Wednesday, June 20th, 2018
মানুষের স্বাধীনতাহরণই দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা
June 20th, 2018 at 4:39 pm
মানুষের স্বাধীনতাহরণই দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা

মাসকাওয়াথ আহসানআমরা যখন তরুণ তখন যে সরকারি দপ্তরেই যেতাম; মনে হতো সেখানকার কর্মচারিরা জনগণকে সেবা দেয়ার জন্য বসে নেই; তারা অন্য কোন রাজকাজে ব্যস্ত। পর্দা ঢাকা কক্ষগুলোতে বাঘের মতো গম্ভীর হয়ে বসে থাকা লোকগুলোকে দেখে মনে হতো; এদের কাছে গেলে হয়তো কামড় দিয়ে খেয়ে নেবে। জেলা প্রশাসক, ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ সুপার, সরকারি ডাক্তার, প্রকৌশলী থেকে প্রতিটি সরকারি দপ্তরের কেরানিরা এমন তিক্ত চেহারা করে বসে থাকতো যে তীব্র বিবিমিষা জাগতো।

আবার সেনা-কর্মকর্তাদের লাঠি দুলিয়ে ঘোরা দেখলেও অবাক লাগতো। ধাক্কা দিয়ে দিয়ে হুকুম করার কায়দায় তাদের কথা বলার স্টাইলটা রীতিমত আজগুবি লাগতো।

অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে কেউ আমার সঙ্গে কখনো দুর্ব্যবহার করেনি। ফলে তাদের প্রতি ব্যক্তিগত কোন অভিযোগ আমার নেই। কিন্তু আমার সামনে তাদেরকে অন্য মানুষের সঙ্গে যেরকম আচরণ করতে দেখেছি; তা খুবই আপত্তিজনক মনে হয়েছে।

ঘুরে ফিরে কেবল মনে হয়েছে; একটি স্বাধীন ও সভ্য দেশে গণমানুষের সঙ্গে এমন কর্কশ আচরণ কোন ভাবেই মেনে নেয়া যায় না। রাষ্ট্রযন্ত্রে এটা ঔপনিবেশিক খোয়ারি বা কলোনিয়াল হ্যাং ওভার ভেবে নিজেকে প্রবোধ দিতাম। বৃটিশ-পাকিস্তান ঔপনিবেশিক আদিম আচরণের উপজাত স্বাধীন দেশে রয়ে গেছে; সুতরাং ঐ প্রজন্মের সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারা অবসরে গেলে একটা সভ্য পরিবেশ তৈরি হবে এমন একটা স্বপ্ন মনের গভীরে লালন করতাম।

আমাদের সমসাময়িক মানুষেরা যখন সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা হয়ে তাদের কর্মজীবন শুরু করলো; তখন প্রশাসনে জনবান্ধব পরিবেশ তৈরি হবার স্বপ্ন পাকাপোক্ত হলো। যারা আমাদের সঙ্গে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে; তারা খুব সভ্য ও শালীন পরিবেশ তৈরি করবে এরকম একটা ইউটোপিয়া ছিলো। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তাদের কেউ কেউ কষ্টেসৃষ্টে তাদের শালীনতা ও সাংস্কৃতিক মনন ধরে রাখতে পারলেও অধিকাংশই প্রতিদিন নিরাশ করে চলেছে গণমানুষকে।

Liberty

অথচ যারা সিভিল-মিলিটারি প্রশাসনে রয়েছে; তারা যদি তাদের সামনেই অবসরে যাওয়া মানুষগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়; তাহলে তারা দেখবে; যারা মানুষের সঙ্গে কর্কশ আচরণ করেছিলো; তারা মানুষ হিসেবে বিস্মৃত হয়েছে; কারণ মানুষ তো তারা ছিলো না; কেবল মানুষের অবয়ব ছিলো তাদের। অথচ যে অল্প সংখ্যক শালীন আচরণের মানুষ ছিলেন; তারা রয়ে গেছেন ভালোবাসার স্মৃতিতে। এটাই মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।

আগে সারাবিশ্বের যোগাযোগ যেহেতু সহজ ছিলো না; তখন বাংলাদেশে বসে এটাকে একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ভেবে দম্ভের একটা বোকার বেহেশত রচনা করে নিজে নিজেই বিরাট হয়ে ঘোরার সুযোগ ছিলো। তখন মানুষকে বিশ্বাস করানো যেতো সরকারি কর্মকর্তা এরকম দাম্ভিকই হয়। কিন্তু এখন গোটা বিশ্ব একটি অখণ্ড যোগাযোগের মাঝে এসে পড়ায় বাংলাদেশের মানুষ ঘরে বসেই জানতে পারে বিশ্বের সভ্য দেশে সরকারি সেবার মান কেমন, সিভিল ও মিলিটারি সার্ভিসের কালচারটাই বা কেমন। তাছাড়া বাংলাদেশের মানুষ নানাদেশে ছড়িয়ে পড়ায় তাদের মধ্যে তুলনামূলক ছবি রয়েছে। বাংলাদেশের প্রত্যন্তের একটি ছেলে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার যে কোন দেশে সরকারি কর্মকর্তাদের শালীন আচরণ দেখে বিস্মিত হয়; ইতালির সেনাবাহিনীর সদস্যদের আন্তরিকতা দেখে মুগ্ধ হয়। সবার মধ্যে একই প্রশ্ন; এও কী সম্ভব! প্রশাসক-পুলিশ-সেনা রীতিমত মানুষের মতো আচরণ করে।

সরকারি কর্মে নিয়োজিত থাকা মানেই শতভাগ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা ও সমালোচনা শোনার জন্য প্রস্তুত থাকা; প্রতিমুহূর্তে নিজেদের ভ্রান্তি সংশোধন করে শ্রেয়তর রাষ্ট্রীয় সেবা নিশ্চিত করা।

ভারতীয় উপমহাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার সরকারি কর্মকর্তা ও সেনাবাহিনীর লোকেরা একবিংশ শতকে বসে; ঊনিশ শো দেড়ের সরকারি কর্মকর্তা ও সেনাবাহিনীর লোকেদের মতো আচার-আচরণ করে। একটা বড় বাড়ি-টাইলস-কমোড-বড় সোফা-চেয়ার-দুটি কাজের ছেলে-কাঁটা চামচ দিয়ে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ-বন্দুক অলা দেহরক্ষী-নিজের একটা পিস্তল; কিছু বিদেশ ভ্রমণ; এগুলো খুব বড় মনে হয় এদের কাছে। অথচ এগুলো তেমন কোন বড় ব্যাপার নয়; এসব জিনিস পৃথিবীতে অনেকদিন ধরেই রয়েছে। আমরা দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ সবই ধানক্ষেত থেকে উঠে আসা; আমাদের দাদারা সবাই রেললাইনের ধারে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে প্রাতঃক্রিয়া করতো। ফলে টাইলস বা কমোডে আমাদের একটু মাথা খারাপ কিছুদিন হতে পারে; মহিষের পিঠে চড়ে হাট হাট শব্দ করে এগিয়ে যাওয়া জীনের লোক আমরা গাড়িতে চড়ে প্রথম প্রথম কিব্বা হনু ভাব এসে পড়া স্বাভাবিক। কিন্তু গোটাবিশ্বের সভ্যতার দিকেও তো খেয়াল রাখতে হবে আমাদের। সামান্য একটু ক্ষমতা আর সচ্ছলতা হাতে পেয়েই উন্মাদ আচরণ অনেকটাই টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স পেয়ে গায়ক বনে গিয়ে লোকের হাসির পাত্র হবার মতো।

আরেকটি ব্যাপার মনে রাখা জরুরি; দক্ষিণ এশিয়া আবহমান কাল ধরেই খুনেদের জনপদ। ইতিহাসবিদেরা যতই মনের মাধুরী মিশিয়ে সোনালী অতীতের রূপকথার গল্প করুক না কেন; আমাদের উপলব্ধি করতে হবে আমরা চর দখলের লড়াই-এ এক কোপে মানুষের ধড় নামিয়ে দেয়া জীনের জনপদ; নৌকা ডাকাত লুকিয়ে আছে আমাদের রক্তে। দক্ষিণ এশিয়ার লোকেরা যতই ফর্সা জামাকাপড় পরে ঘুরুক না কেন; এরা সবই কৃষক-শ্রমিক ঠকানোর মধ্যস্বত্বভোগী দালাল। এইখানে দলিতের ছেলে হাতে ক্ষমতা পেলে দলিত সমাজের কোন উপকার হয়না। বরং মুহূর্তে চোখের পাতা উলটে দলিত নিধনে লেগে পড়ার প্রবণতা সর্বত্র।

কাজেই সমাজকে সুশিক্ষা ও নৈতিকতার আলোয় আলোকিত করে তোলা ছাড়া আমাদের উত্তরণের আর কোন পথ খোলা নেই। পৃথিবীর সব জনপদের মানুষই একসময় আমাদের মতো অসভ্য ও আদিম ছিলো। তারা শিক্ষা ও সামষ্টিক সভ্যতা আহরণের তৃষ্ণায় আজ সভ্যতার পাদপ্রদীপে পৌঁছে গেছে। কিন্তু অনেক দরিদ্র অতীতের মানুষ হওয়ায় টাকা উপার্জন আর বিলাসিতাকেই আমরা জীবনের সাফল্যের সংজ্ঞা হিসেবে নির্ধারণ করেছি; ফলে সভ্যতা অধরা রয়ে গেছে।

সেইখানে সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা হিসেবে হাজির হয়েছে কর্কশ প্রশাসক ও সেনা কর্মকর্তারা। নতুন প্রজন্মের সামনে পৃথিবীর জানালা খুলে যাওয়ায় এইসব আউটডেটেড লোকেরা তাদের কাছে খুবই অপছন্দের। একারণেই সরকারি কর্মকর্তা ও সেনা কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে আশু সচেতনতা জরুরি। তাদের মনে রাখা প্রয়োজন, জনমানুষের স্বাধীনতাহরণই দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা। সভ্যতা ও সামাজিক সুবিচার অর্জনে এদের মনোজগতকে ঊনিশ শো দেড়ের অন্ধকার থেকে নিয়ে আসতে হবে দু’হাজার আঠারোর সমসাময়িকতায়। নইলে কালের ইতিহাসে গণশত্রু হিসেবে ধিকৃত হবে তারা।

মাসকাওয়াথ আহসান

মাসকাওয়াথ আহসান: ব্লগার ও প্রবাসী সাংবাদিক


সর্বশেষ

আরও খবর

পেটমোটা ঠগীর কবলে নবীন কিশোরেরা

পেটমোটা ঠগীর কবলে নবীন কিশোরেরা


‘আপনি হয় আওয়ামী লীগ অথবা জামাত-শিবির-রাজাকার’

‘আপনি হয় আওয়ামী লীগ অথবা জামাত-শিবির-রাজাকার’


দক্ষিণ এশিয়ার ভাটিয়ালি গণতন্ত্রেরা

দক্ষিণ এশিয়ার ভাটিয়ালি গণতন্ত্রেরা


বদি থেকে মাশরাফি; একই স্বপ্নের দৈর্ঘ্য

বদি থেকে মাশরাফি; একই স্বপ্নের দৈর্ঘ্য


পেডোফিলিক রাজনীতিকদের নিয়ে আমরা কী করবো!

পেডোফিলিক রাজনীতিকদের নিয়ে আমরা কী করবো!


হ্যাশট্যাগ স্ট্যান্ড ফর রিচ কিড গ্যাং

হ্যাশট্যাগ স্ট্যান্ড ফর রিচ কিড গ্যাং


আত্মপ্রবঞ্চনা নয় বরং আত্মসমালোচনা

আত্মপ্রবঞ্চনা নয় বরং আত্মসমালোচনা


কোটা সংস্কার আন্দোলনে কেউ হারেনি; কেউ জিতেনি

কোটা সংস্কার আন্দোলনে কেউ হারেনি; কেউ জিতেনি


কোটার ভ্রমর ও বঙ্গপাঞ্জাবির দিনগুলি

কোটার ভ্রমর ও বঙ্গপাঞ্জাবির দিনগুলি


চিরচেনা বৈশাখের নববর্ষ

চিরচেনা বৈশাখের নববর্ষ