Tuesday, January 3rd, 2017
মক্কা থেকে…
January 3rd, 2017 at 8:34 pm
মক্কা থেকে…

প্রিয় বন্ধু,

কেমন আছ তুমি, ভাল আছ তো বন্ধু আমার। আমি খুব ভাল আছি! অবাক হচ্ছো তুমি? আমার মুখে ‘ভাল আছি’ শোনা হয় না তোমার। হ্যাঁ বন্ধু সত্যি আমি ভাল আছি। তোমাকে লিখতে দেরি হয়ে গেল কারণ আমি সৌদি আরবে বসে অন্য কোনো দিকে মনোযোগ দিতে চাইনি। সারাটা জীবন দুনিয়ার কাজ করে বেড়ালাম, এই কয়টা দিন নিজের আত্মার শান্তির জন্য কিছু করলাম। তোমার সাথে সব কথা শেয়ার করি, ওমরাহ হজ্বের কথা না বলি কি করে!

যখন ইহরাম বেঁধে সারা পথ ‘লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক, লাব্বায়েক লাশারিকা লাব্বায়েক…’ পড়তে পড়তে জেদ্দা এয়ারপোর্টে পৌঁছালাম, রাত তখন দুইটা। সব ফর্মালিটিজ শেষ করে মক্কা শরিফের পাশে হোটেলে পৌঁছাতে রাত ৪.৩০ বেজে গেল। লবিতে বসে অপেক্ষা করছি রুমের চাবির জন্য, এমন সময় অভূতপূর্ব এক দৃশ্য নজরে পরল। দলে দলে লোকজন নামাজের জন্য হোটেল থেকে বের হচ্ছে। মাঝরাত কিন্তু সবার মুখে এক ধরনের প্রশান্তি। মক্কা শরীফের আযান শুনতে পেলাম, তাহাজ্জতের আযান হচ্ছে। আমি আমার জীবনে কখনো তাহাজ্জতের আযান শুনি নাই, এই প্রথম। খুব ইচ্ছা করছিল তখনি ছুটে যাই কিন্তু ২৮ ঘণ্টা প্লেনে আর রাস্তায় কাটিয়ে শরীর সায় দিচ্ছিল না তাই রুমে নামাজ পরে বিশ্রাম নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

সকাল এগারটায় নাস্তা শেষ করে ওমরাহর তাওয়াফ করতে হোটেল থেকে বের হলাম, নীচে নেমেই দেখি আল হারাম শরীফ। আল হারামের বিশালতা আর সৌন্দর্য দেখে আমি কেঁদেই ফেললাম। দুই রাকাত নফল নামাজ পরেই তাওয়াফ এর উদ্যেশ্যে পবিত্র কাবা শরীফের দিকে রওনা হলাম। চোখের সামনে পবিত্র ঘর নজরে আসতেই আল্লাহ পাকের মহানুভবতার শুকরিয়া আদায় করতে করতে আগে বারলাম । দু’চোখে বর্ষা নেমেছে, মুখে আল্লাহর কালাম, সোজা নীচে নেমে আমরা তাওয়াফ শুরু করলাম। সারা দুনিয়া থেকে আগত হাজার হাজার মুসলিম ভাই বোনদের সাথে কণ্ঠ মিলেয়ে আমরাও বলতে শুরু করলাম ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহুআকবার লা ইলাহা ইল্লালাহ অলিল্লাহির হামদ’। নানা রকম দোয়া, সূরা পড়তে পড়তে যখন তাওয়াফ করছিলাম বান্ধবী রিমার স্বামী ও মেয়ে আগে চলে গেল। এত ভিড়ে একসাথে থাকা অসম্ভব কিন্তু রিমা আমাকে হারাতে দিল না, সারাক্ষণ আমরা পাশাপাশি ছিলাম। আমি শুনেছি তাওয়াফের সময় এত ভিড় হয় যে, তখন পবিত্র কাবা শরীফ আর হজ্বরে আসোয়াত স্পর্শ করতে পারা ভাগ্যের বিষয়।

আল্লাহ পাকের দয়া হবে হয়ত ঘুরতে ঘুরতে দেখি আমরা কাবা শরীফের একদম সামনে, মহিলাদের ভিড় ঠেলে হাত দিয়ে স্পর্শ করলাম, কপাল ছুঁলাম। আবারো আমাদের চোখে বাধ ভাঙা অশ্রুধারা। এই উপলব্ধিটুকু পৃথিবীর আর কিছুর সাথে তুলনা করা যায় না বন্ধু। মনে হল আমার জীবন ধন্য হয়ে গেছে, দুনিয়াতে আমার বিশেষ কিছু চাইবার নেই, আলহামদুলিল্লাহ।

তাওয়াফ শেষ করে গেলাম সায়ি করতে, বিবি হাজেরা বনবাস অবস্থায় যখন শিশু পুত্র ইসমাইল (আঃ) কে জন্ম দেন, তখন তৃষ্ণার্ত পুত্রের মুখে পানি তুলে দিতে সাফা ও মারওয়া পর্বতের মাঝে দৌড়া-দৌড়ি করেন। আরবের শুষ্ক মরভুমিতে পানি তিনি খুঁজে পাননি, অবশেষে আল্লাহ্‌ পাকের অশেষ রহমতে শিশু ইসমাইল (আঃ) পায়ের কাছে প্রবাহিত হয় পানির নহর। বিবি হাজেরা সেই নহরের চারদিকে পাথর দিয়ে ঘের দিয়ে দেন, যা এখন পবিত্র পানির কুয়া জমজম।  বিবি হাজেরার সেই কষ্টের কথা মনে রেখে হাজিরা সাত বার সাফা ও মারওয়ার মাঝে তাওয়াফ করে।

ওমরাহ্‌ শেষ করে নামাজ পরে হোটেল এ ফিরে এলাম। শরীর ক্লান্ত, পায়ে ব্যাথা, তবু কিসের যেন টান অনুভব করলাম। যে কয়দিন মক্কাতে ছিলাম চেষ্টা করেছি নামাজ মসজিদুল হারামে পড়তে। সুযোগ পেলেই চলে গেছি পবিত্র ঘর কাবার সামনে। বন্ধু আমি সুযোগ এই জন্য বলছি লক্ষ লক্ষ মানুষ কাবা শরীফের সামনে জায়গা পাওয়া মুশকিল, আরও তিনবার নফল তাওয়াফ করেছি, দুইবার রিমার সাথে আর একবার ওর মেয়ে শাপলার সাথে।

বন্ধু, শাপলার কথা একটু না বলে পারছি না। শাপলা জন্ম বড় আমেরিকাতে। শিকাগোর একটা ইউনিভারসিটিতে পড়ে, মাশাল্লাহ্ সব দিক থেকে পারদর্শী, পাচ ওয়াক্ত নামাজ, নফল ইবাদত, ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞান, তার সাথে ফটোগ্রাফির শখ। নতুন প্রজন্মের সাথে এক রুমে রাত্রি যাপন করতে কিছুটা ভয় লাগে আমার, কে জানে আমাদের মত বুড়িদের কি আচরণ ওদের পছন্দ না হয়ে বরং কষ্টের কারণ হয়! ড্রাম-এর ইয়ুথদের সাথে প্রায়ই টুরে যেতে হয়। আমাকে কিন্তু এত লম্বা সময় কারও সাথে রুম শেয়ার করা হয়নি। শাপলার সাথে কাটানো দিন গুলি অবশ্যই আমি মিস করব।

মক্কার পর আমি চলে আসি পবিত্র শহর মদিনায়। এখানে মসজিদে নববীর সামনে হোটেল ছিল আমাদের। এখানেও আমরা চেষ্টা করেছি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে পড়তে। এক ওয়াক্ত কখনো কখনো হোটেলে পড়লেও বাকি ওয়াক্ত মসজিদেই পরতাম। আমার ভীষণ ভাল লাগত মসজিদ ক্যাম্পাসে বসে থাকতে, মাঝে মাঝে তিন ওয়াক্ত এক টানা মসজিদে থাকতাম। মাঝের সময় গুলো মসজিদের সামনে বসে মানুষ দেখতাম।

বন্ধু, ভাবছ মানুষ দেখা কি কোনো কাজ! বিশ্বাস কর, না দেখলে বুঝবে না। লক্ষ লক্ষ মানুষ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা। এই মিলন মেলায় ৩০ হাজার মহিলাও এসেছে, তাদের সাথে বাচ্চা-কাচ্চা তো আছেই। আমি আমার লাইফে এতো মানুষ এক সাথে দেখি নাই। নামাজে যখন কাতার দিয়ে দাঁড়াই, তখন মসজিদ ছাড়িয়ে বারান্দা, তারপরে বাইরের রাস্তায় চলে আসে জামাত। মহিলাদের এলাকা বিশাল বড়, দুই দিকেই তাদের ভিতর বাহির ছাড়িয়ে বাইরের হাঁটাচলার এলাকা পর্যন্ত জামাত হয়। আমি এত বড় জামাত কখনো দেখিনি, এত মহিলা মসজিদে নামাজ পড়ে তাও দেখিনি।

আরেকটি বিষয় নোটিশ করলাম, আমেরিকাতে মহিলারা জামাতে নামাজ পড়ে কিন্তু তাদের জন্য হয় বেইজমেন্ট বা এক কোণায় কিছু জায়গা রাখা হয়। পবিত্র কাবা শরীফের পাশে বা মাসজিদুল হারামে অথবা মাসজিদুল নববীতে অনেক ইম্পরট্যান্ট এরিয়া ও বড় এরিয়া আলাদা করে বা একসাথে দেয়া হয়েছে নারীদের জন্য। আমার প্রশ্ন ইসলাম ধর্মে মহিলাদের কোনঠাসা করার নীতি কোথা থেকে এল? মক্কা ও মদিনায় এত মানুষ এত বেশী ভিন্নতা, তবুও শান্তিতে সবাই নিজ নিজ ধর্ম কর্ম করে যাচ্ছে। অন্য কোনো কারণে এত লক্ষ লোক জমা হলে, একটা ঘরকে কেন্দ্র করে ঘুরতে হলে কি অবস্থা হত আল্লাহ্‌ জানে! এত দিনে আমি ইসলামী উম্মাহর মানে বুজলাম আর এত বড় উম্মাহ কে একসাথে দেখতে পেলাম।

বন্ধু, আমি জানি তোমার এইসব কথা শুনতে মন নেই কিন্তু কি করব আমার জীবনে যা ঘটেছে তাই তো লিখতে হবে। আমরা বাইরের কিছু এলাকাও দেখতে গিয়েছিলাম, যেমন মিনা. আরাফাহ’র ময়দান, হেরা গুহা, জাবালে নুর, মুয়াল্লা কবরস্থান, জান্নাতুল বাকি। যেদিন মদিনা থেকে চলে এলাম খুব কষ্ট লেগেছিল, তবুও তো আসতে হয়।

বন্ধু একটা কথা আছে না ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে, আমার অবস্থাও তাই। মাসজিদুল হারাম, পবিত্র কাবা শরীফ, মাসজিদুল নববীতে ছাড়াও বাইরের হোটেলগুলিতে অনেক লোক পরিস্কার পরিচ্ছনতার কাজ করে যাদের বেশীরভাগ পাকিস্তান বাংলাদেশ ইন্দোনেশিয়া বার্মা ও ভারত থেকে যাওয়া শ্রমিক। আমারা জানি এদের সবাই গেস্ট ওয়ার্কার ভিসায় যায় ও কোম্পানির আন্ডারে কাজ করে। আমি অনেকের সাথে কথা বললাম, বিশেষ করে যারা মসজিদে কাজ করে। বিন লাদেন কোম্পানির নামে এরা এই দেশে এসেছে। এখানে ১৮০০ রিয়েল কেটে নেয় থাকা আর ট্রান্সপোর্টেশন বাবদ আর ৭০০ রিয়েল হাতে পায় বেতন হিসেবে। পরিবারের খরচ পাঠিয়ে খাওয়ার টাকাই থাকেই না, মানুষের দেওয়া বখশিশের টাকায় চলে খাওয়া।

আমি আর আমার ফ্রেন্ড যতটুকু পেরেছি দিয়েছি এদের। আমি ‘দান করে’ বলে বেড়াচ্ছিনা, শুধু তোমাকে লিখালাম এই কারণে পত্রিকায় এই চিঠি প্রকাশের পর যারা পড়বে, তারা যেন তাদের আত্মীয়দের উৎসাহ দেয় এই কম মজুরিতে কাজ করা কর্মচারী যারা পবিত্র মসজিদ পরিস্কার করে আমাদের উপাসনায় সাহায্য করে তাদের সাহায্য করতে। ওমরাহ্‌’র পরে তোমাকে কল দিয়েছিলাম, তুমি আমার অনুভূতি জানতে চাইলে আমি বললাম পবিত্র কাবা ঘরের প্রতি স্পিরিচুয়াল কানেকশন ফীল করলাম, শুধু আমি না সকলেই। তুমি বললে, ‘ওহ্ তাহলে সৌদি সরকার সেখানে থাকে তারা ফিল করে না? তবে কেন তারা ইয়ামেন আক্রমণ করল?’ ভাল প্রশ্ন, আমারো উত্তর জানা নেই তাই আমি পাঠকদের জন্য প্রশ্ন টা রাখলাম। দেখি আমার বা আমাদের বন্ধু পাঠকরা কি উত্তর দেয়। পাঠক বন্ধুরা পত্রিকার সাইটে আপনারা লিখবেন প্লিজ, কি মনে করেন আমার বন্ধুর প্রশ্নের উত্তরে।

বন্ধু, আমি এখন তুরস্কের ইস্তাম্বুলে। খুব সুন্দর অভিজ্ঞতা হয়েছে এখানে। পরের চিঠিতে লিখব তুরস্কের কথা। কাল যাব ইতালিতে আমাদের বন্ধু আইরিন-এর সাথে থাকব ১৫ দিন। তোমাকে খুব মিস করব। ভাল থাক বন্ধু। ভাল থাকুক দেশ ও দেশের মানুষেরা।

ইতি
তোমার বন্ধু
যাকে তুমি কোন নামেই ডাকো না

 লেখক: মানবাধিকার কর্মী

 


সর্বশেষ

আরও খবর

জন্মভূমির টান মানসিক কষ্টে ফেলে দেয়

জন্মভূমির টান মানসিক কষ্টে ফেলে দেয়


‘মুসলিম সমাজের বিভাজন বন্ধ করুন’

‘মুসলিম সমাজের বিভাজন বন্ধ করুন’


আজ জুইস-মুসলিম এক কাতারে দাঁড়িয়েছে

আজ জুইস-মুসলিম এক কাতারে দাঁড়িয়েছে


সর্ব পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে

সর্ব পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে


ভাবতেই কষ্ট হয় আমিও বাঙালি

ভাবতেই কষ্ট হয় আমিও বাঙালি


‘তুরস্ক টিকবে তো?’

‘তুরস্ক টিকবে তো?’


সুবিধাবাদী নেতারা অবহেলিতর কথা বলে না

সুবিধাবাদী নেতারা অবহেলিতর কথা বলে না


‘এই পৃথিবী শিশুদের নিরাপত্তা দিতে অক্ষম’

‘এই পৃথিবী শিশুদের নিরাপত্তা দিতে অক্ষম’


ফিদেল বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল

ফিদেল বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল


‘আমরা যুদ্ধক্ষেত্রে আছি’

‘আমরা যুদ্ধক্ষেত্রে আছি’