Wednesday, May 30th, 2018
বদি থেকে মাশরাফি; একই স্বপ্নের দৈর্ঘ্য
May 30th, 2018 at 1:47 pm
বদি থেকে মাশরাফি; একই স্বপ্নের দৈর্ঘ্য

মাসকাওয়াথ আহসানমাশরাফির জন্য ভোট চাইলেন পরিকল্পনামন্ত্রী কিংবা নির্বাচনে আসছেন সাকিবও; এই জাতীয় সংবাদ শিরোনামগুলো দেখে মনে হলো, শেষ পর্যন্ত বদি থেকে মাশরাফি; একই স্বপ্নের দৈর্ঘ্য; গ্রামের মেম্বর হওয়া বা মেম্বর হোক এমন একটি প্রত্যাশা। অথচ মাশরাফির স্বপ্ন হবার কথা ছিলো ক্রিকেটে বিশ্বকাপ জিতে আনা; পরবর্তী প্রজন্মের ক্রিকেটারদের বিশ্বসেরা করে গড়ে তোলা।

খোদ রাজনীতির মানুষেরাই ভুলে যান; রাজনীতিও একটি বিশেষায়িত ক্ষেত্র। রাজনৈতিক সংগঠনের ছাত্র-যুব-কৃষক-শ্রমিক সংগঠনের যেসব মানুষ তারুণ্য নিবেদন করেন সংগঠনের কাজে, প্রতিনিধিত্ব করেন নিজ নিজ সংগঠনের; তাদের মাঝ থেকেই রাজনৈতিক নেতা বা প্রতিনিধি তৈরি হবার কথা। রাতারাতি রাজনীতিবিদ বনে যাবার মডেলটি যে ভুল; তা আমরা সেনা শাসন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার গুলোর অগণতান্ত্রিক আচরণ দেখে জানতে পেরেছি। অথচ গণতন্ত্রের মোড়কে ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক নেতারাও রাতারাতি রাজনীতিবিদ বানানোর কারখানা খুলে বসেছেন যেন। ব্যবসায়ী যারা মোটা চাঁদা দিতে পারবে; চলচ্চিত্র তারকা বা ক্রিকেট তারকা যাদের জনপ্রিয়তা আছে; সাবেক সামরিক ও বেসামরিক আমলা যাদের অবসর গ্রহণের পর কোন কাজ নেই কিন্তু লোকটা খুব অফিসিয়াল কাজ জানে বলে একটি জনশ্রুতি আছে; এদের রাতারাতি রাজনীতিবিদের সার্টিফিকেট দিয়ে দেয় রাজনীতির মাজারগুলো। মাজার ভিত্তিক রাজনীতিতে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার চেয়ে মাজারের খাদেম হিসেবে আনুগত্যই বেশি কাংক্ষিত কথিত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক মাজারগুলোর কাছে।

মুস্তাফা কামাল সংবাদ সম্মেলন

পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল

যে কারণে সেনা শাসনের অবসানের পর কথিত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক মাজারগুলো ছাত্র-সংসদ নির্বাচন প্রথা তুলে দিয়েছে। নেতা বা জনপ্রতিনিধি তৈরির পরীক্ষিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এমনকি দলের অভ্যন্তরেও গণতন্ত্রের চর্চা নেই। গণ অভিমতের মূল্য নেই। মাজার কতৃপক্ষের পছন্দই সবার পছন্দ বলে লিখিত-পঠিত ও আত্মস্থ। গণতন্ত্রের মুখোশে দাস প্রথা প্রচলন বা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লাল সালু উপন্যাসের মজিদ মডেলে রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিনির্মাণ সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতা।

অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, নীতি নির্ধারণে কী তবে অন্য শ্রেণী-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ থাকবে না। এ প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, একজন মানুষ জীবনের শুরুতেই পেশা নির্বাচন করে ঐ পেশায় সর্বোচ্চ দক্ষতা অর্জন ও সেবা প্রদানের জন্য। স্ব স্ব ক্ষেত্রে অবদান রাখাই দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করা। আইন প্রণেতা বা নীতি নির্ধারক হওয়াটাই প্রতিটি মানুষের অভীষ্ট লক্ষ্য নয়। এটা এমন কোন বড় কাজও না। অন্যান্য সেবামূলক পেশার মতোই একটি পেশা। সভ্য দেশে জনপ্রতিনিধিরা জনারণ্যে মিশে থাকেন। বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়া নিতান্ত অজো গ্রাম বলেই এখানে হাতিতে চড়ে ভি আই পি হয়ে ঘোরে জনপ্রতিনিধিরা। জনপ্রতিনিধি হচ্ছে জনগণের সেবক। নেহাত কমনসেন্সের অভাব না থাকলে কোন জনপ্রতিনিধি হাতি হয়ে ঘুরতে পারে না। এখন এই কমনসেন্স বর্জিত জনপ্রতিনিধিরা ভি আইপি হয়ে ঘুরে এতোদঞ্চলের শিশু-কিশোরদের মনে একটি স্বপ্ন পুঁতে দিয়েছে; আমাকে সাহেবে মেম্বর হতে হবে!

ফলে শিক্ষা-বিজ্ঞান-গবেষণা-শিল্পকলা-সংস্কৃতি এরকম সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান গুলো চর্চার অভাবে বনসাই বা বামন হয়ে গেছে। স্বপ্নের দৈর্ঘ্য মেম্বর হলে; সত্যেন বোস বা জামাল নজরুল ইসলামের মতো স্বপ্নের দৈর্ঘ্যের মানুষ এদেশে আর তৈরি হবে না সেটাই স্বাভাবিক। এখানে গোবিন্দ চন্দ্র দেবের মতো চিন্তার দৈর্ঘ্যের দার্শনিক আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। উদ্ভাবনবিমুখ ভোক্তা সমাজ ভোগ বিলাসে গা ভাসাচ্ছে। ফলে সভ্যতার উত্তরণের সম্ভাবনাগুলো প্রতিদিনই সীমিত হয়ে আসছে।

মাশরাফি

মাশরাফি

রাজনীতির মাজার ও মেম্বর ভিত্তিক একটি গহীন সমাজের মানুষ চিন্তার জগতে মধ্যযুগে চলে যাওয়ায়; হিংস্রতা-হানাহানি-কোন্দল এসব আদিম বিনোদন ঘটতে থাকে সাড়ম্বরে । যে গ্রামে অনেক মানুষের হাতে অবৈধ অর্থ। তারা লক্ষ বাতি জ্বালিয়ে লাখপতি হবার সাফল্য উদযাপন করে। মেম্বরেরা হেলিকপ্টারে করে তাদের নবরত্ন সভার মোটিভেশনাল স্পিকার নিয়ে ঘুরে গ্রাম-গ্রামান্তরে; যারা শিশুদের টাকার স্বপ্ন দেখায়, ডিজাইনার শার্ট পরার স্বপ্ন দেখায়, বড় গাড়িতে চড়ার স্বপ্ন দেখায়। ঐ যে স্বপ্নের দৈর্ঘ্য বামন হয়ে এলে যেরকম ফাপা একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়; ঠিক সেরকম যাত্রাপালার রঙ্গ মঞ্চ এই গ্রামীন জীবন। এখানে মেম্বরের কথাই আইন। মেম্বরের সাফল্যের সংজ্ঞাই পুরো গ্রামের সাফল্যের সংজ্ঞা।

এই বামন চিন্তার রাজনৈতিক মাজারঘন মেম্বার আর ধর্ম ও উগ্রজাতীয়তাবাদের মিশেলে তৈরি দেশপ্রেমের বটিকা বিক্রির বিজন হাট-বাজারে মেপে দেখা হয় প্রতিটি গ্রামবাসীর চিন্তার দৈর্ঘ্য। দৈর্ঘ্য মেম্বরদের চেয়ে কম হলেই ক্ষমতার মেজবানে দাওয়াত। দৈর্ঘ্য মেম্বরদের চেয়ে বেশি মনে হলে তাকে উইচ-সমাজ ও দেশের শত্রু বলে হান্টিং বা শিকার করার নেশায় মাতোয়ারা হয়ে ওঠে রাজনীতির মাজারের খাদেমেরা।

অথচ মাজারের চিন্তার দৈর্ঘ্যে মেপে বেছে নেয়া ক্ষীণবুদ্ধিজীবী সমাজ জারী রাখে স্তবসংকীর্তন। নিজেরা নিজেরাই খুশি হয় গ্রামের শনৈঃ শনৈঃ উন্নয়নে; মেম্বর আত্মসুখে বলে, টেকা-পয়সা ঝুড়ি উপচে পড়ছে; এখন মরেও সুখ। সেই ভালোলাগার সুখে ক্ষীণ সংস্কৃতির লোকেরা গান করে; শুনে মেম্বর বলে, কিশোর কুমারের চেয়ে ভালো হচ্ছে। গায়ক সলজ্জ হাসিতে রাঙ্গামুখ হয়ে ওঠে। মনে মনে বিশ্বাসও করে।

নবরত্ন সভার কেউ কেউ অভিযোগ করে, আমাদের উন্নয়নের শত্রুরা বলছে, আমাদের শিক্ষা-সংস্কৃতি পিছিয়ে পড়ছে। মেম্বর ধমক দেয়, শিক্ষা-সংস্কৃতি আমাদের চেয়ে কী সুশীলেরা বেশি বোঝে! আমাদের বাড়িতেও বই ছিলো-আমরাও রবীন্দ্র সংগীত শুনতাম।

স্কুলে মেম্বরের মতো পোশাক পরে শিশুরা “যেমন খুশী তেমন সাজার” প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। কেউ কৃষক সাজেনা, শ্রমিক, শিক্ষক, চিত্রকর, লেখক কিংবা বিজ্ঞানী সাজে না। সবাই সাজে মেম্বর।

মাসকাওয়াথ আহসান

মাসকাওয়াথ আহসান: ব্লগার ও প্রবাসী সাংবাদিক


সর্বশেষ

আরও খবর

‘আপনি হয় আওয়ামী লীগ অথবা জামাত-শিবির-রাজাকার’

‘আপনি হয় আওয়ামী লীগ অথবা জামাত-শিবির-রাজাকার’


মানুষের স্বাধীনতাহরণই দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা

মানুষের স্বাধীনতাহরণই দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা


দক্ষিণ এশিয়ার ভাটিয়ালি গণতন্ত্রেরা

দক্ষিণ এশিয়ার ভাটিয়ালি গণতন্ত্রেরা


পেডোফিলিক রাজনীতিকদের নিয়ে আমরা কী করবো!

পেডোফিলিক রাজনীতিকদের নিয়ে আমরা কী করবো!


হ্যাশট্যাগ স্ট্যান্ড ফর রিচ কিড গ্যাং

হ্যাশট্যাগ স্ট্যান্ড ফর রিচ কিড গ্যাং


আত্মপ্রবঞ্চনা নয় বরং আত্মসমালোচনা

আত্মপ্রবঞ্চনা নয় বরং আত্মসমালোচনা


দিল্লির অধিনায়কত্ব ছাড়লেন গাম্ভীর

দিল্লির অধিনায়কত্ব ছাড়লেন গাম্ভীর


বিশ্ব একাদশে সাকিব-তামিম

বিশ্ব একাদশে সাকিব-তামিম


কোটা সংস্কার আন্দোলনে কেউ হারেনি; কেউ জিতেনি

কোটা সংস্কার আন্দোলনে কেউ হারেনি; কেউ জিতেনি


কোটার ভ্রমর ও বঙ্গপাঞ্জাবির দিনগুলি

কোটার ভ্রমর ও বঙ্গপাঞ্জাবির দিনগুলি