী সদরঘাট

শত বছরের ঐতিহ্যবাহী সদরঘাট


‘ছেলেরা পারলে আমরা পারবো না কেন?’

‘ছেলেরা পারলে আমরা পারবো না কেন?’


কঠিন মনের নারী সুমি বেগম!

কঠিন মনের নারী সুমি বেগম!


পাহাড়-বনাঞ্চলে রোহিঙ্গাদের নতুন বসতি

পাহাড়-বনাঞ্চলে রোহিঙ্গাদের নতুন বসতি


ত্রাণ বিতরণে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা

ত্রাণ বিতরণে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা


‘ভাই আমাকে মেরে ফেলেন’

‘ভাই আমাকে মেরে ফেলেন’