Thursday, August 4th, 2016
‘আদম আলী গং, সিনিয়র সিটিজেন’
August 4th, 2016 at 7:53 pm
‘আদম আলী গং, সিনিয়র সিটিজেন’

“আইজ একটু আম কেনবা? মুখটা তিতা তিতা লাগে, মরার জ্বর তো আর ছাড়েনা।” আম কেনার প্রশ্নে জোর দেয় আলেয়া। পরেরটুকুন নিজের সাথেই বিড়বিড় করে।

“বৃষ্টির পানিতে ওসসা ঘরডা তলাইয়া যাওনের জোয়ার, তুই আছস আম লইয়া!”- ওসসা ঘর থেকে আদম আলীর জবাব আসে। দম নিয়ে সে আবার বলতে শুরু করে,

“কি পোলা যে প্যাডে ধরছিলি; বাপটা না হয় বাদ দিলাম; মানষে পারে মা’য়ের খবর না লইয়া?”

বিছানায় কাঁধ ফিরে শোয় আলেয়া, অস্ফুট স্বরে বলে, “ওইডা পোলা না- ওইডা ঝোলা।” ওসসা ঘরে ব্যস্ত আদম আলী।

-আপায় ট্যাবলেট দিছিলো খাইছিলি?

-খাইছি। যেই রোগের জন্যই যাই, লায়লা আফা তো ওই একই ট্যাবলেট দেয়; সবুজের বাপ, মুই মনে হয় আর বাচুম না! আলেয়ার কথায় কোথাও যেন এক আক্ষেপ স্পষ্ট।

আদম আলী হঠাৎ ক্ষিপ্ত হয়ে যায়, চিৎকার করে ওঠে- “আমি আদম কোনো হালার বাপ না!”

কিছুক্ষণের অস্থায়ী নিরবতা ভাঙে আদম আলী। বলতে শুরু করে, “মরার সময় তোর হইয়া গ্যাছে, হপ্তায় তিন চাইর দিন ব্যারাম লাইগাই থাহে। মরবি যহন তয় আগে আগে মর, জুয়ান তাগড়া দেইখা আর একটা বিয়া করি।”

অসুস্থ আলেয়ার দুরবস্থাতেও খোঁচা দেয় আদম আলী। আলেয়াও ছেড়ে কথা বলে না, বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর বেরিয়ে আসে তার জবানি থেকে- “দ্যাহো মইরাও যদি তোমার কোনো উপকার করতে পারি! নতুন বেডির একটা পোলা ওইলে শ্যাষ বয়সে তোমার লাডি ওইবে। তয়, এহন পোলা চাইলে আপার ওষুধ লাগবে, এই বয়সে এ্যামনেই তো আর বাপ হওয়া যাইবেনা!”

“এতদিনে আল্লহপাক তোরে মাথায় ব্রেন দিছে! বিয়া করুম? হালার কোন কপাল লইয়া জন্মাইছি! পোলাডার তিনটা পোলা, পাঁচ জন মানষে খায় একজনের আয়! কতক্ষুন পারে ক’? হ্যার উপরে তুই আমি। শ্যাষম্যাষ যোগাযোগই বন্ধ কইরা দিলো।”

কি এক আশ্চর্যরকম ঢেউ খেলে যায় দুজনের বুকে। অশান্ত হয় এপার ওপার, পৃথিবীর সকল শীতলতা মেশানো দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুজ’নে একসাথে বলে ওঠে- “আমাগো কপাল।”

– তুমি মাঝির নাও চালাইয়া আমাগো খাওয়াও নাই?

– তহন গতরে দম আছিলো বেডি, ঢাকা দিয়া হাইড্ডা বাড়ি আইছি! এহন কেউ কামও দিতে চায় না, বয়সের ভার!

তাকিয়ে নিজের গতর দেখে আদম আলী। নিজের ভেতর এক চাপা হতাশা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে তার, “জীবনে কত ভারই তো বইলাম, এহন প্যাডের ভারই সবচাইতে ভারি লাগে। এই প্যাডের ভারে কতকিছু করতে ওইছে জীবনে!” বসে বসে ভাবে আদম আলী, ১৮ বছর বয়সে পায়ে হেটে প্রথম ঢাকা গেছে, নৌকা চালিয়েছে ছাব্বিশ বছর, ট্টাকে আপলোড আনলোড করেছে, ‘শ্যাষ’ বয়সে ‘পিডা’র দোকান দিয়েছিলো; মিছিলে বৃথা স্লোগান দিয়েও টাকা কামিয়েছে সে।

ভাবতে ভাবতে হাঁটা ধরে আদম আলী। ভাবে, ‘বেডি যদি মইরা যায় তার কি অইবে? গ্রামে আপলোড আনলোডের কাম নাই, হারাদিন নৌকা চালানোর গতর এহন আর নাই। বাজারে গিয়া যখন যে কাম পায়, তাই করে; হেদিন টাট্টিখানা সাফ কইরা দুইশো টাকা কামাইছিলো। এহন পকেডে বাইশ টাকা আছে। বেডি সুস্থ থাকলে কামে যায়, হেবাড়ি দিয়া রাইতের খাওনও দেয়’ ক’দিন ধরে সেই বিলেতি উচ্ছিষ্টের চালানও বন্ধ।

বাজারে এসে পা থামে আদম আলীর। বাজারে তার ভাতিজার দোকান আছে, সেখান থেকে ডাক পড়ে তার- “কাক্কু! এদিকে হোনেন!”

আদম আলী ধীর পায়ে দোকান ঘরে ওঠে। মাঝে মাঝে ভাতিজা ডেকে নিয়ে চা খাওয়ায়, আজ চা খেতে বললে একটা বিস্কুটও খেতে চাইবে বলে সিদ্ধান্ত নেয় আদম আলী।

“দোকানে আডু জাগাইয়া লোকেরে কি দেহাও, ভাতিজা?”

রসিকতা করতে করতে ভাজিতার সামনে আসন নিতেই তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে ভাতিজা।

“বসনের কাম নাই তোমার! বাড়ি আইছো ভাল কথা, চাচিম্মায় হুনছি মেয়া বাড়ি কাম করে? দ্যাহো আমাগো অবস্থা- এহন প্লেট আর আগাখানা সাফ কইরা প্যাট চালান লাগে! আর তুমি নাকি হেদিন বাজারে আগাখানা সাফ করতে গ্যালা? ক্যা? খাওনের এত অভাব গেরামে? আইছো ক্যা মারাইতে? আমাগো মান ইজ্জত মারতে আইছো? এই কাম কাইজ তুমি করতে পারবানা কাকা! আমি সামনের বার বাজার কমিটির ইলেকশন করুম। খাইয়া থাহো, না খাইয়া থাহো, সব কাম করতে পারবানা! কেউ তো আর জানে না, তুমি আমার ক্যামন চাচা।”

ভাজিতা চায়ের কথা মুখেও আনেনি, আর বিস্কুট এখন শুধুই কল্পনা। আদম আলী কোন জবাব দেয় না, নতমাথায় বাজারে ফলপট্টির দিকে পা বাড়ায়।

মাংসের দোকান পার হয়ে, মুদি মনোহারির গলি দিয়া আদম হেঁটে সামনে যায়। ব্যাগ ভরে বাজার করার একটা আনন্দ আছে, যৌবনে কোন কারন ছাড়াই ব্যাগ ভরে বাজার করতো আদম আলী। তার মনে হয়, ‘বুড়া ওইলে সব কিছু ছিনামার মত লাগে, চোহের সামনে সব কিছু ভাসতে থাহে।’

– আম কত ভাতিজা?

– এইডা একশোতিরিশ, ওইডা একশোবিশ, ফজলি একশোদশ, আর ডানেই ওইডা সত্তোইর টাকা কেজি।

সব চাইতে কম দামের আমে মাছি ভনভন করে, একটা আম হাতে তুলে আদম আলী আনমনে বিড়বিড় করে- “আম দ্যাহি বুড়ির বুকের মত হইয়া গ্যাছে”

– কতটুক দিমু চাচা?

– আদা কেজি দাও।

– আদা কেজি বেচুম না চাচা।

– পইচ্চা গেছে বাজান, এই পচা আমের কাষ্টমার কই পাবা?

– একবারে বেচুম চাচা। আর আইজকাইল পচা আম, পচা কাঢাল, সব বেচা যায়, পচা মালের কাস্টমার কম নাই বাজারে।

কথোপকথনের মধ্যে দুর থেকে হাঁক আসে- “ওই রহিম, মাছির আম কত রে?”

– ভাই ৭০ টাকা কেজি।

– সব মাপ দিয়া দ্যাখ, কয় কেজি হয়।

মাছির আম মাপতে শুরু করে রহিম, মাছিরা রাগে ভোঁভোঁ করতে থাকে।

– ভাই, নয় কেজি তিনশো গ্রাম।

– ভাল কইরা প্যাকেট কর, আর একশো দশ টাকা কইরা একটা ভাউচার বানাইয়া দে।

প্বার্শচরিত্রের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকে আদম আলী। ভদ্রলোক আম নিয়ে চলে যায়। আদম আলীর রাগ হয়। পরিচয় থাকলে সে আজ ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করেই বসতো, “ভাই পচা আমও কি খাইতে দেবেন না?”

ভাবনায় ছেদ ঘটায় রহিম- “চাচা, বাজারে আর কোনো কাম আছে? ঘুইরা আহেন, নতুন কাটোন ভাঙলে পচা আমি বাইরাইবো। আমি বাইচ্ছা একটা আপনার লইগা রাইখা দিমু। চা খাইয়া আহেন।”

আদম আলী ভাবে, ভাজিতা আজ জানতেই চাইলো না,  চাচা আজ চা খাবে কিনা।

– আর কোন কাম নাই বাজান।

– তাইলে একটু খাড়ান। কাটোন ভাঙলে যে আম বাইরাইবে, ওইহান দিয়া আপনে বাইচ্ছা নিয়েন এডা।

আদম আলী দাঁড়িয়ে থাকে। নতুন ‘কাটোন’-এ অবশ্যই একটি ভাল পঁচা আম বেরিয়ে আসবে।

rana vai

লেখক: মনিরুল ইসলাম রানা


সর্বশেষ

আরও খবর

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান


স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন

স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন


শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!

শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!

সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!


লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ

লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ


দ্য লাস্ট খন্দকার

দ্য লাস্ট খন্দকার


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা

নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা


তূর্ণা নিশীথা

তূর্ণা নিশীথা