Wednesday, January 11th, 2017
শিশুদের সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ করে দিতে হবে
January 11th, 2017 at 2:46 pm
শিশুদের সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ করে দিতে হবে

মাসকাওয়াথ আহসান: রাজধানী ঢাকার উত্তরায় কিশোরদের মাঝে যে গ্যাং কালচার গড়ে উঠেছে তার নির্মম শিকার হয়েছে নবম শ্রেণির ছাত্র আদনান। ডিসকো বয়েজ ও নাইনস্টার নামে দুটো গ্যাং-এর দ্বন্দ্বে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে কিশোরটিকে।এ এমন এক অশনি ঘটনা যা আমাদের আতংকিত করেছে। এমনিতেই শিশুদের শৈশব আমরা কেড়ে নিয়েছি ভুল শিক্ষাব্যবস্থার সিসিফাসের পাথর তাদের কাঁধে বেঁধে দিয়ে। মহানগরে এপার্টমেন্টে আটকে ফেলা হয়েছে শিশুদের জগতটিকে। তাদের খেলার মাঠ নেই। ব্যালকনির গ্রিলের ফাঁক দিয়ে এক টুকরো আকাশ দেখা ছাড়া শিশুদের জন্য নিসর্গের কাছে আসার সুযোগ খুবই সীমিত। যে এলাকায় খেলার মাঠ রয়েছে সেখানে খেলার মাঠে গিয়ে আবার শিশুরা নানা রকম গ্যাং-এ জড়িয়ে পড়ে; সেখানেই শুরু হয় ছোট ছোট অপরাধের হাতেখড়ি; এরপর হত্যার মত বড় অপরাধে জড়িয়ে পড়া অথবা হত্যার শিকার হওয়া; এসব ঘটনা আতংকিত হবার মতো।

ঢাকা মহানগরীতে দেশের নানা জায়গা থেকে নানা প্রকৃতির মানুষজন এসে বসত গড়ে। পৃথিবীর সমস্ত কসমোপলিটান শহরেই তা ঘটে। কিন্তু অন্যান্য কসমোপলিটানের তুলনায় ঢাকায় যেন একটু বেশী বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত বসবাস করে মানুষ। পারস্পরিক চেনাজানা ও মেলামেশার সংস্কৃতি যেন নেই বললেই চলে। অনেকে এটিকে নগরায়নের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য বলে মনে করলেও; আদৌ তা নয়। পশ্চিমের অত্যন্ত ব্যস্ত নগরেও প্রতিবেশীর মাঝে চেনাজানা হয়; একটা সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক থাকে। কেউ কারো প্রাইভেসিতে উঁকি দেয় না; কিন্তু প্রয়োজনে কাজে আসে তারা। অথচ প্রাচ্যের বন্ধনের ঐতিহ্যের মাঝে বসবাস করেও কোত্থেকে নগরায়নের বিশুষ্ক সংস্কৃতি রপ্ত করেছে ঢাকা; যেখানে মানুষ থেকে মানুষের মাঝে এমন দেয়াল।

যে কোন জনপদেই সামাজিকতার বিস্তার না ঘটলে নানারকম বিপর্যয় এগিয়ে আসে। উত্তরায় গ্যাং কালচারের বিস্তার এরকম একটি বিপর্যয়। টিনএজদের মাঝে খুব স্বাভাবিকভাবেই একটু হিরোইজম দেখানোর প্রবণতা থাকে; এর প্রয়োজনও আছে। কিন্তু সেটা বাড়াবাড়ি রকমের হয়ে এন্টি হিরোইজম তৈরী হলেই বিপত্তি। সেটাই দৃশ্যমান হচ্ছে ঢাকার নানা জায়গায় কিছু কিশোরের মাঝে। এর বড় কারণ হচ্ছে সামাজিক স্নেহ ও শাসনের অনুপস্থিতি। শিশু-কিশোরদের উজ্জ্বল ভবিষ্যত গড়া কেবল বাবা-মা’র দায়িত্ব নয়; এটি সামাজিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। কেউ কারো দিকে না তাকিয়ে আত্মকেন্দ্রিক জীবন যাপন করলে সে জনপদের সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। খুব সম্ভব আত্মকেন্দ্রিকতার তিক্ত ফল পেতে শুরু করেছে ঢাকা নামের মেট্রোপলিটানটি।

উত্তরার যে শিশু-কিশোররা গ্যাং কালচারে অভ্যস্ত হয়েছে, এর উপরে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে। উত্তরার কিশোর গ্যাং-গুলো বিভিন্ন এলাকার ওপর নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের যে খেলা শুরু করেছে তা আসলে দেশের প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দলের মত প্রাধান্য বিস্তারের চলামান অপসংস্কৃতিরই অনুকরণ। কারণ শিশু-কিশোররা অনুকরণপ্রিয়। রাজনৈতিক গ্যাং-গুলোর কথা আগে আমরা শুনতাম; কিছু ভ্যাগাবন্ডকে রাস্তার পাশে জোর করে দখল করা জমিতে পার্টি অফিস তৈরী করে চেয়ারে বসে ঠ্যাং দোলাতে দেখতাম। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আয়নায় তা প্রথম স্পষ্টভাবে চোখে পড়লো। দুটি রাজনৈতিক দলের নানারকম গ্যাং চ-বর্গীয় গালাগাল দিয়ে; হুমকি-ধামকি দিয়ে ফেসবুকের ওপর প্রাধান্য বিস্তারের চেষ্টা করলো কয়েকবছর। এই গ্যাংগুলোর সদস্যরা রাজনৈতিক বড় ভাই ও বুবুদের সঙ্গে সেলফি তোলে; নানাদিবসে কেক-পেস্ট্রি খাওয়ার ছবি দিয়ে কাল্পনিক ক্ষমতার শোডাউন করে শিশু-কিশোরদের সামনে মেক্সিকোর অনুরুপ গ্যাং-কালচারটি তুলে ধরলো। কেবলমাত্র গালি দেয়ার গুণে সেলিব্রেটি হয়ে উঠলো কিছু গ্যাং সদস্য। শিশু-কিশোররা শিখে নিলো, গ্যাং বানাতে হয়, দলবেধে সেলফি তুলতে হয়, এ থেকে সেলিব্রেটিও হওয়া যায়। ফলে উত্তরার এক তালাচাবি মেরামত শিল্পীর ছেলে তালাচাবি রাজু হয়ে উঠলো কিশোরদের গ্যাং-স্টার।

উত্তরার কিশোরদের গ্যাং গড়ে তোলার পেছনে প্রত্যক্ষভাবে দায়ী তাদের অভিভাবকেরা। এতো অল্পবয়েসী শিশু-কিশোরদের বাইক কিনে দেয়া কিংবা গাড়ি কিনে দেয়া আত্মঘাতী হয়েছে। তালাচাবি মেরামত শিল্পী থেকে রাজনৈতিক দলের তৈলব্রতশিল্পী হয়ে কিংবা অন্যান্য অশুভ পথে দুটো কাঁচা পয়সা হাতে এলেই তা দিয়ে নিজের শিশু-কিশোরকে বিগড়ে দেয়া অনুচিত। ঢাকায় সামাজিক গতিশীলতা খুবই অস্বাভাবিক। মানুষের জীবনে পর্যায়ক্রমে সচ্ছলতা ও সুখ অর্জনের যে স্বাভাবিক চেষ্টা থাকে– ঢাকায় তা ফিল্মের প্রথম দৃশ্যে বাই-সাইকেলে তালাচাবি সেরে বেড়ানো, দ্বিতীয় দৃশ্যে বাইকে তালাচাবি বিক্রি, তৃতীয় দৃশ্যে গাড়িতে চড়ে নিজের বিশাল তালাচাবি ফ্যাক্টরিতে প্রবেশের মত অস্বাভাবিক দ্রুতগতির অপচেষ্টা। ফলে শিক্ষা-অর্থ-সংস্কৃতির সুষম মনন গড়ে পর্যায়ক্রমে সম্পূর্ণ মানুষ-পরিবার-সমাজ গড়ে উঠতে পারছে না।

দুর্নীতি শিল্প-বিপ্লবোত্তর সমাজে দ্রুত বড়লোক হওয়া, দ্রুত স্ট্যাটাস অর্জন, দ্রুত জাতে ওঠার আত্মঘাতী চেষ্টায় সচ্ছলতার পরিবর্তে প্রাচুর্য্য অর্জন করছে সমাজের অনেক লোক। এই উপচে পড়া সম্পদের বলি হচ্ছে তাদের সন্তানরাই। সম্পদ বিষয়টিকে মানসিকভাবে হজম করার জন্য সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি প্রয়োজন। শিক্ষা-সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি ছাড়া সম্পদ অর্জন করলে সমাজকে দেখতে ময়ূরপুচ্ছ পরা কাকের মতো লাগে।

শিশু-কিশোরদের প্রতি তাদের অভিভাবক ও সমাজকে অত্যন্ত মনোযোগী হতে হবে। তাদের শিক্ষাকে আনন্দময় করার চেষ্টা করতে হবে শিক্ষক সমাজকে। অভিভাবক, এলাকার প্রবীন মানুষ সবাইকে সচেষ্ট হতে হবে শিশু-কিশোরদের পরিচর্যায়। সময় পেলেই রাজনৈতিক বিষয়ে চর্বিত-চর্বনে সময় নষ্ট না করে; শিশু-কিশোরদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তাদের পড়ালেখার পাশাপাশি ব্যস্ত রাখতে হবে নানা সৃজনশীল জগতে। শিশুদের সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ না পেলে তাদের মস্তিষ্ক সমাজের খল-নায়কদের অনুকরণ করবে। প্রত্যেকটি মানুষই সৃজনশীলতার সম্ভাবনা নিয়ে জন্মে। যারা সৃজনশীলতা বিকাশের পথ খুঁজে পায়, তাদের মাঝে তৈরী হয় ইতিবাচকতা। নেতিবাচকতা ভর করে সৃজনশীলতা বিকাশের পথ খুঁজে না পেলে। সমাজের প্রতিটি শিশু-কিশোরের সৃজনশীলতা বিকাশের পরিবেশ সৃষ্টি করা না গেলে, অসংখ্য নেতিবাচক খবর প্রতিদিন ভেসে আসবে। শিশু-কিশোরদের সমাজের অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে নিয়ে আসতে হবে আসন্ন ভয়াবহ বিপর্যয় এড়াতে।

লেখক: প্রবাসী সাংবাদিক ও ব্লগার


সর্বশেষ

আরও খবর

রাইফেল রোটি আওরাত

রাইফেল রোটি আওরাত


মৃত্যুমুখী নগর বাঁচাতে জীবন দিলেন যিনি

মৃত্যুমুখী নগর বাঁচাতে জীবন দিলেন যিনি


প্রশ্নফাঁসঃ নৈতিকতার জনহত্যা

প্রশ্নফাঁসঃ নৈতিকতার জনহত্যা


পণ্যমূল্যের উলম্ফন: বিপর্যস্ত জনগণ

পণ্যমূল্যের উলম্ফন: বিপর্যস্ত জনগণ


স্বপ্নভঙ্গের রঙ কী আলাদা হয়! সন্ত্রাসের রং-ই কী আলাদা হয়!

স্বপ্নভঙ্গের রঙ কী আলাদা হয়! সন্ত্রাসের রং-ই কী আলাদা হয়!


‘খেলা- মেলা’ বনাম ‘জঙ্গি-মাদক’

‘খেলা- মেলা’ বনাম ‘জঙ্গি-মাদক’


সহনশীল হওয়ার জন্য সহনশীলতার চর্চা জরুরি

সহনশীল হওয়ার জন্য সহনশীলতার চর্চা জরুরি


কিশোর সাগরের নির্যাতনকারীদের রুখবে কে?

কিশোর সাগরের নির্যাতনকারীদের রুখবে কে?


শারদীয় দুর্গোৎসব: ধর্ম যার যার, উৎসব সবার

শারদীয় দুর্গোৎসব: ধর্ম যার যার, উৎসব সবার


এ সংকট থেকে বের হয়ে আসতেই হবে

এ সংকট থেকে বের হয়ে আসতেই হবে