Wednesday, January 4th, 2017
আতঙ্কে ছিল নাসিরনগরের হিন্দুরা
January 4th, 2017 at 9:09 am
আতঙ্কে ছিল নাসিরনগরের হিন্দুরা

প্রীতম সাহা সুদীপ, ঢাকা: কালের গর্ভে হারিয়ে গেল আরো একটি বছর। অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, চড়াই-উৎরাই, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও আনন্দ-বেদনার সাক্ষী ছিল বিদায়ী বছর (২০১৬)। বছরটিতে বেশ আলোচনায় ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির ও ঘর-বাড়িতে হামলার ঘটনা।

ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন রসরাজ দাস, যিনি পেশায় একজন জেলে এবং হরিপুর মৎস্যজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক। ওই জেলের নামে খোলা একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ২৯ অক্টোবর শনিবার পবিত্র কাবা শরিফ নিয়ে একটি ব্যঙ্গচিত্র পোস্ট করা হয়। এ ঘটনায় উত্তেজনা সৃষ্টি হলে ওই দিন দুপুরেই রসরাজকে আটক করে নাসিরনগর থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে এলাকাবাসী।

পরদিন ৩০ অক্টোবর ইসলাম অবমাননার প্রতিবাদের নামে নাসির নগরে সমাবেশ ডাকে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত ও তৌহিদি জনতা নামে দুইটি সংগঠন। যেখানে বক্তব্য দেন উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মনিরুজ্জামান। সমাবেশ শেষে শত শত লোক দা, লাঠি-সোটা নিয়ে নাসিরনগরের ১৫টি মন্দির এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের দেড় শতাধিক ঘরবাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। হামলাকারীদের মধ্যে বেশিরভাগই যুবক ও তাদের পরনে প্যান্ট শার্ট ছিল।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হরিপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ফারুক মিয়ার উস্কানিতেই এ ঘটনার সূত্রপাত ঘটে। এছাড়া নাসির নগরের ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি মো. সুরুজ আলীও তার সমর্থকদের নিয়ে ওই দিন একটি প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দেন। তার সঙ্গের কিছু লোকের হাতে লাঠিসোটা ছিল।

ওই ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের গাফিলতি ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অভিযোগ, নাসিরনগরের ইউএনও মোয়াজ্জেম ও ওসি আবদুল কাদেরের উপস্থিতিতে একটি সমাবেশে ‘উসকানিমূলক’ বক্তব্যের পরই ওই হামলা চালানো হয়।

ঘটনার পর সহস্রাধিক লোককে আসামি করে মামলা হয়। দোষীদের গ্রেফতারে নাসির গর জুড়ে অভিযান চলে। অসংখ্য পুরুষকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গ্রেফতার আতঙ্কে পুরুষশূন্য হয়ে পড়ে নাসির নগর। গঠন করা হয় তিনটি তদন্ত কমিটি। মন্দিরসহ বাড়িঘরে হামলার পাঁচ দিনের মাথায় পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যেই শুক্রবার ভোরে উপজেলা সদরের পশ্চিমপাড়া এলাকায় সংখ্যালঘুদের বেশ কয়েকটি ঘরবাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা।

সে সময় নাসিরনগরেই উপস্থিত ছিলেন মৎস ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী ছায়েদুল হক। মন্ত্রী নিজ এলাকায় থাকাকালীন দ্বিতীয়বার সংখ্যালঘুদের উপর হামলা হওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। তখন নিউজনেক্সটবিডি ডটকমের প্রতিনিধির সঙ্গে কথা হয় ছায়েদুল হকের।

ফেসবুকে পবিত্র কাবা শরিফ নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র পোস্ট দেয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত রসরাজ দাসকে যে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে তা স্বীকার করে মন্ত্রী বলেন, “রসরাজের বিরুদ্ধে যে অনাকঙ্ক্ষিত ছবি পোস্ট করার অভিযোগ আনা হয়েছে, এটা তো সে করে নাই। সাইবার বিশেষজ্ঞরা প্রথমে ধারণা করেছিল এটা কাতার থেকে পোস্ট করা হয়েছিল। এখন শুনেছি এটা ঢাকা থেকে করা হয়েছে। এটা এখন বের করা হচ্ছে। ঘটনার পেছনে কারা আছে, সব বের হয়ে যাবে।”

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার জন্য পরিকল্পিতভাবে ফেসবুকে ওই ব্যঙ্গচিত্র পোস্ট করা হয়েছিলো এমন ইঙ্গিতও করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, “ব্যঙ্গচিত্র পোস্ট করার পর যে প্রতিবাদ সমাবেশ করা হয়েছিলো ওই সমাবেশে চৌদ্দটা ট্রাক এসেছে, যে ট্রাকগুলোতে করে মৌলবাদীরা এসে হামলা করেছে। এর ভাড়া দিয়েছে হরিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখি। তাহলে বুঝে নিন এখন এটি কে করেছে? কে লিংক আপ?”

ঘটনার পেছনে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর হাত রয়েছে বলেও ইঙ্গিত করেন ছায়েদুল হক। তিনি বলেন, “আঁখি চেয়ারম্যান কিন্তু কোনদিন আওয়ামী লীগ করে নাই। যেদিন সে ফর্ম কিনেছে, লিখেছে ওইদিন থেকে সে আওয়ামী লীগ। তাকে মনোনয়ন দিয়েছে মুকতাদির চৌধুরী আর মামুন সাহেব। এ ঘটনার পেছনে তাদেরও ইন্ধন রয়েছে।”

যদিও তখন ওই অভিযোগ অস্বীকার করেন মুকতাদির চৌধুরী এবং আঁখি চেয়ারম্যান। কিন্তু তাদের দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট ফুটে ওঠে যে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের অভ্যন্তরীন কোন্দলের মাসুলই দিতে হয়েছে নাসির নগরের সংখ্যালঘুদের।

অভিযুক্ত রসরাজের বাড়ি পরিদর্শন করে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, “রসরাজের বাড়ি পরিদর্শন করেই বোঝা গেছে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বানোয়াট। কারণ সে সামান্য পড়াশোনা করেছে। অথচ যে ছবির কথা বলা হচ্ছে তা ফটোশপ দিয়ে বানানো। রসরাজের মতো লোকের ফটোশপ সম্পর্কে ধারণা থাকার কথা নয়।”

শাহরিয়ার কবির বলেন, “নাসিরনগরে পরিকল্পিতভাবে সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা সৃষ্টি করা হয়েছে। এর আগে ২০১২ সালে যেমন রামুতে শিবিরের এক ছেলের মাধ্যমে উত্তম বড়ুয়ার ফেসবুকে ছবি ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল, ঠিক সেই ঘটনারই পুনরাবৃত্তি ঘটেছে নাসিরনগরে।”

২৮ নভেম্বর যে ছবিকে ঘিরে এতো ঘটনা, সেই ছবি তৈরির মূল হোতা জাহাঙ্গীর আলমকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তখন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, “হরিপুর ইউনিয়নের শঙ্কাদহ গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম ওই বিতর্কিত ছবিটি তৈরি করেন। হরিপুর বাজারে তার মালিকানাধীন ‘আল আমিন সাইবার ক্যাফে’তে ছবিটি তৈরি করা হয়। জাহাঙ্গীর সেই বিতর্কিত ছবি ফটোকপি করে বাজারে বিলিও করে। ঘটনার পর থেকেই সে পলাতক ছিল।”

গোয়েন্দারা আরো জানান, জাহাঙ্গীরের বাবা বেনু মিয়া কুয়েত প্রবাসী। সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জাহাঙ্গীর হরিপুর ইউপি চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান আঁখির কর্মী হিসেবে কাজ করেছে। তবে আগে সে স্থানীয় জামায়াতের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিল।

২৭ ডিসেম্বর হিন্দুপল্লীতে ভাঙচুর ও অগ্নি সংযোগের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম-সম্পাদক শেখ মো. আবদুল আহাদকে গ্রেফতার করে পুলিশ। নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু জাফর বলেন, ‘নাসিরনগরে সহিংসতার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আহাদকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।’

এদিকে ঘটনার দুই মাস পেরিয়ে গেলেও ইসলাম অবমাননার অভিযোগ থেকে মুক্তি পাননি রসরাজ। ৩ জানুয়ারি মঙ্গলবার দুপুরে তার জামিন শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে জেলা জজ ও দায়রা জজের বিচারক মো. ইসমাঈল হোসেন জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন। এসময় আগামী ১৬ জানুয়ারি পরবর্তী জামিন শুনানির দিন ধার্য করা হয়।

রসরাজের পক্ষে জামিন শুনানিতে অংশ নেন তার আইনজীবি অ্যাড. মো. নাসির মিয়া। তিনি সাংবাদিকদের জানান, আদালতে ফরেনসিক রিপোর্ট জমা দেয়া হয়েছে। শুনানি শেষে জেলা জজ ও দায়রা জজের বিচারক মো. ইসমাঈল হোসেন জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন। এসময় আগামী ১৬ জানুয়ারি পরবর্তী জামিন শুনানির দিন ধার্য করেন আদালত।

সম্পাদনা: প্রণব


সর্বশেষ

আরও খবর

বিমানের বহরে পঞ্চম বোয়িং

বিমানের বহরে পঞ্চম বোয়িং


অভিযুক্তদের বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য ২৪ ঘণ্টা সময় নিল শোভন-রাব্বানী

অভিযুক্তদের বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য ২৪ ঘণ্টা সময় নিল শোভন-রাব্বানী


‘সন্তানের জন্য যা যা করতে হয় প্রধানমন্ত্রী তাই আমার জন্য করেছেন’

‘সন্তানের জন্য যা যা করতে হয় প্রধানমন্ত্রী তাই আমার জন্য করেছেন’


বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় দেশে ফিরছেন ওবায়দুল কাদের

বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় দেশে ফিরছেন ওবায়দুল কাদের


কক্সবাজারে বন্দুকযুদ্ধে নিহত ৩

কক্সবাজারে বন্দুকযুদ্ধে নিহত ৩


ভূমধ্যসাগরে নিহত ২৭ বাংলাদেশির পরিচয় মিলেছে

ভূমধ্যসাগরে নিহত ২৭ বাংলাদেশির পরিচয় মিলেছে


ফুট ওভার ব্রীজ ব্যবহারে অনীহা

ফুট ওভার ব্রীজ ব্যবহারে অনীহা


দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী

দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী


আগামী তিনদিনের মধ্যে বৃষ্টির সম্ভাবনা

আগামী তিনদিনের মধ্যে বৃষ্টির সম্ভাবনা


বাগদাদে আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত ৮

বাগদাদে আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত ৮