Thursday, October 20th, 2016
মানুষ ফাঁসানোর কল ‘আমেরিকার স্ট্রিং অপারেশন’
October 20th, 2016 at 9:42 pm
মানুষ ফাঁসানোর কল ‘আমেরিকার স্ট্রিং অপারেশন’

কাজি ফৌজিয়া:

One day I was talking with one of the Peshmerga commanders… who… quoted Napoleon Bonaparte, saying that ‘I am not afraid of 100 men with guns, but I am afraid of one man armed with a pen.’ Since then, I have always looked at my pen as my weapon. I consider myself a Peshmerga, but I fight my battles with a pen.

প্রিয় বন্ধু,

কেমন আছো তুমি?

তোমাকে একটা কল দিতে বলেছিলাম; কিন্তু আমাকে অবহেলা করাতো তোমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অবশ্য তোমার এই সব অবহেলা আমাকে আজকাল আর কষ্ট দেয় না আগের মতো। তোমার অবহেলা আমারও অভ্যাসে রূপ নিয়েছে। এখন কেবল তুমি নও, যে কোনো পুরুষ মানুষের অবহেলা আমি খুব সাধারণ ভাবেই নিতে পারি। আমার ধারণা তোমাদের, মানে পুরুষ মানুষদের সাধারণ মানবিকতা আমাদের থেকে কম; তাই তোমাদের কাছ থেকে ভালো কিছু আশা আমি তেমন একটা করি না। দেখলেতো একটা কল না করার শোধ কীভাবে নিলাম!

থাক এসব ইকরি-মিকরি; কাজের কথায় আসা যাক-আমেরিকার স্ট্রিং অপারেশনের বিষয় হয়তো তুমি জানো কিংবা জানো না। অনেক বাংলাদেশী মানুষও এইসব অপারেশনের শিকার। এমন এক হতভাগ্য ব্যক্তির নাম মুহাম্মদ হুসাইন, বয়স ৫১। ফেলে আসা বাড়ি বাংলাদেশের সিলেটে। তার সাথে ফাঁসানো হয়েছিলো ইরাকের ইয়াসিন আরেফকে; বয়স ৩৬।

ঘটনা ২০০৩ সালের। মুহাম্মদ হুসাইন নিউ ইয়র্কের আলবেনি শহরে ছোট খাট পিজার দোকান পরিচালনা করে কোনরকমে পরিবারের ভরনপোষণ করছিল। একদিন ঐ দোকানে কাস্টমার সেজে আসে পাকিস্তানের সাহেদ হুসাইন ওরফে মালিক। রোজ খাওয়া দাওয়ার ছলে বন্ধুত্ব করে। কথার ছলে মালিক মহাম্মদ হুসাইনের কাছ থেকে তথ্য আদায় করে যে হুসাইনের ব্যবসা ভালো চলছে না, ভালো ভাবে ব্যবসা করার জন্য টাকার দরকার। হুসাইনের এই অসহায়ত্বের সুযোগ নেয় মালিক। নিজেকে হুসাইনের ভাইয়ের মতো দাবী করে। সবসময় বাচ্চাদের জন্য উপহার নিয়ে আসে। প্রথম থেকে হুসাইনের স্ত্রী ফাতিমা এই মালিক লোকটাকে পছন্দ করতো না, ফাতিমা বার বার তার স্বামীকে মানা করেছিলো এই লোকের সাথে বেশি কথা না বলতে।

হুসাইন একটু সাদাসিধে বেশি কথা বলা মানুষ; তাকে পটানো মালিকের জন্য কোনো বড় বিষয় ছিল না। সে হুসাইন কে ব্যবসার জন্য টাকা ধার দিতে রাজি হয় এবং আকারে ইঙ্গিতে মালিক জানিয়ে দেয় পাকিস্তানে সে অস্ত্র ব্যবসা করে, আর লাভের টাকা দিয়ে আজাদ কাশ্মীর লড়াইকে সাপোর্ট করে। মালিক তার দলের নাম বলে ‘জেএমই’। হুসাইনের মোটা চিন্তার মাথায় এসব বিষয় রেখাপাত করে না। কাজের ফাঁকে ফাঁকে সে মালিকের সাথে কথা বলতো; মালিক তাকে সেই সব অস্ত্রের ছবিও দেখেতো। কিন্তু হুসাইন পরে মনে করতে পারিনি কবে দেখিয়েছে বা আদৌ দেখিয়েছে কি না! তবে মালিকের কাছে ছবি ছিল যে, সে হুসাইনকে ছবি দেখাচ্ছে।

ওহ বন্ধু! তোমাকে তো বলাই হয়নি এই মালিক মালটা কে? মালিক এক জালিয়াত চক্রের হোতা যে কিনা মানুষ ঠকিয়ে টাকা নিতো এই বলে যে, সে তাদের ড্রাইভিং লাইসেন্স করে দেবে। ধরেই নেওয়া যায় সে সেসব মানুষের কাছ থেকে টাকা নিতো যারা রেগুলার লাইসেন্স বানাতে পারত না। ২০০২ সালে মালিক পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয় প্রতারণার দায়ে। তখন এফ বি আই তাকে অপশন দেয়, ‘হয় লম্বা কারাবাস নয় গুপ্তচরের কাজ’। মালিকের মতো লোকের কাছে ২য় অপশনটাই আশা করা যায়।

যখন হুসাইন রাজি হয় টাকা নিতে, মালিক কাগজপত্রে সইয়ের কথা বলে আর হুসাইন ইসলামী আইন অনুযায়ী একজন সাক্ষীর কথা বলে, হুসাইন ইয়াসিন আরেফকে সাক্ষী হিসাবে মনোনীত করে। ইয়াসিন একজন কুর্দি রিফুজি, এই দেশে ১৯৯৯ সাল থেকে আইনি ভাবে বসবাস করছিলো। আরেফ আলবেনির স্থানীয় মসজিদ সালাম’র ইমাম। হুসাইন ইয়াসিন আরেফকে সাক্ষির কথা বলে আর মালিক কৌশলে আরেফকে নিজের ব্যবসা জেইএম তার দলের কথা বলে। আধা ইংলিশ জানা ইয়াসিন কী বোঝে আর কী বোঝে না সেটা বড় কথা নয়, কথা হল টাকা দেওয়ার সময় ছবি ঠিকই তুলে নেয়। ৫০,০০০ ডলার দেয়া হয় হুসাইন কে। মাসে মাসে ২০০০ থেকে ৬০০০ ডলার ফেরত দেওয়ার চুক্তিতে হুসাইন সই করে আর আরেফ সাক্ষী হয়। গুপ্তচর মালিক এফবিআই’র হাতে তথ্য-প্রমান তুলে দেয়।

ব্যস, কম্ম সারা! এফ বি আই হুসাইনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গ্রুপের সাথে মানি লনডারিং এর অভিযোগে আনে। এবং নিউ ইয়র্কের পাকিস্তানী রাষ্ট্রদূতকে নাকি মারারও পরিকল্পনা করছিলো, এমন দুই অপরাধে তাদের উপর মামলা সাজানো হয়। পুরোঘটনাই সাজানো, তারপরেও মুসলিম বাঙালি আর কুর্দি হওয়ার শাস্তি পেতে হলো হুসাইন আর আরিফকে। ২০০৪ সালে হুসাইনকে বাসা থেকে আরে আরেফকে মসজিদ থেকে গ্রেফতার করে এফবিআই।

হুসাইনের ছেলে আর মসজিদের সেক্রেটারির বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছিল আকাশে ও মাটিতে পুলিশ-এফবিআই’র একশন দেখে তারা হাসবেন না কাঁদবেন বুঝতে পারছিলেন না। ২০০৬ সালে তাদের দুইজনের সাজা হয় ১৫ বছর করে। হুসাইন ও আরেফের উকিল কোর্টে বলে কারও ক্ষতি হয়নি এমন কি ক্ষতির চিন্তাও হয়নি তবু বেকসুর লোকের সাজা হল। ২০০৭ সালে এন ডাবলিও সি পি ওয়াশিংটনে একটি শুনানি করে, যাতে প্রমাণ করে এরা নির্দোষ; তারপরেও তারা জেল খাটছে। ১৫ বসর কারাবাসের পর হয়তো তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে। উভয় পরিবারের সদস্য সংখা মোটামুটি বড়। আরেফের দুই সন্তান, হুসাইনের ৪ জন। দুইজনের স্ত্রীই গৃহিণী।

এবার তুমিই বলো বন্ধু এই পরিবার কেমন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিলো। ফাতিমা কিছুদিন ১৩ বছরের বয়সের ছোট ছেলেটাকে নিয়ে পিঁজার দোকান চালিয়েছিল, কিন্তু পরে আর পারেনি। দুই বাড়িতেই কয়েকবার গিয়েছিলাম আমি; তাদের দুঃখ কষ্ট কাঁটা হয়ে অন্তরে বিধে আছে। একবার ফাতিমার বাসার বাইরে আসার পর আমাদের পুলিশ থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলো! কি আজব ব্যবস্থা তারা মারবে কাটবে কিন্তু আমারা তাদের সাহায্যও করতে পারব না। এই ঘটনার পর আলবেনির কিছু ভাল মানুষ মসজিদ সালাম’র সভাপতি ও উকিলরা মিলে প্রজেক্ট সালাম নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলে যার মাধ্যমে এই দুই কয়েদি তাদের পরিবারের ন্যায় এর লড়াই করছে আর অন্য মুসলিম কয়েদিদের সাপোর্ট করে যাচ্ছে।

আমার কথা শুনে অনেক লোকজন ভাবে আমি আমেরিকার বদনাম করি। হয়ত এমনি ভাবে আমি বানিয়ে বলি। কেউ যদি আরেফ বা হুসাইন সম্পর্কে আরও জানতে চায় গুগলে প্রোজেক্ট সালাম লিখে সার্চ দিলে এই দুই জন ছাড়াও অনেক মুসলিম কয়েদির কাহিনী জানতে পারবে, জানা যাবে কীভাবে তাদের ফাঁসানো হয়েছে।

বন্ধু, একটা শুনানিতে গিয়েছিলাম বক্তব্য দিতে; ঐটা ছিল সিটি কাউন্সিলের রেজুলশন মুসলিমদের বিরুদ্ধে হেইট ক্রাইম বন্ধ করতে। আমি প্রশ্ন রেখেছিলাম, আমার বক্তব্যে যে আপনারা আমাদের জন্য চিন্তা করছেন, বা পাশে দাঁড়িয়েছেন ভালো কথা; কিন্তু যে পলিসির কারণে আমরা টার্গেট সেই পলিসিতো জায়গা মতোই আছে। তাহলে রেজুলশনে আমাদের কী উপকার হবে? জুতা মেরে গরু দান বা গরু মেরে জুতা দান বলে একটা প্রচলিত কথা আছে বাংলায় আমাদের মনের অবস্থা সেই রকম।

এক রাতে গিয়েছিলাম বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন নিয়ে প্যানেল পরিচিতি অনুষ্ঠানে। ৪ থেকে ৫ শ’ বাংলাদেশী জমা হয়েছিলো কমপক্ষে, আমার উদ্দেশ্য ছিল আমাদের একটি প্রচারণার জন্য সাক্ষর সংগ্রহ করা। বাংলাদেশী সমাজের অনেক নেতা নেত্রীর বক্তব্য শুনতে পেলাম সেই অনুষ্ঠানে। মাঝে মাঝে নিজেকে মনে হয় আলাদা গ্রহ থেকে আসা প্রাণী, নইলে সমাজের এই পাগলামি আমার কাছে কেন ভাল লাগে না। এই শহর আইন কানুন নীতি দুর্নীতি কিছুতেই আমার সমাজের মানুষের কিছু আসে যায় না! তারা বেশ আছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, আর জেলা শহর সমিতির ইলেকশন আর পিকনিক আর বর্ষবরণ নিয়ে।

সবার পরিচয় দেওয়ার সময় নামের পরে হয় দলের নাম বা সমিতির নাম আছেই, যেন তাদের নিজের কোন পরিচয় নেই দল আর সমিতি ছাড়া। আমার দুঃখ হয় এই দেখে যে, কেউ নিজেকে বাংলাদেশীও ভাবে না, দল বা জেলাই যেন তাদের একমাত্র পরিচয়। নিউইয়র্কে এমন পরিচয় সঙ্কটে ভোগা সমাজে আমাদের বসবাস। এই নেতাগিরি করতে গিয়ে কেউ কেউ বউ সন্তান সংসারও তুচ্ছ করে দেখে।

যা হোক, এই বিষয়ে বেশি সমালোচনা না করাই ভালো, এমনিতেই আমি একঘরে।

বাহ! চিঠির শুরুতে তোমার একটা কল না পাওয়া নিয়ে হাহাকার করেছি। বলেছি আমার প্রতি তোমার অবহেলার কথা। আর এখন, চিঠি শেষ করার আগেই তুমি কল করেছো, বুঝতে পারলাম আমার কিছু গুরুত্ব হয়তো এখনো আছে তোমার কাছে!

বন্ধু, আজো ফেডারেল প্লাজায় গিয়েছিলাম। একজন কারামুক্ত বাংলাদেশী ভাইয়ের হাজিরা ছিলো আজ। যেতে আসতে দুই ঘণ্টা তাই ট্রেনে বসেই লেখার সমাপ্তি টানছি, ভীষণ ক্লান্তিও লাগছে।

ভালো থাকো বন্ধু। ভালো থাকুক আমার দেশ ও মানুষ।

ইতি
তোমার সেই বন্ধু, যাকে তুমি কোনো নামেই ডাকোনা!


সর্বশেষ

আরও খবর

আমাদের ঝালমুড়ি দাদা ও গরীবের শ্রেণী সংগ্রাম

আমাদের ঝালমুড়ি দাদা ও গরীবের শ্রেণী সংগ্রাম


জন্মভূমির টান মানসিক কষ্টে ফেলে দেয়

জন্মভূমির টান মানসিক কষ্টে ফেলে দেয়


‘মুসলিম সমাজের বিভাজন বন্ধ করুন’

‘মুসলিম সমাজের বিভাজন বন্ধ করুন’


আজ জুইস-মুসলিম এক কাতারে দাঁড়িয়েছে

আজ জুইস-মুসলিম এক কাতারে দাঁড়িয়েছে


সর্ব পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে

সর্ব পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে


ভাবতেই কষ্ট হয় আমিও বাঙালি

ভাবতেই কষ্ট হয় আমিও বাঙালি


‘তুরস্ক টিকবে তো?’

‘তুরস্ক টিকবে তো?’


মক্কা থেকে…

মক্কা থেকে…


সুবিধাবাদী নেতারা অবহেলিতর কথা বলে না

সুবিধাবাদী নেতারা অবহেলিতর কথা বলে না


‘এই পৃথিবী শিশুদের নিরাপত্তা দিতে অক্ষম’

‘এই পৃথিবী শিশুদের নিরাপত্তা দিতে অক্ষম’