Friday, May 8th, 2020
আমার রবিঠাকুর: একজন নিগূঢ় পরিবেশবাদী
May 8th, 2020 at 3:27 pm
আমার রবিঠাকুর: একজন নিগূঢ় পরিবেশবাদী

নাভিদ সালেহ;

কবিগুরু যে প্রকৃতি প্রেমে মত্ত ছিলেন বরাবরই, তা নূতন করে বলবার কিছু নেই। ঋতুরাজকে সহসাই প্রণাম জানিয়েছেন, তার রঙ আর গন্ধে মেতেছেন অহর্নিশ। মৃদুহাসিতে ডেকেছেন মহারাজ বর্ষাকে:”এসো শ্যামল সুন্দর, আনো তবে তাপহরা তৃষাহরা সঙ্গসুধা”।

অনেক করে ভেবেছেন শরতের শেফালিকে নিয়ে:”ওগো শেফালিবনের মনের কামনা,..ওই বসেছো শুভ্র আসনে, আজি নিখিলের সম্ভাষণে, আহা শ্বেতচন্দনতিলোকে, আজি তোমারে সাজায়ে দিলো কে”।

বসন্তের “পথিক হাওয়া”-য় আন্দোলিত হয়ে ফুলের প্রস্ফুটনে তাঁর প্রেয়সীর আগমনের প্রতীক্ষা করছেন: “মাধবী হঠাৎ কোথা হতে এল ফাগুন-দিনের স্রোতে”।

তাঁর একান্ত নিবিষ্ট দৃষ্টিকে এড়ায়নি কিছুই। সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে যেন তিনি প্রকৃতিকে আস্বাদন করেছেন। কবিগুরু তাঁর প্রিয় নিসর্গ থেকে পেয়েছেন অনেক।

প্রতিদানে কিছু দেবার জন্যে অধীর হয়ে উঠেছিলেন যেন। ১৯২২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর ইংরেজিতে দেয়া বক্তৃতা, “Robbery of the Soil”, প্রকৃতি প্রতিরক্ষার একটি নীরব স্লোগান মনে হয়।

আজ, প্রায় শতবর্ষ পরে, তাঁকে “নতুন করে পাবো বলে”, বক্তৃতার এই অনুলিপিটি আমার হাতে পড়েছে হয়তো।

এ বক্তৃতাটি গ্রামবাংলাকে পূনর্গঠিত করবার জন্যে দেয়া হলেও, প্রকৃতি-রক্ষার আকুতি ফুটে উঠেছে একান্তেই। কবিগুরু শহরতলীর সমৃদ্ধি, প্রাচুর্য, আর আতিশয্যে ক্লান্তি প্রকাশ করেছেন। পল্লী সমাজকে যেন শহরতলীর আমরা নিংড়ে নিয়েছি। তার সুফলা জমির ফলনে আমাদের ভান্ডার পূর্ণ করেছি অনায়াসেই। এ যেন একটি একমুখী সঞ্চালন। কর্ষণযোগ্য জমির অতি-ব্যবহার কখনও কি ভাবিয়েছে আমাদের? স্বচ্ছ বিলের মাছ নিধন কি বিচলিত করেছে আমাদের? গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সোনালী নদীর মৃত্যু একটুও অস্থির করেছে কি কখনও? আমরা যেন নারীর মত ব্যবহার করেছি আমাদের প্রকৃতিকে। রবিঠাকুর বলছেন:

“Like women, they provide people with their elemental needs, with food and joy, with the simple poetry of life… But when constant strain is put upon her through the extortionate claims of ambition, when her resources are exploited through the excessive stimulus of temptation, then she becomes poor in life. The city, in its intense egoism and pride, remains blissfully unconscious of the devastation it is continuously spreading.”

যখন ইমারতের ইট-পাথরের ভাস্কর্য, শহরে ভিড় জমানো ধনাঢ্য মানুষের লিপ্সা, আর বিবেকহীন পুঁজি-আহরণ সভ্যতার সমার্থক হয়ে দাঁড়ায়, লাঞ্চিত হয় মানবতা। নীতিহীন প্রগতির খোলসে যখন স্বাদ, ভোগ আর সম্ভোগে তুষ্টি আসে অভিলাষী মানুষে, তখন প্রয়োজন ফুরায় নারীর, প্রকৃতির। সভ্যতার সূর্যোদয়ের সাথে সাথে জলসাঘরের সাঁঝবাতির প্রয়োজন ফুরায়। কবিগুরু বলেছিলেন, “Civilization today caters for a whole population of gluttons”

এই একতরফা দান আর কতদিন? কখন রুখে দাঁড়াবে নদীর জলস্রোত, থেমে যাবে ফাগুনের সমীরণ, হারিয়ে যাবে হিমবাহের ঘন নীল, আর উর্বরা মাটির ফলন-ক্ষমতা? কখন প্রিয়ার চোখের চকিত চাহনি হঠাৎ বদলে যাবে ক্রোধ-জমা অগ্নিদৃষ্টিতে? অতি শোষণের সময় ফুরিয়েছে। থেমে গেছে প্রবৃদ্ধির চাকা। থমকে গেছে শহরতলীর উন্মত্ত উচ্ছাস! বিচলিত সভ্যতার পাদপীঠে চির ধরেছে। দিশেহারা মানুষ গৃহরুদ্ধ হয়েছে। নিরুপায় চিত্ত প্রণাম ঠুকছে “শ্রীসম্পদ ভূমাস্পদ বেষ্টিত চরণে”।

সময় কি অনেকটাই পেরিয়ে গেলো না। যে ক্ষত হয়েছে ধরিত্রীর শরীরে, তার অরোধ্য রক্তক্ষরণে কি মৃত্যু ঘটবে মানবতার? এ ভয়াল সময় যখন কেটে যাবে, বিস্মৃত আমরা কি আবার ফিরে যাবো চিরাচরিত নির্বুদ্ধিতায়? আমাদের চির আপন প্রকৃতিকে খড়গ হাতে তাড়া করবো আমরা? সমৃদ্ধির সচল চাকা বিষিয়ে তুলবে নিসর্গের বায়ু, জল, আর মাটি? যেটুকু অবশিষ্ট, তা নিংড়ে নেয়া অব্দি শ্লথ হবে না প্রবৃদ্ধির গতি? বোধোদয় হবে না আমাদের: “যা ছিল তা গেল চলে, রইল যা তা কেবল ফাঁকি”।

সময় সত্যিই ফুরিয়ে চলেছে পৃথিবীর। দূষণে উষ্ণায়ন বাড়ছে। ধীরে নিমজ্জিত হতে চলেছে, যত্নে গড়া শহরাঞ্চল আর অবহেলিত গ্রাম। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। নোনা জল ঢুকে পড়ছে ফলনশীল জমিতে। মাছেরা হারিয়ে যাচ্ছে। বন-নিধনে পুড়ছে বনানী। ঘরছাড়া বন্যপ্রানীকূল শহরে পাড়ি জমাচ্ছে।

পানিবাহিত অনুজীবের ক্রোধাগ্নিতে আহত গোটা সভ্যতা। এ আত্ম-নিধন থামাতেই হবে আমাদের। এ নৈসর্গিক রক্তক্ষরণ আর নয়। যে মানুষ মহাকালের খোঁজে চন্দ্রপৃষ্ঠে পা রেখেছে, দূত পাঠিয়েছে মঙ্গলগ্রহে, তাকে পারতেই হবে।

যে মানব বাষ্পকে কাজে লাগিয়েছে, বিদ্যুৎকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, জয় করেছে জলের শক্তিকে, তাকে পারতেই হবে। বিকল্প শক্তির খোঁজে বেরুবে মানুষ। জলকে করবে দূষণমুক্ত। হিমবাহের গলে যাওয়া রুখে দেবে উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণের মাঝ দিয়ে। আমরা পারবো। আমাদেরকে যে পারতেই হবে।

বসন্তকে ভালবাসবার সময় ফুরায়নি এখনো। বর্ষায় নিমজ্জনের সাধ এখনো জীয়ন্ত। প্রেয়সীকে আলিঙ্গনের প্রহর এখনো যে বাকি। “সেই সূরে সাগরকূলে বাঁধন খুলে, অতল রোদন উঠে দুলে,সেই সুরে বাজে মনে অকারণে, ভুলে-যাওয়া গানের বাণী, ভোলা দিনের কাঁদন-হাসি”।

নাভিদ সালেহ; পরিবেশ-প্রকৌশলী এবং গবেষক


সর্বশেষ

আরও খবর

করোনায় মৃত ব্যক্তিকে যেকোনো কবরস্থানে দাফন করা যাবে: স্বাস্থ্য অধিদফতর

করোনায় মৃত ব্যক্তিকে যেকোনো কবরস্থানে দাফন করা যাবে: স্বাস্থ্য অধিদফতর


সচেতন না হলে সরকার আবারও কঠোর হবে: কাদের

সচেতন না হলে সরকার আবারও কঠোর হবে: কাদের


পুরোনো চেহারায় ফিরছে ঢাকা

পুরোনো চেহারায় ফিরছে ঢাকা


দিল্লির সীমান্ত সাত দিনের জন্য বন্ধ: নয়াদিল্লির মুখ্যমন্ত্রী

দিল্লির সীমান্ত সাত দিনের জন্য বন্ধ: নয়াদিল্লির মুখ্যমন্ত্রী


এসএসসির ফল প্রকাশ, পাশের হার ৮২.৮৭%

এসএসসির ফল প্রকাশ, পাশের হার ৮২.৮৭%


এই পরিস্থিতিতে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব না: শিক্ষামন্ত্রী

এই পরিস্থিতিতে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব না: শিক্ষামন্ত্রী


বাস ভাড়া ৮০% বাড়ানোর সুপারিশ বিআরটিএ’র

বাস ভাড়া ৮০% বাড়ানোর সুপারিশ বিআরটিএ’র


ট্রেনের ভাড়া বাড়বে না, টিকিট অনলাইনে: রেলমন্ত্রী

ট্রেনের ভাড়া বাড়বে না, টিকিট অনলাইনে: রেলমন্ত্রী


বাংলাদেশকে ৭৩ কোটি ডলার জরুরি সহায়তা দিচ্ছে আইএমএফ

বাংলাদেশকে ৭৩ কোটি ডলার জরুরি সহায়তা দিচ্ছে আইএমএফ


করোনায় পুলিশের আরেক সদস্যের মৃত্যু

করোনায় পুলিশের আরেক সদস্যের মৃত্যু