Thursday, April 13th, 2017
মঙ্গল শোভাযাত্রা ‘হারাম’
April 13th, 2017 at 10:30 pm
মঙ্গল শোভাযাত্রা ‘হারাম’

শেখ রিয়াল, ঢাকা: ১৯৮৪ সাল। বাংলা ১৩৯০ সনের চৈত্র মাসের শেষ দিন। স্বৈরশাসনের অবরুদ্ধ সময়ের সেই দিনে চট্টগ্রামবাসী এক নতুন ঘটনার অভিজ্ঞতা লাভ করে। তখনকার নন্দনকানন এলাকাটি ছিল শান্ত ও নির্জন। কিন্তু সেদিন বিকেলে ডিসি পাহাড়ের সামনে ছিল শত শত মানুষের কোলাহল। ছিল ঢাকের বাদ্যি, ঢোলের আওয়াজ, বাঁশির আওয়াজ, স্যাক্সোফোনের সুর আর তারুণ্যের উচ্ছ্বাস। বাংলার ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সেজে, রংবেরঙের ব্যানার, ফেস্টুন নিয়ে শোভাযাত্রাটি শুরু হয় ডিসি পাহাড়ের সামনে থেকে। বৌদ্ধমন্দির সড়ক হয়ে শোভাযাত্রাটি শহীদ মিনার, কে সি দে সড়ক, লালদীঘি, আন্দরকিল্লা, মোমিন রোড হয়ে আবার ডিসি পাহাড়ে ফিরে আসে। সম্মিলিত পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপন পরিষদের আয়োজনে পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে সেই প্রথম শোভাযাত্রার শুরু হলো চট্টগ্রামে।

১৯৭৮ সালে নগরে প্রথম নববর্ষের আয়োজন হলেও মঙ্গল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয় এর ছয় বছর পর। চট্টগ্রামে পয়লা বৈশাখের দিনই মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন শুরু হয় বাংলা ১৪১৩ সনের (২০০৬ সালে) নববর্ষে। এর উদ্যোক্তা ছিলেন চট্টগ্রাম চারুকলা কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সংগঠন চট্টগ্রাম চারুশিল্পী সম্মিলন।

শিল্পী আহমেদ নেওয়াজ, বিজন মজুমদার, সুকান্ত চৌধুরী, সুজাউদ্দিন, বিশ্বজিৎ তলাপাত্র, রেজাউল করিম, মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনসহ চারুকলা কলেজের বহু প্রাক্তন শিক্ষার্থীর প্রচেষ্টায় এই মঙ্গল শোভাযাত্রা চট্টগ্রামের ঐতিহ্যে পরিণত হয়। তাদের উদ্যোগে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এই শোভাযাত্রার আয়োজন হতো। বর্তমানে পূর্বসুরিদের এই দায় নতুন প্রজন্মের কাঁধে এসে পড়েছে। এখন প্রতিবছর নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা। আমাদের সংস্কৃতির প্রতীক মঙ্গল শোভাযাত্রা ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। এর ফলে এই উৎসব আরো মর্যাদাপূর্ণ হলো। এই পহেলা বৈশাখে আরো নতুন উদ্যমে, আরো নতুন সাজে মঙ্গল শোভাযাত্রা মুখরিত করবে রাজপথ। আর এভাবেই আমাদের ঐতিহ্যের বার্তাগুলো প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত থাকবে।

তবে বৈশাখের এই মঙ্গল শোভাযাত্র নিয়ে ইসলামী দলগুলোর রয়েছে বিরুপ প্রতিক্রিয়া। তারা মনে করেন, ইসলামের দৃষ্টিতে মঙ্গল শোভাযাত্রা করা হারাম। পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে বর্ষবরণ সংক্রান্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে ইসলামী দলগুলো।

মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বিজাতীয় সংস্কৃতির অংশ বলে আখ্যায়িত করেছে জামায়াতে ইসলামী।মঙ্গল শোভাযাত্র ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম মন্তব্য করে জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশে সর্ব প্রথম ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখ মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রবর্তন করা হয়। মঙ্গল শোভা যাত্রায় বড়বড় পুতুল, হুতোম পেঁচা, হাতি, কুমির ও ঘোড়াসহ বিভিন্ন জীব-জন্তু মুখোশ পরে প্রাপ্তবয়স্কে নারী-পুরুষ একসঙ্গে অশালীন পোশাক পরে অশ্লীল ভঙ্গিতে ঢোল বাদ্যের তালে তালে নৃত্য করে সড়ক প্রদক্ষিণ করার রীতি চালু করা হয়েছে, যা ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম। হিন্দু সমাজে শ্রী কৃষ্ণের জন্মদিনে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। তারা তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী মঙ্গলের প্রতীক হিসেবে পেঁচা, রামের বাহন হিসেবে হনুমান, দুর্গার বাহন হিসেবে সিংহের মুখোশ পরে ও দেবতার প্রতীক হিসেবে সূর্য এবং অন্যান্য জীব-জন্তুর মুখোশ পরে মঙ্গল শোভাযাত্রা করে থাকে।

‘মঙ্গল শোভাযাত্রা বাঙালি সংস্কৃতির অংশ, ধর্মীয় সংশ্লিষ্টতা নেই’—প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এমন বক্তব্যের বিরোধিতা করে মুজিবুর রহমান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে, বাংলাদেশের সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ বিদ্যমান আছে। এ অবস্থায় ক্ষমতার জোরে দেশের সংবিধান লঙ্ঘন করে দেশের জনগণের ওপর ভিন্ন ধর্মের অপসংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়া উচিত হবে না। ভিন্ন ধর্মের রীতিনীতি তিনি দেশের শতকরা ৯০ জন মুসলমানের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা চালালে তার পরিণতি শুভ হবে না।

খেলাফত মজলিশ ও ইসলামী ঐক্যজোট বাংলাদেশের নেতারা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে বলেন, ৯২ ভাগ মুসলমানের দেশে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে বর্ষবরণ সংক্রান্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়। মঙ্গল শোভাযাত্রা এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সংস্কৃতির অংশ নয়। সরকার কর্তৃক জোর করে ভিন্ন ধর্মের সংস্কৃতি এদেশের জনগণের উপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তারা বলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে মুসলমানদের ঈমান- আকিদার ওপর একের পর এক আঘাত করা হচ্ছে। সরকার যদি অবিলম্বে পহেলা বৈশাখে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রার নির্দেশনা প্রত্যাহার না করে তবে দেশের সচেতন জনগণ শিক্ষা- সংস্কৃতিক এবং ইমান বিধ্বংসী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলবে।

অন্যদিকে মঙ্গল শোভাযাত্রাসহ বিধর্মী উৎসব চাপানো ও আলেমদের কলঙ্কিত করা অমঙ্গলজনক বলে মন্তব্য করেছে ২০ দলের শরীক ইসলামী ঐক্যজোট।

জোটের মজলিসে শুরার বৈঠকে নেতৃবৃন্দ বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সন্তানদের উপর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বর্ষশুরুতে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করার সরকারি নির্দেশ এবং ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ এই নীতি দেশের শীর্ষ আলেম ও মরহুম মুফতি সৈয়দ আমীনুল ইহসানের উপর কলংক লেপন অমঙ্গল বয়ে আনবে।

তারা বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থীদের আকিদা-বিশ্বাসের পরিপন্থী অমঙ্গলজনক পথে সরকারকে পরিচালিত করে নাস্তিক্যবাদী ও সাম্প্রদায়িক চক্রান্তকারীরা দেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়।

সম্পাদনা: জাহিদ


সর্বশেষ

আরও খবর

সন্দেহভাজন প্যারিস হামলাকারীর ২০ বছর কারাদণ্ড     

সন্দেহভাজন প্যারিস হামলাকারীর ২০ বছর কারাদণ্ড     


বিক্ষোভের মুখে আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ

বিক্ষোভের মুখে আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ


তৃতীয় সন্তানের জন্ম দিলেন কেট মিডলটন

তৃতীয় সন্তানের জন্ম দিলেন কেট মিডলটন


বিশ্ব একাদশে সাকিব-তামিম

বিশ্ব একাদশে সাকিব-তামিম


১৯ ক্যাটাগরির কর্মী যাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতে

১৯ ক্যাটাগরির কর্মী যাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতে


পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে তারেকের উকিল নোটিশ

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে তারেকের উকিল নোটিশ


দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী

দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী


গাজীপুরে বিলু হত্যায় ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ

গাজীপুরে বিলু হত্যায় ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ


কাল দেশে ফিরছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

কাল দেশে ফিরছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা


যুক্তরাষ্ট্রে রেস্টুরেন্টে নগ্ন হামলাকারীর গুলিতে নিহত ৩

যুক্তরাষ্ট্রে রেস্টুরেন্টে নগ্ন হামলাকারীর গুলিতে নিহত ৩