Tuesday, March 14th, 2017
এখানে খুচরা মূল্যে লাশ বিক্রি হয়: সবাক
March 14th, 2017 at 11:57 am
এখানে খুচরা মূল্যে লাশ বিক্রি হয়: সবাক

ছল্যার চায়ের দোকানের পেছনে ময়লা আবর্জনার বিশাল স্তুপ। আবর্জনাগুলো সব পঁচা। নতুন বর্জ্য পড়ে না। এখানে আছে বিভিন্ন প্রজাতির পোকামাকড়-যেসব পোকামাকড় পঁচা আবর্জনায় জন্ম নেয়। এরা ভাবে দুনিয়াটা মনে হয় আবর্জনায় ভরা। আবর্জনা ছাড়াও যে শহরে অনেক কিছু আছে, তা ওরা জানে না। স্তুপের ভেতরে চলাফেরার সুবিধার্থে কয়েকটা পথ আছে। মহাসড়ক, আঞ্চলিক মহাসড়ক, ছোট সড়ক, গলি, চোরাগলি সবই আছে। হয়তো এসব রাস্তার নামও আছে। মৃত কোন মহান পোকামাকড়ের নামে এসবের নামকরণ করা হয়েছে। কিন্তু আজ সবগুলো রাস্তা বন্ধ। বিশালাকৃতির কিছু আবর্জনা এসে পথঘাট সব বন্ধ করে দিয়েছে। একটা মানব শরীরের ছয়টা টুকরা বিচ্ছিন্নভাবে পড়ে আছে। ধীরে ধীরে ফুলেটুলে আরো বড় হচ্ছে। মাথা উঁচু করে বাধার দেয়ালের চূড়া দেখতে গিয়ে কয়েকটি পোকা চিৎ হয়ে পড়ে গেছে। দুয়েকটির কোমর বরাবর ভেঙে গেছে। ভোরের দিকে একটা পোকা হামাগুড়ি দিয়ে উপরে উঠেছিলো। ফিরে আসেনি। এখন সকাল আটটা। রাস্তা বন্ধ আছে রাত তিনটা থেকে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন পতঙ্গেরা বাধা ছেদ করে যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সফল হওয়ার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

সামনের চায়ের দোকানদারের মালিকের নাম সলিম মিয়া। চা দোকানীর নামের আবার শুদ্ধতা বিশুদ্ধতার কী আছে! এলাকার মানুষজন দায়িত্ব নিয়ে নামের মডিফাই করে নিয়েছে। যত্ন সহকারে এখন ছল্যা বলে ডাকে। সলিমের চায়ের দোকানের চেয়ে ছল্যার চা’র দোকান নামটা অনেক কমিউনিকেটিভ। সলিম মিয়াকে কেউ কেউ আদর করে সল্লু মিয়াও ডাকে। এ সল্লু মিয়া সকাল বেলা পানি ফেলতে গিয়ে লাশের টুকরাগুলো দেখেছে। কিন্তু সে চুপ মেরে বসে আছে। কাউকে কিছু বলছে না। পাশের থানার ওসি বহুত ভেজাল মাল। সল্লু মিয়া তা ভালো করে জানে। তাই অন্য কাউকে প্রথমদর্শী বানানোর ধান্দায় আছে। ওই যে পাশের গলির রিকশাওয়ালা ওসমান আসতেছে, তাকে দিয়েই কাজটা সেরে নেয়ার নিয়ত করেছে। সকালে রিকশা নিয়ে বের হয়ে এখান থেকে চা বিস্কুট খেয়ে একটা চুরুট ধরিয়ে প্যাডেল ঘুরিয়ে রুজির পথে রওনা দেয় ওসমান। আজ তাকে একটি লাশের আইনত প্রথমদর্শী হতে হবে। এর আগে দু’য়েকটি সালিশের প্রতক্ষদর্শী হবার অভিজ্ঞতা আছে। তাই ওসমানের প্রতি সল্লু মিয়ার বিশাল আস্থা।

হুদাই চায়ের লিকার আর কিছু পাতা মিশিয়ে সেখানে কয়েকটা আধাপঁচা পান ফেলে ময়লা পানি বানিয়ে ছোট বালতিতে ভরে রেখেছে। ওসমান এসে চায়ের অর্ডার দিয়ে বসেতে নিয়েছে; এমন সময় বাতলিটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে পেছনে ফেলে আসতে।

সল্লু ধরে নিয়েছে ওসমান পানি ফেলতে গিয়ে জোরসে একটা চিৎকার দিয়ে হাউ মাউ করতে করতে দৌড় দেবে। দৌড় দিয়ে এসে ভয়ে কাঁপতে থাকবে। কিন্তু ওসমান ঠিক যেভাবে গেলো, ঠিক সেভাবেই ফিরে এলো। এসে বললো—সল্লু, ছয় পিস পড়ে আছে। রাতে পড়েছে মনে হয়। মালটা এখনো পঁচে নাই। কী করবি?

—সল্লু কিছু না বোঝার ভান করে বললো, কিসের কথা বলস?

—চেহারাতো দেখি নাই, তয় মাইনষের লাশ যে এটা শিওর।

—বলস কী!! কই, চলতো দেখি!

—হাউ কাউ করিস না। ঝামেলায় জড়ায়া লাভ নাই। চুপচাপ থাক।

কিন্তু সল্লু মিয়ার হাউকাউ থামে না। সে আরো জোরে চিৎকার করতে শুরু করলো। চিৎকার করতে করতে আশপাশের বাসাগুলোর জানালার দিকে চোখ বুলালো। অনেকেই উঁকি মেরে দেখছে। সল্লু চাচ্ছে জানালা থেকে সরে মানুষগুলো নেমে আসুক। তারপর সে পুরো ঘটনা বলবে।

সকালে আসতে দেরি করছি। তাড়াহুড়ো করে দোকান খুলছি। কেটলিতে গতকালকের লিকার আছিলো। সেগুলান বালতিতে ঢেলে পানগুলা ধুয়ে নিলাম। এমন টাইমে ওসমান আইলো চা খাইতে। তারে বললাম বালতির পানিগুলা পেছনে ফালায়া দিয়া আয়, আমি চা বানাইতাছি। হঠাৎ চিৎকার শুনতে পেয়ে…। না না চিৎকার নয়, ওসমান এসে যখন ব্যাপারটা কইলো, আমি তখন চিৎকার দিয়া উঠলাম। এ এলাকায় এতদিন থাকি, কখনো এমন ঘটনা দেখি নাই! কী ভয়ংকর ব্যাপাররে বাপ! আমার মাথা ঘুরাচ্ছে, বমি আসতাছে। কেউ একটু মাথায় পানি ঢেলে দেন…।

এসব বলতে বলতে পা ভেঙে পড়ে গেলো সল্লু। এতক্ষণে বাসা থেকে সল্লুর বৌ চলে এসেছে। স্বামীর মাথায় পানি ঢালছে আর বিলাপ করে কাঁদছে।

২.

পার্টি অফিসে জরুরী মিটিং চলছে। নেতা এসেছেন। বেশ উত্তেজিত হয়ে আছেন। ছয় টুকরা করার বিষয়টা বেশি বাড়াবাড়ি হয়েছে বলে বকাবকি করছেন।

—কোন একটা কাজ করতে দিলেই তোরা সমস্যা পাকাস। ছয় টুকরা করার কী দরকার আছিলো? এখন পেপার টিভি এটা নিয়া বহুত প্যাঁচাল পারবো।

—অপারেশনে আছিলাম ছয় জন। তাই ছয় টুকরা হইছে। আপনিতো আর মেশিন দেন নাই। যেটা দিছেন, সেটা দিয়ে ছয়জন মিলে মারতে গেলে টুকরা না করলে পোষায় না।

—চুপ কর শূয়োরের বাচ্চা। এখন ঠ্যালা তো সামলাইতে হইবো আমারে। ট্যাকা কম পাইবি। ঠিকমতো কাম না করলে ট্যাকা দিমু কেমনে। আমারেও তো জবাবদিহি করা লাগে।

—নেতা, জুলুম কইরেন না। এর পরের কামে আর ভুল হইবো না। ট্যাকাটা পুরা দিয়েন। একটা মেশিন কিনুম। আগেরটা ভাঙারির দোকানে বেইচা দিছি।

—কাম শুরুর আগে কামাইল্যায় কিছু কয় নাই?

—হালায় মরতে রাজি হয় না। কইলাম নেতার অর্ডার। হালায় কয়, নেতায় আমারে কিছু কয় নাই। মরতে পারুম না।
—এরপর?

—এরপর আর কী! দিলাম বাহুতে কোপ মাইরা।

—জিনিসটাতো ভালো দিছিলাম। কয় কোপ লাগছে?

—দুইটা। শেষেরটা অত জোরে দিতে হয় নাই। বামহাতটা গেলো পইড়া। কোপ খায়া আমারে দিলো গাইল। এরপর দৌড় দিলো। ওই যে নতুন চাইনিজ জিনিসটা দিলেন না, ওইটা ছুইড়া মারছি। পিঠে গাঁইথা গেছিলো। হালায় পইড়া গেছে। এরপর দেইল্যা, মানিক্যা…

—মাথা ফালাইছস কখন?

—একেবারে শেষে।

—খোদার গজব! তোরা একেকটা অরজিনাল শূয়োরের বাচ্চা। শুরুতে মাথা ফালায়া দিলেই হইতো। পোলাটা দলের জন্য ম্যালা খাটছিলো। ভালাই আছিলো। কিন্তু ঘিলু কম। কানকথা বেশি শুনছে। যাইহোক, আরেকটা কাম আইতাছে। জরুরী কাম। ওই কামে মেশিন দিমু। মানিক্যা একলা যাইবো। দল পাকাইতে হইবো না।

দলের অবস্থা বেশি ভালো না। এ নিয়ে নেতা টেনশনে আছেন। প্রতিপক্ষের কাছে বারবার রাজনৈতিক মার খেতে হচ্ছে। কোনভাবেই মাঠে নামা যাচ্ছে না। মাঠ গরম করার জন্য চিন্তা ভাবনার মাঝপথে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো দলীয় সন্ত্রাসী কামাল। ঘরের কথা পরকে বলে দিয়ে পরপর কয়েকবার বিপদ সৃষ্টি করেছে। তাই ঝরে গেছে। কিন্তু এটা দিয়ে মাঠ গরম হবে না। মাঠ গরমের জন্য জনপ্রিয় কোন নেতাকে ঝরে যেতে হবে। হিট লিস্টে আছে শহর কমিটির সাধারণ সম্পাদক দিদার। আগামীকালের মিটিংয়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

৩.
—দিদার, ব্যাপারটা বুঝো। দলের অবস্থা ভালা না। এ অবস্থায় কাউরে না কাউরে ত্যাগ স্বীকার করতে হইবো। কেন্দ্র থেকে তোমার দিকে ইংগিত পড়েছে। ঝরে যাওন লাগবো। দেখো, আরো বছর দুয়েক আগেই তুমি ঝরে যাইতা। বিশাল অংকের চাঁদা দিয়া দল তোমাকে বাঁচাইছে। মনে করো দুইটা বছর বোনাস জীবন কাটাইলা। এবার দলের জন্য আত্মত্যাগ করো।

—কিন্তু, আমার মনে হয় ইংগিতটা যুক্তিযুক্ত নয়। দলের জন্য ঝরতে কোন আপত্তি নাই। আমি ঝরে গেলে বিশেষ সুবিধা হবে বলে মনে হয় না। আমার ইমেজ অত ক্লীন না। লিগ্যাল মামলা আছে কয়েকটা। শহরের বেশিরভাগ মানুষ আমাকে ভালো জানে না। আমি মরলে মানুষ খুশিই হবে।

—কিন্তু শীর্ষ পর্যায়ে আর কাউরেতো দেখতাছি না।

—আমার মনে হয় বাবলুই বেটার চয়েস। উঠতি নেতা। কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক। ইমেজও ভালো। তার এলাকার মানুষও খুব ভালোবাসে। এটা আসলে আমার নিজস্ব মতামত। দলের বিবেচনার প্রতি সম্মান আছে। আমার কথা ভেবে দেখতে পারেন।

মিটিংয়ে বাবলু উপস্থিত আছে। আজকের মিটিং এর আয়োজনের পুরো দায়িত্ব তার কাঁধে ছিলো। দিদারকে যে কেন্দ্র সিলেক্ট করেছে, এটা বাবলু জানতো। বাড়ি থেকে আসার সময় বৌকে বলেও এসেছে। দিদার ঝরে যাবে। একবারের জন্যও ভাবে নাই, দিদার নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে তার নাম প্রস্তাব করবে। অবশ্য দিদারের কথায় যুক্তি আছে।

—বাবলু, চুপচাপ কেন? দিদারের কথা শুনছো?

—হ্যাঁ লীডার, মন দিয়ে শুনেছি। বেয়াদবি নিবেন না, একটা কথা বলি। আমারতো বয়স একেবারেই কম। এতো অল্প বয়সে ঝরে যাবো?

—অল্প বয়স হওয়াতে তো সুবিধা। তাজা রক্তের দাম বেশি। কাজ হবে বেশি। তাছাড়া আমার মনে হয় দিদার ঠিকই বলছে।

—আমারো তাই মনে হচ্ছে। কিন্তু একদিনের সময় দিতে হবে। রাতে বৌয়ের সাথে আলাপ করি। দেখি সে কী বলে। তারপর না হয় সিদ্ধান্তটা জানাই।

—বৌ বাচ্চা নিয়া চিন্তা কইরো না। তোমার মৃত্যুর পর দলের ফান্ড থেকে দশ লাখ টাকা দেয়া হইবো। সেটা দিয়া তোমার বৌ ব্যবসা বাণিজ্য করে খেয়ে যাইতে পারবো। বয়স কম আছে, চাইলে আরেকটা বিয়াও করতে পারে।

—এসব নিয়ে চিন্তা করি না। আপনাদের প্রতি আস্থা আছে। তবুও একরাত ভেবে দেখি। কাল জানামুনে। ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিলে সবার জন্য মঙ্গল হবে।

মিটিং শেষে সবাই মিলে বাবলুকে অনেক বুঝালো। দীর্ঘ দিনের বন্ধু ফারুক বাবলুর বৌয়ের দায়িত্ব নিতে চায়। এমনকি মেয়ে সন্তানটা নিয়েও কোন সমস্যা নাই। তাকে মেনে নেবে। প্রয়োজনে ওই মেয়ের নামে তার কিছু সম্পত্তি লিখে দিবে। বন্ধু হিসেবে বাবলুকে এতটুকু নিশ্চয়তা দিয়ে বাবলুর বুকে থাপ্পড় মেরে বললো, ‘সাহস হারাসনে, আমিতো আছি!’

বাবলু খুব ভালো করে জানে বৌ কিছুতেই রাজি হবে না। সবদিক দিয়ে স্বামীর প্রতি সন্তুষ্ট সে। মেয়েটিও ফুটফুটে। তিন সদস্যের ছোট পরিবার। আয় উপার্জনও বেশ। এমন সুখের সংসার হাতছাড়া করার সাহস কয়জন নারীর আছে! তার উপর স্বামীর দলের প্রতি তার ভালোবাসাও নাই। কেবল বাবলুকে ভালোবাসে। তাই বৌকে কিছু জানাবে না বাবলু। নিজেরও মরার কোন ইচ্ছে নেই। আগামীকাল মিটিংয়ে কী বলবে-সেটাও বাড়ি আসতে আসতে ঠিক করে ফেলেছে সে।

৪.

—লীডার, সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছি।

—কী সিন্ধান্ত নিলা?

—আমি মরতে পারবো না। কিছু সমস্যা আছে।

—কও দেখি, শুনি!

—আমাদের বাড়িটাতো দেখেছেন। শহরে হলেও একটু বাইরে বলে গ্রামের মতো। একা বাড়ি। ঘরটা দক্ষিণমুখী। উঠোন যেখানে শেষ হয়েছে, ঠিক সেখান থেকেই একটা পুকুর আছে। পুকুরের চারপাশে ছোটখাটো ঝোপঝাড়ে ভরা। বড় গাছ নাই। তাই গরমের দিনে হু হু করে বাতাস আছে। একটা মাত্র বড় গাছ আছে। কদম গাছ। ফুল দিয়েছে। অনেকগুলো ফুল। গত বর্ষায় আপনাকে চারটি ফুল দিয়েছিলাম। দেখেছেন না, কেমন হৃষ্টপুষ্ট!

—হুমম, ফুলগুলা আমার চার মাইয়া ভাগ করে নিয়া গেছিলো।

—ভুলেননি দেখছি! যাই হোক, গাছের সবগুলো ফুল ঝরতে আরো মাস দেড়েক লাগবে। আপনিতো জানেন-ই কদম ফুল কত ভালোবাসি। গতবার ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাচনে কদম ফুল মার্কা নিয়ে পাশ করেছিলাম।

—হ, জেতার পর সবাই তোমারে কদম ফুলের পাপড়ির উপর শোয়াইয়া রাখছিলো। এখনো পষ্ট মনে আছে। কিন্তু এইটাতো অনেক ছোট সমস্যা। এটা ওভারকাম করতে পারবা। তোমার মৃত্যুর পর কবরের পাশে একটা কদম গাছ লাগিয়ে দিবোনে। বর্ষা আসলে কবরের উপর কদম ফুল ঝরে পড়বে। তোমার আত্মা শান্তি পাইবো।

—সমস্যা আরো আছে। ক’দিন পর মেয়ের প্রথম জন্মদিন। আমারে কাছে না পেলে মেয়ে মন খারাপ করবে। এর পরের মাসে আমার দ্বিতীয় বিবাহ বার্ষিকী। বুঝলাম ফারুক তারে বিয়ে করে নেবে; কিন্তু বিয়ের দুই বছরের মাথায় দ্বিতীয় স্বামীর ঘর করবে, ব্যাপারটা খুব বিশ্রী না? এর পনেরো দিন পরে একমাত্র ছোট ভাইয়ের বিয়ে। বাপ মা মরা ভাইটার আমি ছাড়া আর কোন অভিভাবক নাই। এমনিতে এতিম। আমাকে হারালে পুরা নিঃস্ব হয়ে যাবে।

এটা একটা বড় সমস্যা। ফারুকের একার পক্ষে এতোজনের দায়িত্ব নেয়া সম্ভব হবে না। এমনিতেই তার সাত ভাইবোন। বাপ মাও জীবিত। কিন্তু দলের কী হবে! আলটিমেলটি কিন্তু দলের বিপদ কাটতাছে না। নেতার কপালে চিকন ঘাম দেখা দিয়েছে।

—আমাদের আসলে একজন এতিম অবিবাহিত নেতার দরকার। কমিটিতে এরকম মাত্র একজন আছে।

কর্মীদের মাঝে অনেকেই আছে—লিডারের কথার জবাবে বাবলু বললো।

—না বাবলু, এটা আসলে কর্মী টর্মী দিয়ে হইবো না। কমিটির নেতা লাগবো। নইলে ব্যাপারটা জমবো না। আচ্ছা, আমাদের দপ্তর সম্পাদক জাকিরের তো মা বাপ নাই। বিয়া সাদিও করে নাই। প্রেম ট্রেমও মনে হয় করে না। তা ছাড়া জাকিরের জীবনে দলের ম্যালা অবদান। জাকির কী বলো?

—আমি কখনো দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাইনি। কিন্তু আমার লাভটা কী? আমিতো আর বৌ বাচ্চা রেখে যাবো না—ক্ষতিপূরণের প্রশ্নও নাই। আবার ট্যাকাটুকা দিলে কবরে নিয়ে খরচ করার সুযোগ নাই।

—তোমার নামে একটা ক্লাব করবো। মেইনরোড থেকে তোমাদের মহল্লার দিকে যে রাস্তাটা গেছে, সেটার নাম তোমার নামে করে দিবো। আর তোমার নামে উপজেলা ভিত্তিক একটা গোল্ডকাপ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট হইবো প্রতি বছর। মৃত্যুবার্ষিকীতে বিরাট মেজবানীর আয়োজন করা হইবো। আর কী চাও?

—সবগুলা ঠিক আছে। দলের অফিসে আমার কোন ছবি থাকবে না?

—থাকতে পারে। কিন্তু সেটা কেন্দ্র থেকে অনুমোদন করায়া নেওন লাগবো। বিষয়টা আমি দেখবোনে। কেন্দ্রকে রাজি করানোর দায়িত্ব আমার। টেনশন কইরো না।

—ঠিক আছে, কিন্তু মারবেন কীভাবে?

—উপর্যপুরি ছুরিকাঘাতে মারা যাইবা। মরার পর পায়ের হাঁটু হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে ফেলা হবে। চোখ দুইটাও উপড়ে ফেলবে। জিহ্বাটা কাইটা ফেলবে।

—এখানে একটু সমস্যা আছে। আপনিতো দেখেনই আমার ভুড়িটা বেশ স্বাস্থ্যবান। দেখা গেলো পঞ্চাশ ঘাই মারার পরও মরলাম না। যার দরুণ অনেক কষ্ট পাবো। তার চেয়ে বরং মাথায় গুলি করে মারা হোক। মরার পরে ইচ্ছামতো ঘাই মারুক, বাকি যা যা আছে সব করুক। সমস্যা নাই। তবে গুলি কিন্তু একসাথে দুই তিনটা করতে হবে। যাতে করে দ্রুত মারা যাই। বেশি কষ্ট দেয়া যাবে না। জীবনে অনেক কষ্ট করেছি, মরার সময় কষ্ট করতে চাই না।

—এসব মানতে কোন সমস্যা নাই। আর কোন দাবি দাওয়া থাকলে কইতে পারো।

—বড় কোন দাবি নাই। দুইটা রাত ফাইভ স্টার হোটেলে থাকার খুব শখ ছিলো। পারি নাই। যতবার টাকা জমাইছি, ততবার খরচ হয়ে গেছে। বেশি খরচ করুম না। বারে বসে একটু মদ খাবো আর রাতে শুয়ে শুয়ে টিভি দেখবো। রুম ভাড়া আর মদ খরচের বাইরে খরচ করবো না।

—ঠিক আছে। এ টাকা দিদার আর বাবলু বহন করবে। এ সপ্তাহের মধ্যেই সবকিছু সাইরা ফেলন লাগবো। আজ এক বৃহস্পতিবার। আগামী বৃহস্পতিবার রাতে আসল কাজ শেষ করতে হইবো। কাল সন্ধ্যায় আমার বাসায় আইসা কিছু টাকা পয়সা নিয়া যাইও। এ ক’দিন ভালোমন্দ খাইও। দলের প্রতি তোমার এ ত্যাগ স্বীকার আমরা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবো। তুমি মহান হয়ে গেলা।

মিটিং শেষে সবাই জাকিরের সাথে কোলাকুলি করলো। সবার মুখে প্রশংসা আর প্রশংসা। জীবনে প্রথম নেতার সামনে সিগারেট টানার সুযোগও পেলো। একেবারে নেতার পাশে বসে। জাকিরের মাথার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছেন তিনি। এমনকি নেতার এসি গাড়িতে করে আজ বাসায় যাবে।


সর্বশেষ

আরও খবর

লোক-সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে ফ্যাসিবাদ-সাম্রাজ্যবাদকে রুখতে হবে

লোক-সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে ফ্যাসিবাদ-সাম্রাজ্যবাদকে রুখতে হবে


হুমায়ুন আজাদের ৭০তম জন্মবার্ষিকী

হুমায়ুন আজাদের ৭০তম জন্মবার্ষিকী


লাকীর জন্য খেরোখাতা

লাকীর জন্য খেরোখাতা


উনসত্তর : বয়স তোমাকে হারাতে পারেনি

উনসত্তর : বয়স তোমাকে হারাতে পারেনি


ভাঙন-ঘেঁষা ঘাসফুলে কাঁপে শব্দে

ভাঙন-ঘেঁষা ঘাসফুলে কাঁপে শব্দে


মুক্ত কথা: যাদের ঘরে ঈশ্বর খেলেন ঘুড়ি উড়াবার খেলা

মুক্ত কথা: যাদের ঘরে ঈশ্বর খেলেন ঘুড়ি উড়াবার খেলা


অনুগল্প: তেলাপোকা।। সুপ্তা সাবিত্রী

অনুগল্প: তেলাপোকা।। সুপ্তা সাবিত্রী


বর্ষশুরুর কবিতা

বর্ষশুরুর কবিতা


নয়ন খাঁ মঙ্গল শোভাযাত্রায় যে পাঞ্জাবিটি পরবে।। তুহিন দাস

নয়ন খাঁ মঙ্গল শোভাযাত্রায় যে পাঞ্জাবিটি পরবে।। তুহিন দাস


লাখো কণ্ঠে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা

লাখো কণ্ঠে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা