Monday, May 29th, 2017
দ্রোহের গুঞ্জন: সংস্কৃতি ও রাজনীতি
May 29th, 2017 at 11:27 am
দ্রোহের গুঞ্জন: সংস্কৃতি ও রাজনীতি

মাসকাওয়াথ আহসান: বাঙ্গালী উদার সংস্কৃতির মানুষ। সে পৃথিবীর সব ভাষা ও সংস্কৃতির সুন্দর উপাদানগুলোকে তার জীবন নদীতে মিশিয়ে নিতে রাজী। এক্ষেত্রে ইচ্ছার স্বাধীনতা বাঙ্গালীর মনের গভীরতম চাওয়া। তাই সে নিজের ইচ্ছাতে অন্য সংস্কৃতির মঙ্গল উপাদান খুঁজে নিতে জানে। কিন্তু বাঙ্গালীর ওপর জোর করে কোন সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়া কখনোই সম্ভব হয়নি।

বাঙ্গালী আসলে তার নিজস্বতা হারাতে রাজী নয়। বৃটিশেরা তাদের সংস্কৃতি চাপিয়ে দিতে গিয়ে প্রথম প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়েছে বাঙ্গালীর কাছ থেকেই। তবে পশ্চিমা সংস্কৃতির সুন্দর দিকগুলোকে বাঙ্গালী স্বাগত জানাতেও কার্পণ্য করেনি। পাকিস্তানীরা জোর করে উর্দু ভাষা চাপিয়ে দিতে গিয়ে ভাষা আন্দোলনের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিষিদ্ধ করার পাকিস্তানী নোংরামীকে বাঙ্গালী রুখে দিয়েছে। আবার বাঙ্গালী সংগীতে, চিত্রকলায়, চলচ্চিত্রে পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক ভিত্তি তৈরীতে সক্রিয় অবদান রেখেছে। যা কিছু সুন্দর তার সঙ্গে বাঙ্গালী থেকেছে; কিন্তু যা কিছু কুতসিত তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে।

বাঙ্গালী সাংস্কৃতিক মুক্তি আন্দোলনে সতত সক্রিয়। এটি তার মানসিক গড়নের মাঝের “মুক্তি” -র চিরন্তন আকাংক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। বাঙ্গালীর সাংস্কৃতিক আন্দোলনগুলোই এক সময় রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত হয়। ফলে কতৃত্ববাদী কোন শাসককেই সে গ্রহণ করতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধ বাঙ্গালীর মুক্তির আকাংক্ষার হিরণ্ময় দৃষ্টান্ত।

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর অনেকেই ধারণা করেছিলো; বাঙ্গালী বুঝি এবার কথিত ভারতীয় সংস্কৃতির দাস হয়ে পড়বে। কিন্তু তা হয়নি। আবার বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর অনেকে ভেবেছিলো বাঙ্গালী আবার কথিত পাকিস্তানী সংস্কৃতির দাস হয়ে যাবে। কিন্তু তা হয়নি। পালা করে ভারতীয় সংস্কৃতি ও পাকিস্তানী সংস্কৃতির দাস হয়ে যাবার আশংকা নিয়ে দুটো পক্ষ অনেক লোফালুফি করে অবসর বিনোদন করলেও বাঙ্গালী কারোরই সাংস্কৃতিক দাস হয়নি। বাঙ্গালীর জীবনের একমাত্র আকাক্ষা মুক্ত জীবন যাপন করা। তাকে দাস করবে কার সাধ্য!

একবিংশ শতকে এসে সৌদি আরবের সংস্কৃতি আগ্রাসী ভূমিকা নিয়ে হাজির হয় বাঙ্গালীর সামনে। সৌদি আরবে বিপুল সংখ্যক বাঙ্গালী চাকরি করতে যাবার সূত্র ধরে সৌদি আরব বাঙ্গালীকে সাংস্কৃতিক দাস করার চেষ্টা করেছে। জামায়াতে ইসলাম “আল্লাহর ভয়” দেখিয়ে সৌদি সংস্কৃতিকে বাঙ্গালী সংস্কৃতির মাঝে মিশিয়ে দেবার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। খানিকটা সফলও হয়েছে। কিন্তু যে সৌদি আরব মুসলিম বিদ্বেষী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে মুসলিম দেশ ইয়েমেন ও ইরানে হামলার জন্য জোট বাঁধছে; সেই সৌদি আরবের দেখানো কথিত “আল্লাহর ভয়কে” বাঙ্গালী আর কী করে বিশ্বাস করবে!

প্রতিটি ধর্মের সত্য-সুন্দর-মঙ্গলের উপাদান নিয়ে বাঙ্গালীর জীবন। নদী মানুষ বাঙ্গালী মুখে মুখে ছড়া বাঁধা, সুর দেয়া, গান করার জীনগত বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ। গোটা পৃথিবীর মানুষই জানে, এমন বাঙ্গালী খুঁজে পাওয়া কঠিন; যার কন্ঠে সুর নেই। সুরের মানুষ বাঙ্গালীকে অসুরের চাপাতি দিয়ে সৌদি সুরহীনতার দাস করতে চাইলে তা প্রত্যাখ্যাত হতে বাধ্য। ছবি আঁকা, ভাষ্কর্য তৈরির সংস্কৃতি গোটা পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতার মত বাঙ্গালীর প্রাচীন সভ্যতার সুন্দর উপাদান হিসেবেই রয়ে গেছে। সেইখানে কথিত “আল্লাহর ভয়” দেখিয়ে বাঙ্গালীকে ছবি আঁকা বা ভাষ্কর্য তৈরী থেকে দূরে রাখা অসম্ভব।

বাঙ্গালীকে সুন্দর যে কোন কিছু চর্চায় বাধা দিলেই সে বিদ্রোহ করে। সুতরাং সমকালীন সাংস্কৃতিক দ্রোহটি দ্রুতই ছড়িয়ে পড়বে। এসময় শাসকগোষ্ঠীকে খুব বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বাঙ্গালীর অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জামায়াতে ইসলাম বা হেফাজতে ইসলামের কষ্টকল্পিত ভোট-ব্যাংকের চেয়ে বাঙ্গালীর সাংস্কৃতিক মুক্তির আকাংক্ষা অনেক বেশী শক্তিশালী। এটি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হলে সাংস্কৃতিক দ্রোহটি রাজনৈতিক দ্রোহে পরিণত হবে। ভুলে গেলে চলবে না; বাঙ্গালী মুক্তিযোদ্ধার জাত।


সর্বশেষ

আরও খবর

হয়ত শাকিব অপুও থাকবে না

হয়ত শাকিব অপুও থাকবে না


পাঠ প্রতিক্রিয়া: ফরিদপুরে বিতর্ক চর্চা

পাঠ প্রতিক্রিয়া: ফরিদপুরে বিতর্ক চর্চা


একটি আত্মহত্যা ও কিছু প্রশ্ন

একটি আত্মহত্যা ও কিছু প্রশ্ন


অপরাজিতা মেয়ের পরাজয়ের গল্প

অপরাজিতা মেয়ের পরাজয়ের গল্প


বাঙালির দ্বি-মুখী লড়াই: হিন্দুত্বের সাথে এবং মুসলমানিত্বের সাথে

বাঙালির দ্বি-মুখী লড়াই: হিন্দুত্বের সাথে এবং মুসলমানিত্বের সাথে


কেউ কষ্টের কথাগুলি বলতে চায় না

কেউ কষ্টের কথাগুলি বলতে চায় না


আমগো যা কওয়ার ছিলো; তাই কইতাছে বাংলাদেশ: সাঈদী

আমগো যা কওয়ার ছিলো; তাই কইতাছে বাংলাদেশ: সাঈদী


শ্রমিক আর সংবাদকর্মী: সবাই আজ শোষিত

শ্রমিক আর সংবাদকর্মী: সবাই আজ শোষিত


বাজিলো কাহারো বীণা

বাজিলো কাহারো বীণা


নানীর পহেলা বৈশাখ: ভায়লেট হালদার

নানীর পহেলা বৈশাখ: ভায়লেট হালদার