Wednesday, June 7th, 2017
বাঙালির দ্বি-মুখী লড়াই: হিন্দুত্বের সাথে এবং মুসলমানিত্বের সাথে
June 7th, 2017 at 10:52 am
বাঙালির দ্বি-মুখী লড়াই: হিন্দুত্বের সাথে এবং মুসলমানিত্বের সাথে

রাজু আহমেদ মামুন: বাঙালি বলতে এই গ্রহে যে জনগোষ্ঠিকে বোঝায় তার প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ ভাগ ইসলাম ধর্মের অনুসারী। এই ধর্মটি এমন যে জনগোষ্ঠীর মধ্যে এর বিস্তার হয় সেই জনগোষ্ঠীর ভাষা সংস্কৃতি ধর্মটি গ্রাস করে ফেলে। যেমন মিশরীয়রা তাদের সমৃদ্ধ সভ্যতা ও ভাষা সংস্কৃতি হারিয়ে অনেকটা আরবীয় বনে গেছেন। কিন্তু এই বাস্তবতার এক শক্ত ব্যতিক্রম হল বাঙালিরা। ইসলাম বাংলার মানুষ গ্রহণ করেছে ঠিকই কিন্তু সে তার ভাষা সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিয়ে নয়। বরং ভাষা সংস্কৃতিকে রক্ষা করার প্রয়োজনে এই জনগোষ্ঠী কখনও কখনও দুর্ভেদ্য ইস্পাতের দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাজার বছর ধরে এই আগ্রাসন প্রচেষ্টার বাঁকে বাঁকে বাঙালি মুসলমানদের প্রতিরোধের অনেক নজির রয়েছে।

ধরা যাক সেই মধ্যযুগের কথা, যখন পৃথিবীতে জাতীয়তাবাদের বিষয়টি খুব স্পষ্ট নয় সেই ঘুম প্রহরেও বাঙালি মুসলমান কবি তার ভাষা সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে জ্বলে উঠেছেন আগ্নেয়গিরির মত। উচ্চারণ করেছেন, “যে জন বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/ সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি”। তাহলে এবার আমাদের একটু খোঁজ নেয়া প্রয়োজন বাঙালির এই প্রধান ধর্মীয় শাখাগুলোর জন্ম, ইতিহাস এবং পরিচিতি সম্পর্কে। তবে তার আগে বাঙালির ইতিহাসটা জানা জরুরি।

চলুন ফিরে যাই ইতিহাসের আরও প্রাচীনতম পর্বে। বাঙালিদের সম্পর্কে প্রথম স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় প্রাচীন গ্রিকদের লেখায়। সেই ২৩০০ বছর আগে বা ৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, আলেকজান্ডার যখন ভারত আক্রমন করলেন তখন আমরা জানতে পারলাম বঙ্গে বিরাট এক সামরিক শক্তির উপস্থিতি। ষাট হাজার পদাতিক বাহিনী, দশ হাজার অশ্বারোহী এবং ছয় হাজার হস্তি বাহিনীর বিশাল সমর উপস্থিতি তো কোনো অসভ্য বা অসংগঠিত জনগোষ্ঠীর দ্বারা সম্ভব নয়! এতদিন আমরা প্রাচীন বৈদিক হিন্দুদের গ্রন্থ থেকে প্রাচীন বাঙালিদের সম্পর্কে কী প্রচারণা শুনে এসেছি? বাঙালিরা ম্লেচ্ছ, তাদের ভাষা পাখির ভাষার মত, বাঙালিরা দাস/দস্যু/রাক্ষস, এই অঞ্চল পাণ্ডববর্জিত। অতএব বঙ্গে কেউ যাবে না, যে যাবে তাকে শুদ্ধি গ্রহণ করতে হবে। এখন প্রশ্ন হতে পারে এই গালাগালের পেছনে আসল রহস্যটা কী? ধরা যাক উপকথা অনুসারে, মহাভারতের অর্জুন আসামের রাজার সাথে লড়াই করে জয়ী হয়, মনিপুর জয় করে, তারা কি একবারও বাংলায় ঢোকার চেষ্টা করেননি? না দেখেই বাঙালিদেরকে দাস/দস্যু/রাক্ষস প্রভূতি গালাগাল করে চলে গেলেন! ব্যাপারটি আসলে এমন নয়। কেননা, গ্রিকদের বর্ণনা মোতাবেক এত বড় সমর উপস্থিতি যে জনগোষ্ঠির ছিল তাদের দেশ তো জয় করা সহজ ব্যাপার নয়। সম্ভবত যতবারই বৈদিকরা বঙ্গে আক্রমন চালিয়েছে ততবারই ব্যাপক মার খেয়ে ভাগতে হয়েছে। ফলে ‘আঙুর ফল টক’, বাঙালিরা দাস/দস্যু/রাক্ষস! পাণ্ডবরা যেখানে ঢুকতেই পারেনি সেই স্থান তো তারা বর্জন করতেই পারে!

সম্ভবত বঙ্গীয় অঞ্চলের মানুষ তাদের নিজস্বতা সম্পর্কে সেই প্রাচীন কালে এতটাই সচেতন ছিল যে আজ থেকে ২৬০০ বছর আগে জৈন তীর্থাঙ্কর মহাবীর যখন ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে বাংলায় প্রবেশ করলেন, স্থানীয় জনগন তাকেও প্রত্যাখ্যান করেছিল। কুকুর লেলিয়ে তাড়ানো হয়েছিল। ফলে মহাবীর বাংলা থেকে চলে গিয়ে বলেছিলেন, ‘এরা খুব অসভ্য, কুকুর লেলিয়ে দেয়’। বাঙালিদের সম্পর্কে প্রাচীন গ্রন্থ দ্বীপবংশে আরেকটি বীরত্ব গাঁথার উল্লেখ পাওয়া যায়। সম্ভাব্য ঘটনাটি হতে পারে আজ থেকে ২৭০০/২৮০০ বছর আগে। বাঙালি যুবরাজ বিজয়সিংহ কর্তৃক সিংহল বিজয় এবং রাজ্য স্থাপনের কাহিনী। যদিও সেখানে বিজয়সিংহকে উপস্থাপন করা হয়েছে অনেকটা নিন্দনীয়ভাবে। তবুও এটা স্পষ্ট বাঙালিরা লড়াকু, সাহসী এবং বীরের জাতি। যাই হোক, চলুন বাঙালি জাতির ইতিহাস অনুসন্ধানে আমরা আরও সুদূর অতীতের পথে হাঁটি। নিশ্চয়ই এই প্রশ্নটা সবার ভেতরে উঁকি দিচ্ছে কীভাবে বঙ্গে বাঙালি জাতির উদ্ভব!

আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যানে আজ আমরা জানি মানুষ প্রজাতির উদ্ভব ঘটেছিল আফ্রিকা অঞ্চলে। সম্ভবত তাঞ্জেনিয়া ছিল সেই লীলাভূমি। জেনেটিক সায়েন্সের কল্যাণে জিনের মার্কারের উপর গবেষণা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা আজ আমাদের নিশ্চিত করেছেন যে, আজকের পৃথিবীর মানুষের পূর্বপুরুষ হোমাসেপিয়েন্স সেপিয়েন্সরা আজ থেকে ৭০ হাজার বছর আগে দক্ষিণ সুদান থেকে রেড সী পাড়ি দিয়ে আরবের মধ্য থেকে পারস্য হয়ে ভারতে প্রবেশ করে এবং বাংলার উপর দিয়ে তাদের অগ্রগামী দল ৫০ হাজার বছর আগে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছে। হোমাসেপিয়েন্স সেপিয়েন্সদের দ্বিতীয় দলটি আজ থেকে ৬০ হাজার বছর আগে উত্তর আফ্রিকা থেকে বের হয়ে ইরাক, পারস্য হয়ে পাকিস্তানের উত্তরাংশ দিয়ে তিব্বতের দিকে অগ্রসর হয় এবং পাকিস্তান থেকে একটি শাখা ভারতের ভেতর প্রবেশ করে দক্ষিণাত্যের দিকে চলে যায়। তিব্বতের দিকে চলে যাওয়া শাখাটি বঙ্গের পূর্বদিক দিয়ে প্রবেশ করে বর্মা, চীন এবং থাইল্যান্ডের দিকে চলে যায়। অন্যদিকে পাকিস্তান থেকে দক্ষিণাত্যের দিকে প্রবাহিত হয়ে যাওয়া শাখাটিরও একটা অংশ সমুদ্র উপকূল ধরে কালক্রমে বঙ্গের দিকে উপস্থিত হয়।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, মানুষের এই মহাযাত্রা যখন চলছিল তখন কিন্তু গ্রহ জুড়ে বরফযুগ। পৃথিবীর অধিকাংশ জল জমে আছে বরফ হয়ে। সমুদ্রের পানির লেভেল অনেক নিচে। অর্থাৎ আজকের চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা ও কলকাতা থেকে দক্ষিণ দিকের সমুদ্রের ভেতর বিস্তর ভূমি ছিল, যেখানে মানুষ পায়ে হেঁটে চলাচল করতো এবং সমুদ্র থেকে খুব সহজেই মাছ ধরে খাদ্যের যোগান দিতে পারতো। নিরক্ষীয় অঞ্চল বরাবর হওয়ায় কৃষির সূচনাটিও সম্ভবত এই অঞ্চলে ঘটেছিল। যদিও বিজ্ঞানীরা এ ব্যাপারে একমত যে, ধান নামক খাদ্যশস্যটির প্রথম আবাদ বাংলা থেকে থাইল্যান্ডের কোনো এক অঞ্চলে। যাই হোক এটি স্পষ্ট যে, আজ থেকে ১২ হাজার বছর আগে বরফযুগ শেষ হবার আগ অব্দি বাংলার মত পৃথিবীর নিরক্ষীয় অঞ্চল বরাবর যে সমস্ত দেশগুলো রয়েছে সেখানে মানুষ এবং প্রাণির ঘন সন্নিবেশ ছিল। ফলে জাতি হিসেবে বাঙালি এই বঙ্গে ৫০ হাজার বছর ধরে বিবর্তিত হওয়ার সুযোগ লাভ করেছে।

আজ থেকে ১২ হাজার বছর আগে যখন শেষ বরফযুগের সমাপ্তি ঘটে, হিমালয়ের বরফ গলতে শুরু করে এবং বঙ্গের উপর দিয়ে তা যখন বঙ্গোপসাগরের দিকে প্রবাহিত হতে থাকে সেই বিগলিত জলধারার কারণে বৃহত্তর বঙ্গের উপর সৃষ্টি হয় হাজার হাজার নদী। জল নিয়ে আসে পলি, বাড়তে থাকে বঙ্গভূমির উচ্চতা। ওদিকে বাড়তে থাকে সমুদ্র জলের উচ্চতাও। ফলে দুর্গম হয়ে যায় হাজার হাজার নদী বেষ্টিত বৃহত্তর বাংলা। দুর্যোগপ্রবণ হয় জনপদ, কিন্তু মাটি তো উর্বর! মৎস্যবাহী নদী, চারদিকে জন্ম নেয় বিপুল বৃক্ষের। খাদ্য অফুরান, নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন দুর্গম জনপদে স্বাধীনভাবে বিস্তার লাভ করে বাঙালি জীবন।

প্রাকৃতিক কারণেই বহিরাগতদের দ্বারা বাংলা আক্রমন খুব একটা সহজ ব্যাপার ছিল না। আর স্থানীয় জনগণ যেহেতু প্রকৃতির সাথে লড়াই করতে অভ্যস্থ ছিল, সুতরাং তারা ছিল প্রকৃত যোদ্ধা। লেখ্য ভাষার প্রচলনের আগে যেহেতু মানুষের অভিজ্ঞতাজাত জ্ঞান, উপলব্ধি ও উপকথা স্মৃতিস্থ করে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রচারিত হত, তেমনি বিলুপ্তি এবং বিস্মৃতির সম্ভাবনাও ছিল যথেষ্ট। সেই প্রাচীন পৃথিবীতে বাঙালিরা যে জ্ঞান চর্চা করেনি সেটি কিন্তু হলফ করে বলা যায় না। তবুও অতীতের অন্ধ ঘর হাতরে যা দু-একটি পাওয়া যায় তাও কিন্তু উল্লেখ করার মত। অধ্যাপক রিচার্ড গার্বে গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, আজ থেকে ২৭০০ বছর আগে সেই প্রাচীন সাংখ্য দর্শনের জন্ম হয়েছিল বাংলায়। আবার প্রাচীন হস্তি চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক পালকাপ্য মুনিও ছিলেন একজন বাঙালি। বৌদ্ধ লামা শাখার প্রবর্তক বাঙালি অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান আজও পৃথিবীর বিখ্যাত ব্যক্তিদের একজন।

যাই হোক, প্রাচীন বাংলার বাঙালিরা যে সরল, উদার, বীরত্বপূর্ণ ও সাম্যবাদী সমাজের মানুষ ছিল তার পরিচয় বাঙালি মানসের গহিনে আজও কম-বেশি বিদ্যমান। কিন্তু এই বাংলায় প্রথম বহিরাগতদের উপস্থিতি আমরা টের পাই কখন? আলেকজান্ডারের চলে যাওয়ার পর মগধে সেই ৩২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এক শুদ্র রমণী মুরার নামে তার পুত্র চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য প্রতিষ্ঠা করেন মৌর্য সাম্রাজ্য। মৌর্য সাম্রাজ্যে প্রথম বাংলার অর্ন্তভূক্তির ইতিহাস পাওয়া যায়। সে কি আপোষকামিতার ফল ছিল নাকি যুদ্ধের মাধ্যমে তা স্পষ্ট নয়, কেননা মগধকে প্রায়ই বগধ নামেও প্রাচীন গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়। যেহেতু রাজধানী পাটলিপুত্র বঙ্গের সীমান্তবর্তী ছিল সেহেতু এই সাম্রাজ্যকে অনেকখানি বাঙালি সাম্রাজ্যও বলা যেতে পারে। ধারণা করা হয়, এই সময় থেকেই পশ্চিম ভারতীয় ধর্ম ও দর্শন ভাবনা ধীরে ধীরে বাংলায় প্রবেশ করার সুযোগ লাভ করে। এটি স্পষ্ট যে, মৌর্য সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রধর্ম বৌদ্ধ ধর্ম এসময় থেকেই বাংলার জনপদে বিস্তার লাভ করতে শুরু করে। সেদিক থেকে বৌদ্ধ ধর্মই প্রথম কোনো বহিরাগত ধর্ম যা সম্ভবত আজীবক সম্প্রদায়ের হাত ধরে বাংলার জনপদগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। তবে ধারণা করা হয় যে এই অনুপ্রবেশও সহজ ছিল না। বৌদ্ধ দর্শন বঙ্গে প্রবেশ করে স্থানীয় তন্ত্র দর্শন ও শাক্ত ধর্মের সাথে অনেকখানি কমপ্রোমাইজ করে এবং স্থানীয় চরিত্র লাভ করে।

মৌর্য সাম্রাজ্য পতনের কয়েক শতাব্দি পরে মগধকে কেন্দ্র করে ৩২০ খ্রিস্টাব্দের দিকে যখন আবার গুপ্ত সাম্রাজ্যের জন্ম হয় তখনও বাংলায় স্থানীয় লোকধর্মের পাশাপাশি বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার চলছে। যদিও মৌর্য সাম্রাজ্য থেকে গুপ্ত সাম্রাজ্যের চরিত্র অনেকখানি ভিন্ন ছিল। ব্রাহ্মণ্যইজম-এর বর্ণাশ্রম প্রথা প্রভাবিত পৌরাণিক হিন্দু ধর্মের উত্থানকাল ছিল গুপ্ত সাম্রাজ্যের পৃষ্ঠপোষকতায়। তবুও গুপ্ত সম্রাটদের সহিষ্ণু ধর্মনীতির কারণে বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার লাভের ক্ষেত্রে তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়নি। ঐতিহাসিকভাবে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা প্রথম প্রকট হতে দেখা যায় সপ্তম শতকের শুরুর দিকে শৈব ধর্মাবলম্বী রাজা শশাঙ্কের সময়। শশাঙ্ক বৌদ্ধদের উপর কিছুটা নিপীড়নের দৃষ্টান্ত রেখে যান, কিন্তু তার মৃত্যুর পর বাংলায় কেন্দ্রিয় শাসনের অনুপস্থিতে শুরু হয় রাজনৈতিক মৎস্যন্যায়। যদিও স্থানীয় জনগন ৭৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে গোপাল নামক বৌদ্ধ ধর্মালবম্বি এক বাঙালিকে গৌড়ের সম্রাট পদে অভিষিক্ত করে। জনগন কর্তৃক নির্বাচিত এই বৌদ্ধ পালদের শাসন প্রায় চারশ বছর দীর্ঘস্থায়ী হয়। পালদের জনকভূমি ছিল বাংলাদেশের রাজশাহীতে। এগার শতকের শেষের দিকে দক্ষিণ ভারত থেকে আসা হিন্দু সেনরা পালদের হটিয়ে বাংলা দখল করে নিলে শুরু হয় বাংলার ইতিহাসে হিন্দুযুগ। বাংলার জনপদে নেমে আসে বর্ণাশ্রম প্রথার করাল আঘাত। স্থানীয় বৌদ্ধ এবং লোকজ ধর্ম অনুসারীদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয় বর্ণপ্রথা। সহযোদ্ধা ক্ষত্রিয়দের মধ্যে সামন্ত, মহাসামন্ত পদ সৃষ্টি করে সেনরা ভাগ করে দেন বাংলার জনপদ। কনৌজ প্রভূতি অঞ্চল থেকে আমন্ত্রন জানিয়ে নিয়ে আসেন কিছু ব্রাহ্মণদের। যদিও স্থানীয় অধিবাসীরা এই হিন্দু বর্ণবাদী প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে গেছেন সেন শাসনের শেষ অবধি। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধদের উপরে নেমে আসে হিন্দু নিপীড়ণ। সামন্ত, মহাসামন্তদের হাতে নিহত হতে থাকেন বৌদ্ধ শ্রমণরা। তবে স্থানীয় লোকধর্মের কিয়দাংশ অনুসারীরাই বাধ্য হয়ে কখনও কখনও মেনে নিয়েছে সেনদের বর্ণপ্রথা। এভাবেই বাংলায় জন্ম লাভ করতে শুরু করে বাঙালি হিন্দু সমাজ। যদিও সেনদের বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে সারা বাংলা জুড়ে বিস্তর বিদ্রোহের ইতিহাস রয়েছে।

১২০৩ খ্রিস্টাব্দের দিকে বখতিয়ার খলজির বাংলা আক্রমনের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি হতে শুরু করে সেন শাসনের। সংখ্যাগরিষ্ট ও নিপীড়িত বৌদ্ধরা গ্রহণ করতে শুরু করে ইসলাম ধর্ম। বাংলায় জন্ম নেয় বাঙালি মুসলিম সমাজের। ততদিনে বহিরাগত ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং স্থানীয়দের নিয়ে সৃষ্টি হওয়া বাঙালি হিন্দু সমাজ পড়ে যায় ব্যাপক অস্তিত্ব সংকটে। বাঙালি বৌদ্ধরা যেমন রাজনৈতিক কারণে মুসলমান হয়েছে দলে দলে, তেমনি বাঙালি হিন্দুদের উচ্চবর্ণের লোকদেরও জোরপূর্বক মুসলমান বানানোর ইতিহাস পাওয়া যায় কম-বেশি।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ভারতজুড়ে বৌদ্ধ ধর্মগুরু শ্রমণদের সাথে ব্রাহ্মণদের সাম্প্রদায়িক সংঘাতটি দীর্ঘদিনের। তবে বাংলায় এই সংকটটি প্রকট হয়ে ওঠে সেন আমলে। ব্রাহ্মণরা বরাবরই শ্রমণদের নাস্তিক, পাষণ্ড এবং ন্যাঁড়া বলে গালি দিতেন। বৃহত্তর বাঙালি বৌদ্ধ সমাজ বাঙালি মুসলমান সমাজে বিবর্তিত হলেও সাম্প্রদায়িকতা কিন্তু বাঙালিকে ছাড়লো না। বাঙালি বৌদ্ধদের প্রতি দেয়া ‘ন্যাঁড়া’ গালিটি বিবর্তিত হয়ে মুসলমানদের উপর পড়লো ‘ন্যাঁড়ার পো’ বলে। জানা যায়, হিন্দু সেনরা তাদের শাসনামালে স্থানীয় ভাষা-সংস্কৃতির কোনো পৃষ্ঠপোষকতা তো করেইনি বরং নিপীড়ণ করেছে। এর কারণ হতে পারে অধিকাংশ মানুষ যেহেতু বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী ছিলেন ফলে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিতে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা না করাই স্বাভাবিক। তবে তারা যে শিল্প-সাহিত্যের চর্চা করেনি তেমনটাও নয়। করেছেন, তবে সেটা সংস্কৃত ভাষায়। বিশেষ করে জয়দেব-এর ‘গীতিগোবিন্দ’ সে সময়ের উল্লেখযোগ্য কাব্যকীর্তি।

যাই হোক খিলজি শাসন, মামলুক শাসন এবং মাহমুদ শাহী বংশের শাসনে প্রায় দেড় শতাব্দিকালে বাংলার ইতিহাসে ধর্মান্তকরণের গতি বৃদ্ধি এবং মুসলমান শাসক কর্তৃক ভূমি দখল ছাড়া তেমন কেনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা নেই। তবে ১৩৪২ খ্রিস্টাব্দের দিকে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের হাত ধরে বাংলায় সূচনা ঘটে স্বাধীন সুলতানী আমলের। বাংলার ইতিহাসের এক স্বর্ণজ্জ্বল অধ্যায়। এই স্বাধীন সুলতানী আমল প্রায় ২০০ বছর স্থায়ী হয়েছিল। সুলতান ইলিয়াস শাহকে বলা হয় ‘শাহ-ই-বঙ্গাল’। তিনিই প্রথম বঙ্গের সমস্ত অঞ্চলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশটির নাম রাখেন ‘বাঙ্গালা’। বাংলার সুলতানরা স্থানীয় ভাষা-সংস্কৃতির ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা করেন। সুলতানী আমল ছিল বাংলা সাহিত্যেরও স্বর্ণযুগ। এ যুগে জন্ম হয় মঙ্গলকাব্য ও পদাবলীর। রাজ পৃষ্ঠপোষকতায় অনুবাদ হয় রামায়ণ এবং মহাভারতের। তখনও কিন্তু বর্ণবাদী হিন্দুরা প্রচার চালিয়েছিল-ম্লেচ্ছদের ভাষা বাংলায় যারা রামায়ণ বা মহাভারত অনুবাদ করবে তারা রৌরব নরকে যাবে!

ঢাকার সোনারগাঁওকে রাজধানী করে সুলতানী বাংলার সমৃদ্ধি ছিল প্রবাদ-প্রতীম। যেহেতু সার্বভৌম দেশ, তাই সুলতানদের হাতে বাংলার সম্পদ বাংলাতেই থাকতো। দিল্লী কিংবা অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ ছিল না। সুলতানদের তুলনামূলক অসাম্প্রদায়িক নীতির কারণে বাংলা জুড়ে ধর্মীয় স্বাধীনতাও ছিল উল্লেখ করার মত। এর একটি দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ হল এই যুগে হিন্দু ধর্মের বিকাশ। সেন আমলে জন্ম নেয়া বাঙালি হিন্দু সমাজ এবং তার পরপরই জন্ম নেয়া বাঙালি মুসলিম সমাজ প্রায় সমবয়সী হলেও বাঙালি বৌদ্ধদের ধর্মান্তকরণের ফলে এবং মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় বঙ্গে ইসলামের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটে। অন্যদিকে অস্তিত্ব সংকটে পড়ে নিশ্চিহ্ন হতে থাকে বাঙালি হিন্দু সমাজ। এমন প্রেক্ষাপটে হিন্দুদের বৈষ্ণব উপ-ধর্মের রাধা-কৃষ্ণের প্রেম কাহিনী নিয়ে ধর্মীয় ভাবান্দোলনের সূচনা ঘটান নদীয়ার শ্রীচৈতন্য। এখানে উল্লেখ্য যে, উড়িষ্যার জাজপুরের বাসিন্দা শ্রীচৈতন্যের পরিবার বাঙালি ছিলেন না। তবুও তার ভাবান্দোলনের ফলে বাংলা সাহিত্যে যে রোমান্টিসিজমের জন্ম হয় তা ছিল প্রবাদ-প্রতীম। যা আজও আমাদের জাতীয় সাহিত্যে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে রয়েছে। শ্রীচৈতন্যের এই ভাবান্দোলন এতটাই প্রভাবশালী হয়েছিল যে বাংলা জুড়ে হিন্দু ধর্মের যেমন বিস্তার ঘটেছিল তেমনি অনেকখানি রোধ করে ফেলেছিল ইসলাম ধর্মের অগ্রযাত্রার ধারা। এমনকি মুসলমান কবিরা পর্যন্ত এই বৈষ্ণব ভাবান্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিল। ধারণা করা হয় শ্রীচৈতন্যের পৈতৃক দেশ উড়িষ্যার পুরী মন্দিরে শ্রীচৈতন্যকে হত্যা করে তার প্রতিপক্ষ হিন্দুরা।

তবে এটিও সত্য যে, বাঙালি হিন্দু এবং মুসলমান দুই ধারার সাথেই কম-বেশি সংমিশ্রণ ঘটে বহিরাগত অ-বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানদের। আর এটাও এক প্রাকৃতিক সত্য যে, একটি বড় জাতিকে যদি আমরা মানুষের মহাসমুদ্রের দিকে প্রবাহমান একটি বড় নদী মনে করি, তাহলে সেই নদীর স্রোতে নানা ধারার জল এসে মিশে একটি বড় প্রবাহ সৃষ্টি করবে এটাই স্বাভাবিক। শেষ সত্য তো আমরা সবাই মানুষের সন্তান। তবে রাজ পৃষ্ঠপোষকতা এবং সুফিদের ইসলাম প্রচারের পাশাপাশি টুকিটাকি জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণ যে মুসলিম বাংলায় ঘটেনি এমনটা নয়। এমনটা বেশি ঘটেছে উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের সাথে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরদের পরিবারের মত পীরালি ব্রাহ্মণ আজও বাংলায় কম-বেশি পাওয়া যায়।

মোঘলদের হাতে স্বাধীন সুলতানী বাংলার পতন ঘটলে ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে ঢাকাকে রাজধানী করে জন্ম হয় মোঘল প্রদেশ ‘সুবা বাংলা’। রাজস্ব ছাড়া ভাষা-সংস্কৃতি-ধর্মসহ স্থানীয় মানুষের ইত্যাকার বিষয়ে মোঘল শাসকদের কোনো আগ্রহ ছিল না। তবে মোঘল এবং নবাবী শাসনামালে বর্ণ হিন্দুরা শাসকদের কাছ থেকে সর্বাধিক সুবিধা আদায়ে সফল ছিলেন। সেদিক থেকে বাঙালি মুসলমানরা বরাবরই ছিলেন পিছিয়ে। তাদের নেতৃত্বেও থাকতো সর্বদা বহিরাগত মুসলমানরা। যেহেতু বাঙালি মুসলমানরা ভূমিপুত্র, তারা থাকতেন গ্রামীণ জনপদে। নগর এবং শাসকদের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিল খুবই কম। ধর্মীয় স্বাধীনতা তারা হয়তো পেতেন কিন্তু এর অতিরিক্ত কোনো রাজানুকূল্য তাদের ভাগ্যে ছিল কদাচিৎ। বাংলা ভাষায় ছিল তাদের বলার, ভাবার এবং যাপনের জগৎ।

যাইহোক, ১৭১৭ সালের দিকে মোঘল শাসনের কেন্দ্রিয় দুর্বলতার সুযোগে মুর্শিদকুলি খানের হাত ধরে বাংলা আবার স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং সূচনা ঘটে স্বাধীন নবাবী বাংলার। তবে ৪০ বছরের স্বাধীন নবাবী বাংলার পতন ঘটে ইংরেজ বেনিয়াদের হাতে ১৭৫৭ সালে। কার্যত এই সময় থেকেই শুরু হয় বাংলার উপনিবেশিক ইংরেজ শাসনের যুগ। যেহেতু অধিকাংশ সময়েই বাঙালি মুসলমানদের নেতৃত্বে থাকতো সামান্য সংখ্যক বহিরাগত মুসলমান, অতএব তাদের চোখে সাদা ইংরেজরা ছিল মুসলমানদের হাত থেকে ক্ষমতা অপহরণকারী শত্রু। কাজেই শত্রুর ভাষা-সংস্কৃতি এবং তার সাহচর্য বর্জন করে দ্রোহি হওয়াই ছিল বাঙালি মুসলমানদের মানসিক অবস্থান। অন্যদিকে হিন্দুদের কাছে এটা ছিল সাম্প্রদায়িক শত্রু রাজার বদল মাত্র। কাজেই বাঙালি হিন্দুরা দ্রুতই ইংরেজদের ভাষা-সংস্কৃতি আত্মস্থ করে রাজকীয় সুযোগ-সুবিধা নিতে উঠে পড়ে লাগে এবং সফলও হয়।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এই দুটি বড় বাঙালি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উদ্ভব কাল থেকেই শুধু মুসলমান এবং শুধু হিন্দু মানসের সাথে- বাঙালি মুসলমান এবং বাঙালি হিন্দু মানসের একটি আন্তঃসাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব সর্বদাই বিরাজমান ছিল। যেকারণে সামান্য সংখ্যক বহিরাগত মুসলমানরা বাঙালি মুসলমানের বাঙালিত্বকে সর্বদাই হেয় চোখে দেখতেন এবং বাঙালিত্বকে ভুলিয়ে দেবার ব্যর্থ চেষ্টাও ছিল নিরবচ্ছিন্ন। তেমনি বাঙালি হিন্দুদেরকে অ-বাঙালি হিন্দু ব্রাহ্মণরা বরাবরই হেয় চোখে দেখে এসেছে। এমনকি বাঙালি ব্রাহ্মণদের গায়েও “দীর্ঘতমা মুনির জারজ সন্তান”র তকমা এঁটে দিতে পশ্চিম ভারতীয় ব্রাহ্মণরা কখনওই ভুল করেননি। তবে বাঙালির শরীরে সাম্প্রদায়িকতার যে বিষ হাজার বছর ধরে প্রবাহিত হচ্ছিল ব্রিটিশ আমলে তা কিন্তু বেশ ভয়ানক রূপে স্পষ্ট হয়। তিতুমীরের ইংরেজ বিরোধী বিদ্রোহ বা হাজী শরীয়তউল্লাহর ফরায়েজী আন্দোলন যেমন সাম্প্রদায়িক ছিল এবং এটা সর্বজনীন বাঙালির ছিল না, তেমনি রাজা রাম মোহন রায় বা বিদ্যাসাগরের সংস্কার আন্দোলনও ছিল কেবল বাঙালি হিন্দুদের জন্য যা সর্বজনীন বাঙালির ছিল না। আবার শিক্ষা-দীক্ষায় অগ্রসরমান বাঙালি হিন্দু বুদ্ধিজীবিরা সাম্প্রদায়িক তাড়নায় বাঙালি মুসলমানদের বাঙালিত্বকেই খারিজ করে দিতে উঠে পড়ে লাগলেন।

অন্যদিকে স্থানীয়দের শাসনের প্রয়োজনে ইংরেজদের দরকার হয়ে পড়ে একটি স্থানীয় ভাষার। সেক্ষেত্রে অনিবার্যভাবেই নির্ধারিত হয় বাংলা ভাষা। ভাষাটিকে শাসনকার্যে ব্যবহার উপযোগি করতে সংস্কারের উদ্দেশ্যে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে আসন লাভের সুযোগ পান রাম রাম বসুর মত সংস্কৃত ভাষার পণ্ডিতরা। বিজয় গুপ্ত, আলাওল, কীর্ত্তিবাস, কাশীরাম দাশসহ অজস্র বাঙালি কবিদের হাতে সেই সুলতানী আমলে সমৃদ্ধ হওয়া বাংলা ভাষার শরীরে নেমে আসে তাল তাল সংস্কৃত ভাষার মৃত মাংস। জনগনের কাছে দুর্বোধ্য হয়ে পড়ে সংস্কার করা ভাষাটি। যদিও পরবর্তী কালে বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত অনেক বাঙালি মনীষিকেই দেখা যায় সংস্কৃতকে বাংলার উপর চাপিয়ে দেয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে।

তৎকালীন ইউরোপের অগ্রসর জনগোষ্ঠির মধ্যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের জয়জয়কার দেখে কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু বুদ্ধিজীবিরা বুঝে নিলেন জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্ব। অতএব বাঙালিত্ব চাই, কিন্তু তা কেবল হিন্দুদের। যদিও কিছুকাল পরে ১৮৭২ সালে বাংলায় যখন প্রথম আদমশুমারি হয় তখন জানা গেল বাংলা একটি মুসলিম প্রধান অঞ্চল। কাজেই ভড়কে গেলেন হিন্দু সাম্প্রদায়িক বুদ্ধিজীবিরা। শুরু হল কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু বুদ্ধিজীবি কর্তৃক বাঙালি মুসলমানের বিরুদ্ধে তথ্যসন্ত্রাস। যেমন ধরা যাক, বাঙালি মুসলমানরা হিন্দু থেকে মুসলমান হয়েছে অথবা বাঙালি মুসলমানরা ছিল নিম্ন বর্ণের হিন্দু। আবার কেউ কেউ একটু এগিয়ে বলার চেষ্টা করেছেন-মুসলমানরা আসলে এই অঞ্চলের মানুষই ছিল না! বিস্ময়করভাবে এই অপপ্রচারটি লুফে নেয় বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে অবস্থানকারী বহিরাগত মুসলিম মানসের উত্তরাধিকাররা। তারা বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে প্রচার চালানোর চেষ্টা করে-মুসলমানই একটি জাতি এবং জগতের শ্রেষ্ঠতম জাতি, কী দরকার তোমাদের বাঙালি পরিচয়ের! বাঙালিত্ব বরং একটি নিচু ব্যপার! পরিত্যাগ করো এই পরিচয়। কিন্তু বাঙালি মুসলমানরাও ততদিনে আধুনিক শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে গেছে কিছুটা এবং বুঝেও ফেলেছেন বহিরাগত অবাঙালি মুসলমানদের ভুল প্রচারণা।

তবে ইংরেজদের হাত ধরে বাঙালি হিন্দু-মুসলমানদের সাম্প্রদায়িকতা অনেকটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে। ঢাকাকে রাজধানী করে পূর্ববঙ্গ এবং আসাম নিয়ে ব্রিটিশরা তাদের শাসনকার্যের সুবিধার্তে একটি নতুন প্রদেশ সৃষ্টি করলে কিছুটা বিপন্ন হয়ে পড়ে কলকাতাকেন্দ্রিক পূর্ববঙ্গের হিন্দু জমিদাররা। তাদের পয়সায় দেশপ্রেমে ফেটে পড়ে কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু বুদ্ধিজীবিরা। এদিকে মুসলমান অধ্যুষিত পূর্ববঙ্গের বাঙালিদের ইংরেজরা বোঝাতে চেষ্টা করেন-নতুন প্রদেশ তাদের কল্যানেই সৃষ্টি করা হয়েছে। যদিও এ গল্প সর্বস্তরের বাঙালি মুসলমানরা গিলেনি এবং অনেক বাঙালি মুসলিম নেতাই বঙ্গবঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ফলে বাঙালি হিন্দুদের দেশপ্রেমের আন্দোলনের তোড়ে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয় ব্রিটিশ রাজ। এই গোলযোগে কলকাতা থেকে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী চলে যায় দিল্লীতে। পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের সান্ত¡না দেবার জন্য ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষনা দেয় ইংরেজরা। কিন্তু উক্ত ঘটনার পরে এসব ছাপিয়ে বাঙালি হিন্দু এবং মুসলমানদের মধ্যে অহেতুক স্পষ্ট হয়ে ওঠে একটি বড় সাম্প্রদায়িক দেয়াল। তবে জনসংখ্যার দিক দিয়ে অবিভক্ত বাংলায় বাঙালি মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার ফলে ১৯৩৭ সালের প্রথম নির্বাচনে বাংলার প্রধানমন্ত্রী হন শেরে বাংলা এ. কে ফজলুল হক। এর পরবর্তীতে অবিভক্ত বাংলার প্রায় সবগুলো নির্বাচনেই কোনো না কোনো মুসলমান নেতার নেতৃত্বে বাংলায় সরকার গঠন করতে দেখা যায়। ফলে সাম্প্রদায়িক বাঙালি হিন্দু নেতৃত্বের কাছে সর্বভারতীয় হিন্দু ঐক্যের বিষয়টিই হয়ে পড়ে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য। এদিকে ব্রিটিশদের বিদায় লগ্ন ঘনিয়ে আসলে উপমহাদেশ জুড়ে দাবী ওঠে একটি হিন্দু ভারতের এবং একটি মুসলমান ভারত বা পাকিস্তানের। যদিও ভারতীয় উপমহাদেশ কখনওই একটি দেশ ছিল না। এই সর্বভারতীয় ইজমটি যতটা না ভারতীয় তার চেয়ে অনেক বেশি ব্রিটিশ উপনিবেশিক মানসজাত ছিল।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ১৮৮৫ সালে কলকাতায় জন্ম নেয়া রাজনৈতিক দল কংগ্রেস থেকে বাঙালি কর্তৃত্ব হারায় তার আভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে। তেমনি ১৯০৬ সালে ঢাকায় জন্ম নেয়া রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ থেকেও বাঙালির কর্তৃত্ব চলে যায় পশ্চিম ভারতীয় জিন্নাহর হাতে। ফলে ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের নেতৃত্ব দানকারী এই দুটি রাজনৈতিক দলের উপর বাঙালিদের কোনো কর্তৃত্বই ছিল না। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে, হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়গত বিবেচনায় সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপট এবং বাংলার প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপটে যেমন হিন্দুরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং মুসলমানরা ছিল সংখ্যালঘিষ্ঠ, তেমনি বাংলার প্রেক্ষাপটে মুসলমানরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং হিন্দুরা ছিল সংখ্যালঘিষ্ঠ। ফলে বাঙালি মুসলমানের স্বপ্নের কেন্দ্রভূমি যেমন ছিল বাংলা, তেমনি বাঙালি হিন্দুর স্বপ্নের কেন্দ্রভূমি ছিল হিন্দু প্রধান ভারতবর্ষ।

১৯৪৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের পক্ষে সোহরাওয়ার্দী বাংলায় জয় লাভ না করলে জিন্নাহ পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা হতে পারতেন কিনা সন্দেহ আছে। কেননা সারা ভারতের মধ্যে একমাত্র বাংলায়ই মুসলিম লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। তবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলার প্রায় সকল মুসলিম নেতা এমনকি শরৎ বসু, কিরণশঙ্করের মত কিছু হিন্দু নেতারাও চাইলেন ভারত বা পাকিস্তানে না গিয়ে বাংলা আলাদাভাবে একটি স্বাধীন দেশ হোক। এই প্রস্তাবের পক্ষে মুসলিম লীগের প্রধান জিন্নাহও রাজি ছিলেন। ফলে সম্মতি মিলেছিলো ব্রিটিশ রাজের। কিন্তু বাদ সাধলেন কংগ্রেস নেতা নেহেরু এবং বাংলার হিন্দু সাম্প্রদায়িক দল হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী। তারা উঠে পড়ে লাগলেন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাকে ভেঙ্গে একটি খণ্ডিত হিন্দু বাংলা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায়। রাজনৈতিক নেতারা জনগনের মধ্যে ছড়িয়ে দিলেন সাম্প্রদায়িকতার আগুন। অনিবার্যভাবে বাংলা জুড়ে নেমে আসলো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট তারিখে কলকাতার হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার রেশ ছড়িয়ে পড়লো সমগ্র উপমহাদেশ জুড়ে।

তবে সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক দাঙ্গার ঘটনাটি ঘটে বাংলার নোয়াখালী অঞ্চলে। বাঙালি হিন্দুদের উপরে বাঙালি মুসলমানদের বর্বরোচিত হামলার ঘটনাটিকে দারুণভাবে পুঁজি করে ফেলেন হিন্দু মহাসভা এবং কংগ্রেস নেতারা। যাইহোক, অজস্র ষড়যন্ত্র, দাঙ্গা এবং হৃদয়বিদারক অনেক ঘটনার শেষে ১৯৪৭ সালে বিভক্ত হয়ে যায় বাংলাদেশ। হিন্দু প্রধান ক্ষুদ্র পশ্চিম অংশটি হয় ভারতীয় ইউনিয়নের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ এবং পূর্ববঙ্গ তথা বৃহত্তর অংশটি হয় পূর্ব পাকিস্তান। এই বিভাজনের ফলে বাংলার দুই অংশের লাখ লাখ মানুষ পূর্বপুরুষের ভিটে-মাটি ফেলে পাড়ি দেয় সাম্প্রদায়িক সীমান্ত। বয়ে নিয়ে যায় দাঙ্গা আর ঘৃণার স্মৃতি। উপমহাদেশের মানচিত্র থেকে বিলুপ্ত হয় বাংলা নামক কোনো দেশের চিহ্ন।

যাইহোক, এই ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত ও বিভাজনের শেষে ভারতীয় ইউনিয়নের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু বাঙালিরা বুঝতে শুরু করেন তাদের দীণতা এবং অসহায়ত্ব। শুরুর দিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায় পশ্চিমবঙ্গকে বিহারের সাথে মিলিয়ে দিতেও একবার সচেষ্ট হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু জনগনের প্রতিরোধের ফলে আখেরে তা সম্ভব হয়নি। যাইহোক, ধীরে ধীরে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির ভাগ্যবিধাতা হয়ে ওঠেন পশ্চিম ভারতীয়রা। রাজধানী কলকাতা শহর থেকে বিলুপ্তির পথ ধরে বাংলা ভাষা। সর্বভারতীয় হওয়ার দৌড়ে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা আজ প্রায় হারাতে বসেছে তার আত্মপরিচয়।

অন্যদিকে পাকিস্তান সৃষ্টির শুরু থেকেই পূর্ববাংলার বাঙালিদেরকে শোষণ করার ষড়যন্ত্র শুরু করে পশ্চিম পাকিস্তানি নেতারা। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকায় এক ভাষনে মুহম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। অনেকটা হঠাৎ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার মত মুখের উপর বাঙালিদের প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠতে দেখে তিনি বিস্মিত হন। অতঃপর বাংলা ভাষার মর্যাদার আন্দোলনে পূর্ববঙ্গের বাঙালিরা রক্ত দিয়ে রচনা করেন ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির বোধন। অতঃপর পাকিস্তানি শোষনের বাঁকে বাঁকে বাঙালিরা নিশ্চিত হন স্বাধীনতা ছাড়া তাদের আত্মপরিচয় নিয়ে বাঁচার আর কোনো পথ নেই। সমাগত হয় ১৯৭১ সাল। হাজার হাজার বছর ধরে বয়ে আসা বাঙালি জীবনে আসে এক মহাকাব্যিক সময়ের উত্থান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালিরা ঝাপিয়ে পড়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে। নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম হয় নতুন বাংলাদেশের।

যদিও এই বাংলার, এই বাঙালির শরীরে জমে আছে হাজার বছরের সাম্প্রদায়িকতার বিষ। শরীরের সাম্প্রদায়িক বিষে আজ যেমন ভারতের হিন্দু বাঙালিরা মুমূর্ষ হয়ে আত্মপরিচয়ের সংকটে ধুকছে, আবার সচেতন অংশ আপন ঘর ভাঙার গ্লানিকে উপলব্ধি করছে তেমনি আজকের বাংলাদেশের বাঙালিরাও লড়ছে শরীরে জমানো হাজার বছরের পুরনো সেই সাম্প্রদায়িক বিষের সাথে। হয়তো একদিন এই বিষকে পরাজিত করে জেগে উঠবে সত্যিকারের সোনার বাংলা, একান্তই বাঙালির বাংলা, একটি মানবিক বাংলাদেশ।


সর্বশেষ

আরও খবর

হয়ত শাকিব অপুও থাকবে না

হয়ত শাকিব অপুও থাকবে না


পাঠ প্রতিক্রিয়া: ফরিদপুরে বিতর্ক চর্চা

পাঠ প্রতিক্রিয়া: ফরিদপুরে বিতর্ক চর্চা


একটি আত্মহত্যা ও কিছু প্রশ্ন

একটি আত্মহত্যা ও কিছু প্রশ্ন


অপরাজিতা মেয়ের পরাজয়ের গল্প

অপরাজিতা মেয়ের পরাজয়ের গল্প


দ্রোহের গুঞ্জন: সংস্কৃতি ও রাজনীতি

দ্রোহের গুঞ্জন: সংস্কৃতি ও রাজনীতি


কেউ কষ্টের কথাগুলি বলতে চায় না

কেউ কষ্টের কথাগুলি বলতে চায় না


আমগো যা কওয়ার ছিলো; তাই কইতাছে বাংলাদেশ: সাঈদী

আমগো যা কওয়ার ছিলো; তাই কইতাছে বাংলাদেশ: সাঈদী


শ্রমিক আর সংবাদকর্মী: সবাই আজ শোষিত

শ্রমিক আর সংবাদকর্মী: সবাই আজ শোষিত


বাজিলো কাহারো বীণা

বাজিলো কাহারো বীণা


নানীর পহেলা বৈশাখ: ভায়লেট হালদার

নানীর পহেলা বৈশাখ: ভায়লেট হালদার