Tuesday, December 20th, 2016
হাত বাড়ালেই বন্ধু
December 20th, 2016 at 12:19 pm
হাত বাড়ালেই বন্ধু

মাসকাওয়াথ আহসান: ফেসবুকে মাঝে মাঝে কিছু অর্ধশিক্ষিত বুবু বা ভাইয়াকে সগর্বে ঘোষণা দিতে দেখা যায়, “অমুককে আনফ্রেন্ড করুন; আইদার ইউ আর উইদ মি অর এগেইন্সট মি।” বিস্ময়বোধ করি এ নিখাদ গ্রাম্যতা দেখে; কারণ গ্রামেও কখনো এতোটা গ্রাম্যতা দেখিনি।

কে কার সঙ্গে মিশবে না মিশবে তা নিশ্চিতভাবেই ব্যক্তির ইচ্ছার স্বাধীনতা। মানুষ তো শেয়াল নয় যে গ্যাং পাকিয়ে ঘুরবে। আর কথিত আধা খ্যাঁচড়া গ্রাম্য-মেট্রোপলিটান বুবু বা ভাইয়ারা এমন কোন আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী নয় যে তাদের জাপটে ধরে রাখতে হবে তাদের অপছন্দনীয়দের জলাঞ্জলি দিয়ে।

শৈশবে আমার বাবা-মা’র সহকর্মীদের মাঝে কারো সঙ্গে তাদের সম্পর্কে সামান্য অবনতি ঘটলেও আমাকে বলে দেয়া হতো, এসব যেন তাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ককে প্রভাবিত না করে। ফলে সবার সঙ্গে আমার সম্পর্কের উষ্ণতা জারি থাকতো। সুতরাং আজ কোত্থেকে উড়ে আসা ভাটিয়ালী ফেসবুক বুবু ও ভাইজানরা যেন অমুককে আনফ্রেন্ড করুন বলে আবদার জুড়ে না দেন। সাংস্কৃতিক যে আলোকায়ন শৈশবেই ঘটে গেছে, আজ মাঝবয়েসে এসে তাতে অন্ধকার লেপে দেয়া সম্ভব নয়।

এখন যখন পেছন দিকে তাকিয়ে দেখি, বুঝতে পারি যাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিলো; প্রতিটি সম্পর্কই অক্ষুণ্ণ আছে। তার মানে একবার বন্ধু হলে সারাজীবন বন্ধু।

স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে কেউ কখনো এসে আবদার জুড়ে দেয়নি—অমুকের সঙ্গে বন্ধুত্ব করলে আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব ছাড়তে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা বিভাগের নানা চিন্তার বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা করেছি। কীভাবে কার সঙ্গে মিশতে হবে এটা আমিও কাউকে শেখাতে যাইনি; কেউ আমাকেও শেখাতে আসেনি।

ফলে আমাদের আয়োজিত বিতর্ক ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক আয়োজনে সবাই অংশ নিতো; এমনকী দর্শকের সারিতে সব ছাত্র সংগঠনের নেতাদের আগ্রহের সঙ্গে বসে থাকতে দেখেছি। এমনকী গোলাগুলিরত দুটি ছাত্র-সংগঠন আমাকে হঠাৎ মাঝখান দিয়ে হেঁটে যেতে দেখে কিছুক্ষণ গুলিবিনিময় বিরতি দিয়ে আমাকে নিরাপদে পার হয়ে যাবার সুযোগ দিতো।

কারণ তারা স্পষ্টভাবেই জানতো আমি উদারপন্থার মানুষ; সংকীর্ণ কোন স্বার্থের কচুরিপানা ভর্তি পুকুরে সাঁতার কাটার প্রয়োজন নেই। কারো কাছ থেকে কোন রাজনৈতিক আদর্শে দীক্ষা নেবার প্রয়োজন আমার নেই। আমার রাজনীতি হচ্ছে অহিংস-পরমতসহিষ্ণুতা এবং অসাম্প্রদায়িক চিন্তার আলোকায়ন। সাংস্কৃতিক সাযুজ্যই বন্ধুতার নিয়ামক। সে সংস্কৃতি কারো বাসার শোকেসে বা ড্রয়ারে থাকে না—তা থাকে মুক্তভাবনার উদার আকাশে।

ফেসবুক বুবু ও ভাইয়ারা কোন শেয়ালের গর্তে পড়ালেখা করেছেন জানি না; আমি তাদের নিরন্তর গ্রাম্যতার পাঁচালির সঙ্গে একদম মানানসই নই। তাদের কাছ থেকে সত্যিই আমার শেখার কিছু নেই; এতো বদ্ধচিন্তার খারাপ ছাত্র-ছাত্রীর কাছ থেকে কি কিছু শেখার থাকে নাকি! ঢাকার কিছু সাংস্কৃতিক বৃত্তে হালে ঘোরাফেরা করে যেসব বুবু-ভাইয়ার লেট ইয়ূথের আগমন ঘটেছে, তাদের সাংস্কৃতিক মোড়লিপনা করার জন্য খুঁজে বের করতে হবে তাদের মতোই তারুণ্যে শেয়ালের গর্তে বসবাসকারী চিন্তারজগতে পিছিয়ে থাকা মানুষদের।

আমি বিতর্কের জগতের মানুষ। আমি আলোচনা এবং সংলাপের সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত। ঝগড়া অপসংস্কৃতির সঙ্গে কখনো দেখা’ই হয়নি আমার। কোন বন্ধুতায় সাময়িক বিরতি ঘটলেও তিক্ততার কোন স্মৃতি নেই আমার মনোজগতে। বিতর্কের এই যৌক্তিক সংস্কৃতি ফেসবুক বুবু ও ভাইয়াদের বোঝানো কঠিন। কারণ তাদের চিন্তার পাতকূয়াটি এতো অনগ্রসর যে, তাদের পক্ষে সমসাময়িক মানুষ হয়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব। কাজেই প্রত্যাশা রাখি “অমুককে আনফ্রেন্ড করুন” জাতীয় পিছিয়ে থাকা মনোভাব নিয়ে ভবিষ্যতে কথিত বুবু বা ভাইয়ারা বিরক্ত করবেন না। বন্ধুত্ব সম্ভব না হলেও মঙ্গল প্রত্যাশা রইলো ফেসবুক বুবু ও ভাইয়াদের জন্য।

লেখক: প্রবাসী সাংবাদিক ও ব্লগার


সর্বশেষ

আরও খবর

হয়ত শাকিব অপুও থাকবে না

হয়ত শাকিব অপুও থাকবে না


পাঠ প্রতিক্রিয়া: ফরিদপুরে বিতর্ক চর্চা

পাঠ প্রতিক্রিয়া: ফরিদপুরে বিতর্ক চর্চা


একটি আত্মহত্যা ও কিছু প্রশ্ন

একটি আত্মহত্যা ও কিছু প্রশ্ন


অপরাজিতা মেয়ের পরাজয়ের গল্প

অপরাজিতা মেয়ের পরাজয়ের গল্প


বাঙালির দ্বি-মুখী লড়াই: হিন্দুত্বের সাথে এবং মুসলমানিত্বের সাথে

বাঙালির দ্বি-মুখী লড়াই: হিন্দুত্বের সাথে এবং মুসলমানিত্বের সাথে


দ্রোহের গুঞ্জন: সংস্কৃতি ও রাজনীতি

দ্রোহের গুঞ্জন: সংস্কৃতি ও রাজনীতি


কেউ কষ্টের কথাগুলি বলতে চায় না

কেউ কষ্টের কথাগুলি বলতে চায় না


আমগো যা কওয়ার ছিলো; তাই কইতাছে বাংলাদেশ: সাঈদী

আমগো যা কওয়ার ছিলো; তাই কইতাছে বাংলাদেশ: সাঈদী


শ্রমিক আর সংবাদকর্মী: সবাই আজ শোষিত

শ্রমিক আর সংবাদকর্মী: সবাই আজ শোষিত


বাজিলো কাহারো বীণা

বাজিলো কাহারো বীণা