Saturday, January 28th, 2017
ভাবতেই কষ্ট হয় আমিও বাঙালি
January 28th, 2017 at 10:37 pm
ভাবতেই কষ্ট হয় আমিও বাঙালি

কাজি ফৌজিয়া:

প্রিয় বন্ধু,

কেমন আছ তুমি, আশা করি নতুন বছরে সব ঠিকঠাক চলছে তোমার। নিজের শরীরের খেয়াল রেখো, সময় মত খাবার খেও। আমার শরীর খুব একটা ভাল নেই, ইস্তাম্বুলে বৃষ্টিতে ভিজে ঠাণ্ডা লাগিয়েছি, এখন কাশি শ্বাসকষ্ট লেগেই আছে। তোমাকে লিখতে দেরি হয়ে গেল, কত কথা জমে আছে, কত অভিজ্ঞতা জমে আছে; কয়েক চিঠিতেও শেষ হবে না।

৩১শে ডিসেম্বর ভেনিসে এয়ারপোর্টে নেমে ইমিগ্রেশন জটিলতা শেষ হতেই লাগেজ খুঁজে বের করলাম, তারপর বাইরে আসতেই দেখি আইরিন এর মেয়ে করিন দাড়িয়ে আছে । আমাকে দেখেই বললো ওই দিকের গেটে চলেন, আম্মা ওখানে দাঁড়িয়ে কান্না করছে, একটু এগোতেই আইরিন আমাকে দেখে দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। আমাদের দুজনের চোখে অশ্রুধারা। ১২ বছর পর দেখা, এর মধ্যে দুজনের প্রিয়জন হারানোর ওজন বেশ ভারী। ১২ বছর ধরেই প্লান করছি দেখা করার। অবশেষে আমি আর আইরিন একসঙ্গে পরস্পরের স্পর্শ অনুভব করছি।

আইরিন অনেক বছর হলো এখানে ইতালির ছোট একটি শহর ত্রিএসত্রিতে থাকে। আজ আমরা ওর বাসায় নয় এয়ারপোর্ট থেকে ভেনিস যাচ্ছি। আইরিন আমাকে নিয়ে থার্টি ফার্স্ট ভেনিসে উদযাপন করবে। তাই দুই ছেলে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে আমরা চললাম হোটেলে জিনিসপত্র রাখতে। আমার থার্টি ফার্স্ট নিয়ে তেমন আগ্রহ কোন কালেও নেই বন্ধু। নিউ ইয়র্কে এত ধুমধামে হয় আমি কোনদিন যাইনি। আইরিন এর খুঁশির জন্য আমি হ্যা বলেছি। বাস থেকে ভেনিসে নেমে মহাধাক্কা খেলাম, একি শহর! প্রতি এক রাস্তার মাথায় ছোট ছোট কালভার্ট বা ব্রিজ। লাগেজ নিয়ে চলা অসম্ভব। কোন ব্রিজে লাগেজ এক্সেস নাই। বিপদ বুঝে লাগেজগুলো ট্রেন স্টেশনের লকারে জমা রেখে শুধু হাত লাগেজ নিয়ে হোটেলে গেলাম।

হোটেলও জটিলতা, আমি বড়রুম ও চারজন মানুষের বুকিং দিয়েছি। কিন্তু হোটেল বলছে দুইজনের থাকার ব্যবস্থা। বাচ্চাদের জন্য ৮০ ইউরো বেশি দিয়েও রুমে গিয়ে দেখি ছোট রুম আর এক্সট্রা চার্জ করেও চাদর বালিশ কিছু দেয়নি! আমার মনে হয় টুরিস্ট শহরগুলোর ব্যবসায়ীরা শুধু টুরিস্টদের ঠকায়। রাতে বের হলাম থার্টি ফার্স্ট দেখতে। হাজার হাজার মানুষ, ছোট চিকন রাস্তাগুলো দিয়ে মিছিলের মতো চলছে সান মার্কও প্লাজার দিকে। ঐতিহাসিক রোমান স্থাপত্যকলায় নির্মিত প্লাজা স্থানীয় ভাষায় পিয়াজ্জা। এখানেই সব লোকজন জমা হচ্ছে পানির উপর আতশবাজি দেখতে। এই প্লাজাটি ৮০০ থেকে ১১০০ সেঞ্চুরিতে বানানো, গ্রীক সম্রাট জাস্টিনিয়ান শুরু করেন যুগে যুগে হাত বদল হয়।

প্রথমে গ্রীক তারপর রোমান তারপর নেপোলিয়ন তারপর অস্ট্রিয়ানদের হাতে আবার নেপোলিয়ন তারপর ফাইনালি ইটালিয়ানদের হাতে ফেরত আসে। রোমান শাসনামলে যখন রায়ট শুরু হয়, এই প্লাজাটিতেও আগুন লাগানো হয়। কাঠের অনেক স্থাপনা পুড়ে গেলেও সব পুড়ে যায়নি। নেপোলিয়ন জমানায় নেপোলিয়ন ভেনিস আসলে এখানেই থাকতো। বলা হয়ে থাকে এটা ছিল তার সময়ের বিশ্বস্ত হেডকোয়ার্টার। মনোরম প্রাসাদ পরিবেষ্টিত সুউচ্চ স্তম্ভ চার্চ ও একদিকে পানির উপর নানা রকম পর্যটকদের মনোরঞ্জন ব্যবস্থা সমৃদ্ধ ভেনিস সান মার্কও প্লাজাতে আতশবাজি দেখে আমরা সেই প্রতারক হোটেলে ফিরে এলাম।

আইরিনের সঙ্গে গত বারো বছরের সুখ দুঃখের কথা বলতে বলতে রাত শেষ করে সকালে হোটেল থেকে চেক আউট করে বের হলাম পায়ে হেটে দিনের ভেনিস দেখবো বলে। দিনের ভেনিস আমার বেশি ভাল লাগলো, পানির শহর, চিকন খালের উপর ছোট ছোট কালভার্ট। শহরের ভেতরে কোন যানবাহন নাই। নৌকা হলো প্রধান যানবাহন,পর্যটকদের জন্য আছে বিলাসী নৌকা ভ্রমণ। স্থানীয় ইটালিয়ানরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে এই নৌকা চালায়, এক ঘণ্টা ১২০ ইউরো। সাধারণত জুটিবদ্ধ মানুষ এই আনন্দ উপভোগ করে, বুঝতেই পারছো আমার জুটি নেই তাই উঠিনি।

ভেনিসে আরেকটি বিষয় ভালো লেগেছে একটু পর পর গিফট শপ বা ভেন্ডিং শপ। এর বেশির ভাগেরই হকার বা বিক্রেতা বাংলাদেশি । অনেকের সঙ্গে কথা হলো। জানতে চাইলাম কেমন আছে তারা, বাংলাদেশে কোথায় বাড়ি? সবাই একটা কথা বললো ব্যবসা আগের মতো ভাল না, ফুটপাতের জায়গা বা ছোট দোকানের লিজ পেতে এখন অনেক টাকা লাগে।তাদের মূল প্রতিযোগিতা চাইনিজদের সঙ্গে ।এক জায়গায় দেখলাম তিন বাংলাদেশি ফুটপাতে কিছু জিনিসপত্র নিয়ে বসেছে। আর দুইজন পেস্তুসা ভেজে বিক্রি করছে। আমি হালচাল জিজ্ঞাসা করে পেস্তসা কিনতে চাইলাম, সে বললো দেশি বোন ভাল করে ভেজে দেই। কথায় কথায় সে দশ ইউরোর পেস্তসা দিয়ে টাকা নিবেনা। আমি জোর করে টাকা দিতে গেলাম। তার একটাই কথা ,দেশের বোনের সঙ্গে ব্যবসা করবে না। বললাম তাহলে একটা ছবি তোলেন আমার সঙ্গে, দেশি ভাইয়ের স্মৃতিটুকু নিয়ে যাই। রাতে লাগেজ ব্যাগেজ নিয়ে আমরা তিরেস্তির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। দুই ঘন্টার ট্রেন সফর।বন্ধু ভ্রমণ পার্ট আজ এখানে শেষ করবো। ক্রমান্বয়ে তোমাকে ত্রেরেস্তি প্যারিস রোম দেখার গল্প বলবো।

আমি এখন নিউইয়র্কে, এখানে অনেক কিছু ঘটে যাচ্ছে তোমাকে তা জানাতে চাই। আমি ফিরে এসেছি ১৫ই জানুয়ারি। ১৬ তারিখে ছিল মার্টিন লুথার কিং ডে তাই সরকারি ছুটি। আমি ভাবলাম ভালই হলো একদিন ছুটি কাটানোর জন্য পেলাম। পরের দিন অফিসে যেতেই কাজ যেন মাথার উপর জাম্প করলো। ২০ তারিখে ট্রাম্পের অভিষেক। তা নিয়ে অনেক কর্মসূচি, অবশ্যই প্রতিবাদ কর্মসূচি। ২১ তারিখে মহিলারা সারাদেশের পাশাপাশি প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দিয়েছে ওয়াশিংটন ডিসিতে। কাজের চাপে তোমাকে চিঠি লেখার সময় বের করতে পারিনি। তাই তোমাকে লিখতে লিখতেই ২০ তারিখ এসে গেল, আমরা গেলাম লোকজন নিয়ে নিউ ইয়র্ক ট্রাম্প টাওয়ারের সামনে।

দশটি শ্রমিক সংগঠন মিলে ফ্রীডম সিটি কাম্পেইন লাঞ্ছ করলাম। মানে নিউ ইয়র্ককে বানাতে হবে আমাদের সকল সমাজের নিরাপদ আশ্রয়। পরের দিন উইমেন মার্চ বা মহিলা সমাবেশ। আমরা পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গেলাম নিউ ইয়র্ক জাতিসংঘের সামনে। প্লান হল জাতিসংঘের সামনে থেকে ট্রাম্প টাওয়ার পর্যন্ত মানুষ মিছিল নিয়ে যাবে। সেভেন ট্রেন নিয়ে গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল গিয়ে দেখি এত মানুষ স্টেশনের বাইরে যাওয়ার অবস্থা নেই। বহু কষ্টে ভীড় ঠেলে বাইরে এলাম। লক্ষ লক্ষ মানুষ অফ রোড ধরে ৪৫ স্ট্রিট পর্যন্ত গেলাম। তারপর সেখান থেকেই শুরু করলাম মিছিল। সাড়ে চার ঘন্টায় ৪ ব্লক এগোতে পারলাম। এত মানুষ বা এত মহিলা নিউ ইয়র্কে আছে তাই জানতাম না।

দশ লক্ষ মহিলা পুরুষ শিশু সমবেত হয়েছিল, যার বেশিরভাগ ছিল মহিলা। আমি আমার এই ৪৭ বছরের জীবনে এত মানুষ দেখি নাই। ম্যানহাটনের রাস্তাগুলোতে তিল ধারণের জায়গা নেই। সকলের এক দাবি ট্রাম্পকে ঘৃণা, জাহান্নামে যাও; ট্রাম্প আমার প্রেসিডেন্ট না। দশ লক্ষ মানুষ জমা হয়েছিল ওয়াশিংটন মলে। মোট ২.৯ মিলিয়ন মানুষ মিছিল করেছে যা আমেরিকার সকল যুগের ইতিহাসকে ভেঙ্গে দিয়েছে।জন কেরি পর্যন্ত ডিসির মিছিলে যোগদান করেছেন। আমেরিকাসহ সারা দুনিয়ার বড় শহরে মানুষ মিছিল করেছে, সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দুনিয়ার ১৫৬টি শহরে মিছিল হয়েছে। অ্যান্টার্কটিকাতেও মানুষ সমাবেশ করেছে। ধর্ম বর্ণ চামড়ার লিঙ্গের ভেদাভেদ ভুলে সব এক কাতারে শামিল হয়েছে। ঘৃণা নিপাত যাক ঐক্য কায়েম থাক।

আমেরিকার মহিলাদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে সারা দুনিয়াতে যে এত বড় সমাবেশ হলো তার কারণ কি? মনে আছে বন্ধু তোমাকে লিখেছিলাম ট্রাম্পের ১০০ দিনের কর্মসূচি। সেই কর্মসূচির একটি হল প্লানড পেরেনহুড বাতিল করা। মানে পরিবার পরিকল্পনা বাতিল ও এবরশনের অধিকার কেড়ে নেয়া। তাই মহিলারা তাদের অধিকার রক্ষার জন্য রাস্তায় নেমেছে, নেমেছে পুরুষ আর শিশুরা। যে জনগোষ্ঠীকে বলতে গেলে দেখা যায়নি তারা হলো বাঙালি সমাজ, তারা বড় ব্যস্ত সমিতি মিটিং পিঠা উৎসব আরো কত কি!!

আমার ভাবতেও কষ্ট হয় আমি তাদের সমাজের একজন, আমিও বাঙালি। সূর্যসেন, প্রীতিলতা, ভাসানী মুজিব, তিতুমির আর লক্ষ কোটি মুক্তি সেনা কি বাঙালি ছিল? যেদিন সাদা আধিপত্যবাদীরা তাদের মা বোনের হিজাব ধরে টান দিবে, বলবে হিজাব পরো না।যেদিন তাদের বাচ্চারা স্কুলে নিপীড়নের শিকার হবে তারা বলবে কাল থেকে স্কুল বাদ। তারা সভা সমিতি করতে করতেই যাবে অতি বিনয়ের সঙ্গে বাঙালি মুসলিম হিসাবে তালিকাভুক্ত হতে।তারা অতি বিনয়ের সঙ্গে বহিস্কার হয়েও চলে যাবে।

শুনতে বা পড়তে খারাপ লাগছে বন্ধু? আমার কথা তিতা হলেও সত্যি । হে আমার আমেরিকান বাঙালি সমাজ আপনি এই ইনসাফের লড়াইয়ে আসবেন কি আসবেন না আপনার বিষয়। আমি আমার সংগ্রামের অধিকার কারও ধমকে হারাতে দেবো না! যতক্ষণ দেহে প্রাণ আছে আমি প্রীতিলতার দেশের মেয়ে হিসাবে লড়াই চালিয়ে যাবো।জয় হোক দুনিয়ার মেহনতি মানুষের।ভাল থাকো বন্ধু, ভাল থাকুক দেশ ও দেশের মানুষেরা।

 

ইতি তোমার বন্ধু

যাকে তুমি কোনো নামেই ডাকো না

লেখক: মানবাধিকার কর্মী


সর্বশেষ

আরও খবর

আমাদের ঝালমুড়ি দাদা ও গরীবের শ্রেণী সংগ্রাম

আমাদের ঝালমুড়ি দাদা ও গরীবের শ্রেণী সংগ্রাম


জন্মভূমির টান মানসিক কষ্টে ফেলে দেয়

জন্মভূমির টান মানসিক কষ্টে ফেলে দেয়


‘মুসলিম সমাজের বিভাজন বন্ধ করুন’

‘মুসলিম সমাজের বিভাজন বন্ধ করুন’


আজ জুইস-মুসলিম এক কাতারে দাঁড়িয়েছে

আজ জুইস-মুসলিম এক কাতারে দাঁড়িয়েছে


সর্ব পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে

সর্ব পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে


‘তুরস্ক টিকবে তো?’

‘তুরস্ক টিকবে তো?’


মক্কা থেকে…

মক্কা থেকে…


সুবিধাবাদী নেতারা অবহেলিতর কথা বলে না

সুবিধাবাদী নেতারা অবহেলিতর কথা বলে না


‘এই পৃথিবী শিশুদের নিরাপত্তা দিতে অক্ষম’

‘এই পৃথিবী শিশুদের নিরাপত্তা দিতে অক্ষম’


ফিদেল বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল

ফিদেল বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল