Saturday, June 9th, 2018
দক্ষিণ এশিয়ার ভাটিয়ালি গণতন্ত্রেরা
June 9th, 2018 at 4:23 pm
প্রাচীন ভারতের প্রতিটি প্রত্ন নগরীর অবস্থাও ঠিক এমন ছিলো। রাজন্যবর্গ আর সেনাপতি ও সৈনিকদের নিয়ে ছিলো উচ্চশহর। আর জনমানুষ আজকের মতোই নিম্ন শহরে বসবাস করতো।
দক্ষিণ এশিয়ার ভাটিয়ালি গণতন্ত্রেরা

মাসকাওয়াথ আহসানদক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশ ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে জাতীয় বাজেটের সর্বোচ্চ বরাদ্দ থাকে সেনা-বাহিনীর জন্য। রাষ্ট্রকে যদি গৃহ ধরি, এই দেশগুলোতে গৃহের শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সংস্কৃতি এসবের চেয়ে বড় বাজেট গৃহের পাহারাদারের জন্য। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশেই শিক্ষা-সংস্কৃতি-স্বাস্থ্যসেবার অবস্থা করুণ। অল্প কিছু ধনী মানুষের বসবাসের এলাকা বাদ দিলে দেশগুলোর সাধারণ মানুষের বসবাসের এলাকাগুলো জীর্ণ-অস্বাস্থ্যকর। এর বিপরীতে দেশগুলোর সেনানিবাসগুলো ইউরোপের মতো উন্নতমানের জীবন নিশ্চিত করে।

প্রাচীন ভারতের প্রতিটি প্রত্ন নগরীর অবস্থাও ঠিক এমন ছিলো। রাজন্যবর্গ আর সেনাপতি ও সৈনিকদের নিয়ে ছিলো উচ্চশহর। আর জনমানুষ আজকের মতোই নিম্ন শহরে বসবাস করতো। এখনও যেমন রাজনৈতিক, বেসামরিক প্রশাসন ও ক্যান্টনমেন্টে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নেই; সেকালেও নিম্ন শহরের মানুষের উচ্চ নগরে প্রবেশাধিকার ছিলো না। সেই প্রত্ন ভারতের উচ্চ-বর্ণ ও নিম্ন বর্ণের মানুষের জীনগত মানস আজকের কথিত আধুনিক দক্ষিণ এশিয়ায় একইভাবে বিরাজ করছে। প্রাচীনকালের রাজা-বাদশাহরা যেমন রাজকর্মচারী ও সেনাবিভাগের লোকদের খুশী রেখে নিজের মসনদ নিশ্চিত করতেন; আজকের দক্ষিণ এশিয়ার দেশেগুলোতে ক্ষমতায় টিকে থাকার কৌশলটিও একই।

ভারত ও পাকিস্তানের কার্যত পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ করার কোন সামর্থ্য নেই। দুটি দেশের হাতে যে পারমানবিক অস্ত্র আছে; তা ব্যবহার করলে দুটি দেশ ধুলায় মিশে যাবে। কিন্তু প্রায়ই আমরা ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের দামামা শুনতে পাই। এই দামামা আসলে সেনা বাজেটে সর্বোচ্চ বরাদ্দ ধরে রাখার জন্য উভয় দেশের সামরিক বাহিনীর মঞ্চস্থ নাটক। ভারত ভূত দেখিয়ে পাকিস্তানের মানুষকে শান্ত রাখা হয়; সার্বভৌমত্বের জন্য সেনা-বাজেট সর্বোচ্চ রাখতে হবে এই বিশ্বাস প্রোথিত করা হয় পাকিস্তানের অধিকার বঞ্চিত মানু্ষের মাঝে। একইভাবে পাকিস্তান জুজু দেখিয়ে ভারতের সেনা-বাজেট সর্বোচ্চ রাখার যৌক্তিকতা দেয়া হয়। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ও ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার কাজ হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার নানা জায়গায় নাশকতামূলক কাজ দেখিয়ে সামরিক বাহিনীর প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরা।

পাকিস্তানের সেনাবাহিনী একধাপ এগিয়ে গিয়ে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিরাজ করছে। জাতিসংঘ মিশনে চাকরির অপশন বাঁচিয়ে রাখতে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী যেহেতু সরাসরি ক্ষমতা গ্রহণের আর কোন সুযোগ দেখছে না; তাই তারা পুরোনো দুটি রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ (নওয়াজ) ও পাকিস্তান পিপলস পার্টিকে মাইনাস টু করে ইমরান খানের পাকিস্তান তেহেরিক ইনসাফ পার্টি বা পিটি আইকে ক্ষমতায় আনতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর জনপ্রিয় নেতাদের ভয় দেখিয়ে পিটি আই-এ যোগদানের নির্দেশ দিচ্ছে বলে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। তারমানে পাকিস্তানে যে কল্পিত গণতন্ত্রের কথা বলা হচ্ছে; তা আসলে সেনা সমর্থিত গণতন্ত্র।

ভারতে গণতন্ত্র খুব প্রাচীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠেছে। কিন্তু পাকিস্তান জুজুর কারণে সেনাবাজেট সর্বোচ্চ রাখতে হয়। ভারতের ক্ষমতায় যে দলই থাকুক; ভারত-পাকিস্তান পররাষ্ট্রনীতিকে শাসন করে সেনাবাহিনীই। অতীতে এরকম বিষয় রাজনৈতিক আভিজাত্যের কারণে বাইরে না এলেও; সাম্প্রতিক বছর গুলোতে ভারতের সেনা প্রধানকে সেই প্রাচীন যুদ্ধ-বিগ্রহের আদলে রণহুংকার দিতে দেখা গেছে। আর ভারতের অভ্যন্তরে জনমানুষ যে কোন অনাচারের প্রতিবাদ জানালে ক্ষমতাসীন দলের পিকেটাররা সেনাবাহিনী ও দেশের প্রতি গভীর প্রেম দেখিয়ে বলে, সিয়াচেনে আমাদের জওয়ান শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ছে; সেদিকে খেয়াল আছে। অযথা প্রতিবাদ করে শত্রুর হাতে অস্ত্র তুলে দিওনা। উল্লেখ্য যে, এই “শত্রুর হাতে অস্ত্র তুলে দিওনা” বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের পিকেটারদের প্রিয় সংলাপ।

ভারত-পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীদ্বয় চিরস্থায়ী যুদ্ধ নাটকের পটভূমি রচনা করে সর্বোচ্চ বাজেট নিশ্চিত করেছে। তাহলে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী কী করে সর্বোচ্চ বাজেট নিশ্চিত করবে। এখানে বিএনপি আমলে ভারত জুজু আর আওয়ামী লীগ আমলে পাকিস্তান জুজুর কিছু খুচরো বাজার থাকলেও; সেনাবাহিনীর পক্ষে স্পষ্ট করে বলা কঠিন, তারা ঠিক কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে! ওদিকে জাতিসংঘ মিশনে চাকরির অপশন বাঁচিয়ে রাখতে গেলে ক্ষমতা দখলের সুযোগ আর নেই। সেকারণেই এক এগারোতে সেনা সমর্থিত সরকারের কনসেপ্টটি চালু করা হয়। সেইখানে মাইনাস টু-র পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হওয়ায়; পাকিস্তানের পিটি আই-এর মতো তৃতীয় জনপ্রিয় কোন দল না থাকায়; মাইনাস ওয়ানে খুশী থাকতে হয় সেনাবাহিনীকে।

সেনা বাজেট যদি সর্বোচ্চ থাকে, বিচার বিভাগকে মাইনাস করে ক্রসফায়ারের মাধ্যমে বিচারদাতা তৃতীয় স্তম্ভ হয়ে পড়তে পারলে; ইচ্ছেমত অপহরণ ও গুম করা গেলে; ভীতিদাতা হিসেবে সরকারের কাছে গুরুত্ব ক্রমেই বাড়তে থাকে। ফলে মাইনাস ওয়ানের পর অবশিষ্ট ওয়ানের সঙ্গে ক্ষমতা-ভাগাভাগি করতে অসুবিধা কোথায়!

আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখে মানবিকতার একটি গল্প শুনে অশ্রু সংবরণ করা আরো কঠিন হয়ে পড়ে। কিছুদিন আগে তিনি বলছিলেন, অর্থের অভাবে জওয়ানদের রুটি খেতে হতো একবেলা। ভাত দেয়া যায়নি। যতদিন জওয়ানরা ভাত পায়নি; ততদিন নিজেই ভাত খাওয়া বন্ধ রেখেছিলাম। এবার যখন জওয়ানদের জন্য ভাতের ব্যবস্থা করা গেলো; কেবল তখনই আবার ভাত মুখে দিলাম। এই গল্পটি দক্ষিণ এশিয়ার গ্রামীণ সংস্কৃতির আদি ও অকৃত্রিম সম্পদ। সেনাসমর্থিত শেখ হাসিনা সরকার, সেনা সমর্থিত মোদি সরকার আর আসন্ন সেনাসমর্থিত ইমরান খান সরকার দক্ষিণ এশিয়ার ভাটিয়ালি গণতন্ত্রের স্মারক হয়ে বেঁচে থাকুক।

মাসকাওয়াথ আহসান

মাসকাওয়াথ আহসান: ব্লগার ও প্রবাসী সাংবাদিক


সর্বশেষ

আরও খবর

‘আপনি হয় আওয়ামী লীগ অথবা জামাত-শিবির-রাজাকার’

‘আপনি হয় আওয়ামী লীগ অথবা জামাত-শিবির-রাজাকার’


মানুষের স্বাধীনতাহরণই দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা

মানুষের স্বাধীনতাহরণই দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা


বদি থেকে মাশরাফি; একই স্বপ্নের দৈর্ঘ্য

বদি থেকে মাশরাফি; একই স্বপ্নের দৈর্ঘ্য


পেডোফিলিক রাজনীতিকদের নিয়ে আমরা কী করবো!

পেডোফিলিক রাজনীতিকদের নিয়ে আমরা কী করবো!


হ্যাশট্যাগ স্ট্যান্ড ফর রিচ কিড গ্যাং

হ্যাশট্যাগ স্ট্যান্ড ফর রিচ কিড গ্যাং


আত্মপ্রবঞ্চনা নয় বরং আত্মসমালোচনা

আত্মপ্রবঞ্চনা নয় বরং আত্মসমালোচনা


কোটা সংস্কার আন্দোলনে কেউ হারেনি; কেউ জিতেনি

কোটা সংস্কার আন্দোলনে কেউ হারেনি; কেউ জিতেনি


কোটার ভ্রমর ও বঙ্গপাঞ্জাবির দিনগুলি

কোটার ভ্রমর ও বঙ্গপাঞ্জাবির দিনগুলি


চিরচেনা বৈশাখের নববর্ষ

চিরচেনা বৈশাখের নববর্ষ


মাদ্রাসায় পোড়ালাশ…!!

মাদ্রাসায় পোড়ালাশ…!!