Saturday, December 23rd, 2017
ডিজিটাল যুগে রাজধানীতে ঘোড়ার বাহন
December 23rd, 2017 at 7:00 pm
ডিজিটাল যুগে রাজধানীতে ঘোড়ার বাহন

এম কে রায়হান, ঢাকা: বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে পরিবর্তন হয়েছে অনেক কিছু। যানবাহনের বেলাতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি এতটুকুও। কালের আবর্তে যানবাহনে অনেক পরিবর্তন হলেও এখনও ঢাকার রাজপথে টগবগিয়ে চলছে প্রাচীন যান ঘোড়ার গাড়ি। এ যেন আধুনিক যুগের প্রাচীন বাহন।

বর্তমানে রাজধানী ঢাকার সদরঘাট ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে থেকে গুলিস্তান গোলাপ শাহ মাজার পর্যন্ত ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত যাত্রী নিয়ে চলাচল করে থাকে প্রাচীন এ বাহন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায় ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে গুলিস্তান গোলাপ শাহ মাজার পর্যন্ত বর্তমানে ৩০ থেক ৪০টি ঘোড়ার গাড়ি চলাচল করে। প্রতিটি গাড়িতে ১০ থেকে ১২ জন যাত্রী বহন করে, ভাড়া জনপ্রতি ১০ টাকা। আর ঈদ, পহেলা বৈশাখের মতো উৎসবের দিনে ২০ থেকে ৩০ টাকা করে ভাড়া নেন তারা। সদরঘাট থেকে গুলিস্তান মাত্র ১০ মিনিটের রাস্তা হলেও যানজটের কারণে কখনো কখনো এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় লাগে। আর নানা অযত্নে ব্যবহৃত প্রাণী ঘোড়াগুলো প্রায়ই অসুস্থ থাকে।

রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে সব মুখবুঝে সহ্য করে দৌড়াতে হয় ঘোড়াগুলোকে। যাত্রীদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়াই যেন এসব ঘোড়ার জীবনের প্রাপ্তি ও সফলতা। এভাবেই চলছে দিন, সপ্তাহ, মাস-বছর। সাঁঝ সকালে পানি-ভুসি খেয়ে ঘোড়াগুলোর শুরু হয় গাড়ি টানা। সারাদিনে তেমন আর কোনো খাওয়া পড়ে না মুখে। সন্ধ্যার আলো গভীর হয়ে রাত নেমে এলেই ঘোড়াগুলো বেঁধে রাখা হয় ফ্লাইওভারের নিচে। সেখানে খেতে দেয়া হয় ছোলার ভুসি আর পানি। মাঝে-মধ্যে ভালো খাবার আয়োজন হলে কপালে জোটে ঘাস।

রাজধানীর পুরান ঢাকায় ঘোড়া, ঘোড়ার গাড়ি আর চালকদের ব্যস্ততা প্রতি মুহূর্তেই চোখে পড়লেও সন্ধ্যার পর থেকে ফুলবাড়িয়ার সেক্রেটারিয়েট রোডের পাশে ফ্লাইওভারের নিচে ঘোড়াগুলোকে বিশ্রাম নিতে দেখা যায়। আর ঘোড়াগুলোর রাত্রিযাপনের কোনো নিরাপদ ব্যবস্থা নেই। রাতের পর রাত তাদের কাটে এখানেই, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। জানা যায় এসব ঘোড়া সপ্তাহে পাঁচদিন যাত্রীবাহী গাড়ি টানে, আর বাকি দু’দিন পার্কে বিচরণের জন্য ছেড়ে দেয়া হয়।

এসব ঘোড়ার মধ্যে অনেক অসুস্থ এবং ঘাড়ে আঘাত পাওয়া ঘোড়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি কোনো ঘোড়ার মালিক। তবে মাসুদ নামের এক ঘোড়ার গাড়ির মালিক নিউজনেক্সটবিডিকে বলেন, ‘আগে এখানে প্রায় ১০০ এর উপর ঘোড়া ছিল কিন্তু এখন আর আগের মত যাত্রী হয়না তাই ঘোড়ার সংখ্যাও কমে গেছে। আর মালিকদের আয় অনেক কমে গেছে তাই অনেক অসুস্থ ঘোড়াকে ঠিক মত চিকিৎসা করানো সম্ভব হচ্ছে না। অনেকে আবার অসুস্থ ঘোড়াকে দিয়েই মানুষ আনা নেয়া করছেন।’

ঘোড়ার মালিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, একটি ঘোড়ার গাড়ির মাধ্যমে সারা দিনে দুই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা যায়। মোঃ ইসমাইল নামের এক ঘোড়ার গাড়ি মালিক জানান, ঘোড়ার খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় আগের চেয়ে ব্যয় বেড়েছে কয়েকগুণ।

তিনি বলেন, ‘মানুষ এখন আর ঘোড়ার গাড়িতে যেতে চায় না। কারণ সময় একটু বেশি লাগে। আবার ভাড়াও বাসের চাইতে একটু বেশি। এছাড়াও প্রতিটি গাড়িতে দু’জন লোকের বেতন, দুটি ঘোড়ার খাবার খরচ এবং রাস্তাঘাটের আরো কিছু খরচ দিয়ে খুব সামান্যই অবশিষ্ট থাকে। তাতে পোষায় না।’

ঘোড়ার খাবার সম্পর্কে জানতে চাইলে মাসুদ বলেন, ‘ঘোড়াগুলোকে গম, ভূষি, ঘাস, ধানের ছিলকা, ছোলা-বুট খেতে দেয়া হয়। রহমতগঞ্জ থেকে আমরা খাবার কিনে আনি। তবে ছোলা, গম, ভূষি ও বুটের দাম বেড়ে যাওয়ায় খাবারের খরচ অনেক বেড়ে গেছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে মূলত পুরনো ব্যবসায়ীরাই এ ব্যবসা ধরে রেখেছেন। তেমন লাভ নেই বলে নতুনরা কেউ আর এ পেশায় আসছেন না।

ঘোড়ার গাড়ি বাড়তি যানজট তৈরি করে কিনা এমন প্রশ্নে সদরঘাটে থাকা ট্রাফিক সার্জেন্ট নাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘গাড়ি মানেই যানজট। যানজটের জন্য আলাদা করে ঘোড়ার গাড়িকে দোষ দেয়ার কিছু নাই। ঘোড়ার গাড়ি ও রিকশার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তবে মাঝে মাঝে কিছু অসুস্থ ঘোড়া রাস্তায় চলতে চলতে থেমে যায় তখন কিছুটা সমস্যার সৃষ্টি হয়।’

ঘোড়ার গাড়ির যাত্রী সৈয়দ মিনারা জামান নিউজনেক্সটবিডিকে বলেন, ‘ঐতিহ্যের বাহন হওয়ায় মাঝে মধ্যে শখে ঘোড়ার গাড়ি দিয়ে গুলিস্তান পর্যন্ত যাতায়াত করি। সাধারণত যাত্রীবাহী বাসগুলোর চেয়ে এই বাহনগুলোতে একটু চাপ কম থাকায় ঘোড়ার গাড়িতে যাতায়াত করতে আনন্দ লাগে।’

অসুস্থ ঘোড়ার পিঠে চরে যাতায়াত করা কতটা মানবিক, এমন প্রশ্নে অতুল নামের আরেক যাত্রী নিউজনেক্সটবিডিকে বলেন, ‘এভাবে আসলে কখনো ভেবে দেখেনি। তবে হ্যা মাঝে মাঝে দেখি কিছু অসুস্থ ঘোড়া অনেক কষ্ট করে গাড়ি বয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু সবাই উঠে বলে আমিও উঠি।’

মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় যাত্রী পরিবহন ছাড়াও পুরান ঢাকায় বিয়ে, জন্মদিন, চলচিত্রের শুটিং ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন সংগঠনের শোভাযাত্রায় ব্যবহার করা হয় গোড়ার গাড়ি। অনেকে বিয়ের অনুষ্ঠানে শখ করে পালকির বিকল্প যান হিসেবে এই গাড়ি ব্যবহার করে থাকেন। বিভিন্ন দিবস অথবা কোনো পণ্যের বিজ্ঞাপনে ঘোড়ার গাড়ি বর্ণিল সাজে সাজিয়ে দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করা জন্য নিচ্ছেন।

সম্পাদনা: জাই


সর্বশেষ

আরও খবর

চীন ও ভারতের গহনার দাপটে অস্তিত্ব সংকটে ঐতিহ্যবাহি ভাকুর্তার গহনা শিল্প

চীন ও ভারতের গহনার দাপটে অস্তিত্ব সংকটে ঐতিহ্যবাহি ভাকুর্তার গহনা শিল্প


‘স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও দেশের এ করুণ অবস্থা দেখে ঘৃণা হয়’

‘স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও দেশের এ করুণ অবস্থা দেখে ঘৃণা হয়’


নতুন প্রজন্মের কাছে চাওয়া তারা যাতে ক্ষমতার লড়াই না করে প্রকৃত দেশপ্রেমী হয়: রওশন আরা বাচ্চু

নতুন প্রজন্মের কাছে চাওয়া তারা যাতে ক্ষমতার লড়াই না করে প্রকৃত দেশপ্রেমী হয়: রওশন আরা বাচ্চু


রাজনৈতিক স্বার্থে নষ্ট হচ্ছে একুশের চেতনা

রাজনৈতিক স্বার্থে নষ্ট হচ্ছে একুশের চেতনা


লাল-সবুজের ফেরিওয়ালাদের গল্প

লাল-সবুজের ফেরিওয়ালাদের গল্প


রাজধানীতে বাড়ি ভাড়ায় নৈরাজ্য 

রাজধানীতে বাড়ি ভাড়ায় নৈরাজ্য 


শত বছরের ঐতিহ্যবাহী সদরঘাট

শত বছরের ঐতিহ্যবাহী সদরঘাট


‘ছেলেরা পারলে আমরা পারবো না কেন?’

‘ছেলেরা পারলে আমরা পারবো না কেন?’


কঠিন মনের নারী সুমি বেগম!

কঠিন মনের নারী সুমি বেগম!


পাহাড়-বনাঞ্চলে রোহিঙ্গাদের নতুন বসতি

পাহাড়-বনাঞ্চলে রোহিঙ্গাদের নতুন বসতি