Wednesday, August 16th, 2017
একটি আত্মহত্যা ও কিছু প্রশ্ন
August 16th, 2017 at 5:54 pm
একটি আত্মহত্যা ও কিছু প্রশ্ন

কাজি ফৌজিয়া: আজ আমি আবারো সুমিকে নিয়ে লিখছি। কারণ খুব সহজেই সুমি আমার চিন্তার জগত থেকে বিদায় নিচ্ছে না। আমার কাজের ব্যস্ততা অনেক, দিন রাত ২৪ ঘণ্টার মাঝে ১২ থকে ১৪ ঘণ্টাই আমি কাজ করি। আমার জীবনে কোনো অকারণ চিন্তার স্থান নেই, তার মানে সুমিকে নিয়ে চিন্তা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে পরিচিত অপরিচিত যার সাথেই কথা হয় একটাই কথা মেয়েটা কেন মরতে গেল? অনেক নোংরা বাজে কথা তো আছেই বাজারে, তা কতটা সত্য সেটাও সকলে জানতে চায়।

কেউ বলে সে বাংলাদেশে তার বাব মায়ের কাছে কেন গেল না? কেউ বলে ডিপ্রেশন এর ডাক্তার কেন দেখালো না, চাকরি কেন করলো না, কেনো মানুষের কাছে হাত পাতলো? কেউ বলে কেন সে একজন বিবাহিত লোকের প্রেমে পড়ল? এমন হাজারো প্রশ্ন!!

আমি শুধু সবাইকে বলি আপনি তার অবস্থান থেকে চিন্তা করে দেখেন আপনি হলে এর চেয়ে বেশি কি করতে পারতেন? আর এই নোংরা কথা ছড়ানোর দায়িত্ব নিয়েছে তার শ্বশুর বাড়ির লোকজন কিছু বাজে পত্রিকা আর সমাজের কিছু মানুষ যারা পরোক্ষভাবে সুমির মৃত্যুর জন্য দায়ী।

আমাকে সবচেয়ে অবাক করেছে এই নোংরা কথা সবচেয়ে বেশি ছড়াচ্ছে মহিলারা!বাকিদের স্বার্থে আঘাত লেগেছে বা তাদের অনেক লাভ হতে যাচ্ছে সুমির মৃত্যুতে কিন্তু মহিলাদের স্বার্থটা কি বুজলাম না। সুমিকে পাপি বানিয়ে একজন মেয়ে হয়ে একজন মৃত মেয়ের সম্মান হানি করে মহিলারা কোন পুণ্য কামাচ্ছেন আমি জানি না।

আজ আমার এই লেখা সুমিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য নয়; সুমিকে মৃত্যুর জন্য যে সমাজ দায়ী তাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে। আমার প্রিয় বাংলাদেশি সমাজের মানুষ অবাক হচ্ছেন এই কথা শুনে? হা আমি ঠিক ই বলছি, সুমির আত্মহত্যা আমাদের মনে যেমন হাজারো প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে তেমন খুলে দিয়েছে সমাজের মানুষের আসল মেকি চেহারাটা। আমার কথাগুলি প্রায় সময় খুব তিতা হয় কারণ আমি সত্য কথা বলি আর সত্যি নাকি শুনতে তিতাই লাগে। সুমি একলা মরে গেছে কিন্তু প্রতিনিধিত্ব করে গেছে হাজারো মেয়েদের;যাদের কথা এখনো চার দেয়ালের ভিতরে আছে। আমার কথা হেয়ালি লাগছে? ওহ না, আমি আজ সব খুলেই বলব, কিছুই বাদ দিব না কাউকে ছাড়ব না।

প্রথমেই বলি সুমির পরিবারের কথা, তার পরিবার সুমির সাথে যখন মাহফুজের বিয়ে দেয় কতটা খোঁজ খবর নিয়েছে আমি জানি না। আমি যতটা সুমির মুখ থেকে শুনেছি সুমির থেকে মাহফুজ বয়সে অনেক বড় আর সুমি বিয়ের আগে মাহফুজের কাছে জমা পুঁজি যতটা জেনে এসছিল, বিয়ের পরে নিউ ইয়র্কে এসে তা দেখেনি। যখন মাহফুজ স্ট্রোক করে সে নাকি তার পরিবারের কাছে সাহায্য চেয়েছিল কিন্তু মাহফুজের পরিবার মুখ ফিরিয়ে নেয়। সুমি এটাও বলেছিল যে মাহফুজের আমেরিকার আয় এর সিংহ ভাগ তার পরিবারের জন্য খরচ করেছে আর তার বড় বিপদে সেই পরিবার মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আর এখন সুমির মৃত্যুর পরে সেই পরিবারের সদস্যরা কি বলছে তা তো মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা দেখতেই পাচ্ছি। আমার অনুরোধ বাংলাদেশি বাবা মায়ের কাছে, আপনারা শুধু বিদেশে থাকে শুনেই মেয়ে বিয়ে দিবেন না কিছু খোঁজ খবরও নিবেন। এখানে বলার অপেক্ষা রাখে না মাহফুজের মতো দরদী ভাই বা সন্তান অনেকেই আছেন যে নিজের ভবিষ্যৎ চিন্তা না করে পরিবারের জন্য সব লুটিয়ে দেন, এই ঘটনা আমাদের শিক্ষা দিল যে নিজের ভবিষ্যতের কথা ভুলে গেলে চলবে না।

দ্বিতীয় যে সমস্যাটি এই ঘটনায় নজরে আসে তা হলো আমাদের বাংলাদেশ থেকে যে সব মেয়েরা স্বামীর সঙ্গে বা স্বামীর কাছে আসে তাদের বেশির ভাগ বাইরে কাজ করে না; স্বামীদের ভাষায় তারা হাউজ ওয়াইফ বা গৃহিণী। কিছুদিন পূর্বে নিউ ইয়র্ক টাইমের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায় নিউ ইয়র্ক শহরে মহিলা মানসিক রুগীর মধ্যে বাংলাদেশি মহিলাই বেশি, বিশেষ করে যারা কাজ করে না। বউ রা কাজ করলে আমাদের সমাজের মহান স্বামীদের পৌরষত্বে লাগে, অনেকে মনে করে বউরা কাজ করলে অন্য পুরুষের সঙ্গে চলে যাবে! সুমি যখন আসে কেন প্রথম থেকে কাজ করেনি এই কারণ আমার অজানা, হতে পারে আমাদের মাহফুজ সাহেবও বউ এর কাজ করা পছন্দ করত না।

এই মহান(!)স্বামীদের আমি বলব যে সব মেয়েরা বাইরে কাজ করে তারা বিপদকালে একদম অসহায় হয়ে যায় না, বেঁচে থাকার একটা অবলম্বন তাদের হাতে থাকে। আজ যদি সুমি কাজ করত সংসারের এত বড় বিপদে তার টিকে থাকার একটা অবলম্বন থাকত। বিপদে পরে অসহায় সুমি যখন মাহফুজের বন্ধুদের কাছে হাত পেতেছে উপকারের নামে যথেষ্ঠ প্রতারিত হয়েছে। অবশেষে প্রতারণা আর প্রতারকের অত্যাচারে অতিষ্ঠ সুমি নিজের জীবনটাই দিয়ে দিল। মাহফুজ সুস্থ থাকতে সামাজিক কর্মকাণ্ডে দুহাতে ব্যয় করেছে আর তার বিপদে উপকারের নামে সেই সামজিক সংগঠন আর বন্ধুরা তার বউকে মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে দিয়েছে আর তার বাচ্চাকে করেছে এতিম। আমার প্রশ্ন আমার সমাজের ভাইদের প্রতি আপনারা কি চান আপনার বিপদে বা আপনি যদি মরে যান আপনার পরিবার এমন করে হাত পাতুক আর নিজের জন্য অসম্মান ডেকে আনুক? আপনার উত্তর যদি না হয় তো এখন থেকেই মেয়েদের কাজ করতে দিন। একজন কর্মজীবী নারী ঘর বাহির দুই এর দায়িত্ব ভালোভাবে পালন করতে পারে, আর বিপদের সময়ে শক্ত হাতে সংসারের হাল ধরতে পারে।

আল্লাহ যদি কখনো মাহফুজকে সুস্থ করে দেন আমি জানি না কি করে মাহফুজের বন্ধুরা মাহফুজকে মুখ দেখাবে। আমাকে অনেক মহিলা বলছে সুমি কেন মাহফুজের বিবাহিত বন্ধু্র সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলল? এটা অনৈতিক ছিল আমি তাদের কে বলি একটা দিশেহারা মেয়ে কেন নৈতিক ছিল না এটা আপনাকে অবাক করে কিন্তু বন্ধু মাহফুজের অসহায় স্ত্রী ছোট্ট একটি বাচ্চার মা এর দিকে কি করে মাহফুজের বন্ধুরা তাকালো?

নৈতিকতা তো তাদের থাকার দরকার ছিল, সুমির নয়। আমি আমার লেখার সব জায়গায় বন্ধু নয় বন্ধুরা বলছি কারণ আমি জানি সুমি কে মৃত্যু পর্যন্ত নিয়ে যেতে এক ব্যক্তি নয়, বহুজন দায়ী, তা প্রত্যক্ষ হউক বা পরোক্ষ হউক। আবারো আমি বাংলাদেশি সোসাইটি আর সমিতির ভাইদের বলছি নিজের পরিবারকে বঞ্চিত করে যে সমিতির টাকা যোগান দেন আপনি মরলে আপনার পরিবার কে রাস্তায় আনতে এদের মোটেও কষ্ট হবে না অথবা আপনার লাশের দাফন কাফনের জন্যও এরা টাকা দিবে না আপনার নামে চাঁদাবাজি করবে। সময় এখনো আছে, এখনই সচেতন হন, আর নিজের পরিবারের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করেন।

সুমির মৃত্যু ছাড়াও গত কিছুদিন ধরে আরেকটি বিষয় বাংলাদেশি সমাজে খুব আলোচিত সেটি হলো জাকির খানের মৃত্যুর পর তার পরিবার নগরের আশ্রয় কেন্দ্র বা শেলটারে উঠেছে। মাহফুজ আর জাকির খান বাংলাদেশি সমাজের প্রিয় মুখ ও সমাজ কর্মী ছিলেন। সমাজের নানাবিধ কর্মকাণ্ডে তারা দুহাত উজার করে দিয়েছেন, বিনিময়ে আজ দুটি পরিবার সর্বহারা। ইন্ডিয়ার ক্রাইম পেট্রোল নামক অনুষ্ঠানে সঞ্চালক অনুপ সোনি একটা কথা প্রায়ই বলে ‘সবক এক কো শিখ সবকো’ মানে একজনের বিপদ থেকে সকলের শিক্ষা নেয়া উচিৎ। আমার তো মনে হয় জাকির খান আর মাহফুজের ঘটনা আমাদের বাংলাদেশি সমিতির নেতাদের জন্য সকালের সাবধান ঘণ্টা!!এখন তারাই বুঝুক তারা সাবধান হবেন, না অসাবধানতার মুল্য দিবেন। আমার অনুরোধ মহিলাদের কাছে আপনারা সুমির নামে বদনাম না করে তার জন্য দোয়া করেন আল্লাহ যেন আমাদের এ বোন কে মাফ করে দেন আর সামিন যেন ভাল মানুষ হয়। আমি আপনাদের আরো বলব যারা কাজ করেন না, অনুগ্রহ করে কাজ করুন, ছোট হোক, বড় হোক, একটা কিছু করুন যদি কোনো বিপদ আসে আপনি যেন সামাল দিতে পারেন। আমার লেখা পড়ে অনেক ভাই হয়ত গালি দিবেন, আমার গালি খেতে কষ্ট লাগবে না, কিন্তু এই লেখা যদি একটি মেয়েকেও স্বাবলম্বী করতে সাহায্য করে তবেই আমি সার্থক।

 

লেখিকা: মানবাধিকারকর্মী


সর্বশেষ

আরও খবর

হয়ত শাকিব অপুও থাকবে না

হয়ত শাকিব অপুও থাকবে না


পাঠ প্রতিক্রিয়া: ফরিদপুরে বিতর্ক চর্চা

পাঠ প্রতিক্রিয়া: ফরিদপুরে বিতর্ক চর্চা


অপরাজিতা মেয়ের পরাজয়ের গল্প

অপরাজিতা মেয়ের পরাজয়ের গল্প


বাঙালির দ্বি-মুখী লড়াই: হিন্দুত্বের সাথে এবং মুসলমানিত্বের সাথে

বাঙালির দ্বি-মুখী লড়াই: হিন্দুত্বের সাথে এবং মুসলমানিত্বের সাথে


দ্রোহের গুঞ্জন: সংস্কৃতি ও রাজনীতি

দ্রোহের গুঞ্জন: সংস্কৃতি ও রাজনীতি


কেউ কষ্টের কথাগুলি বলতে চায় না

কেউ কষ্টের কথাগুলি বলতে চায় না


আমগো যা কওয়ার ছিলো; তাই কইতাছে বাংলাদেশ: সাঈদী

আমগো যা কওয়ার ছিলো; তাই কইতাছে বাংলাদেশ: সাঈদী


শ্রমিক আর সংবাদকর্মী: সবাই আজ শোষিত

শ্রমিক আর সংবাদকর্মী: সবাই আজ শোষিত


বাজিলো কাহারো বীণা

বাজিলো কাহারো বীণা


নানীর পহেলা বৈশাখ: ভায়লেট হালদার

নানীর পহেলা বৈশাখ: ভায়লেট হালদার