Saturday, February 24th, 2018
আফঘানিস্তান: দক্ষিণ এশিয় দুর্নীতি-রোগের এক্সরে রিপোর্ট
February 24th, 2018 at 2:00 pm
আফঘানিস্তান: দক্ষিণ এশিয় দুর্নীতি-রোগের এক্সরে রিপোর্ট

মাসকাওয়াথ আহসান: ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সাম্প্রতিক দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে দুর্নীতি-সংকুল দেশ আফঘানিস্তান। দক্ষিণ এশিয়ায় দুর্নীতি ধারণা সূচকে আফঘানিস্তানের পরেই রয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৭ সালের সিপিআই অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অবস্থান- ভুটান (স্কোর ৬৭), ভারত (৪০), শ্রীলংকা (৩৮), মালদ্বীপ (৩৩), পাকিস্তান (৩২), নেপাল (৩১), বাংলাদেশ (২৮) এবং আফগানিস্তান (১৫)।

আফঘানিস্তান যুদ্ধাহত দেশ। সেখানে অসহায়ত্বজনিত কারণে ক্ষমতাসীন কতিপয়তন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে সাধারণ মানুষ। নাগরিক সমাজ বলতে যে ক্ষুদ্র অংশটি রয়েছে; তারা জনমানুষের পক্ষে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারেনা; বরং ক্ষমতাসীনদের তল্পিবাহকের কাজটি করে। এর পরিবর্তে উন্নয়ন বাজেটের কলাটা-মূলোটা খেয়ে নিজেদের মোটাতাজাকরণ অব্যাহত রাখে।

সে দেশে নাগরিক সমাজ ক্ষমতাসীনদের বংশবদ; সেখানে সরকার জবাবদিহিতার প্রয়োজন বোধ করে না। ফলে রাজনীতি-সিভিল-মিলিটারি প্রশাসন ভাগ-বাটোয়ারা করে খেয়ে নেয় রাষ্ট্রের সম্পদ। ব্যবসায়ী সমাজও ক্ষমতা-কাঠামোর সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্ক রেখে নিজেদের লাগামহীন মুনাফা নিশ্চিত করে।

আফঘানিস্তানের মিডিয়া খুবই বিকশিত। অনেকগুলো এফ এম রেডিও ও কম্যুনিটি রেডিও চালু রয়েছে সেখানে। রয়েছে টিভি কেন্দ্র। কিন্তু আফঘানিস্তানের সাংবাদিকতা মানেই সরকার তোষণ। আফঘান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানির প্রেস কনফারেন্স মানেই সাংবাদিকদের তৈলব্রত। এ অবস্থা সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের সময়েও জারী ছিলো।

আফঘানিস্তানের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের সম্ভাবনা যেহেতু নেই; তাই ক্ষমতাসীনরা ফুটবল ও ক্রিকেট দলের সাফল্যের ছদ্ম আনন্দে সাধারণ মানুষকে আচ্ছন্ন করে রাখে। ক্রীড়া-জাতীয়তাবাদের তৃপ্তির ঢেঁকুরের সমান্তরালে চলে সম্পদ লুন্ঠন ও পাচার।

ক্ষমতাসীন লুন্ঠকদের সন্তানেরা পশ্চিমা দেশগুলোতে পড়াশুনা করে; আফঘানিস্তানের সাধারণ মানুষের হকের টাকা মেরে প্রভাবশালীরা পশ্চিমে তৈরী করে সেকেন্ড হোম। অন্যদিকে আফঘানিস্তানের শিক্ষা-ব্যবস্থার বেহাল অবস্থা। শিক্ষা খাতে বৈদেশিক সাহায্যের কমতি নেই। কিন্তু সে সাহায্য চুঁইয়ে চুঁইয়ে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে পৌঁছাতে পারে না কিছুতেই। আফঘানিস্তানের মানুষ সরকারের দুর্নীতির কারণে এতোটাই হতাশ যে তারা দেশে নিজেদের কোন ভবিষ্যত দেখতে পায় না আর। তাই সুযোগ পেলেই দেশান্তরী হতে চেষ্টা করে।

আফঘানিস্তানের রাজনৈতিক নেতা, সরকারী প্রশাসকেরা সমাজের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। সাধারণ মানুষ এদের সঙ্গে সর্বোচ্চ ভক্তি প্রদর্শন করে নিরাপদ বোধ করে। আফঘানিস্তানের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাধারণ মানুষ প্রভাবশালীদের সঙ্গে সেলফি তুলে ডুবন্ত মানুষের খড়কুটো আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার হাসিমুখ চেষ্টাগুলো চালিয়ে যায়।

কাবুলের পশ্চিমা দূতাবাসগুলোতে অনুষ্ঠানে দাওয়াত পাওয়াকে প্রবল গর্বের বিষয় বলে মনে করে কাবুলাইট ট্রেন্ডি মানুষেরা। নানা দেশের রাষ্ট্রদূতকে ঘিরে নাগরিক সমাজের ছবি তোলা রীতিমত একটি প্রতিযোগিতামূলক ব্যাপার।

আফঘানিস্তানের সাধারণ মানুষ বিশেষতঃ নারীসমাজ অত্যন্ত গণতন্ত্রপ্রিয়। নির্বাচনে তাদের ভোট দিতে যাবার আগ্রহ প্রবল। কিন্তু আফঘান ধর্মান্ধ তালিবানরা নারীকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে সক্রিয়। আফঘানিস্তানে তালিবানদের গুড তালিবান ও ব্যাড তালিবান নামে দু”ভাগে ভাগ করে নিয়ে একদিকে চলে কথিত ব্যাড তালিবান জঙ্গীদমন; অন্যদিকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে কথিত গুড তালিবান মোল্লাতোষণের প্রবণতা রয়েছে ক্ষমতাসীনদের। এইভাবে কিছু তালিবান মোল্লা ক্ষমতাসীন সরকারের নানা বরাদ্দ নিয়ে ফুলে ফেঁপে ওঠে। জঙ্গীদমন ও মোল্লাতোষণ পাশাপাশি চলে মঞ্চস্থ নাটকের মতো করে।

আফঘানিস্তানের বড় একটি সমস্যা মাদক-ব্যবসা আর কর্ম-সংস্থানহীন হতাশ যুবকদের মাদকাসক্তি। এছাড়া কাবুলের ধনিক শ্রেণীর তরুণ-তরুণীদের মধ্যে প্রবল মাদকাসক্তি লক্ষ্য করা যায়। এতে করে আফঘানিস্তানের ভবিষ্যত যেন ঘুমিয়ে থাকে মাদকের আবেশে। ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার মতো প্রতিবাদী তারুণ্যের সংখ্যা প্রতিদিনই কমতে থাকে।

দূর থেকে যুদ্ধাহত দেশ হিসেবে আফঘানিস্তানকে যারা দেখেন; তাদের জন্য অবিশ্বাস্য মনে হবে ক্ষমতা-বলয়ের আফঘানদের বিলাসী জীবনের কথা। কাবুলে কিছু কিছু বিলাস-বহুল এলাকা রয়েছে; যেখানে লাস-ভেগাসের মতই বিলাসী জীবনের দেখা মেলে। আবার পাশাপাশি রয়েছে সাধারণ অধিকার বঞ্চিত আফঘানদের টানাপোড়েনের জীবনের ট্র্যাজেডি।

লেখক: ব্লগার ও প্রবাসী সাংবাদিক

 


সর্বশেষ

আরও খবর

গণতন্ত্রের রক্ষাকবজ হিসাবে গণমাধ্যম ধারালো হাতিয়ার

গণতন্ত্রের রক্ষাকবজ হিসাবে গণমাধ্যম ধারালো হাতিয়ার


মহামারী, পাকস্থলির লকডাউন ও সহমতযন্ত্রের নরভোজ

মহামারী, পাকস্থলির লকডাউন ও সহমতযন্ত্রের নরভোজ


ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করুন

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করুন


নাচ ধারাপাত নাচ!

নাচ ধারাপাত নাচ!


মাতৃভাষা বাংলা’র প্রথম লড়াই ১৮৩৫ সালে হলেও নেই ইতিহাসে!

মাতৃভাষা বাংলা’র প্রথম লড়াই ১৮৩৫ সালে হলেও নেই ইতিহাসে!


তারুণ্যের ইচ্ছার স্বাধীনতা কোথায়!

তারুণ্যের ইচ্ছার স্বাধীনতা কোথায়!


সমাজ ব্যর্থ হয়েছে; নাকি রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে?

সমাজ ব্যর্থ হয়েছে; নাকি রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে?


যুদ্ধ এবং প্রার্থনায় যে এসেছিলো সেদিন বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই আমাদের স্বাধীনতা থাকবে

যুদ্ধ এবং প্রার্থনায় যে এসেছিলো সেদিন বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই আমাদের স্বাধীনতা থাকবে


বঙ্গবন্ধু কেন টার্গেট ?

বঙ্গবন্ধু কেন টার্গেট ?


আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…

আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…