Saturday, September 24th, 2016
এন্টিবায়োটিক বিশ্বের জন্য হুমকি!
September 24th, 2016 at 7:12 pm
এন্টিবায়োটিক বিশ্বের জন্য হুমকি!

তূর্য রহমান, ঢাকা:  গত ২১ সেপ্টেম্বরের কথা, জাতিসংঘের অধিবেশন চলছে। ১৯৩ টি দেশের প্রতিনিধিরা আলোচনা করছেন পৃথিবীর মানুষের স্বাস্থ্য বিষয়ক ঝুঁকি নিয়ে।

জাতিসংঘের বিগত সত্তর বছরের ইতিহাসে মাত্র চতুর্থবারের মত শুধুমাত্র স্বাস্থ্য বিষয়ক সমস্যা নিয়ে মিটিং ডাকা হয়েছে। তবে পার্থক্যটা হল, আগের তিনবারে আলোচনায় যেখানে ছিল এইডস-ইবোলার মত ভয়াবহ রোগ, এবারে সেখানে আলোচনার বিষয় হল রোগের ওষুধ, এন্টিবায়োটিক! 

যে ওষুধ গত একশো বছরে কোটি মানুষের জীবন বাঁচালো, সেটা কিভাবে এখন আমাদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তা চিন্তার সময় এসে গেছে।

জ্বর, ডায়রিয়া, কাশি— মানে মাথার রোগ হোক আর পেটের রোগ, ফার্মেসি থেকে এন্টিবায়োটিক নিয়ে খেলেই ম্যাজিকের মত সেরে যায়। কিন্তু এই ম্যাজিকের খারাপ প্রভাব দেখা যায় হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা ওই রোগির ক্ষেত্রে, সামান্য জ্বরেই যার মরণ-দশা, কোন এন্টিবায়োটিক ওষুধই যার উপর আর কাজ করছে না।

আপনি আমি ফার্মেসি থেকে ওষুধ খেলে কেন আরেক রোগির সমস্যা হবে! কেমন কথা এইটা! অদ্ভুত তাই না!

ব্যাপারটা এরকম, ধরা যাক মি: ‘গ’ এর ডায়রিয়া হল, সাথে পেট ব্যাথা। সাধারণভাবে বলা যায়, পেটে ক্ষতিকর ব্যাক্টেরিয়া সংখ্যায় বেড়ে গেলে ডায়রিয়ার মত রোগ হয়।  ‘গ’ সাহেব ফার্মেসিতে গিয়ে বললেন সমস্যার কথা, সেখানে তাকে দেয়া হল ‘মেট্রনিডাজল’, খেলেই সেরে যাবে!  আসলেও হল তাই, দুই দিন ওষুধ খেয়েই পেট ঠিক, কি দারুণ! এর জন্য ‘খামোখা’ ডাক্তারের ভিজিটের টাকা খরচের কোন মানে হয়।

bacteria

কিন্তু এইখানে হল গিট্টুটা, মেট্রনিডাজল খাওয়ার নিয়ম হল তিন-পাঁচ দিনের কোর্স পূর্ণ করা। দুই দিন ওষুধ খেলে বেশিরভাগ ব্যাকটেরিয়া মরে যায় (সব না কিন্তু)। রোগও সেরে যায় তাতে, তবে কিনা যে ব্যাকটেরিয়াগুলো থেকে যায়, তারা মেট্রোনিডাজলের বিরুদ্ধে লড়াই করা শিখে ফেলে। এবং মলের মাধ্যমে এরা ছড়িয়ে পড়ে পানিতে, পানি থেকে অন্য মানুষের শরীরে, তখন কিন্তু মেট্রোনিডাজল আর এদের বিরুদ্ধে কাজ করবে না। এদের মারার জন্য তখন দরকার হবে আরো শক্তিশালী ওষুধ।

এটা একটা যুদ্ধের মত, যেখানে শত্রু (ব্যাকটেরিয়া) ধীরে ধীরে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে, আর তাকে মারার জন্য প্রতিনিয়ত দরকার হচ্ছে আরো শক্তিশালী অস্ত্র। এই যুদ্ধে আমাদের, মানে মানুষদের অবস্থানটা কোথায় সেই বিষয়ে পরে বলছি (ভয়ের কথাবার্তা শেষে রাখাই ভালো!)

শুধু ফার্মেসি থেকে ওষুধ খেলেই কি এই সমস্যা হয়? উত্তর হল— না।  ভুল ওষুধ খেলে, কম পরিমাণে ওষুধ খেলে অথবা নির্ধারিত সময়ের কোর্স শেষ না করে এন্টিবায়োটিক বন্ধ করে দিলেও একই অবস্থা হয়। সবশেষে উল্লেখ করা কারণটাই আমাদের দেশে বেশি দেখা যায়।

এছাড়া যেসব ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক লাগে না— যেমন সর্দি জ্বর, গলাব্যাথা বা শুকনো কাশি;  সেসব ক্ষেত্রে ‘রোগীকে খুশি করতে’ ডাক্তারদের এন্টিবায়োটিক দেয়ার প্রবণতাও এর জন্য দায়ী। গবাদি পশু-পাখির জন্য যথেচ্ছ এন্টিবায়োটিক ব্যাবহার আরও একটা বড় কারণ এই ক্ষেত্রে।

এইসব ঘটনা এক দিনের না, বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা এইসব বদঅভ্যাসের ফল ভোগ করতে যাচ্ছি আমরা। 

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, এখন কেন এইসব নিয়ে এতো আলোচনা হচ্ছে। 

দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে ভাই।  

বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে, খুব দেরি না, আমাদের বেশিরভাগের জীবদ্দশাতেই এর খারাপ প্রভাব আমরা দেখতে পাবো।

বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় সাত লক্ষ মানুষ মারা যায় এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া দিয়ে ইনফেকশনের কারণে, ২০৫০ সালে এই সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় এককোটিতে! ২০৫০ সাল আসতে হয়তো অনেক দেরি, কিন্তু চিন্তা করে দেখেন, বর্তমান প্রজন্মের বেশিরভাগ মানুষ কিন্তু ওই সময়টায় শেষ বয়সে পৌঁছাবে, ওষুধ-প্রতিরোধী রোগের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবে তারা।

যুক্তরাজ্যের ২০১৪ সালের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, ওষুধ-প্রতিরোধী রোগের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারে। এই অবস্থাকে তুলনা করা যায় ২০০৮ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার সাথে, কেবল পার্থক্যটা হল, আমাদের মত জনবহুল দেশ হবে এই মন্দার প্রধান শিকার।

antibiotic

চিকিৎসার খরচ বাড়বে কয়েকগুণ, কেননা শক্তিশালী ওষুধগুলোর (নতুন প্রজন্মের ওষুধ বলা হয় যাদের) দাম সাধারণ ওষুধের কয়েকগুন বেশি। উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, একটা ‘মেট্রনিডাজলের’ দাম যেখানে ৮-১০ টাকা, চতুর্থ প্রজন্মের ওষুধ ‘কার্বাপেনেমের’ এক একটা ডোজের দামই সেখানে ১২০০ টাকা। খরচের হিসাবটা এখান থেকেই আন্দাজ করা যায়। এন্টিবায়োটিক প্রয়োজন এমন চিকিৎসা, যেমন— পেটের সার্জারি, কেমোথেরাপি, অঙ্গ প্রতিস্থাপন— এসব ক্ষেত্রেও খরচ বেড়ে যাবে বহুগুণ। এবং খরচ বাড়ার চেয়েও ভয়াবহ ব্যাপার হল, এমন সব ওষুধ প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার উৎপত্তি হবে, যাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত কোন ওষুধই কাজ করবে না!

লেখার মাঝে ব্যাক্টেরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের কথা বলেছিলাম। যুদ্ধে টিকে থাকতে হলে নিত্য-নতুন প্রযুক্তির অস্ত্র দরকার হয়। ১৯৮৭ সালের পর থেকে, অর্থাৎ গত প্রায় ত্রিশ বছরে নতুন কোন গ্রুপের এন্টিবায়োটিক আবিষ্কার হয়নি। ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরোধ ক্ষমতা কিন্তু বেড়ে চলছে ঠিকই। সুতরাং এই যুদ্ধে আমরা কতটা পিছিয়ে আছি সেটা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে।

এখন তাহলে উপায় কি? 

উপায় অবশ্যই আছে, মানুষের সভ্যতা বহু বড় বড় বাধা পার করেই এই পর্যায়ে এসেছে।  

এই বছরই জাতিসংঘে এন্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী রোগের বিস্তার রোধে মিটিং হয়েছে, এবং তাতে ১৯৩ দেশের নেতারা প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলারের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সম্মত হয়েছেন, এই ঝুঁকির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য। ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’ (WHO) গত কয়েক বছর ধরেই কাজ করে যাচ্ছে এই বিষয়ক সচেতনতা বাড়ানোর জন্য।

এছাড়া নতুন প্রজন্মের ওষুধ তৈরির জন্যেও কাজ চলছে, এবছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের একদল গবেষক নতুন গ্রুপের এন্টিবায়োটিক আবিষ্কার করেছেন, যা কিনা গত ত্রিশ বছরের মাঝে প্রথম।

who

 

তবে এসব কাজের কোনটাই সুফল নিয়ে আসবে না, যদি আপনি আমি সচেতন না হই, যদি না আমরা নিয়ম নীতি ছাড়া এন্টিবায়োটিকের ব্যাবহার বন্ধ করি। সঠিক ওষুধ, সঠিক পরিমাণে এবং সঠিক সময়ে— এই নিয়মটুকু মানলেই বর্তমান সমস্যা অনেক অংশে দুর করা সম্ভব।

স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন অনুসরণ করার মত, আমরা সেই দেশ, যারা কিনা শতকরা ৯৫ ভাগের বেশি শিশুকে টিকাদানের মাধ্যমে সুরক্ষিত করেছি, শিশু মৃত্যুহার কমিয়ে এনেছি অনেক উন্নত দেশের থেকেও।

সুতরাং, এখনো সময় আছে, আসেন সচেতন হই। এন্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ থেকে নিজেরা বাঁচি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও বাঁচাই।

turza-rahman লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা মেডিকেল কলেজ


সর্বশেষ

আরও খবর

পাবলিক পাঞ্চিং ব্যাগ

পাবলিক পাঞ্চিং ব্যাগ


ধর্ম: প্রশ্নই জগতের প্রাণপ্রবাহ

ধর্ম: প্রশ্নই জগতের প্রাণপ্রবাহ


যাপনে নয়, জীবন উদযাপনের

যাপনে নয়, জীবন উদযাপনের


যে গল্পের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই

যে গল্পের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই


কাশ্মীর: দক্ষিণ এশিয়ার কাইজ্জার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত!

কাশ্মীর: দক্ষিণ এশিয়ার কাইজ্জার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত!


পুলিশ সেবা সপ্তাহ ২০১৯:  তুমি কী আমার বন্ধু!

পুলিশ সেবা সপ্তাহ ২০১৯: তুমি কী আমার বন্ধু!


ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন ফেব্রুয়ারিতে

ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন ফেব্রুয়ারিতে


বট-খেজুরের সখ্য এবং ‘রক্ত-রস’ রহস্য

বট-খেজুরের সখ্য এবং ‘রক্ত-রস’ রহস্য


‘যারা আন্দোলনে ব্যর্থ, তারা নির্বাচনেও ব্যর্থ হন’

‘যারা আন্দোলনে ব্যর্থ, তারা নির্বাচনেও ব্যর্থ হন’


টেকনাফে র‍্যাবের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত ২

টেকনাফে র‍্যাবের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত ২