Wednesday, February 21st, 2018
নতুন প্রজন্মের কাছে চাওয়া তারা যাতে ক্ষমতার লড়াই না করে প্রকৃত দেশপ্রেমী হয়: রওশন আরা বাচ্চু
February 21st, 2018 at 1:10 pm
নতুন প্রজন্মের কাছে চাওয়া তারা যাতে ক্ষমতার লড়াই না করে প্রকৃত দেশপ্রেমী হয়: রওশন আরা বাচ্চু

এম কে রায়হান: বায়াহান্নোর ভাষা আন্দোলনের কথা বললেই যাদের কথা ভেসে উঠে তার মধ্যে রওশন আরা বাচ্চু অন্যতম। ২১ সে ফেরব্রুয়ারির অন্যতম সাক্ষী তিনি। আন্দোলনের ৬৫ বছর পরও তিনি ভোলেননি সেই দিনগুলোর কথা। আজও তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে ভয়াল সেই দিনের কথা। সম্প্রতি নিউজনেক্সটবিডি ডটকম এর এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপ হয় রওশন আরা বাচ্চুর। যেখানে তিনি ভয়াল সেই দিনগুলোর বর্ণনা দেন।

১৯৫২ সালে কেন ভাষার জন্য আন্দোলন করা হলো?

রওশন আরা বাচ্চু: ১৯৫২ সালে আমরা যে সংগ্রাম করেছিলাম তার পেছনে অনেকগুলি কারণ ছিল। ১৯৪৭ সালে যখন দেশ বিভাজন হয়ে গেল তখন আমরা আশা করেছিলাম ২০০ বছরের গোলামি বুঝি এবার শেষ হলো। কিন্তু দেশ যখন ধর্ম ভিত্তিক ভাগ হয়ে গেল আমরা দেখতে পেলাম একটা ষড়যন্ত্রের স্বীকার হয়েছি। আমরা শোষিত হচ্ছি, শাসিত না। অর্থনৈতিক, সামাজিক আর রাজনৈতিকভাবে আমরা বৈষম্যের স্বীকার হচ্ছি। তার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ আমরা একটা বিক্ষোভ করি। এর আগে ১৯৪৮ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ধীরেন দত্ত গণপরিষদের সভায় উপস্থাপন করেন যে, ৬ কোটি ৯০ লাখের মধ্যে ৪ কোটি ২০ লাখই আমরা পূর্ব পাকিস্তানবাসী। সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও আমরা কেন বাংলা ভাষাকে আমাদের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ব্যবহার করতে পারছি না। কিন্তু তার এ দাবি কেউ কর্ণপাত করল না। পাকিস্তানের তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানসহ আরো অন্যান্য নেত্রী স্থানীয় ব্যক্তিরা এই বিষয়টা গুরুত্বের সাথে নেয়নি। এমনকি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নাজিম উদ্দিন সাহেবও বিষয়টি গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেননি। বরং গণপরিষদের ভাষা উর্দু এবং ইংরেজিতে হবে বলে ঠিক করেন, এমনকি পাবলিক সার্ভিস পরীক্ষাতে বাংলাকে বাদ দেয়া হলো। এগুলো আমাদের জন্য প্রকট হয়ে দেখা দিল। আমরা এর প্রতিবাদ করলাম। তারই ফলশ্রুতিতে আমরা ১১ মার্চ সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করি। ১১ মার্চের সেই বিক্ষোভে আমরা নাজিম উদ্দিন সাহেবকে একটা চুক্তিতে আনতে বাধ্য করি এবং তিনি সব কিছু মেনে নিয়ে সেই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন এবং আমাদের দাবি দাওয়া বাস্তবায়নের কথা দেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি সেই চুক্তি ভঙ্গ করেন। তিনি যদি সেই চুক্তি ভঙ্গ না করতেন তাহলে ২১ তারিখের জন্মই হতো না।

১৯৫২ সালের সেই দিনগুলোর কিছু কথা যদি বলতেন।

রওশন আরা বাচ্চু: ২০ ফেব্রুয়ারি যখন কারফিউ ও ১৪৪ ধারা জারি করা হলে সেই রাতেই আমরা নওয়াবপুরে একটা মিটিং করি। সেই মিটিং এ ১৪৪ ধারা ভঙ্গের জন্য একটা ভোটাভুটি করি এবং সেখানে আমরা (বিশ্ববিদ্যালয় এর সংগ্রাম পরিষদ) ১১/৪ ভোটে হেরে গেলাম। কিন্তু সর্বদলীয় এক্সন কমিটি বলেন আমরা আস্তে আস্তে প্রশাসনিক ভাবে এটাকে অর্জন করে নিব। কিন্তু তারপরেও আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয় এর ছাত্রছাত্রী ছিলাম তারা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম এবং সিদ্ধান্ত নিলাম যে পরদিন আমরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করব।

কিভাবে ২১ ফেব্রুয়ারির প্রস্তুতি নিলেন?

রওশন আরা বাচ্চু: যেহেতু আমরা মেয়েরা সংখ্যায় কম ছিলাম তাই আরো মেয়েদের জোগাড় করি। আমরা বিভিন্ন স্কুল, কলেজ এমনকি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থীদেরও জড়ো করে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে যেতেই আমরা দেখি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে অনেকগুলো ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে এবং মাঠের ভিতরে অনেক ছাত্রছাত্রী সমবেত হয়েছে। তখনই দেখলাম দুই গ্রুপের মধ্যে তর্ক বিতর্ক হচ্ছে যে ১৪৪ ধারা ভাঙ্গা হবে কি হবে না। এর মধ্যেই ১২টার দিকে আমাদের সভা শুরু হলো। ২০ তারিখের পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী গাজীউল হককে সভার সভাপতি করা হলো এবং তাকে বলা হলো তিনি যদি গুলিবিদ্ধও হন তাও যাতে তিনি চেয়ার থেকে না ওঠেন। হাবিবুর রহমান সেলিমকে বলা হলো উনি যাতে মিছিলের সামনে থাকেন। কারণ উনি খুব লম্বা চওড়া ছিলেন এবং খুব ভালো শ্লোগান দিতে পারতেন। এর মধ্যে তৎকালীন উপাচার্য মোয়াজ্জেম হক আরো কিছু শিক্ষক নিয়ে আমাদের কাছে এসে বললেন, তোমরা আন্দোলন করো না, তোমাদের বিপদ হতে পারে। এ কথা শুনে ছাত্ররা বিনয়ের সঙ্গে বললেন যে, স্যার এটা আমাদের জাতীয় প্রশ্ন, আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন আমরা আপনাদের এই কথা রাখতে পারব না। এর পরে গাজীউল হক ভাষা সৈনিক মতিনকে কিছু বলার জন্য বললেন। বারুদের মধ্যে আগুন লাগিয়ে দিলে যেই অবস্থার তৈরি হয় ঠিক তেমন একটা অবস্থায় মতিন সাহেব মঞ্চে উঠেই বজ্রকণ্ঠে বললেন, আপনারা কিীকরতে চান? ১৪৪ ধারা ভাঙবেন নাকি ভাঙবেন না? তখন সবাই উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠল আমরা আমাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকব, আমরা ১৪৪ ধারা ভাঙবই ভাঙব।

কখন এবং কিভাবে গুলি বর্ষণ হয়?

রওশন আরা বাচ্চু: যখন আমরা বের হওার সিদ্ধান্ত নিলাম তখন সামাদ আজাদ বললেন যে ১০ জন ১০ জন করে বের হব এবং প্রতিটা দলের শুরুতে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আড়াই হাত লম্বা লাঠি বেরিকেট দেয়া ছিল এবং ১৫/২০ হাত দূরে রাস্তার ওপাশে হাটুভাঙ্গা অবস্থায় দাঙ্গা পুলিশ রাউফেল তাক করে বসে আছে। প্রথম দলে বের হলেন ডঃ সুফিয়া খাতুন, দ্বিতীয় দলে বের হলেন হাবিবা খাতুন, তৃতীয় দলে যখন আমি বের হলাম তখন আমি বেরিকেট ভেঙে বের হওার সিদ্ধান্ত নেই এবং তাই-ই করি। বেরিক্যাড ভাঙ্গার সাথে সাথে আমার ওপর সাথে সাথে লাঠি চার্জ শুরু হয়। তার মধ্যেই হঠাৎ করে টিয়ারশেল নিক্ষেপ শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যেই গোটা এলাকা অন্ধকারে ছেয়ে যায়, চোখ জ্বালা পোড়া শুরু করে, চোখ দিয়ে পানি পড়া শুরু করে, কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। আমরা দৌড়াচ্ছি আর মুখে মুখে শ্লোগান দিচ্ছি ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, রাজবন্দিদের মুক্তি চাই, চল চল এসেম্বলিতে চল’। আমরা যখন মেডিকেল মোড়ে আসলাম হঠাৎ করে গুলিবর্ষণ শুরু হয়। পুলিশ মেডিকেলের মোড়টা ঘিরে রেখেছে বলে আমরা আর সেদিকে যেতে পারছিলাম না। হঠাৎ করে দেখি রাস্তা ফাঁকা হয়ে গেছে। আমাদের সাথে থাকা অনেককেই ট্রাকে করে ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ।

আপনারা যে চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ভাষা আন্দোলন করেছিলেন তার কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে?

রওশন আরা বাচ্চু: আমাদের একুশের চেতনা থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পর্যন্ত আমরা যা অর্জন করেছি তা আমরা ধরে রাখতে পারছি না। কারণ আমরা চেয়েছিলাম গণতন্ত্র, জাতি ধর্ম নিরপেক্ষতা, মানবিকতা। কিন্তু এখন আমরা সেই চেতনা আমাদের মধ্যে লালন করতে পারছি না। এটা আমাদের ব্যর্থতা, এটা একুশের চেতনার ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতা আমাদের কষ্ট দেয়, আমাদের পীড়া দেয়।

এই ব্যর্থতার জন্য আপনি কাকে দায়ী করছেন?

রওশন আরা বাচ্চু: এই ব্যার্থতা আমাদের নীতিনির্ধারকদের কারণে হচ্ছে। আমরা সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চেয়েছিলাম। আমরা আমাদের খেটে খাওয়া মানুষ, আমাদের কৃষক, আমাদের শ্রমিক এদের কথা আমরা ভাবছি না। কিন্তু আমরা আন্দোলন করেছিলাম পুরো জাতীর কথা ভেবে। এখন আমরা শুধু ভাবছি উচ্চবিত্তের কথা।

তরুণ প্রজন্মের জন্য আপনার উপদেশ কী?

রওশন আরা বাচ্চু: নতুন প্রজন্মের কাছে আমার একমাত্র চাওয়া তারা যাতে প্রকৃত দেশপ্রেমী হয়। ক্ষমতার লড়াই না করে কিভাবে দেশকে এগিয়ে নেয়া যায় সে চিন্তা থাকতে হবে সবার মাঝে। ধনী গরীব সবাই মিলে কিভাবে শান্তিপূর্ণ ভাবে থাকা যায় সেই লক্ষ্য স্থির করতে হবে।

সম্পাদনা: এম কে আর


সর্বশেষ

আরও খবর

ফের কমলো স্বর্ণের দাম

ফের কমলো স্বর্ণের দাম


বছরের উষ্ণতম তাপমাত্রার রেকর্ড ঢাকায়

বছরের উষ্ণতম তাপমাত্রার রেকর্ড ঢাকায়


এইচএসসিতে পাশের হার ৬৬.৬৪%, গতবছর থেকে কমেছে ২.৭%

এইচএসসিতে পাশের হার ৬৬.৬৪%, গতবছর থেকে কমেছে ২.৭%


হুমায়ূন আহমেদের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ

হুমায়ূন আহমেদের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ


যেভাবে জানা যাবে যেভাবে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল

যেভাবে জানা যাবে যেভাবে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল


বাড়ি ফিরছে গুহায় আটকে পড়া থাই কিশোররা

বাড়ি ফিরছে গুহায় আটকে পড়া থাই কিশোররা


কাল এইচএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ

কাল এইচএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ


জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে: শেখ হাসিনা

জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে: শেখ হাসিনা


কিংবদন্তি নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার শততম জন্মবার্ষিকী আজ

কিংবদন্তি নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার শততম জন্মবার্ষিকী আজ


ভল্টের স্বর্ণ হেরফের হয়নি: বাংলাদেশ ব্যাংক

ভল্টের স্বর্ণ হেরফের হয়নি: বাংলাদেশ ব্যাংক