Saturday, August 13th, 2022
অত আগুন, এত মৃত্যু, দায় কার?
June 5th, 2022 at 11:07 pm
অত আগুন, এত মৃত্যু, দায় কার?

শরীফ খিয়াম, ঢাকা: বাংলাদেশে অগ্নিকাণ্ড প্রসূত ট্রাজেডির তালিকা ফের বড় হলো। ২০১০ সালের নিমতলী, ২০১৩ সালের তাজরীন, ২০১৯ সালের চুড়িহাট্টা বা ২০২১ সালের সেজান সুজ কারখানার সাথে যুক্ত হলো সীতাকুণ্ড ট্রাজেডি। যারই জেরে শিরোনামে উল্লেখিত প্রশ্নটি নানা ভাব ও ভাষায় আলোচিত হচ্ছে দেশজুড়ে।   

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের কেশবপুরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন বিএম কনটেইনার ডিপোর অগ্নিকাণ্ডে এখন (রোববার রাত ১০টা) পর্যন্ত নিহত ৪৯ জনের মধ্যে নয় জন ফায়ার সার্ভিসকর্মী।  আরো অন্তত তিন কর্মী এখনো নিখোঁজ  বলে সন্ধ্যায় গণমাধ্যমকে ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তর ।

“আমার জানা মতে, এর আগে কখনো একটি ঘটনায় এত অগ্নিনির্বাপক কর্মীর মৃত্যু হয়নি,” ঢাকার ইংরেজী দৈনিক ডেইলি স্টারকে বলেছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন।

ওদিকে- উদ্ধার হওয়ার মরদেহগুলোর মধ্যেও মাত্র ১৩ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে উল্লেখ করে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মমিনুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, বাকি ৩৬ লাশের পরিচয় নিশ্চিত হতে সোমবোর ডিএনএ সংগ্রহ করা হবে।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বিএম কনটেইনার ডিপোতে শনিবার রাত নয়টার দিকে এই ডিপোতে আগুন লাগে। পরে রাত ১১টার দিকে বিকট শব্দে কনটেইনার বিস্ফোরণের পর আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পরে এবং একের পর এক বিস্ফোরণ হতে থাকে।

বিস্ফোরক পরিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়ার কথা উল্লেখ করে ইতিমধ্যেই ডিপোর মালিক, স্মার্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চট্টগ্রাম জেলা দক্ষিণ আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ মুজিবুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, সেখানে বিপুল পরিমাণ দাহ্য রাসায়নিক ‘হাইড্রোজেন পারক্সাইড’ মজুত ছিল।

তবে চট্টগ্রাম বিস্ফোরক পরিদপ্তরের পরিদর্শক তোফাজ্জল হোসেনের ভাষ্য, তারা আমাদের কাছ থেকে কোনো লাইসেন্স বা অনুমোদন নেয়নি।

গত বছরের এপ্রিলে ঢাকার আরমানিটোলায় কেমিক্যাল গোডাউনে আগুন লেগে চারজন মারা যাওয়ার তৎকালীন প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ এই প্রতিবেদককে বলেছিলেন, “পুরানো ঢাকায় বিস্ফোরক পরিদপ্তর অনুমোদিত রাসায়নিক দাহ্য পদার্থের কোনো গুদাম বা মজুদ নেই। তবুও প্রতিবারই অগ্নিকাণ্ড হলে আমাদের যেতে হয়। জবাবদিহিতা করতে হয়।”

“দেশে আমদানি হওয়া দাহ্য রাসায়নিকের মাত্র পাঁচ শতাংশ আমরা অনুমোদন দিয়ে থাকি,” যোগ করেন তিনি।   তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একেকটি রাসায়নিক আনার অনুমোদন একেকটি দপ্তর বা মন্ত্রণালয় দেয়। এগুলোর সবগুলোর খবর তাদের জানাও থাকে না।

সিটি কর্পোরেশন, স্থানীয় সরকার বিভাগ, ফায়ার সার্ভির এন্ড সিভিল ডিফেন্স, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ মোট ১০-১২টি সরকারি প্রতিষ্ঠান বাজারের ৯৫ শতাংশ দাহ্য রাসায়নিক আনার ছাড়পত্র দেয় উল্লেখ করে প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক আরো বলেছিলেন, “এমন অগ্নিকাণ্ড ঠেকাতে হলে সব ধরণের দাহ্য রাসায়নিক আমদানির অনুমোদনের বিষয়টি একটি দপ্তরের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।”  

২০১৯ সালের চুড়িহাট্টার ঘটনার পরে সরকার এ ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছে জানিয়ে তিনি জানিয়েছিলেন, “এ বিষয়ে ‘ওয়ানস্টপ সার্ভিস’ চালুর জন্য মন্ত্রীপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে একটা কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে দুটি বৈঠকও করেছে কমিটি।”

এ বিষয়ক একটি কর্মপরিকল্পনা জমা দেওয়ার কথা জানিয়ে প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক বলেছিলেন, “কারিগরি কমিটি এটি গ্রহণ করলে সর্বপ্রথম আমরা একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার তৈরী করবো। অর্থাৎ কে কী আমদানির অনুমোদন দিচ্ছে বা কোথায় কতটুকু মজুদ রাখা হচ্ছে, তার একটা হিসেব অনন্ত এক জায়গায় রাখবে সরকার।”

“দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় সব ধরণের  দাহ্য রাসায়নিক আমদানি, উৎপাদন, পরিবহন ও মজুদের ছাড়পত্র প্রদান একটি দপ্তরের আওতায় নিয়ে আসার বিষয়টি রয়েছে। এর জন্য নতুন আইন ও বিধিমালা প্রস্তুত করতে হবে,” উল্লেখ করেছিলেন তিনি।

একই বছরের জুলাইতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ভুলতার কর্ণগোপ এলাকার সেজান সুজ কারখানায় আগুনে ৫২ জনের মৃত্যুর পর আলাপ হচ্ছিল অগ্নিনিরাপত্তা বিষয়ে কারিগরি সহায়তা প্রদানকারী প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান রিঅ্যাক্ট্রন বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ তানভীর হোসেনের সাথে।

তিনি তখন বলেছিলেন, “আগুনের ধরণ দেখেই বোঝা গিয়েছে সেখানে বিভিন্ন দাহ্য রাষায়নিকের মজুদ ছিল। কিন্তু সে অনুযায়ী কোনো প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা ছিল না। যে কারণে পুরোপুরি নেভাতে এত বেগ পেতে হয়েছে।”  

বারবার বড় বড় অগ্নিকাণ্ড ও অজস্র প্রাণহানী হওয়ার পরও মালিকরা সচেতন হচ্ছেন না উল্লেখ করে তিনি বলেছিলেন, “অটোমেটেড ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম-তো অনেক পরের বিষয়, আমাদের দেশের কত শতাংশ কারখানায় ‘অটোমেটেড ফায়ার এ্যালার্মিং সিস্টেম’ রয়েছে?”

“তিন-চারশ কোটি টাকা খরচ করে তৈরী করা কারখানার মালিকরা তিন-চার কোটি টাকাও অগ্নি-নিরাপত্তার জন্য খরচ করতে চাননা,” যোগ করেছিলেন তানভীর।

এদিকে- তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ ইতিমধ্যে জানিয়েছেন, সীতাকুণ্ডের বিস্ফোরণের ঘটনাটি দুর্ঘটনা নাকি নাশকতা, তা খতিয়ে দেখা হবে।

তবে একাধিকবার অগ্নি নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. মো. মাকসুদ হেলালী এই প্রতিবেদকে বলেছেন, “দূর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, বাংলাদেশে ‘ইনটেনশনাল ফায়ার’ চিহ্নিত করার কোনো মতো প্রযুক্তি নেই।” বাংলাদেশে সংগঠিত অগ্নিকাণ্ডের সিংহভাগই ‘ইনটেনশনাল ফায়ার’ বলেও দাবি করেন ন্যাশনাল ফায়ার কোড প্রণয়নে সঙ্গে যুক্ত থাকা এই বিশেষজ্ঞ।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের এই অধ্যাপকের ভাষ্য, “অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ মুখস্থ বলে দেয় যে অগ্নিকাণ্ডটি বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে হয়েছে। কিন্তু বাস্তবততা হচ্ছে বৈদ্যুতিক আগুন চিহ্নিত করার প্রযুক্তিও তাদের হাতে নেই।”

উল্লেখ্য, নিমতলী ট্রাজেডিতে ১২৪, তাজরীন ট্রাজেডিতে ১১২ ও ২০১৯ সালের চুড়িহাট্টা ট্রাজেডিতে ৭১ জন নিহত হয়েছিলেন।


সর্বশেষ

আরও খবর

সংসদে ৬,৭৮,০৬৪ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব

সংসদে ৬,৭৮,০৬৪ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব


আ’লীগ নেতা বিএম ডিপোর একক মালিক নন

আ’লীগ নেতা বিএম ডিপোর একক মালিক নন


চীনের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চায় বাংলাদেশ

চীনের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চায় বাংলাদেশ


ভোজ্যতেল ও খাদ্য নিয়ে যা ভাবছে সরকার

ভোজ্যতেল ও খাদ্য নিয়ে যা ভাবছে সরকার


তৎপর মন্ত্রীগণ, সীতাকুণ্ডে থামেনি দহন

তৎপর মন্ত্রীগণ, সীতাকুণ্ডে থামেনি দহন


যে গল্প এক অদম্য যোদ্ধার

যে গল্প এক অদম্য যোদ্ধার


আফগান ও ভারতীয় অনুপ্রবেশ: মে মাসে আটক ১০

আফগান ও ভারতীয় অনুপ্রবেশ: মে মাসে আটক ১০


সীমান্ত কাঁটাতারে বিদ্যুৎ: আলোচনায় বিজিবি-বিজিপি

সীমান্ত কাঁটাতারে বিদ্যুৎ: আলোচনায় বিজিবি-বিজিপি


চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর সরকার

চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর সরকার


সাংবাদিকতা বিরোধী আইন হবে না: মন্ত্রী

সাংবাদিকতা বিরোধী আইন হবে না: মন্ত্রী