Saturday, July 16th, 2016
যেভাবে হার্ট এ্যাটাক হলো আমার
July 16th, 2016 at 10:09 am
যেভাবে হার্ট এ্যাটাক হলো আমার

গত ১৭ জুন শুক্রবার ছিল। স্বাভাবিক নিয়মেই সকালে চেম্বারে যাই। সকাল দশটা থেকে একটা পর্যন্ত রুগী দেখি। দুপুর একটার দিকে সমস্ত বুক জুড়ে এক ধরনের অস্বস্তি টের পাই। কোনো ভাবেই ভালো লাগছিল না। বাধ্য হয়েই রুগী দেখা বন্ধ করে রেস্ট রুমে যাই কিন্তু শুয়ে বসে বালিশ চাপা দিয়ে কোনো ভাবেই ভালো লাগছিলো না।

পড়ে নীচে এসে ইসিজি করালাম। ইসিজিতে হার্টে রক্ত চলাচলের সমস্যা( ইসকিমিয়া) ধরা পড়লো। বুঝতে পারলাম বসে থাকা যাবে না। তৎক্ষণাৎ বরিশালের সিনিয়র কার্ডিলজিস্ট রনজিৎ চন্দ্র খাঁ এর বাসায় যাই। সেদিন দুপুরে তার বড় ছেলের বিয়ের আশির্বাদের দাওয়াত ছিলো।

স্যারকে ডেকে ইসিজি দেখালাম। স্যার সাথে সাথে তার গাড়ি দিয়ে আমাকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিলেন। উদ্বেগহীন ভাবেই আমি সাথে অপসোনিন কোম্পানির উত্তমবাবু এবং ছোটভাই স্বপন করকে নিয়ে হাসপাতালের উদ্দ্যেশে রওয়ানা হলাম। কার্ডিওলজি বিভিগের সার্বক্ষণিক চিকিৎসক আমার বন্ধু সহপাঠি ডাঃ মান্নানকে বললাম ‘আমার আনস্টেবল এনজাইনা হচ্ছে, ভর্তি হবো তুমি একটা বেড রেডি করো।’ যেতে যেতেই প্রয়োজনীয় সব ঔষধ হাতে নিয়ে নিলাম। স্বাভাবিক ভাবে ভর্তি হয়ে বেডে উঠলাম। আমাদের সংগ্রহকৃত ঔষধ দিয়েই চিকিৎসা শুরু হলো।

আমরা যখন হাসপাতালে পৌঁছাই তখন বিকেল তিনটে।চারটের মধ্যে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে আমি ঘুমিয়ে পরি। পরবর্তীতে ঘুমের মধ্যেই আমার হার্ট এ্যটাক চুড়ান্ত রূপ নেয় ফলত হার্টের সংকোচন কমে গিয়ে প্রেসার নামতে থাকে এবং আমি শকে যাই।এমতাবস্থায় আমার সহকর্মী বন্ধু অধ্যাপক ডাঃ অসীৎ ভূষন দাস আমাকে দেখতে যান এবং জরুরি পদক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন। আমাকে শকের জন্য ডোপামিন ড্রিপ এবং হার্টের রক্তনালীতে জমা ক্লট ছুটানোর জন্য স্ট্রেপটোকাইনেজ ইনজেকসন দেয়া হয়।

রনজিৎ চন্দ্র খাঁ স্যারকে কল দেয়া হলে উনি আসতে আসতে আমার কার্ডিয়াক এ্যারেস্ট হয়। কার্ডিয়াক এ্যারেস্ট এমন একটি অবস্থা যেখানে হার্টের স্বাভাবিক সংকোচন বন্ধ হয়ে যায় এবং ইসিজি মনিটরে স্বাভাবিক গ্রাফের পরিবর্তে সরল রেখা দেখা দেয়। হার্ট এ্যাটাকের পর অনেক রুগীরই এমনতর জটিলতা হতে পারে যেমন শক সহ নানান এরিদমিয়া। এরিদমিয়া হচ্ছে হার্টের স্বাভাবিক ছন্দ পতন এবং এমতাবস্থায় হার্ট ইচ্ছে খুশীমতো স্বয়ংক্রিয়তা ভুলে গিয়ে যেকোন জায়গা থেকে সংকুচিত হয়ে বিট দিতে শরু করে। এরকম নানান এরিদমিয়া যেমেন এট্রিয়াল, ভেনট্রিকুলার বা সুপরাভেন্ট্রিকুলার নানন ধরনের হয়ে থাকে। তবে কার্ডিয়াক এ্যারেস্ট যেটা আমার হয়েছিলো সেটা খুবই মারাত্বক জটিলতা এবং খুব জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে না পারলে মৃত্যু অনিবার্য।

সৌভাগ্যবশত ডাঃ রনজিৎ খাঁ স্যারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এক মিনিটেরও পরে আমার হার্ট আবার তার কাজ শুরু করে। এই এক মিনিটেরও অধিক সময় আমি সত্যিকার অর্থে হার্টলেস অবস্থায় ছিলাম যা মৃত্যুরই নামান্তর।মজা হচ্ছে এই সময়টাতে আমি সম্পূর্ন অচেতন ছিলাম এবং আমাকে নিয়ে যমে মানুষের কোন টানাটানিই আমি টের পাইনি। সচেতন হবার পর শুনেছি আমার শুভাকাঙ্ক্ষী ও বন্ধু সুজনরা ঐ সময়টাতে বেশ ঘাবরে গিয়েছিলো অনেকে রীতিমত আমি মৃত ভেবে বিলাপ করছিলো।আমার অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে হাসপাতালে দর্শানার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং দর্শনার্থী সামলাতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে যথেষ্ঠ হিমশিম খেতে হয়।

রাত বাড়ার সাথে সাথেই আমার অবস্থার উন্নতি হতে থাকে এবং এক পর্যায়ে আমি সচেতন হয়ে অনেকের সাথে কথাও বলি যদিও সেদিন রাতের কারো সাথের কোন কথাই আমার স্মৃতিতে নেই। সেদিন রাতে আমার জানাশোনা অনেক ভাই বন্ধু আত্মীয় স্বজন স্থানীয় গন্যমান্য লোক শিল্পী সাহিত্যিক সাংবাদিক বুদ্ধিজীবী অনেকেই আমাকে হাসপাতালে দেখতে এসে দেখতে না পয়ে ফিরে গেছেন। কারণ ডাক্তারদের পরামর্শে আমাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছিল।

পরের দিন সকালে হাসপাতালের কর্ত্তৃপক্ষ ও কর্তব্যরত চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে এয়ার এম্বুলেন্সে আমাকে ঢাকা ইউনাইটেড হাসপাতালে প্রেরণ করার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা ছিলো।ঢাকা থেকে এয়ার এ্যাম্বুলেন্স স্টার্টও দিয়েছিলো কিন্তু সকাল বেলায় আমার শারিরীক আশাতীত উন্নতি হওয়ায় আমার ইচ্ছেতেই যাত্রা স্থগিত করা হয়। পরবর্তীতে ইসিজি বা ইকো তে বড় কোন ত্রুটি ধরা পরে নি। কয়েকদিন হাসপাতলের পুরোপুরি বিশ্রামে থেকে বাসায় আসি। তারপর সপরিবারে বন্ধু অসিৎ ভূষন দাস এ এনামুল কবির পান্নাসহ ২৪ তারিখ রাতে ঢাকা ইউনাইটেড হাসপাতালের উদ্দেশ্যে লঞ্চযোগে বরিশাল ত্যাগ করি।

পঁচিশ তারিখে ঢাকা পৌঁছামাত্র আমরা ইউনাইটেডে ভর্তি হয়ে যাই। সকালের মধ্যেই আমার প্রাথমিক সব পরীক্ষা নীরিক্ষা হয়ে যায়। দুপুর নাগাৎ এনজিওগ্রাম করার কথা থাকলেও পাঁচটার একটু পর আমাকে ক্যাথল্যাবে নেয়া হয়। আমার আগে আর একটি কেস ছিলো। সে টি করার পর আমাকে বেডে ওঠানো হলো। ডাঃমোমিনুজ্জামান আমার পূর্ব পরিচিত এবং আমার সিনিয়ার বন্ধু সম। এক সময় স্নাতোকোত্তর পড়াশোনার জন্য পি জিতে এবং পরবর্তীতে বরিশালে একসাথে অনেক সময় কাটিয়েছি। ডাঃ মোমিনুজ্জামান আমাদের বরিশাল মেডিকেল কলেজেরই ছাত্র আমাদের দুই বছরের সিনিয়র।

ক্যাথল্যাবে আমার সামনে এসে হাসি দিয়ে আমার হাতটি ধরলেন। আমিও নির্বিকার ছিলাম। চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনো ভয় বা আবেগ আমার মধ্যে কাজ করেনি। গল্প করতে করতেই আমার ডান হাতের নাড়ীতে সুই ফুটিয়ে তিনি তার প্রয়োজনীয় কাজটি সেরে নিলেন।

গল্প করতে করতেই খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি এ্যাঞ্জিওগ্রাম করে নিলেন। পরীক্ষায় দেখা গেলো আমার বাম দিকের একটা আর্টারীতে প্রায় ৯০ ভাগ ব্লক রয়েছে।অন্য দুটো আর্টারী ভালোই সচল রয়েছে। সাধারন মানুষের বাম দিকে দুটো করে আর্টারী থাকে ঈশ্বর আমাকে একটা বেশী দিয়েছে কিন্তু যেটি বেশী সেটিই মুল রক্ত সরবরাহকারী নালী হাসেবে ব্যবহৃত হতো এবং তার প্রায় ৯০ ভাগ বন্ধ দশায় আমার এ পরিনতি।

সাথে সাথে এঞ্জিওপ্লাস্টির সিদ্ধান্ত দিয়ে দেই এবং ব্লকড আর্টারীতে একটি স্টেন্ট(রিং) পড়িয়ে দেয়া হয়। পরবর্তীতে পুরো একটা রাত আমাকে সিসিইউতে থাকতে হয় ফলো আপের জন্য। সকাল বেলায় আবার আমায় কেবিনে ফেরত দেয়া হয়। তিন দিন ইউনাইটেডে ভর্তি থেকে লঞ্চযোগে বরিশাল ফেরত আসি। ঢাকা ইউনাইটেডে ভর্তি থাকা অবস্থায় অনেক আত্মীয় বন্ধু সুজন কবি সাহিত্যিক দেখতে আসেন আমাকে যা আমার কাছে এক অনন্য স্মৃতি।

বরিশাল এসে বেশ কদিন বিশ্রামে থকার পর ঈদের ছুটির পর কাজে যোগদান করি এবং চেম্বারেও সীমিত আকারে রুগী দেখা শুরু করি। প্রভুর কৃপায় এবং আপনাদের সবার আশির্বাদে আমি এখন পুরোপুরি সুস্থ। আমার এ অসুস্থদশায় যারা সাথে ছিলেন ভালোবাসা স্নেহ আশির্বাদে আমাকে ধন্য করেছেন সবার কাছে আমি সমান কৃতজ্ঞ।

হৃদরোগীদের জন্য আমার পরামর্শ

অতিরিক্ত কাজের চাপে হারিয়ে যাবেন না। পরিমিত সুষম খাদ্য খান। লাল মাংস ঘি মাখম পেটভরে ভাত খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। শাকসব্জী ফল পানি রুটি ও আঁশযুক্ত খাবার খান। ধুমপান একদম করবেন না। ওজন ঠিক রাখুন।

উচ্চরক্তচাপ, ডায়েবেটিস ও রক্তে চর্বিকনা বেশি থাকলে ঠিকঠাক ঔষধ খেয়ে নিয়ন্ত্রনে রাখুন। হাঁটা আপনাকে হৃদরোগ থেকে দূরে রাখবে। আজই শুরু করুন জোর কদমে পয়তাল্লিশ মিনিট হাঁটুন। দুঃচিন্তা পরিহার করুন। বছরে একবার কার্ডিয়াক চেক আপ করান।

Vaskarভাস্কর সাহা: চিকিৎসক


সর্বশেষ

আরও খবর

দৈনিক চার হাজার মানুষের মৃত্যুর আশংকা আগামী মঙ্গলবার থেকে লকডাউনে যাচ্ছে সমগ্র গ্রেট ব্রিটেনে

দৈনিক চার হাজার মানুষের মৃত্যুর আশংকা আগামী মঙ্গলবার থেকে লকডাউনে যাচ্ছে সমগ্র গ্রেট ব্রিটেনে


করোনা: আরও ২৩ মৃত্যু, শনাক্ত ১৩০৮

করোনা: আরও ২৩ মৃত্যু, শনাক্ত ১৩০৮


এন্টিড্রাগ ফেডারেশনকে সহায়তার আশ্বাস

এন্টিড্রাগ ফেডারেশনকে সহায়তার আশ্বাস


করোনা আক্রান্ত যশোরের চিকিসৎসককে ঢাকায় স্থানান্তর

করোনা আক্রান্ত যশোরের চিকিসৎসককে ঢাকায় স্থানান্তর


গণস্বাস্থ্যের করোনা ল্যাব ও প্লাজমা সেন্টার বন্ধের নির্দেশ

গণস্বাস্থ্যের করোনা ল্যাব ও প্লাজমা সেন্টার বন্ধের নির্দেশ


‘না বুঝে অনেকেই স্বাস্থ্য বিভাগের সমালোচনা করেছেন’

‘না বুঝে অনেকেই স্বাস্থ্য বিভাগের সমালোচনা করেছেন’


দেশে করোনায় মৃতের সংখ্যা ৪ হাজার ছাড়াল!

দেশে করোনায় মৃতের সংখ্যা ৪ হাজার ছাড়াল!


সিরাজুল ইসলাম মেডিকেলকে ৩০ লাখ টাকা জরিমানা

সিরাজুল ইসলাম মেডিকেলকে ৩০ লাখ টাকা জরিমানা


করোনায় অ্যান্টিজেন টেস্ট চালুর কথা ভাবছে সরকারঃ স্বাস্থ্যমন্ত্রী

করোনায় অ্যান্টিজেন টেস্ট চালুর কথা ভাবছে সরকারঃ স্বাস্থ্যমন্ত্রী


“ভারতীয় ভ্যাকসিন প্রাপ্তিতে বাংলাদেশ অগ্রাধিকার পাবে”

“ভারতীয় ভ্যাকসিন প্রাপ্তিতে বাংলাদেশ অগ্রাধিকার পাবে”