Wednesday, March 8th, 2017
সমাজের বিপ্লবী রূপান্তর নারী মুক্তির একমাত্র পথ
March 8th, 2017 at 2:37 pm
সমাজের বিপ্লবী রূপান্তর নারী মুক্তির একমাত্র পথ

লিনা ফেরেদৌস: কিছুদিন আগেও যে মেয়েটি ধানের খেতে আল বেয়ে ফ্রক পড়ে নাচতে নাচতে স্কুলে যেত, সেই মেয়েটি এখন তার কৈশোর না পেরুতেই কোন না কোন বাড়ীর বউ হয়ে জানালার ফাঁক দিয়ে লুকিয়ে আকাশ দেখে। নির্মম হলেও এ কথা সত্য যে আমাদের দেশের ৬৬ শতাংশ মেয়েকে কৈশোর না পেরুতেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। প্রাকৃতিক ভাবে শরীর প্রস্তুত হওয়ার আগেই একটা তেরো-চৌদ্দ বছর বয়সের মেয়ে বিয়ের পীড়িতে বসতে হয় এবং তার তার কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে আর্থিক অসচ্ছলতা এবং নিরাপত্তা সংকট।

আমরা জানি কিশোর বয়স হল বয়ঃসন্ধির সময়, এ সময়ে মানুষের শরীরিক এবং মানসিক বিভিন্ন রকম পরিবর্তন হয়। যে মেয়েটি নতুন জীবনে প্রবেশ করতে যাচ্ছে তার এই নতুন পরিবেশ ও নতুন দায়িত্বর সাথে মানিয়ে নেওয়ার মত শারীরিক এবং মানসিক প্রস্তুতি আছে কিনা সেই দিকটা না ভেবেই অভিভাবকরা বিয়ে দিয়ে দেন।

আমি এও দেখেছি যে সব অভিভাবকরা মেয়েদের পড়াশোনার ব্যাপারে বেশ আগ্রহী তাদেরকে সমাজের অনেকের কাছেই শুনতে হয় যে ‘এত পড়িয়ে হবে কি! সেই তো পরের ঘরে পাঠাতে হবে।’

কলেজে পড়ার সময়ও দেখেছি অনেক বাবা মা কলেজ পার হবার আগেই তাদের মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেবার জন্য অস্থির থাকে। সেই মেয়েটির হয়ত তার জীবন নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছিল, হয়ত তার ইচ্ছে ছিল ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিম্বা অন্য কোন পেশায় নিজের জীবন গড়ার। কিন্তু এদেশের বাবা মায়েদের কাছে মেয়েদের পড়াশোনা নিয়ে সেরকম কোন স্বপ্ন নেই।

আমি আমার সমসাময়িক অনেক মেয়েকে দেখেছি যে গ্রাজুয়েশনের পরে অভিভাবক মেয়েদের পড়া বন্ধ করে দিয়েছে। তার একটা প্রধান কারণ হল অভিভাবকরা মনে করেন যে, একটা মেয়ে মাস্টার্স পাশ করা মানে তার অনেক বয়েস, বেশী বয়সের মেয়ে বিয়ের পাত্রী হিসাবে এখনো এই সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। বেশিরভাগ মেয়ের বাবা মা মেয়েকে একটা ভাল বিয়ে হবে শুধু স্বপ্নই দেখে। তারা মনে করে বিয়ে দিতে পারলেই দায়িত্ব শেষ, মেয়ে নাকি পরের আমানত, তাকে যত তাড়াতাড়ি বিয়ে দেওয়া যায় ততই মঙ্গল।

খুব লজ্জা ও পরিতাপের বিষয় যে, আমরা আনুষ্ঠানিক ভাবে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করি ঠিকই কিন্তু মেয়েদের স্বাধীনতা বলতে বুঝি কোন রকম লেখাপড়া শিখিয়ে বিয়ে দিয়ে দেওয়া যেন মেয়ে সুন্দর করে সংসার আর সন্তান পালন করতে পারে এবং সেটাই আমাদের মেয়েদের সবচেয়ে সম্মানিত সামাজিক অবস্থান। সামাজিক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ বাঁচিয়ে রাখার জন্য নিজের কন্যা সন্তানকে এক রকম অন্ধকারে ছুঁড়ে ফেলতেও দ্বিধা বোধ করি না আমরা। আসলে সব অভিভাবকই হয়ত মনে করেন যে মেয়েরা হলো একেকটি আর্থিক বোঝা, তা না হলে এ ধরণের আচরণ মেয়েদের সাথে কেন করা হবে!

আসলে নারী ছিল অন্তঃপুরবাসিনী। প্রাগৈতিহাসিক যুগের প্রাচীনতম প্রথা এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী শিক্ষা ছিল মহাপাপ। ইতিহাস বলে সামাজিক, আর্থিক, সাংস্কৃতিক নানা কারণে এদেশে নারীরা যুগে যুগে বঞ্চিত হয়ে এসেছে এবং লেখাপড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে সবচেয়ে বেশী। শিক্ষা যেহেতু নারীকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে এবং শিক্ষার আলোতে আর্থ-সামাজিকভাবে নারী স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে সেই জন্য পরিকল্পিত ভাবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা সামাজিক এবং ধর্মীয় আদর্শ ও নৈতিকতা নারীদের উপর চাপিয়ে তাদের দমিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে যুগে যুগে। পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কারণে তখনকার কন্যা শিশুদের খেলার বয়স না পেরোতেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য করা হতো। এত অল্প বয়সে সাংসারিক এবং সামাজিক চাপ,ধর্মীয় মূল্যবোধ, কুসংস্কার এবং অনুশাসন আরও বেশী নারীকে অন্তঃপুরের অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছিল। পরিণত বয়সের আগে সন্তান ধারণ, অযত্ন, অবহেলায়, অতিরিক্ত পরিশ্রম, সামাজিক-শারীরিক- মানসিক নির্যাতন ও নিপীড়নের কারণে খুব সহজে নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে তারুণ্য পেরোনোর আগেই জীবন ফুরিয়ে যেত তাদের। উফ ! কতটা অমানবিক ছিল তাদের সেই জীবন।

এখনো এদেশের বেশীরভাগ মেয়ের অভিভাবক মেয়েকে পরের ঘরে পাঠিয়ে মনে করে যে তাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে গেছে। শ্বশুর বাড়ীতে যদি ঐ মেয়েকে মানসিক ও শারীরিকভাবে নিপীড়িত ও নির্যাতনের শিকার হতেও হয়, তবুও তার বাবা মায়ের কাছ থেকে বেশীরভাগ মেয়ে কোন রকম সামাজিক বা মানসিক সাহায্য পায় না। স্বামী যদি মেয়েকে মানসিক ও শারীরিকভাবে নিপীড়িত ও নির্যাতন করে বেশিরভাগ অভিভাবক মেয়েকে মানিয়ে নিতে উপদেশ দেন এবং যেহেতু সামাজিক ভাবে কোন মেয়ের বাবা মা এই অত্যাচারের প্রতিবাদ করে না সেহেতু স্বামীর নির্যাতন মেয়েটির উপর দিন দিন বেড়ে যেতেই থাকে। মেয়েটি হয় সারা জীবন ধুকে ধুকে বাঁচে নতুবা সেই নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

অথচ মেয়েটির অভিভাবকের একটু সচেতনতা মেয়েটিকে দিতে পারত অন্য জীবন। অভিভাবকেরা মেয়েটিকে একটু সাহায্য করলেই মেয়েটি সহজেই তার সামাজিক অবস্থানের পরিবর্তন আনতে পারত, নিজেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে নিজের পছন্দের পেশায় কাজ করে, পছন্দ অনুযায়ী জীবনসঙ্গী বেছে নিয়ে সুখে সংসার করতে পারত। জীবনের চলার বাঁকে যে কোন চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করার মত এবং পরিবার ও সমাজের উন্নয়ন সাধন করার মত ক্ষমতা মেয়েদের আছে, শুধু প্রয়োজন মেয়ে সন্তানের প্রতি অভিভাবকের দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানসিকতার পরিবর্তন।

এদেশে মেয়েদের সামাজিক অবস্থানের খুব বেশী পরিবর্তন হয়নি। হাজার হাজার বছরের এই সামাজিক সংস্কারের শেকড় এতটাই গভীরে প্রবেশ করেছে যে তার থেকে মুক্তি লাভ খুব সহজ নয়। তাই নারীদের প্রতি বৈষম্য মূলক আচরণের বিরুদ্ধে নারীদেরকেই সোচ্চার হতে হবে এবং সচেতন হতে হবে। নারী অধিকার বলতে আসলে কি বোঝানো হয়েছে সেটা নারীদের কাছেই আগে খুব স্পষ্ট হতে হবে।

নারীদের প্রকৃত উন্নয়নে নারীদের সমস্যা, চাহিদাগুলোকে আলাদা আলাদা করে চিহ্নিত করতে হবে, আমি মনে করি নারীর অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ভূমিকা হল নারীর অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন আনা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার বস্তুগত অবস্থার পরিবর্তন ও আর্থ সামাজিক পরিবর্তন ছাড়া এই যাঁতাকল থেকে নারীদের মুক্তি নাই।

রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ভাবে সমানাধিকারের জন্য সাহসের সাথে লড়াই করতে হবে এবং আত্মপ্রত্যয়ের সাথে বাস্তবায়ন করতে হবে। শুধুমাত্র অর্থনীতিক স্বাধীনতাই নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে পারবেনা, সামগ্রিকভাবে সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর জন্য এবং মানসিকতার পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন রকম সচেতনতামুলক কার্যক্রমে সমাজের সকল স্তরের নারীদের এগিয়ে আসতে হবে। অবশ্য যে দেশের রাষ্ট্র-সমাজ-পরিবার বাল্য বিবাহ প্রথা সমর্থন করে সেই দেশের নারীদের সমঅধিকার পাওয়া এত সহজ নয়। সমাজের আমূল বিপ্লবী রূপান্তর নারী মুক্তির একমাত্র পথ এবং সেই কঠিন পথ পারি দেবার মানসিক দৃঢ়তা মেয়েদের বাড়াতে হবে।

লেখক: ম্যানেজার পিআর এন্ড সিআর, একটি বহুজাতিক কোম্পানি, প্রকাশ: তুহিন


সর্বশেষ

আরও খবর

রাইফেল রোটি আওরাত

রাইফেল রোটি আওরাত


মৃত্যুমুখী নগর বাঁচাতে জীবন দিলেন যিনি

মৃত্যুমুখী নগর বাঁচাতে জীবন দিলেন যিনি


পাঠ প্রতিক্রিয়া: ফরিদপুরে বিতর্ক চর্চা

পাঠ প্রতিক্রিয়া: ফরিদপুরে বিতর্ক চর্চা


প্রশ্নফাঁসঃ নৈতিকতার জনহত্যা

প্রশ্নফাঁসঃ নৈতিকতার জনহত্যা


পণ্যমূল্যের উলম্ফন: বিপর্যস্ত জনগণ

পণ্যমূল্যের উলম্ফন: বিপর্যস্ত জনগণ


স্বপ্নভঙ্গের রঙ কী আলাদা হয়! সন্ত্রাসের রং-ই কী আলাদা হয়!

স্বপ্নভঙ্গের রঙ কী আলাদা হয়! সন্ত্রাসের রং-ই কী আলাদা হয়!


‘খেলা- মেলা’ বনাম ‘জঙ্গি-মাদক’

‘খেলা- মেলা’ বনাম ‘জঙ্গি-মাদক’


সহনশীল হওয়ার জন্য সহনশীলতার চর্চা জরুরি

সহনশীল হওয়ার জন্য সহনশীলতার চর্চা জরুরি


কিশোর সাগরের নির্যাতনকারীদের রুখবে কে?

কিশোর সাগরের নির্যাতনকারীদের রুখবে কে?


শারদীয় দুর্গোৎসব: ধর্ম যার যার, উৎসব সবার

শারদীয় দুর্গোৎসব: ধর্ম যার যার, উৎসব সবার