Wednesday, April 12th, 2017
নানীর পহেলা বৈশাখ: ভায়লেট হালদার
April 12th, 2017 at 10:50 am
নানীর পহেলা বৈশাখ: ভায়লেট হালদার

আবীর ও মিনা কলেজ থেকে ফিরে দেখে ছোট মামাকে সাথে নিয়ে নানী এসেছে গ্রাম থেকে। নানী ও মামাকে দেখে নিমিষেই দুপুর রোদে পোড়া গরমের ক্লান্তি ছুটে গেছে দেহমন থেকে। ওরা নানীকে খুব ভালবাসে। সেই ছোটবেলা থেকে যতবারই নানীর সঙ্গ পেয়েছে ততবারই দারুণ মজায় কেটেছে দিনগুলো।

….—‘নানী এবার কিন্তু অনেকদিন থাকতে হবে আমাদের সাথে। অনেক অনেক গল্প শুনবো আর তোমাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াবো।’ মিনা বলল।
….—‘আগে হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আয়, দুপুরের খাওয়া শেষ করে তবেই মামা ও নানীর সাথে গল্প করিস।’ মা বলল।
ছয় চেয়ারের ডাইনিং টেবিলে মিনা, আবীর, মামা, নানী খেতে বসেছে; মা খাবার বেড়ে দিচ্ছে। টেবিলে হরেক রকমের ভর্তা, আলু ভর্তা, ডাল ভর্তা, বেগুন ভর্তা, শুটকি ভর্তা ও টমেটো ডাল। আজকের টেবিলের সাজানো ভর্তাগুলো অন্যদিনের বানানো ভর্তাগুলো থেকে আলাদা। নিশ্চয়ই নানী নিজ হাতে বানিয়েছে। মিনার বাবা দুপুরে বাসায় ফেরেন না, একবারে অফিস শেষ করে সন্ধ্যায় বাড়ী ফেরেন।
….—‘বুবু তুমিও খেতে বসে যাও আমাদের সাথে, আমাদের যার যা দরকার নিয়ে নেবো।’ মামা বলল মাকে।
দুপুরের খাবার খেতে খেতে বেশ গল্প হচ্ছিল, হঠাৎ ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেল। মাথার উপর ঘুরতে থাকা ফ্যান মূর্তির মত দাঁড়িয়ে গেল। ভর্তার ঝালে একে তো জিভ জ্বলছে আর নাক-চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। অন্যদিকে চৈত্রের গরম। ঘামে সমস্ত জামা ভিজে জবজবে অবস্থা, মনে হয় যেন আরেকবার গোসল দিয়ে উঠেছে।

বিকেলবেলা আজ শখ করে চা বানাল মিনা, চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মিনা বলল,
….—‘নানী, এবারের নববর্ষ তুমি আমাদের সাথে পালন করবে, তোমাকে নিয়ে আমরা মঙ্গল শোভাযাত্রা ও বৈশাখী মেলায় যাবো।’
….—‘মঙ্গল শোভাযাত্রা মানে কী?’
….—‘আরে নানী মঙ্গল শোভাযাত্রা বুঝলে না!?’
….—‘না, আমাদের সময়ে তো এসব ছিল না, তাছাড়া আমি গ্রামে থাকি। আমাদের গ্রামে এসব তো আর হয় না, তাই জানি নে বাপু।’
….—‘আচ্ছা নানী, বলছি তবে শোন। ১৯৮৯ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে সর্বপ্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হয়। প্রতিবছর চারুকলার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করার উদ্যোগ অব্যাহত রাখে। যদিও তখন এই শোভাযাত্রাকে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ বলা হত। পরে ১৯৯৬ সাল থেকে এর নাম হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। সকল মানুষের জন্য সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি কামনা করে আনন্দময় মিলনের বার্তা পৌঁছে দেয় এ শোভাযাত্রা। নববর্ষের সকালে চারুকলা ইন্সটিটিউট কাগজ দিয়ে তৈরি ও হরেক রঙে অঙ্কিত বিশালকায় চারুকর্ম যেমন পুতুল, হাতি, কুমীর ও ঘোড়াসহ বিচিত্র মুখোশ ও সাজসজ্জাসহ বাদ্যযন্ত্র ও লোকজ নাচ সহ বর্ণাঢ্য আনন্দ মিছিল বের করে।’
….—‘বাহ! অসম্ভব ভাল উদ্যোগ। সকল মানুষের সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি আর মঙ্গল কামনা করে অগণিত মানুষের মিলন মেলা, নিশ্চয়ই যাবো, নানী বললেন। তবে আজ ক’দিন হলো তোদের বাড়িতে এলাম কিন্তু নববর্ষ পালনের কোন প্রস্তুতি তো দেখছি না। একটি পুরাতন বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর কোন আয়োজন তো দেখছি না।’
….—‘কি বলছো নানী এসব! আমরা তো সবাই নতুন কাপড় কিনেছি যা পহেলা বৈশাখের দিনে পরে ঘুরে বেড়াবো। তোমার জন্য শাড়ী ও ছোট মামার জন্য পাঞ্জাবী কেনা হয়ে গেছে।’
….—‘নারে, আমি পোশাকের কথা বলছি না। আমার ছেলেবেলায় আমার মা বলতেন বছরের প্রথম দিনটা যেরকম ভাবে কাটবে বাকী দিনগুলো ঠিক সেরকমভাবে কাটবে। যে কারণে আমাদের বর্ষবরণের প্রস্তুতি ছিল অন্য রকমের। চৈত্রের শেষ দিনগুলো মনে পড়ে যায়। আজ তোরা যা করছিস আমরা তা কল্পনায়ও ভাবতে পারতাম না। আমরা সব ভাইবোনেরা মিলে বাড়িঘর ঝাড়পোছ করতাম। উঠান ও আশপাশের ঝোপজঙ্গল পরিস্কার করতাম। মা খেজুরের গুড় দিয়ে মুড়িমুড়কি, মোয়া বানাতেন। আটা দিয়ে খুরমা বানাতেন। আমার বাবা মা আমাদের নতুন কাপড় কিনে দিতেন না ঠিকই তবে কেউ কেউ নতুন কাপড় কিনতো।’
….—‘বলো নানী, তোমার ছেলেবেলার পহেলা বৈশাখের কথা শুনতে চাই।’
….—‘শোন তবে, আমাদের তখন মাটির ঘর ছিল, মেঝে ছিল মাটির। টিনের বেড়া, মাথার উপর টিনের চাল। টুপ্টাপ করে যখন বৃষ্টি নামতো খুব চমৎকার একটা ছন্দ কানে এসে বাজতো। চৈত্রের মাঝামাঝিতে হঠাৎ আকাশ কালো করে দমকা ঝড়ো হাওয়া বইতো সেই সাথে বৃষ্টি, আমরা বৃষ্টিতে ভিজে আম কুড়াতাম। মায়ের বকুনি খেতাম কারণ চৈত্র মাসে কাঁচা আম খাওয়া নিষেধ ছিল। ডায়রিয়া, জলবসন্ত এসব দেখা দিত চৈত্র মাসে। মা বলতেন, কাঁচা আম জলে না দিয়ে খাওয়া যাবে না। আজ অনেক রাত হলো, এবার ঘুমিয়ে পড়ো, আগামীকাল আবার বলবো।’
….—‘নানী বলো না, আরো শুনতে ইচ্ছে করছে।’
….—‘মায়ের বকুনি খেয়ে মিনা ঘুমোতে চলে গেল। পরের দিন ভোরে নাস্তা করে কলেজে গিয়ে চুপচাপ বসে আছে। মিনার চোখে কেবলই ভেসে উঠছে ঝড়ো হাওয়া, গাছ থেকে ছোট ছোট আম পড়ছে, দৌড়ে গিয়ে মিনা আম কুড়িয়ে ঘরে নিয়ে এসেছে,কানের মধ্যে বেজে চলেছে টিনের চালে পড়া বৃষ্টির টুংটাং শব্দ ঠিক যেন কেউ গিটারের তারে আঙ্গুল ছুঁইয়ে যাচ্ছে। অদ্ভুত মিষ্টি এক আবেশে মিনা আবিষ্ট হয়ে পড়ে। পেছন থেকে কেউ একজন মিনার কাধে হাত রাখে।
….—‘মিনা এই মিনা, এত যে ডাকছি শুনতে পাচ্ছিস না?কি হয়েছে তোর?’
কাঁধে নীলার হাতের স্পর্শ পেয়ে নড়েচড়ে বসে মিনা।
….—‘নারে কিছুই হয়নি, কাল রাতে নানীর কাছে গল্প শুনছিলাম। নানীদের সময়ে কেমন করে তারা পহেলা বৈশাখ পালন করত!’
….—‘এই আমাকেও বল না রে!’
….—‘নারে, এখনো পুরোটা শোনা হয়নি, তোকে বলবো, আগে তো পুরো গল্পটা শুনে নেই নানীর মুখ থেকে।’
….—‘আজ আমিও তোদের বাড়িতে যাবো নানীর ছেলেবেলার পহেলা বৈশাখের গল্প শুনতে।’
….—‘চল তবে এখনি যাই।’ বলল মিনা।
মিনা আর নীলা দুজনেই কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে আসে। নীলার বাড়িতে মিনার মা ফোন করে জানিয়ে দিয়েছে নীলা আজ মিনার সাথে এ বাড়িতেই থাকবে।
দুপুরের খাবারের পর নানীর সাথে বসে। নানী পান মুখে দিতেই বলল আমি নীলাও পান খাবো, আমাদের পান দাও।
….—‘আচ্ছা তোরা কি জাগ শব্দটার মানে জানিস?’
….—‘জানি তো নানী, জাগ মানে জাগা, জেগে থাকা।’
নানী মুচকি হাসলেন, বললেন, ‘আরে বোকারা এই জাগ সেই জাগ নয়। আজ আমি তোদের বলবো ‘জাগ’ কি!’
….—‘বলো না নানী, আমরা তো জানতেই চাইছি।’
….—‘চৈত্র মাসের শেষ দুইদিন আগে আমরা মানে বাড়ির ছোট বড় সকলে মিলে বাড়ির জঙ্গল কেটে সাফ করে উঠানের কোণায় কোণায় ভুর দিতাম। আমার মা ফুপুরা বাড়ির সবকিছু ধুয়েমুছে পরিস্কার করতেন। ঘরের ভেতরের মাকড়সার জাল থেকে শুরু করে ঘরের মাচার উপরে যা কিছু আছে বছরের এই সময় মানে চৈত্র মাসে পরিস্কার করা হত। তারপরে বানানো হত হরেক রকমের খাবার, যেমন, মোয়া, খুরমা, গুড়ের সন্দেশ, নারিকেলের সন্দেশ, পিঠাপুলি, আট কড়াই…।’
….—‘আট কড়াই! এটা কি জিনিস?’
….—‘আট কড়া মানে হলো চাল, খোসা সহ কয়েক রকমের ডাল, শিমের বিচি, চানাচুর, ছোলাবুট, মটরডানা ভেজে একসাথে মিশানো হয়, আর সব একত্রে মিশানোর পরে যে খাবার হয় তার নাম আট কড়াই।‘
….—‘যা বলছিলাম, এই যে জঙ্গল কেটে এনে বাড়ির উঠানে রাখা হত সেগুলোকে সকালসন্ধ্যা দু’বেলা নারিকেলের বাইল মানে পাতা দিয়ে আগুন ধরানো হত। জঙ্গলগুলো যেহেতু কাঁচা ধরতে বেশ সময় লাগত, অনেক ধোঁয়া হত, কাঁচা পাতা পোড়ার সুন্দর একটা গন্ধ যা তোদের বুঝিয়ে বলতে পারবো না। ধোঁয়ার চতুর্দিকে আমরা মানে বাড়ির বড়-ছোট সকলে মিলে হাত ধরে শেকল বেঁধে ঘুরতাম আর বলতাম:‘জাগ জাগ জাগ, আমাদের বাড়িতে জাগ,/রাজার বাড়ীর ধন দৌলত, আমাদের বাড়িতে জাগ।/বিপদ-আপদ রোগ বালাই, দূর হয়ে যাক।/সুখ-শান্তি-ভালবাসা আমাদের বাড়িতে জাগ। এই কথাগুলো আওড়াতে আওড়াতে আমরা জাগ পোড়াতাম আর ঘুরে ঘুরে ধোঁয়া শরীরে মাখাতাম। মুরুব্বীরা বলতেন, এই ধোঁয়া শরীরে মাখালে রোগ বালাই দূরে থাকে। আমরা এইগুলো না বুঝলেও করতাম কেননা আমরা আনন্দ পেতাম। গানের মত সুর করে কথাগুলো বলতাম ‘
….—‘বাহ নানী, বেশ ভাল লাগছে শুনতে।’
….—‘কিন্তু তোদের মাঝে আনন্দ দেখতে পাচ্ছি না কেন?’
….—‘তোরা নতুন পোশাক কিনেছিস। অথচ বাড়িঘর ধুয়েমুছে পরিস্কার করছিস না কেন?’
….—‘কেন নানী আমরা তো ঈদের সময় সব ধুয়ে-মুছে পরিস্কার করি।’
….—‘ঈদে পরিস্কার করিস বটে। পহেলা বৈশাখ মানে বুঝিস তো? একটা পুরাতন বছরের বিদায় আর একটা নতুন বছরের আগমন। পুরাতন বছরকে বিদায় জানাতে হয় ধন্যবাদ সহ। এই পুরাতন বছর চাইলেও আর কোনদিন ফিরে আসবে না। সন্তুষ্টচিত্তে বলেছিস কখনো, ‘যা দিয়েছো যা পেয়েছি আমি কৃতজ্ঞ হে পুরাতন বছর ধন্যবাদ তোমায়। নতুন বছরকে আগমন জানানোর জন্য কি মানসিক প্রস্তুতি নিয়েছিস তোরা? নতুন বছরে নতুন কাপড় পরে মঙ্গল শোভাযাত্রা আর বৈশাখী মেলায় যাওয়াই কি নববর্ষ উদযাপন!’
….—‘তাই তো নানী, এমন করে তো কখনো ভাবি নি।‘
….—‘পুরাতন বছরের ভুল-ভ্রান্তি আর শিক্ষা থেকেই তো নতুন বছরকে গড়তে হবে। তবেই না সুখ শান্তি আর সমৃদ্ধি আসবে।’
….—‘ঠিক বলেছো নানী।’
নীলা বলল, ‘নানী আমরা তো মুসলমান, আমাদের নাকি পহেলা বৈশাখ পালন হারাম!?’
….—‘কে বলেছে এসব কথা! আমার ধর্ম ইসলাম। আমরাও নামাজ রোজা করেছি। পাড়াপড়শির সাথে মিলেমিশে একত্রে বেড়ে উঠেছি। আজ যে কোরান হাদীস পড়ছে মানুষ আমরাও সেই একই কোরান হাদীস পড়েই বড় হয়েছি। তখন অনেক কামেল, হুজুর, পীর ছিল; কারো মুখে তো শুনি নাই যে নববর্ষ পালন করা হারাম। ইসলাম আমার ধর্ম আর বাংলা আমার সংস্কৃতি। এই বাংলার মাটিতে জন্মেছি, বাংলায় কথা বলি, বাংলার খেয়ে-পরেই বেড়ে উঠেছি এবং আজো বেঁচে আছি বাংলার মাটিতে। আল্লাহ যদি বাংলা সংস্কৃতিকে অপছন্দ করতেন তবে বাংলা সংস্কৃতি বলে কিছুই থাকতো না পৃথিবীতে। যারা ধর্মের নামে বাংলা সংস্কৃতি পালন হারাম বলছে তারা ধর্মের অপব্যাখ্যা করে ধর্মের বারোটা বাজাচ্ছে এবং এই বাংলার মাটিতে জন্মে বাংলা মা’কে অস্বীকার করছে। পবিত্র হাদীসে আছে: মায়ের পায়ের তলে সন্তানের বেহেস্ত। যে মা’কে অস্বীকার করে সে কুলাঙ্গার। বাংলার মাটি আমাদের মা। মৃত্যুর পরে এই মাটিতেই আবার মিশে যাবো। সুতরাং তোমরা কেউ এই বাংলার মাটিকে অসম্মান করো না। দেশ ও দেশের মাটিকে অসম্মান করা আর নিজের মা’কে অসম্মান করার মধ্যে কোন তফাৎ নেই। আজকের দিনে ধর্মের যেসব ব্যাখ্যা শোনা যাচ্ছে আগে কোনদিন এ ধরনের কথা শোনা যায় নি। তাহলে কি বলবে আগে এদেশে মুসলমান ছিল না? ইসলাম ছিল না? পীর, মাওলানা, মুফতি ছিল না। ‘
….—‘নানী রাগ করো না। আমাদের বাড়িতে আমপাড়া পড়াতে যে হুজুর আসে তিনি বলেছে, বাংলা নববর্ষ পালন করা মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত গুনাহের কাজ।’
….—‘এরা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য মানুষের সাথে মানুষের বিভেদ তৈরি করার চেষ্টা করে চলেছে। ধর্ম যদি মানুষেরই জন্য তবে ধর্ম কেন মানুষকে মানুষের কাছ থেকে পৃথক করবে?’ বলল মিনা।
….—‘ওকে নানী, আগামীকাল পহেলা বৈশাখ আমরা মেলায় যাবো।’

২.
আজ পহেলা বৈশাখ, শুভ নববর্ষ। পাখির ডাকে ঘুম ভাঙে মিনার। বিছানা থেকে ধড়মড় করে উঠে হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে ছাদে যায়। সবেমাত্র আকাশ লাল হতে শুরু করেছে, এখনো সূর্যমামা আকাশে আসেনি। আজ মিনা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাবে সূর্যমামাকে। ছাদের ফুলগাছের পাতার ওপর পড়া দু’এক ফোটা শিশির আঙুল দিয়ে স্পর্শ করে ঠোঁটে মাখায় শিশির। আর বলে: ‘শুভ নববর্ষ ফুলগাছেরা, শুভ নববর্ষ সূর্যমামা।’ নিচে নেমে এসে ভাইয়ের দরজায় টোকা দেয়, ‘শুভ নববর্ষ ভাইয়া; উঠে পড়, আমি রেডি। বাবা ইতোমধ্যে উঠে পড়েছে। নানী, মা-বাবা ও মামাকেও শুভ নববর্ষ জানায় মিনা। মঙ্গল শোভাযাত্রায় নানীকে নিয়ে যাবে এ বছর। কিন্তু নানী বলল, ‘আমি তো তোদের মতো এত হাঁটতে পারবো না। তোরা যা, আমি বরং টিভিতে দেখবো ঘরে বসে; বিকেলবেলা মেলায় যাবো তোদের সাথে। বহু বছর আমার মেলায় যাওয়া হয় না।
মিনার মন একটু খারাপ হল, তবুও মেনে নিল; নানুমনি বুড়ো মানুষ, হাঁটতে না পারলে গিয়ে লাভ কি! বাবা, ভাই আর ছোটমামাকে সাথে নিয়ে মিনা চলে গেল মঙ্গল শোভাযাত্রায় যোগ দিতে।

মঙ্গল শোভাযাত্রা থেকে ফিরে ঘরে নাস্তার টেবিলে এসে মিনা ও আবীরের চক্ষু চড়কগাছ। এসব কি? পান্তা-ইলিশ ভাজা, ভর্তা নেই টেবিলে। নারিকেল কোড়া, গুড়, ছাতু, চিড়া ভেজানো, খই, মুড়ি, দই, ক্ষীর, কলা দিয়ে সাজানো হয়েছে নাস্তার টেবিল। এত এত সব একসাথে মিশিয়ে যে খাওয়া যায় তাই কখনো জানতো না আবীর ও মিনা। নানী সবার প্লেটে তুলে দিচ্ছে আর বলছে সব একসাথে মিশিয়ে খেতে হয়। নানী নিজেই একটা প্লেটে সব নিল, তারপরে নাতি ও নাতনির সাথে বসে খেল। আবীর ও মিনা’র এই প্রথম অভিজ্ঞতা, প্রথম স্বাদ নিল পহেলা বৈশাখে একেবারে নিরেট শতভাগ বাঙালি নাস্তা। এত বড় হয়েছে, অথচ ওরা কোনদিন নানীর সঙ্গে নববর্ষ উদযাপন করেনি। মিনার মা বউ হয়ে শহরে আসার পরে একান্নবর্তী পরিবারে কোনদিন এসব করার সুযোগ পায়নি।
– ‘নানী এত এত খাবার তুমি কোথায় পেলে? কোথা থেকে যোগাড় করলে এতকিছু?’ বিস্মিত হয়ে আবীর জিজ্ঞাসা করল নানীকে।
– ‘আরে আমি গ্রাম থেকেই সবকিছু নিয়ে এসেছি। নিজ হাতে ভাজা মুড়ি, খই, ঢেঁকিতে কোটা চিড়া, গাছের নারকেল, কলা–এসবই বাড়ি থেকে তোদের জন্য নিয়ে এসেছি। আমার অনেক ইচ্ছে ছিল তোদের সাথে এবারের নববর্ষ উদযাপন করবো।’
– ‘ওয়াও নানী! আমরা অভিভূত। তুমি অনেক কষ্ট করে আমাদের জন্য এসব নিয়ে এসেছো। ধন্যবাদ, নানুমনি।’ বলল আবীর।
বলল মিনা, ‘সত্যিই নানুমনি, এত সুস্বাদু খাবার আমরা এর আগে কখনো খাইনি।’

আজ দুপুরেও মায়ের সাথে নানুমনি গেল রান্নাঘরে। মা কেটেকুটে ধুয়ে দিচ্ছে আর নানুমনি রান্না করবে পহেলা বৈশাখের খাবার। দুপুরবেলা ডাইনিং টেবিলে এসে দেখে ইলিশ ভাজা, পান্তা, ভর্তা, মরিচ কিছুই নেই টেবিলে। ওরা প্রতিবছর এগুলোই খায় পহেলা বৈশাখে। এ বছর নেই কেন? ইলিশ পান্তা তো বাংলার খাবার। প্রশ্ন করতেই নানী বলল,
– ‘বহু বছর ধরেই তো এসব খাচ্ছো, এবার না হয় আমার মেনুই খাও।’ বলে মৃদু হাসলেন, তার মুখে আত্মতৃপ্তির ছাপ।
নানুমনি আর মা দু’জনে মিলে একে একে রান্নাঘর থেকে তরকারীর বাটি নিয়ে এসে টেবিলে রাখছে। কই মাছের দোপেয়াজা, রুই মাছের কালিয়া, সবজির লাবড়া, বেগুন, মিষ্টি কুমড়া, আলু ভাজা ও সাদাভাত। এক এক করে তরকারীর নামগুলো বলল নানুমনি।
ইলিশ পান্তা না পেয়ে মন বেশ খারাপ হলো বটে, কিন্তু কিছুই মুখ ফুটে বলল না মিনা ও আবীর। নানুমনিকে ওরা কষ্ট দিতে চায় না। সবাই একত্রে বসে খেয়ে নিল। রান্না খুব ভাল হয়েছে। এমনিতে সবজি খেতে পছন্দ করে না মিনা ও আবীর, কিন্তু আজকে অনেক সবজি খেয়েছে। একটা আলাদা গন্ধ, পাঁচফোড়োনের গন্ধ বেশ মিষ্টি।

বিকেল চারটা। সবাই মিলে রওনা হলো মেলার উদ্দেশ্যে। মেলায় প্রবেশ করার পরে নানুমনি এদিক-সেদিক তাকায়, কিছু একটা খুঁজে ফিরছে তার দু’চোখ। হতাশ দৃষ্টিতে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্ছে লোকজনের দিকে। আবীর ও মিনা দোকানে দোকানে ঘুরছে, এটা-সেটা কিনছে।
– ‘নানুমনি তোমার জন্য কি কিনবো।’ জানতে চাইল আবীর।
– ‘একটা বুড়ো দাদু, তালপাতার বাঁশি, আলতা, ফিতা, মাটির হাঁড়িপাতিল।’
– ‘এগুলো কোথায় পাবো?’
– ‘কেন মেলায় এসব পাওয়া যায় না?’ বলল নানুমনি। ‘ভেবেছিলাম তোর জন্য মেলা থেকে মাটির হাতি, ঘোড়া, বাঘ, বুড়োদাদু কিনবো আর মিনার জন্য আলতা, ফিতা, কাঁচের চুড়ি। আমি এসব খুঁজছিলাম মেলায় এসে।’
– ‘নানুমনি, কেউ কি এখন ফিতা দিয়ে চুল বাঁধে? আলতা পরে পায়ে? নাকি কেউ মাটির পুতুল দিয়ে খেলে? আমাদের এখানে মেলায় এখন আর এসব পাওয়া যায় না।’
ইতোমধ্যে একদল ছেলে হুড়মুড় করে গায়ের মধ্যে এসে পড়ে। নানুমনি মাটিতে পড়ে যায়। ব্যাথা পেয়েছে বেশ। ছলছল চোখে নানী দেখছে এ কালের মেলা। মনে মনে ভাবছে না এলেই বোধহয় ভাল হত।
আবীর বলল, ‘চল নানী, ওই স্টলে গিয়ে বসি। ওখানে পান্তা-ইলিশ খাবো আমরা সবাই মিলে।’
সবার জন্য পান্তা ইলিশ আর ভর্তার অর্ডার দেওয়া হলো।
নানী বলল, ‘আমি এখন খাবো না, তোরা খা আমি পাশে বসে দেখি।’
মিনা, আবীর, বাবা, মা আর ছোটমামা পান্তা-ইলিশ খেল। দাম শুনে নানী চোখ কপালে তুলল। পাঁচজনে পান্তা-ইলিশের দাম দুই হাজার টাকা। না, নানী আর ভাবতে পারছে না।
নানী মাকে ডেকে বলল: ‘দানাদার পাওয়া যাবে? খুরমা, জিলাপি, আমিত্তি, রসগোল্লা? নে ধর এক হাজার টাকা, এই দিয়ে মিষ্টি কিনে নিয়ে বাড়িতে চল্।’
মেলা থেকে বের হতেই নানীর চোখে পড়ল কেউ একজন ফুট ও তরমুজ বিক্রি করছে। ছোটমামাকে বলতেই মামা ফুট ও তরমুজ কিনলো। তারপরে রসগোল্লা, চমচম কিনে বাড়িতে ফিরে গেল সকলে।

রাতের বেলা নানীর সাথে বারান্দায় বসেছে সকলে। নানীর দিকে তাকিয়ে মনে হল সে কিছুটা বিরক্ত আর মন খারাপ।
জিজ্ঞাসা করল মিনা, ‘কি হয়েছে নানী?’
– ‘আমি বেশ হতাশ হলাম আজকে মেলায় গিয়ে। পান্তা-ইলিশ এত টাকা দিয়ে কিনে খেতে হয়? এ কেমন মেলা? নববর্ষের দিনে পান্তা-ইলিশ খেতে হবে কেন? কবে থেকে এসবের প্রচলন হলো? নববর্ষে পান্তা-ইলিশ খাওয়া কে প্রবর্তন করলো? আমাদের ছেলেবেলায় তো এসব দেখিনি, এমনি কারো মুখে কোনদিন পান্তা ইলিশ খাওয়ার গল্পও শুনিনি কখনো। আমরা সকলের মঙ্গল কামনা করে নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় করেছি। একে অন্যকে মিষ্টিমুখ করিয়েছি। সন্দেশ, পিঠাপুলি, পায়েস, নকুলদানা, বাতাসা, চিনির হাতি-ঘোড়া-বাঘ-সিংহ-কুমির সহ আরো কত রকমের মিষ্টি। বাড়িতে বাড়িতে সামর্থ্য অনুযায়ী ভালমন্দ রান্না করেছি, রান্নার পদগুলো ষোলআনা খাঁটি বাঙালিআনা। চতুর্দিকে ঢোল বাজতো। মেলায় গিয়ে বাউল গান শুনতাম, নৌকাবাইচ হত, মোরগ লড়াই-লাঠিখেলা আরো কত কি। হায়! আমার বাংলা সংস্কৃতি কিভাবে হারিয়ে যাচ্ছে কালের গর্ভে! না, নিজে নিজে হারায় নি, আমরা আমাদের সংস্কৃতিকে গলা টিপে হত্যা করে চলেছি। আমাদের সংস্কৃতিকে কবরে পাঠিয়ে আমরা নিয়ে আসছি অন্যের সংস্কৃতি, অন্য দেশের ভাষা, অন্যের খাবার, পোশাক, চলন-বলন সবকিছুই অন্যেরটা আমাদের করে নিতে শিখে গেছি। আমরা হারিয়ে ফেলেছি আমাদের নিজস্বতা, আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের আমরাকে।’

কথাগুলো বলতে বলতে নানীর কণ্ঠ ভারী হয়ে ওঠে। ভিজে যাওয়া চোখ জোড়া মুছতে থাকে শাড়ীর আঁচলে।
আবীর ও মিনা নানুমনির দুই কাঁধে দুজনে মাথা রেখে বলে, ‘আমরা আমাদের সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখতে লড়াই করে যাবো। আজ থেকে আমরা কখনোই আমাদের ভাষার সাথে অন্য ভাষার সংমিশ্রণ করে কথা বলবো না। আমরা বাঙালি, বাংলা আমাদের গর্ব। বাংলা সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গ করবো।’


সর্বশেষ

আরও খবর

বাঙালির দ্বি-মুখী লড়াই: হিন্দুত্বের সাথে এবং মুসলমানিত্বের সাথে

বাঙালির দ্বি-মুখী লড়াই: হিন্দুত্বের সাথে এবং মুসলমানিত্বের সাথে


দ্রোহের গুঞ্জন: সংস্কৃতি ও রাজনীতি

দ্রোহের গুঞ্জন: সংস্কৃতি ও রাজনীতি


কেউ কষ্টের কথাগুলি বলতে চায় না

কেউ কষ্টের কথাগুলি বলতে চায় না


আমগো যা কওয়ার ছিলো; তাই কইতাছে বাংলাদেশ: সাঈদী

আমগো যা কওয়ার ছিলো; তাই কইতাছে বাংলাদেশ: সাঈদী


শ্রমিক আর সংবাদকর্মী: সবাই আজ শোষিত

শ্রমিক আর সংবাদকর্মী: সবাই আজ শোষিত


বাজিলো কাহারো বীণা

বাজিলো কাহারো বীণা


ভাস্কর্য চাই। ভাস্কর্য চাই না।

ভাস্কর্য চাই। ভাস্কর্য চাই না।


‘এই পরবাস অপমানের’

‘এই পরবাস অপমানের’


রং ফড়িং’র পাঠশালা

রং ফড়িং’র পাঠশালা


বিবেক তুমি কোথায়?

বিবেক তুমি কোথায়?