Thursday, December 14th, 2017
৩৬৪ দিন বুদ্ধিবৃত্তির প্রতি জাতির আগ্রহ হারিয়ে যায়
December 14th, 2017 at 6:57 pm
৩৬৪ দিন বুদ্ধিবৃত্তির প্রতি জাতির আগ্রহ হারিয়ে যায়

মাসকাওয়াথ আহসান: ১৪ ডিসেম্বর এলে “শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস” পালনের তোড়জোড় চোখে পড়ে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় যে শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিল্পী-সাহিত্যিকদের পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দালালেরা নির্মমভাবে হত্যা করেছিলো; সেই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি জাতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে। সেই হারিয়ে যাওয়া হিরণ্ময় মানুষদের জাতির সূর্য সন্তান বলে বর্ণনা করে ক্ষমতা-কাঠামো, মিডিয়া ও সাধারণ মানুষ।

১৪ ডিসেম্বর এলেই জাতির জন্য গর্ব হয়; এ জাতি তার বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদকে আলাদা করে শ্রদ্ধা জানাতে জানে; সুতরাং জাতির সামষ্টিক বুদ্ধিবৃত্তিক উত্থানের আকাংক্ষা স্পষ্ট।

কিন্তু ১৫ ডিসেম্বর থেকেই আবার ৩৬৪ দিনের জন্য বুদ্ধিবৃত্তির প্রতি জাতির আগ্রহ হারিয়ে যায়; প্রায় উবেই যায়। শিক্ষা ব্যবস্থাটিকে অবহেলায়, অনাদরে, স্বেচ্ছাচারিতায় ক্রমে ক্রমে জীর্ণ করে দেয়া হয়। পাঠ্যপুস্তকে কট্টর ধর্মভিত্তিক দলগুলোর আবদারে ছুরি-কাঁচি চলে, আর সেইসঙ্গে বাক্য-বানান ভুলের মচ্ছব চলে পাঠ্যপুস্তকে। পরীক্ষার সময় চলে প্রশ্নফাঁসের তাণ্ডব। আর যে শিক্ষকেরা শিশুদের পাঠদান করান, তাদের সবচেয়ে কম বেতন-ভাতা দিয়ে কীভাবে কাজটি করিয়ে নেয়া যায়; তার নির্মম অনুশীলন চলে। এর প্রতিবাদ করলে, রাজপথে শিক্ষকদের ওপর লাঠিচার্জ করে স্বাধীন বাংলাদেশের আইন-শৃংখলা রক্ষা বাহিনী। আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক ক্যাডারদের দৌরাত্মে শিক্ষকরা নিজভূমে পরবাসীর মতো করে বাঁচেন। এইভাবে শিক্ষকরা ক্রমে ক্রমে চলে গেছেন সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক অবস্থানে। বিশ্বের আর কোনো দেশে শিক্ষক সমাজ এতো কম মর্যাদা সম্পন্ন নন। সাম্প্রতিক সময়ে বেতনের স্কেলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ওপরে মর্যাদা দেয়া হয়েছে আমলাদের। এইখানে বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটি খুব স্পষ্ট করেছে শিক্ষক সম্পর্কে তার মনোভাব। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে ঠিক একাত্তরের মতোই হারিয়ে যেতে দেখেছি।

সাংবাদিকদের পরিস্থিতিটিও একই। সবচেয়ে অল্প সম্মানীতে কীভাবে একজন সাংবাদিককে দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়া যায়; তার কসরত চালিয়ে যায় মিডিয়া মালিকেরা। সরকার সাংবাদিকদের জন্য পৃথক ওয়েজবোর্ড গঠনের কথা বলে; কিন্তু তা বাস্তবায়নের প্রশ্নটি অধরা রয়ে যায়। নানা ভয় ভীতির মাঝে সাংবাদিকদের কাজ করতে হয়। রাজনৈতিক মাস্তানদের পছন্দের বাইরে খবর প্রকাশ সাংবাদিকদের প্রাণহানির কারণ হয়েছে বহুবার। সেসব সাংবাদিক হত্যার ন্যায়বিচারও পায়না স্বজন হারানো পরিবারগুলো। আবার ঠিক একাত্তরের মতো সাংবাদিককে তুলে নিয়ে যাওয়ার মতো খুনে বাহিনীও চোখে পড়ে।

যথেষ্ট চিকিৎসা সরঞ্জাম ছাড়াই বিপুল জনসংখ্যাকে চিকিৎসা সেবা দিতে ডাক্তারদের পাঠিয়ে দেয়া হয় হাসপাতালে। সেইখানে ডাক্তারদের রোগীর আত্মীয় স্বজনের রুদ্ররোষের শিকার হতে হয়। আর আছে রাজনৈতিক ক্যাডারদের নিয়ত হানাহানির পর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়া, তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী আদালতে সাক্ষ্য দেয়া, নানারকম মেডিক্যাল সার্টিফিকেট, ডেথ সার্টিফিকেট লেখার চাপ; এসবের মধ্যে দিয়ে ডাক্তাররা এক মর্যাদাহীন জীবন যাপন করেন। এরমাঝে আমলারা আবদার করে তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা দিয়ে আসার জন্য। নির্দেশ অমান্য করলে ডাক্তারদের শাস্তির নির্দেশনাও আমলাদের দিতে দেখেছি সাম্প্রতিক সময়ে।

এইভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিটি ক্ষেত্রে কর্মরত মানুষ অন্যায়, অপমান, নির্যাতনের স্বীকার। বুদ্ধিজীবীদের এই প্রান্তিক অবস্থান দেখে সমাজ বুদ্ধিবৃত্তিকে আকর্ষণহীন এক জগত হিসেবে পরিত্যাগ করেছে। সমাজ সাফল্যের সংজ্ঞায় এনেছে পেশীবহুল রাজনীতি, ঋণখেলাপীবহুল ব্যবসা, আর ইউনিফর্ম-লাঠি-অস্ত্রবহুল পেশাগুলোকে। ফলে শহীদ বুদ্ধিজীবী পালন নেহাত একটি পোশাকী বিষয় হয়ে রয়ে গেছে। এর অর্থ স্পষ্ট হয়নি জনমানসে। আর কোনো সূর্য সন্তান লালনে জাতি প্রস্তুত নয়।

এরমাঝেও কিছু দালাল বুদ্ধিজীবীকে শাসকগোষ্ঠীর কোলে বসে নাচানাচি করতে দেখা যায়। এরা একাত্তরের দালাল বুদ্ধিজীবীদের মতো যারা স্বাধীনচেতা, আলোর মানুষ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা করে পাকিস্তানের খুনে বাহিনীর হাতে দিয়েছিলো। সেই তালিকা এখনো তৈরি হয়; বর্তমানের দালাল বুদ্ধিজীবীরা বুদ্ধিবৃত্তির নানাক্ষেত্রের স্বাধীনচেতা আলোর মানুষদের তালিকা দিয়ে আসে ক্ষমতাসীনদের হাতে। ক্ষমতাসীনেরা তাদের সুরে সুর মিলিয়ে কথা বলতে না পারলেই বুদ্ধিজীবীকে উইচহান্টিং-এর টার্গেট করে। দলের বর্বর ক্যাডারদের লেলিয়ে দেয় তাদের সাইজ করতে। স্বচ্ছ-স্পষ্ট চিন্তার মানুষদের কথায় কথায় “সুশীল” বলে নিরুতসাহিত করে তাদের দালাল “কুশীল” হবার পথে দাওয়াত দেয় উগ্রজাতীয়তাবাদের ঠিকাদার ও উগ্রধর্ম ব্যবসায়ীরা। এরা সেই একাত্তরের রাজাকারদের মতোই এখনো ক্ষমতা কাঠামোর দালালী অব্যাহত রেখেছে।

আজ জাতীয় জীবনে যে বিশৃংখলা, সুসংস্কৃতিহীনতা ও অসভ্যতা দৃশ্যমান; এর পেছনের প্রধান কারণটিই হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে শাসকগোষ্ঠীর চিন্তার খর্ব গজফিতা দিয়ে বনসাই করে রাখা; বা মিডিওকার করে রাখা। আজ ধর্মের যে বাড়াবাড়ি দৃশ্যমান, এর পেছনে সাংস্কৃতিক দৈন্যই কাজ করে। কারণ সংস্কৃতি চর্চার মুক্ত পরিবেশ অনুপস্থিত। আর বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রের আলোর মানুষদের এমনভাবে কোণঠাসা করে ফেলা হয়েছে; তাদের মাঝ থেকে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব বিকশিত হবার সম্ভাবনাগুলোকে প্রতিদিনই হত্যা করা হয়।

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের বাণীতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, ক্ষমতাসীন ও প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা যেসব বাক্য-বিশেষণ ব্যবহার করেন; তারা হয় সেগুলোর অর্থ বোঝেন না বা দুর্বোধ্য আরবী আয়াত-সংস্কৃত শ্লোক মুখস্থ উচ্চারণের মতোই পড়েন। ১৯৭১-এর শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সূর্যসন্তান বলে বন্দনা করে ২০১৭-র বুদ্ধিজীবীদের চিন্তার সূর্যটিকে খাঁচায় পুরে শায়েস্তা করার যে বৈপরীত্য চোখে পড়ে; তাতে জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের স্বপ্নদায়ী ১৪ ডিসেম্বরকে যাপিত জীবনে খুব প্রাসঙ্গিক মনে হয় না। বরং মনে হয় এ যেন এক চলমান ট্র্যাজেডি; এই জনপদে আলোর মানুষের ক্রমশঃ প্রান্তিক হয়ে পড়া, নিষ্প্রভ হয়ে যাওয়া, জীবন্মৃত হয়ে বেঁচে থাকা কিংবা একেবারেই হারিয়ে যাওয়াই বুঝি নিয়তি।

লেখক: সাংবাদিক ও ব্লগার।


সর্বশেষ

আরও খবর

কোটা সংস্কার আন্দোলনে কেউ হারেনি; কেউ জিতেনি

কোটা সংস্কার আন্দোলনে কেউ হারেনি; কেউ জিতেনি


কোটার ভ্রমর ও বঙ্গপাঞ্জাবির দিনগুলি

কোটার ভ্রমর ও বঙ্গপাঞ্জাবির দিনগুলি


চিরচেনা বৈশাখের নববর্ষ

চিরচেনা বৈশাখের নববর্ষ


মাদ্রাসায় পোড়ালাশ…!!

মাদ্রাসায় পোড়ালাশ…!!


আফঘানিস্তান: দক্ষিণ এশিয় দুর্নীতি-রোগের এক্সরে রিপোর্ট

আফঘানিস্তান: দক্ষিণ এশিয় দুর্নীতি-রোগের এক্সরে রিপোর্ট


ঈদুল খালেদা, স্টকহোম সিনড্রোম ও মজনু জনতা

ঈদুল খালেদা, স্টকহোম সিনড্রোম ও মজনু জনতা


তথ্য অধিকারকে নেকাব দিয়ে ঢেকে দেয়া

তথ্য অধিকারকে নেকাব দিয়ে ঢেকে দেয়া


“স্যার” সম্বোধনের মনস্তত্বে আদিম “প্রভু” দৃশ্যমান

“স্যার” সম্বোধনের মনস্তত্বে আদিম “প্রভু” দৃশ্যমান


সরকার নয় জনগণকেই ক্ষমতাসীন দেখতে চাই

সরকার নয় জনগণকেই ক্ষমতাসীন দেখতে চাই


জীবন দর্শনের আনন্দযজ্ঞে নিমন্ত্রণ

জীবন দর্শনের আনন্দযজ্ঞে নিমন্ত্রণ