Monday, November 21st, 2016
‘আমরা যুদ্ধক্ষেত্রে আছি’
November 21st, 2016 at 1:27 pm
‘আমরা যুদ্ধক্ষেত্রে আছি’

প্রিয় বন্ধু,

কেমন আছো তুমি, দোয়া করি ভাল থাক। আমি বা আমরা ভাল নেই, ভাল থাকার দিন আমাদের শেষ হয়ে গেছে। আমাকে খুব হতাশাবাদী মনে হচ্ছে তাই না, হ্যাঁ বন্ধু, আমি হতাশাবাদী তালিকায় নাম লিখাতে চাই। আমি জানি এই সময়ে ভাল কিছু আশা করা বোকামি।

তোমাকে চিঠি লিখতে দেরি হয়ে গেল, নিজেকে ঠিক করতে সময় লাগছে, কিছুতেই পারছিলাম না স্থির হয়ে বসতে ও লিখতে। তোমার বুঝতে নিশ্চয় অসুবিধা হচ্ছে না কেন বলছি এমন কথা। আমেরিকার ইলেকশনের ফলাফল যাকে ক্ষমতায় নিয়ে এসেছে তার পরিপ্রেক্ষিতে এখানকার জনজীবনে যে প্রভাব পড়ছে এক চিঠিতে আমি সেই অবস্থার বর্ণনা দিতে পারব কি-না জানি না।

গত বৃহস্পতিবার সকালে তোমাকে চিঠি পাঠিয়ে গেলাম অফিসে, যাওয়ার সময় ট্রেনে দেখলাম লোকজন অনেক কম। আমাদের মত দেশি লোকজন নাই বললেই চলে, মানুষ হয়ত প্রাথমিক ধাক্কা কাটাতে সময় নিচ্ছে। আমার অফিসে সবাই সিদ্ধান্ত নিল জরুরি মিটিং এ বসবে, নিজেদের মনের অবস্থা কি সেটা বলে শুরু করব মিটিং, মূলত শুরু হল কান্না দিয়ে। আমরা সবাই সিদ্ধান্ত নিলাম জরুরী মেম্বারশিপ মিটিং করব পরের দিন, কারণ আমাদের বেশিরভাগ লোকজন কাগজপত্রবিহীন, তাদের মনের অবস্থা কি তা বুঝতেই পারছি, এই মুহূর্তে একে অপরের হাত শক্ত করে কান্না করাও জরুরী।

আমরা খারাপ সময়গুলিতে সবাইকে উপদেশ দেই- মন শক্ত কর, কান্নাকাটি করিও না, নিজেকে মজবুত রাখ। আমাদের ‘মুভমেন্ট সমাজে’র লোকজন এমন ভাবে না, তারা বলে, নিজেদের আবেগ ইমোশন খুব জরুরি, যদি তুমি নিজেকে চেপে রাখো তবে তা তোমার শরীরের ক্ষতি করবে। পরের দিন মিটিং-এ আমাদের মেম্বারদের আমরা বললাম সবাই নিজের কথা বলার জন্য একজন সাথী বেছে নাও, ট্রাম্প জেতায় তোমার কি অনুভূতি হয়েছে ৪ মিনিটে তাকে বল, কান্না করতে চাইলে কর, যদি চিৎকার করতে ইচ্ছা হয় তাও কর। পরের ৪ মিনিট আরেকজন এভাবেই বলবে।

এই পদ্ধতিতে আমরা আমাদের আবেগকে বাইরে নিয়ে আসব, তারপর প্ল্যান করব কি করে আমরা সামনের দিন মোকাবিলা করব। তারপর আমরা তাদের সামনে কিছু ইতিহাস তুলে ধরলাম অতীতে ডানপন্থী সরকাররা কি করেছিল, আর এই সরকার কেমন করে ক্ষমতায় আসল, কি কারণে সে ক্ষমতায় আসল আর আমরা কি কারণে এই অবস্থায় পড়লাম। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা সকল নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর একতা গড়ে তুলবো আর লড়াই করব নিজেদের সুরক্ষা ও মর্যাদা রক্ষা জন্য। আগামি ৪ বছর আমাদের সবচে বেশি কাজ করতে হবে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে।

বন্ধু, আমার কথা শুনে কি মনে হচ্ছে আমরা যুদ্ধক্ষেত্রে আছি? হ্যাঁ! বন্ধু আমরা আসলেই এক যুদ্ধক্ষেত্রে ফেঁসে গেছি। আমেরিকা কখনো ড্রাগস কন্ট্রোলের নামে লাতিন আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, সন্ত্রাস দমনের নামে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, এবার তারা নিজের দেশের ভিতরে সাদা ব্যতীত সকল বর্ণের মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা দিয়েছে।

গত কয়েকদিন যাবত আমাদের একমাত্র কাজ মানুষকে ভয় মুক্ত করা। অফিস স্টাফে যারা আছি সবাই মিলে ঠিক করলাম মেম্বারদের নিয়ে ট্রাম্পবিরোধী মিছিলে যাব, এতে করে আমাদের মনেও জোর আসবে আর মেম্বাররা একটু ভয়মুক্ত হবে। গত রোববার ২টা থেকে আমাদের মত মেম্বার আছে এমন সংগঠন ট্রাম্প টাওয়ার এর সামনে সমবেত হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। আমারা ঠিক করলাম এটাতেই যাব। সবাই মিলে হাজির হলাম ট্রাম্প হোটেল এর সামনে। আমাদের মনে কিছু সংশয় ছিল কত লোক হবে, ধীরে ধীরে লোক জমা হতে থাকল শেষ পর্যন্ত আনুমানিক ১৪ হাজার মানুষ হয়েছে বলে খবরে দেখতে পেলাম। সবাই স্লোগান দিচ্ছিল ‘ট্রাম্প ইজ নট মাই প্রেসিডেন্ট’।

‘সে ইট লাউড, সে ইট ক্লিয়ার, ইমিগ্রান্ট আর ওয়েলকাম হেয়ার’, ‘রেসিস্ট ফেসিস্ট এন্টাই গে, ডোনাল্ড ট্রাম্প গো এয়োয়ে’, ছেলেরা বলছিল ‘হার বডি হার চয়েজ’, মেয়েরা বলছিল, ‘মাই বডি মাই চয়েজ’ এরকম আরও কত কি শ্লোগানে মুখরিত মিছিল। আমরা অনেকটা পথ হেঁটে গেলাম। ট্রাম্প টাওয়ারের সামনে প্লাস্টিক হ্যান্ড কাফ নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়ানো হাজার হাজার পুলিশ, সেদিকে কারো মনোযোগ নেই। সবার মনের দুঃখ কষ্ট রাগ যেন শ্লোগান হয়ে বাইরে আসছিল।

অনেকে আবার মনে করে মিছিল করে কি হবে! আমার প্রশ্ন না করেই তারা কি উদ্ধার করে ফেলছে! এর চেয়ে আমরা ভাল, নিজেদের অধিকার লড়াই করে আদায় করে নিতে চাই। বন্ধু তোমার মনে আছে, আমি যখন এই দেশে আসি বাংলাদেশে তখন নির্বাচন চলছিল, তুমি আমাকে কল দিয়ে হাসতে হাসতে বললে এইবার আওয়ামী লীগ থেকে কলাগাছ দাঁড়ালে কলাগাছও পাশ করবে! আমি বলেছিলাম, বন্ধু যে জাতি কলাগাছ পাশ করায় সেই জাতির কপালে দুঃখ আছে। আমেরিকা কলাগাছ না ধূতরা গাছ পাশ করিয়েছে। এই ধুতরা গাছ শুধু আমাদের নয় তাদেরকেও বিষাক্ত করে ছাড়বে। বন্ধু ভেবে বসো না আমি খুব ভেঙ্গে পরেছি তাই এসব বলছি।

ট্রাম্প এর ১০০ দিনের যে এজেন্ডা দিয়েছে তা দেখার পর যে কোন মানুষ চিন্তিত হবে। সেখান থেকে আমি কিছু গুরুত্ব পূর্ণ পয়েন্ট তুলে ধরছি তোমার সামনে।

  •  প্রথম দিনেই ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট ওবামার সকল নির্বাহী আদেশ বাতিল করে দিবে। তার মানে গত ২০১২ তে আমরা অক্লান্ত লড়াই করে কাগজপত্রবিহীন যুবাদের জন্য যে ‘ডেফার্ড একশন ফর চাইল্ডহুড এরাইভ্যেল’ পেয়েছিলাম সেটাও চলে যাবে। এসব যুবা গণ বাবা মা দের সাথে অল্প বয়সে এখানে এসেছিল ভিজিট ভিসায়, কাগজপত্র না থাকলে অনেক টাকা দিতে হয় তাই অনেকে কলেজে যেতে পারছিল না, এই DACA স্ট্যাটাস তাদের কলেজ ফি কমিয়ে দিয়েছে আর বাকি টাকা তারা কাজ করে যোগাড় করছে। এই যুবাদের সংখ্যা প্রায় ২,৮৭,০০০ এর মত। এখন তুমি বল বন্ধু কতটা জালিম হলে প্রথম দিনেই এত গুলি যুবক-যুবতীর জীবন থেকে তাদের সপ্ন, এডুকেশন, কাজ কেড়ে নিয়ে তাদের এই দেশ থেকে বহিস্কার এর মত বিপদে ফেলতে পারে।
  • ট্রাম্প বলেছে ১০০ দিনের মধ্যে ২ থেকে ৩ মিলিয়ন মানুষ, যাদের ক্রিমিনাল রেকর্ড আছে তাদেরকে নিজ দেশে ফেরত পাঠাবে। তাও নিজ দেশের রাষ্ট্রীয় খরচে! যদি রাষ্ট্র তাদের ফেরত না নেয় তবে সেই রাষ্ট্রের সব ভিজিট ভিসা সে বাতিল করে দিবে। অনেকে বলছে, এসব লোকজন তো অপরাধী, আমি তাদের উত্তর দেই অপরাধীর সংজ্ঞা কি আমি জানি হয়ত, এই তালিকায় অনেক লোকজন আছে যারা গুরুতর অপরাধ করেছে কিন্তু সকলে নয়। আমার জানা মতে নকল ‘গুছি বেল্ট’ বিক্রির কারণে অপরাধীর ছাপ লেগেছে, নকল সুগন্ধি বিক্রির কারণে অপরাধী হয়েছে। তাই না জেনে ঢালাও ভাবে মানুষজনকে এই দেশ থেকে বহিস্কার করাকে সাপোর্ট করা আমি বিরোধীতা করেই যাচ্ছি। ট্রাম্প এই চালটা দিয়েছে যাতে করে মানুষের মাঝে ডিভিশন তৈরি করতে পারে, ৩ মিলিয়ন অপরাধী, ২,৮৭,০০০ নির্বাহী আদেশ তারপর আসবে নতুন তালিকা নিয়ে। একসময় সে বলবে এই দেশে সাদা ছাড়া আর কাউকে দরকার নেই, যদিও সে এটা করতে পারবে না কিন্তু কে জানে তার প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনাও তো অসম্ভব ছিল! তা যখন হয়েছে  সকল খারাপ আমাদের আগে থেকেই ভাবতে হবে।
  •  ট্রাম্প প্রথম ১০০ দিনের কর্মসূচীতে সেঞ্চুরি সিটি ফেডারেল ফান্ড কেটে দিবে। এটার মানে হল যেসব স্টেট ইমিগ্রেন্টদের সাপোর্ট করে তাদের হাউজিং স্বাস্থ্য সেবা ও নিরাপত্তা খেয়াল রাখে তারা ফেডারেল গভর্মেন্ট থেকে কোনো টাকা পাবে না। এই ঘোষণায় বড় বড় শহরের মেয়ররা খুব দুঃখ পেয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার মেয়র বলেছে তারা ইউএসএ’র অংশ থাকতে চায় না। লস এঞ্জেলস এর পুলিশ বলছে আমরা ফেডারেল পুলিশকে অভিবাসী বহিস্কার এর বিষয়ে সাহায্য করব না। সিয়াটল মেয়র সব কাগজপত্রবিহীন মানুষকে নিরাপত্তা দিতে অঙ্গীকার করেছে, মেয়র নিজেই সিটি হলে প্রতিবাদ সভা করেছে। নিউ ইয়র্কের মেয়র আর গভর্নর নিজেদের স্টেটকে অভিবাসী বন্ধু স্টেট রাখতে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। ট্রাম্পকে তারা আহ্বান জানিয়েছে ফেডারেল ফান্ড না কাটতে।
  • ট্রাম্প ১০০ দিনের কর্মসূচীতে সকল ফরেন ট্রেড এগ্রিমেন্ট যেমন টিপিপি, নাফটা সহ সকল চুক্তি বাতিল করে দিবে। এ কথার মানে হল মুক্ত বাজার অর্থনীতির নামে পুঁজির বাজারে যথা ইচ্ছা তথা পুঁজি বিনিয়োগ করে আমাদের মত গরীব দেশ গুলির অর্থনীতি ধ্বংস করে আমাদের লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের রুটি রুজিকে তাদের নির্ভরশীল করে এখন ক্ষতিপূরণ ছাড়া বা কয়েক বছর সময় না দিয়ে হুট করে বলে চুক্তি বাতিল। আমাদের মত দেশ সব শুনেও চুপ করে আছে কারণ অনেকের ধারণা সে যা বলেছে তা করবে না। ট্রাম্প চীন মানে চায়নার উপর খুব খেপেছে কি কারণে জানি না, তার ১০০ দিনের কর্মসূচীতে চীনের মুদ্রা বাজার মনিটরিং করবে বলছে, দেখে শুনে মনে হয় সে চায়নার সাথে যুদ্ধ বাঁধাবে।
  • ট্রাম্প বলেছে মুসলিমদের স্পেশাল তালিকা বদ্ধ হতে হবে, সবাই ভেবেছে এটা হুমকি! সে বলছে বিশেষ কিছু মুসলিম দেশের মানুষকে তালিকাবদ্ধ হতে হবে। বুশের সময় ঠিক এইভাবেই ৮০,০০০ এর উপর মানুষ তালিকায় নাম লিখিয়েছিল, ১৩,০০০ এর উপর মানুষকে কাগজপত্র নাই বাহানা দিয়ে দেশে ফেরত পাঠিয়েছিল, এখন আবার সেই ভয় মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে।

বন্ধু আমার কথা শুনে আমাকে হতাশাবাদী ভেবে নিও না। ট্রাম্প এর ক্যাবিনেট এ যাদের মনোনীত করছে তারা যুগের সেরা বর্ণবাদী, সাদা আদিপত্যবাদী, মুসলিম বিদ্বেষী, অভিবাসী বিদ্বেষী, জুইস নারী বিদ্বেষী। প্রতিদিন একেক জনের নাম শুনতে পাই আর তাদের কুকর্মের তালিকা প্রকাশ করে সংবাদ মাধ্যম। এদেরকে ক্যাবিনেট না নেওয়ার জন্য অনলাইন পিটিশন হচ্ছে। আজ আর নয় বন্ধু, আবার লিখব পরের চিঠিতে। ততক্ষণ ভাল থাক বন্ধু, ভাল থাকুক দেশ ও দেশের মানুষেরা।

ইতি
তোমার বন্ধু যাকে তুমি কোন নামেই ডাকো না।

Kazi Fouziaলেখক: মানবাধিকারকর্মী


সর্বশেষ

আরও খবর

জন্মভূমির টান মানসিক কষ্টে ফেলে দেয়

জন্মভূমির টান মানসিক কষ্টে ফেলে দেয়


‘মুসলিম সমাজের বিভাজন বন্ধ করুন’

‘মুসলিম সমাজের বিভাজন বন্ধ করুন’


আজ জুইস-মুসলিম এক কাতারে দাঁড়িয়েছে

আজ জুইস-মুসলিম এক কাতারে দাঁড়িয়েছে


সর্ব পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে

সর্ব পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে


ভাবতেই কষ্ট হয় আমিও বাঙালি

ভাবতেই কষ্ট হয় আমিও বাঙালি


‘তুরস্ক টিকবে তো?’

‘তুরস্ক টিকবে তো?’


মক্কা থেকে…

মক্কা থেকে…


সুবিধাবাদী নেতারা অবহেলিতর কথা বলে না

সুবিধাবাদী নেতারা অবহেলিতর কথা বলে না


‘এই পৃথিবী শিশুদের নিরাপত্তা দিতে অক্ষম’

‘এই পৃথিবী শিশুদের নিরাপত্তা দিতে অক্ষম’


ফিদেল বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল

ফিদেল বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল