Sunday, April 22nd, 2018
যে শহর শূ্ন্যতার
April 22nd, 2018 at 3:33 pm
যে শহর শূ্ন্যতার

মাসকাওয়াথ আহসান: ঘুম থেকে জেগে অন্যদিনের চেয়ে অনেক বেশী নীরবতা টের পান তিনি। আজকের দিনটা বিশেষ কেন তা ভাবতে স্মৃতি হাতড়ান; স্মৃতির ডায়েরিতে কোথাও এক কোণায় কী লেখা আছে কেন আজকের দিনটি বিশেষ। ভাবতে ভাবতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বেসিনে হাত-মুখ ধুতে ধুতে আয়নার মধ্যে যেন একে একে নিজের কৈশোর-তারুণ্য-যৌবন-প্রৌঢ় সময়ের মুখগুলো ভাসতে থাকে। তারপর আবার তা এসে থিতু হয় ৭৬ কিংবা ৭৭ বছরের মুখমণ্ডলে।

আজকের দিনটি বিশেষ কেন, চারদিকে অথৈ নীরবতা কেন; এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে একটা নীলাভ শার্ট কালো ট্রাউজারের মাঝে টাক ইন করতে করতে ভাবেন; বয়স যত বাড়ে ততই বোধ হয় ইন করে শার্ট পরে বেল্ট বাঁধতে থাকার সময় পরিধি বাড়তে থাকে। সেই যে পাঁচ মিনিটে রেডি হয়ে গিয়ে প্রায় প্লাটফর্ম ছেড়ে চলে যাওয়া ট্রেনে দৌড়াতে দৌড়াতে ওঠার সময়গুলো তার তুলনায় আজ এই একটু নিজেকে গুছিয়ে বাজারে যেতেই অনেক সময় লেগে যাওয়াটাই কী বার্ধক্য!

বাড়ির সামনের বাগানের রাস্তা পেরিয়ে গেট খুলে বের হবার পরেই মনে হয় বারান্দার গ্রিলের গেটে তালা দেয়া হয়েছে কী! পকেটে সেল ফোন টা নেয়া হয়েছে তো! এইসব নানা প্রশ্নের উত্তর মেলাতে আরো কিছুটা সময় চলে যায়।

তারপর রাস্তায় বেরিয়ে কাউকে না দেখে প্রশ্ন জাগে আজ এ শহরের লোকগুলো কোথায় গেলো। এগিয়ে যেতে যেতে রাস্তার মোড়ে পৌঁছেও কাউকে চোখে পড়ে না। চায়ের দোকানটাও খোলা; কিন্তু কেউ নেই চা-খানায়। সড়কে কোন রিক্সা নেই; হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে যাওয়া ট্রাক নেই। অবশ্য বাজার পর্যন্ত প্রতিদিন হেঁটে যান তিনি। ফেরার সময় রিক্সা নিয়ে ফেরেন। ভাবেন ফেরার সময় ঠিকই রিক্সা পাওয়া যাবে।

হঠাতই চোখ পড়ে একটা বাড়ির দিকে। এই বাড়িতে একজন বন্ধু থাকতো। আজকাল কোন সমসাময়িক বন্ধুর কথা ভাবতে গেলেই সেটা অতীতকালের ব্যাপার। প্রতিদিনই যেন গাছের পাতা ঝরে যাবার মতো সমসাময়িক মানুষেরা চলে গেছে গত কয়েক বছরে। তারপর থেকে নিজেকে একা মনে হতে থাকে। বাজারের দু’একটি ঔষধের দোকানে বসে পরিচিত মানুষেরা আড্ডা দিতো। বাজারের অধিকাংশ মুখই পরিচিত ছিলো। বিভিন্ন দোকানে যে দোকানিরা বসতো তাদের সবাই ছিলো চেনা-জানা ছিলো। এক এক করে এক একটা মুখ যেন মুছে যেতে থাকে। বাচ্চারা যেমন শ্লেটে বর্ণমালা লিখে একটা একটা করে অক্ষর মুছে দেয়; ঠিক তেমন করে কেউ যেন মুছে দিতে থাকে প্রায় অর্ধশতক ধরে পরিচিত হাসি; একটু ভাব বিনিময়; একটু গল্পগুজব।

তারপর থেকে ক্রমশঃ নিজেকে শহরে সাদাচুলের নিঃসঙ্গ গাছের মতো মনে হয়। পরিচিত গাছেরা কেউ নেই; পরিচিত বৃক্ষ শাখা; ফুল; পাখী; বাতাসের গান; কিছুই আর নেই।

Literature surrealism

শূ্ন্যতার শহর 

মাঝে মাঝেই মনে হতো এই যে আমার সমবয়েসি কিংবা আমার চেয়ে কমবয়েসিরা সবাই চলে গেলো; আমি একাই রয়ে গেলাম এটা ঠিক কেমন হলো! অল্প বয়েসিরা কেউ কী আমাকে চেনে! নাকি আমি একা একজন অচেনা মানুষ অনেকগুলো চেনাজানা মানুষের জনপদে ঘুরে ফিরে বেড়াই।

এখানে-ওখানে পড়ি মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। আজকাল নাকি মানুষ অনেকদিন বেঁচে থাকে। তাহলে এ শহরের প্রিয়তম পাতাগুলো এতো তাড়াতাড়ি কী করে ঝরে গেলো।

বাজার পর্যন্ত এগিয়েও কোন জনমানুষের চিহ্ন পাওয়া গেলো না। দোকান-পাট সব হাট করে খোলা। সবজির দোকানে লক লক করছে তাজা সবজি। মাছের বাজারে গোলাকার থালাগুলোর মাঝে জীবন্ত মাছেরা নড়াচড়া করছে। জীবন্ত মোরগ-মুরগিগুলো টুল টুল করে তাকাচ্ছে খাঁচার ভেতর থেকে। একটা ঘিয়ে রঙ কুকুর প্রতিদিনের মতোই কাঁচা বাজারের মাঝ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে পেছন ফিরে তাকায়। বাজারের মাঝ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনেক ভেবেও এইসব রহস্যের কোন কূলকিনারা করা যায়না। এমনকি মিষ্টির দোকানে গরম গরম জিলাপি ভেজে রাখা হয়েছে।

একটু এগিয়ে গেলে সংবাদপত্রের দোকান। আজকের নতুন খবরের কাগজের গন্ধ মৌ মৌ করছে। মনে হয় রেল স্টেশানে গেলে বুঝি কারো দেখা পাওয়া যাবে। ওভারব্রিজে ভিক্ষুক নেই; প্লাটফরমে বাঁশীওয়ালা নেই। স্টেশান মাস্টারের ঘরে কেউ নেই। প্লাটফর্মে দাঁড়ানো ট্রেনের ইঞ্জিন চালু আছে; অথচ চালক নেই; হুইসেল দিয়ে পতাকা ওড়ানো গার্ড নেই; যাত্রী নেই; তবু যেন মনে হচ্ছে ট্রেনটা এক্ষুণি ছেড়ে যাবে।

দ্রুত আবার বাজারে ফিরে আজ খাবার জন্য যা দরকার তা কিনে ক্যাশবাক্সে টাকা ফেলে আসেন এই আশায় যদি দোকানি ফেরে। প্রতিদিনের মতো বাজার সেরে মেইন রোডে এসে দাঁড়াতেই একটা অটোরিক্সা এসে দাঁড়ায়। ইঞ্জিন চালু আছে; অথচ চালক নেই। এটা কোন স্বপ্ন দৃশ্য নাকি বাস্তব এরকম ভাবতে ভাবতে অটো রিক্সায় বসলে সেটা চলতে শুরু করে। না কোথাও জনমানুষের চিহ্ন নেই। অটোরিক্সা বাড়ির কাছে নামিয়ে দেয় প্রতিদিনের মতো। চালকের সিটের ওপর ভাড়াটা রেখে দিতেই অটোরিক্সাটা চলে যায়। বাড়িতে ফিরে বাজারের ব্যাগ রেখে; ঠান্ডা পানিতে হাত-মুখ ধুয়ে টিভি চালু করেন। টিভি চলছে; লাইভ নিউজ লেখা আছে; কিন্তু খবরগুলো তো একই; গতকাল-পরশু তো এসব খবর শুনেছেন মনে হচ্ছে। ফলে এটা আসলেই লাইভ; নাকি রেকর্ডেড নিউজ বোঝা মুশকিল।

বাধ্য হয়ে ছেলেকে ফোন করেন। ফোনটা বাজতে বাজতে আনসারিং মেশিনে ঢুকে পড়ে; এখন একটু ব্যস্ত আছি; ফ্রি হয়েই ফোন করছি। কিন্তু এটাও তো রেকর্ডেড ভয়েস। এ থেকে নিশ্চিত হবার উপায় নেই পৃথিবী থেকে জীবন বিলুপ্ত হয়েছে কীনা। দেয়ালে ঘড়ির দিকে তাকান। আজ রবিবার। এই দিনে নিয়ম করে নাতিকে ফোন করেন। কোন কারণে দেরি হলে নাতিই ফোন করে। আজ নানা ভাবনায় কিছুটা দেরি হয়ে গেলো। নাতি ফোন করে।

–হ্যাপি বার্থডে দাদা।

আরো নিশ্চিত হতে নাতিকে হোয়াটস এপে ভিডিও কল করেন।

নাতি জিজ্ঞেস করে, কী ভাবছো দাদা! তোমাকে একটু চিন্তিত মনে হচ্ছে!

প্রথমে ভাবেন এড়িয়ে যাবেন শহর জনশূন্য হয়ে যাবার ব্যাপারটা। বরং জিজ্ঞেস করেন,

–আচ্ছা দাদা তোমার শহরে আজ কোন মানুষের দেখা পেয়েছো!

নাতি হেসে উত্তর দেয়, আজ এখানে বরফ পড়েছে; কাউকে পথে বের হতে দেখিনি। অবশ্য বের হয়েই কী লাভ! যেদিন সূর্য ওঠে সেদিন মানুষজন এতো তাড়াহুড়া করে ছুটে যায় যে তা এমন বরফপড়া শূ্ন্যতার শহরের মতোই মনে হয়।

Bangladesh writer

লেখক: ব্লগার ও প্রবাসী সাংবাদিক


সর্বশেষ

আরও খবর

ঠিকাদারি!

ঠিকাদারি!


বুড়ো সেলিব্রেটির ঘাড়ে মিউজ

বুড়ো সেলিব্রেটির ঘাড়ে মিউজ


মধু-ফাঁদের খোয়ারি

মধু-ফাঁদের খোয়ারি


যতদিন পৃথিবী থাকবে ততদিন মশা থাকবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

যতদিন পৃথিবী থাকবে ততদিন মশা থাকবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী


কাক সরিয়ে মহানগরীর দখল নিয়েছে মশা

কাক সরিয়ে মহানগরীর দখল নিয়েছে মশা


কথাসাহিত্যিক শওকত আলী আর নেই

কথাসাহিত্যিক শওকত আলী আর নেই


‘জসীম উদ্দীন’ পুরস্কার দেবে বাংলা একাডেমি

‘জসীম উদ্দীন’ পুরস্কার দেবে বাংলা একাডেমি


ফিরে ফিরে আসার গল্প

ফিরে ফিরে আসার গল্প


কবি শামসুর রাহমানের ১১তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত

কবি শামসুর রাহমানের ১১তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত


সংস্কৃতি চর্চা মানুষের মনকে শুদ্ধ করে: রাবি উপাচার্য

সংস্কৃতি চর্চা মানুষের মনকে শুদ্ধ করে: রাবি উপাচার্য