Tuesday, April 18th, 2017
বাজিলো কাহারো বীণা
April 18th, 2017 at 1:07 pm
বাজিলো কাহারো বীণা

মাসকাওয়াথ আহসান: স্বর্ণদেশের রাণীকে সে দেশের অনুভূতি হেফাজতকারীরা অনুরোধ জানায়, তাদের অনুভূতি বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বীকৃতি দেবার জন্য। কারণ স্বর্ণদেশে অনুভূতি শিক্ষার হার সর্বোচ্চ। সাধারণ যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এতোদিন ধরে দেশের সব সুযোগ সুবিধা নিয়ে এতোরকম শিক্ষা দিয়ে চলেছে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনুভূতি শিক্ষার হারই সর্বোচ্চ। এতো আঁট কষে শেষ পর্যন্ত যদি টনটনে অনুভূতি শিক্ষাই পায়; তাহলে স্বল্প খরচে বিশেষায়িত অনুভূতি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনুভূতির শিক্ষা নেয়াই শ্রেয়। বিশিষ্ট অনুভূতি মোল্লাদের এই অভিমত স্বর্ণদেশের রাণীর পছন্দ হয়। উনি অনুভূতি বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বীকৃতি দেন।

অনুভূতি মোল্লারা এবার তাদের আরেক প্রস্তাবের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে রাণী মহোদয়ার।”বিচারালয়ের সামনে একটি নারীমূর্তি রহিয়াছে; উহা যুবসমাজের মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটাইতেছে; এই নারীমূর্তির দেহ সৌষ্ঠব দেখিয়া অশীতিপর বৃদ্ধেরও উপাসনা হইতে মনস্খলন ঘটিয়া থাকে।”
রাণী মহোদয়ারও এই ভাষ্কর্যটি পছন্দ নয়। এটা প্রতীচ্যের ভাষ্কর্য; স্বর্ণদেশের ভাষ্কর এতে শাড়ী পরিয়ে দিয়েছে। উনি বিচারালয়ের বিচারকের সঙ্গে এই ভাষ্কর্যের বিষয়ে কথা বলার আশ্বাস দেন।

সুযোগ বুঝে অনুভূতি হেফাজতি এক মোল্লা দাবি জানান, স্বর্ণদেশের সকল ভাষ্কর্যই অপসারণ করিতে হইবে। তাহা না হইলে অনুভূতির হেফাজত সম্ভব হইবে না।

বিচারকের সঙ্গে আলাপ করে রাণী স্থির করেন; বছরে দুটি বিশেষ প্রার্থনাকালে ভাষ্কর্যটিকে আচ্ছাদিত করে রাখলে; অনুভূতি মোল্লাদের প্রার্থনার মনোসংযোগে বিঘ্ন ঘটবে না। অনুভূতি হেফাজতি মোল্লারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে, ঐ স্থানে দেশের রাজসিক ব্যক্তিবর্গের মরণোত্তর প্রার্থনাও অনুষ্ঠিত হয়। কাজেই ঘন ঘন মূর্তিটিকে আচ্ছাদিত করিতে হইবে বৈকি।

আচ্ছাদিত হবার খবর শোনার পর থেকেই বিচারালয়ের সামনের নারী মূর্তি আতংকিত বোধ করে। আর ভাষ্কর্যটি নিয়ে অনেক আলোচনা হওয়ায় দূর দুরান্ত থেকে দর্শকেরা এসে মূর্তিটিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। জীবনে এই প্রথম প্রতীচ্যের নারীমূর্তি আড়ষ্ঠ বোধ করে। প্রতীচ্যের খোলামেলা সমাজেও এমন আড়ষ্ঠতা আসেনি কখনো। স্বর্ণদেশের ভাষ্করের অনুরোধে সে শাড়ী পড়তে রাজি হয়েছিলো। স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি খানিকটা মুগ্ধতাবশতঃ শাড়ী পরে ভালোই লাগতো তার। কিন্তু এখন দর্শকেরা এসে আঁতিপাতি করে তার মাঝে ইতিউতি কী যেন খোঁজে।

আইনজীবীদের সর্বদলীয় একটি জোট মতামত রেখেছে, এই নারীমূর্তি আদালতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য যাবার পথে মনোযোগের খুবই ক্ষতি করে।

নারীমূর্তিটির নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়। পৃথিবীর এতো দেশে বিচারালয়ের সামনে নারীমূর্তিটি দাঁড়িয়ে থাকে ন্যায় বিচারের প্রতীক হয়ে; কোথাও লোকজন এমন হা করে দেহবল্লরীর দিকে তাকিয়ে থাকে না। ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে সবাই তাকে শ্রদ্ধাই করে। এই প্রথম এমন একটি অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি নারীমূর্তিটি।

নারী মূর্তিটি চিন্তা করে, এই দেশে আর থাকা যাবে না। আবার প্রতীচ্যেই ফিরে যেতে হবে। গভীর রাতে চারপাশ দেখে নারীমূর্তিটি আস্তে করে নেমে পড়ে পথে। বিচারালয়ের সামনে দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে রাতের ঝিরি ঝিরি হাওয়াটা ভালই লাগে। কিন্তু হঠাতই এক লোক গাড়িতে বসে একটা শিস দিয়ে জিজ্ঞেস করে, একা নাকি! যাবে নাকি আমার সাথে। তোমাকে সবচেয়ে নিরাপদ এলাকায় নিয়ে যাবো। নারীমূর্তিটির মনে পড়ে আদালত এলাকায় খবর এসেছিলো, একটি নিরাপদ এলাকায় এক নারীকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু বিচারালয়েরও সাহস হয়নি সে হত্যাকাণ্ডের বিচার করার।

নারীমূর্তি আবার দৌড়ে গিয়ে বিচারালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে। গাড়িটাপেছন পেছন এসে ভুত দেখার মতো ভয় পেয়ে সটকে পড়ে।
একটু পরে কয়েকজন লোক আসে একটা কালো কাপড় নিয়ে। নারীমূর্তিটিকে কালো কাপড়ে আচ্ছাদিত করে দেখে ঠিকমতো ঢাকা গেছে কীনা!
হঠাৎ নারীমূর্তি ধমক দেয়, গায়ে হাত দিচ্ছো কেন! ভুত দেখার মতো ভয় পেয়ে লোকগুলো যে যেদিকে পারে পালিয়ে যায়।

এমন সময় এক কবি কবি চেহারার লোক আসে কাঁধে ঝোলা নিয়ে। নারীমূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে রোমান্টিক হাসি দিয়ে বলে, কী আমায় দেখে লজ্জা পেলে নাকী! মুখ তোলো; তোমার চোখ দুটো দেখি। জানো তোমার কথা ভেবে ভেবে আমি একটা পুরো কাব্যগ্রন্থ লিখেছি। আমার কল্পনায় তুমি আফ্রোদিতির মতো জীবন্ত হয়ে ওঠো। খুব ইচ্ছা করে তোমায় নিয়ে বংশী নদীর ধারে ঘুরতে যাই।

নারীমূর্তিটির মনে হয়, এই লোকটি খুব রোমান্টিক। বংশী নদীর কথা শুনে সেখানে ঘুরতে যেতে ইচ্ছা করে। সে সহাস্যে নেমে আসে।
–কৈ চলো ঠাকুর পো। আমায় বংশী নদীর ধারে নিয়ে চলো।

কবি অজ্ঞান হয়ে যায়। নারীমূর্তিটি আবার ভাষ্কর্য হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। জ্ঞান ফিরে কবি বলে, স্বপ্ন বুঝি এতোটাই সুন্দর হয়। বাজিলো কাহারো বীণা মধুর স্বরে!


সর্বশেষ

আরও খবর

একটি আত্মহত্যা ও কিছু প্রশ্ন

একটি আত্মহত্যা ও কিছু প্রশ্ন


অপরাজিতা মেয়ের পরাজয়ের গল্প

অপরাজিতা মেয়ের পরাজয়ের গল্প


বাঙালির দ্বি-মুখী লড়াই: হিন্দুত্বের সাথে এবং মুসলমানিত্বের সাথে

বাঙালির দ্বি-মুখী লড়াই: হিন্দুত্বের সাথে এবং মুসলমানিত্বের সাথে


দ্রোহের গুঞ্জন: সংস্কৃতি ও রাজনীতি

দ্রোহের গুঞ্জন: সংস্কৃতি ও রাজনীতি


কেউ কষ্টের কথাগুলি বলতে চায় না

কেউ কষ্টের কথাগুলি বলতে চায় না


আমগো যা কওয়ার ছিলো; তাই কইতাছে বাংলাদেশ: সাঈদী

আমগো যা কওয়ার ছিলো; তাই কইতাছে বাংলাদেশ: সাঈদী


শ্রমিক আর সংবাদকর্মী: সবাই আজ শোষিত

শ্রমিক আর সংবাদকর্মী: সবাই আজ শোষিত


নানীর পহেলা বৈশাখ: ভায়লেট হালদার

নানীর পহেলা বৈশাখ: ভায়লেট হালদার


ভাস্কর্য চাই। ভাস্কর্য চাই না।

ভাস্কর্য চাই। ভাস্কর্য চাই না।


‘এই পরবাস অপমানের’

‘এই পরবাস অপমানের’