Sunday, July 3rd, 2022
আমি ইচ্ছা করে নিজের দেশ ত্যাগ করিনি
September 29th, 2016 at 8:17 pm
আমি ইচ্ছা করে নিজের দেশ ত্যাগ করিনি

কাজি ফৌজিয়া: এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি, রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি। মনে ভাবিলাম, মোরে ভগবান রাখিবে না মোহগর্তে, তাই লিখি দিল বিশ্বনিখিল দু বিঘার পরিবর্তে।

প্রিয়বন্ধু,

কেমন আছ তুমি ? ভাল থাকো এই কামনা করি। আমার চিঠি পড়ে অনেকে জিজ্ঞ্যসা করে তুমি কে ? আদৌ তুমি আছ নাকি নেই ? তোমার সাথে আমার প্রেম আছে নাকি তোমাকে ভালোবাসি কি না আর কত কি! আমি কিছুই বলি না, মনে মনে বলি নিজেই ত জানি না তুমি আমার কে? আদৌ তোমাকে ভালোবাসি কি না আর ভাসলেই তোমার কি আসে যায়। তোমার প্রাইভেসি থিওরির  কোনো গ্যাঁড়াকলে  আমার স্থান আমি নিজেই জানি না। তুমি হয়ত বলবে আমরা বন্ধু আমি বলব শুধুই বন্ধু? থাক বন্ধু আই পেঁচালে পরার ই দরকার নেই বন্ধু হই শত্রু হই যা কিছু হই  কি আসে যায়। আমি শুধু একটা কথাই জানি তুমি আছ এই উপলব্ধি আমাকে শান্তি, সাহস ও মনোবল যোগায়।

গত ১৯ ও ২০  সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে  হয়ে  গেল বিশ্ব অভিবাসী ও উদ্বাস্ত বিষয়ক সম্মেলন। প্রেসিডেন্ট ওবামা ওই দুইদিনের সম্মেলনের নেতৃত্ব দেয়। এই সম্মেলনে পুরো দুনিয়া থেকে অভিবাসী অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন সংগঠনগুলিও যোগ দিতে এসেছিল। এমনই একটা গোষ্ঠী গ্লোবাল মাইগ্রেশন ফোরাম জাতিসংঘের বাইরে সমাবেশ করেছে। সমাবেশে অন্যান্যদের সাথে আমিও বক্তব্য রেখেছি।আমার বক্তব্যের একটি লাইন আমি তুলে দিচ্ছি এখানে ‘ আমি ইচ্ছা করে নিজের দেশ ত্যাগ করি নাই, রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সামাজিক বৈষম্য এর জন্য দায়ী। যখন আমি এই দেশে আসি আমার বয়স তখন ৪০,আমাকে এয়ারপোর্ট থেকে আনতে যাওয়ারও কোনো আত্মীয় বা বন্ধু ছিল না তারপরও আমি এই জীবনের ঝুকি নিয়ে পাড়ি জমাই অ-বন্ধু সুলভ একটি শহরে যেখানে প্রতি পায়ে পায়ে বিপদ ওঁত পেতে থাকে অভিবাসীদের জন্য।

আমার মতো কাহিনী সকল অবিভাসীদের, শখ করে কেউ নিজের দেশ ছারে না।  আমাদের মতো মানুষের প্রবাসী হওয়ার পিছনে এই সব বড় বড় রাষ্টের বৈষম্যমূলক নীতিমালা দায়ী ’।আমাদের সমাবেশের উপস্থাপক একটি  মূল্যবান কথা বলেছে যে আজ জাতিসঙ্গের ভিতরে যে সব রাষ্ট্র একত্রিত হয়েছে উদ্বাস্ত ও অভিবাসী নীতি ঠিক করতে হাস্যকর হলেও সত্যি এরাই মানুষ উদ্বাস্ত ও অভিবাসী হওয়ার পিছনে মূল কারণ আর এরাই বসেছে নীতি ঠিক করতে।আমরা যারা উদ্ভাস্থ বা অভিবাসী আমাদের কে কেউ জিজ্ঞাসা করে না আমরা কি চাই।এমন কি আফ্রিকা থেকে আসা কয়েকজন অভিবাসী সংগঠক কে জাতিসংঙ্গ ভিতরে যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছে না। বন্ধু আমার জাতিসংঘ নামক সংগঠনটিকে বড় দেশগুলির দালাল মনে হয় তাই এর কাছে আমার খুব কিছু আশাও করি না। সবমিলিয়ে সেপ্টেম্বর মাস টিকেই আমার তামাশার মাস মনে হয় পুরো দুনিয়ার রাষ্ট প্রধান রা তাদের লটবহর নিয়ে আসে সকালে জাতিসংঘ রাতে সামাজিক দলীয় নেতাদের সাথে সমাবেশ বা সংবর্ধনা দেয়া চলে তারপর বিদায়। আমাদের মতো সাধারণ অভিবাসীদের খবর কেউ নেই না আমরাও তাদের আসা যাওয়ার খবর রাখি না।

অনুষ্ঠান শেষে আমরা কয়েকজন ম্যানহাটন এর রাস্তা পার হচ্ছিলাম কফি শপে যাব বলে, হঠাৎ দেখি সায়মা আপা আর জারা নেই আমি রেবেকাকে জিজ্ঞাসা করলাম ওনারা কই সে বলল দে আর টেকিং পিকচার।আমি চিন্তা করলাম এই রাস্তায় ছবি তোলার মতো কি পেল? ঘার ফিরিয়ে দেখি ডঃ ইউনূস! আমিও গেলাম পরিচিত হলাম ছবি তুললাম খুব সাদাসিদা চালচলন হাসিখুশি মানুষ । ফেইসবুক এ ছবি তুলে দেয়ার পর আমাকে অনেক মানুষ জিজ্ঞাসা করল তুমি কি মাইক্রো ক্রেডিট এর ভক্ত আমি বললাম না তবে কি গ্রামীণ এর ভক্ত আমি বললাম না তবে ছবি দিয়ে কি বুঝাতে চাও। আমি বললাম আমি তার আবিস্কার বা নোবেল পাওয়ার ভক্ত না।

মোহাম্মদ ইউনূস আমার পছন্দ কারণ হাজারো প্রতিকুলতা আর সরকার এর আক্রমণ উনি হাসি মুখে মোকাবিলা করে সব সময় হাসি দেখি মুখে লেগেই থাকে। এই সব বিষয় আমাকে মুগ্ধ করে কারণ আমি খুব অল্পতেই রেগে যাই কেঁদে ফেলি তাই মানসিক স্টেমিনা যাদের মজবুত আমার তাদের ভালই লাগে। রইল মাইক্রোক্রেডিট ওহনো আমি কি করে এটার ভক্ত হব। আমি ১০ লাখ টাকার মতো পরিশোধ করেছি আশা ও ব্রাক এর লোন। আমি জানি পাওয়া যত সহজ পরিশোধ না করতে পারলে বা একটা কিস্তি দিতে দেরি করলে কতটা অপমান অপেক্ষা করে। শুনেছি কেউ কেউ ত অপমান সহ্য করতে না পেরে নিজের জীবন টাই দিয়ে দেয়। মাইক্রো ক্রেডিট এর একটা গুণ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত যে এই পদ্ধতি গরীব মানুষের সম্পত্তি বন্ধক না রেখে তাদের বিশ্বাস করে ঋণ দেই এই কথা আমার মতে ঠিক না গরীবের সম্পত্তি শুধু সম্পদ নয় তার সম্পর্কও তার সম্পত্তি আর মাইক্রো ক্রেডিট তা বন্ধক নেই কমপক্ষে ৩ থেকে ৫ জন ঋণগ্রহিতার পক্ষে জিম্মাদার হলে তবে ঋণ দেয়।আর যখন কেউ সময় মতো ঋণের কিস্তি দিতে পারে না তার জীবন ত ধরে নরক বানিয়ে দিবে মাইক্রো ক্রেডিট কর্মীরা সাথে সাথে জিম্মাদারের জীবন ও, আর কর্মীরা টাকা তুলতে ব্যর্থ হলে সুপারভাইজর তাদের জীবন এই ভাবে ধাপে ধাপে চলবে হয়রানির প্রক্রিয়া।

তোমার মনে আছে আমি ঋণ পরিশোধ করতেই দেশ ছেড়েছিলাম, আজ ঋণ পরিশোধ করেছি কিন্তু খেয়াল করি নাই কবে আমার দেশ চলে গেছে। আমার অফিসের পরের দরজা ছিল গ্রামীণ আমেরিকা, তারা খুঁজে খুঁজে লাতিনো মহিলাদের ঋণ দেই যাদের কাগজপত্র নেই আইছক্রিম বা ফল বিক্রি করে বা ছোটখাট ব্যবসা করে। বাঙালিদের খুব একটা ঋণ দেয় না । শুনতে বা দেখতে লাগে আহা কাগজপত্র নাই মানুষ বিশ্বাষ করে! উহু আমার মনে হয় কাগজপত্র নাই মানুষ টাকা ফেরত দিতে ঝামেলা করবে না কারণ তারা পুলিশি ঝামেলা চায় না কারণ পুলিশ এলে তাদের কাগজপত্র দেখতে চাইবে আর না দিতে পারলে তাদের এই দেশ থেকে বহিষ্কার করে দিবে। এই দেশে মাইক্রো ক্রেডিট এর কিস্তি আদায় করতে কর্মীদের দিয়ে জীবন বিষাক্ত করা আইনত দণ্ডনীয় তাই এই বিষয়ে পুলিশ ডাকতে হয়। তাই বোধহয় জেনে বুজে মানুষের দুর্বলতা বুজে ঋণ দেয়া হয়।

বন্ধু তোমাকে লিখতে বসলেই চিঠির মাঝামাঝি আসতেই একটা বড় কিছু ঘটনা ঘটে গত চিঠিতে চেলসি বোম্ব ব্লাস্ট আজ ওয়াশিংটন সিয়াটল মলের ঘটনা। কেউ একজন মলে ঢুকে ৫ জনকে গুলি করে মেরে ফেলেছে কি আজব দেশে আছি কারণে অকারণে মানুষ অস্ত্র কেনার লাইসেন্স পেয়ে যায়। আর মানুষ রাগ হলেই ঐ লাইসেন্স করা অস্ত্র দিয়ে মানুষ হত্যা করে। এই কেসে এমন এ মোটিভ হবে মনে হচ্ছে বা কে জানে কি হবে? ভয় নিয়ে বেঁচে থাকা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। গত দুইদিন যাবৎ তোমাকে লিখতে পারিনি এর মধ্যেই ঘটে গেল আর এক দুর্ঘটনা লস এঞ্জেলসে এক বাংলাদেশি স্বামী ও স্ত্রীকে গুলি করেছে। স্বামী মারা গেছে মহিলা হসপিটালে। দোকান থেকে জিনিসপত্র নিয়ে টাকা না দিয়ে চলে যাচ্ছিল বাধা দেয়ায় এই কাণ্ড। আমাদের লস এঞ্জেলস সমাজ এটাকেই হেইট ক্রাইম নাম দিচ্ছে, জানি না আমাদের সমাজের কি হয়েছে কেন নিজেদের এত দুর্বল প্রমাণ করতে উঠে পরে লেগেছে।

নিউ ইয়র্কে আমাদের বাংলাদেশি সমাজ খুব আচার অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে পিকনিক সিজন শেষ হতেই প্রধানমন্ত্রীর সফর তাদের সংবর্ধনা চলছে। বাংলাদেশিদের আঞ্চলিক সংগঠনের নির্বাচন ও প্রচারণার কাজেও মুখর এই শহর। মানুষ মোটামুটি ভুলেই গেছে ইমাম আকুঞ্জি ও নাজমা আপাকে । জীবনের নিয়ম ই হয়তো এই কিন্তু আমাদের মতো মানুষ কিছুই ভুলে না ভুল করা চলবে না যেই নীতির কারণে এই সব ঘটনা ঘটে সেই সব নীতি বদলাতেই হবে। আর যতদিন আমরা সেই বদলানো দিন দেখবো শান্তি তে বসবো না। যখন তোমাকে চিঠি লিখা শুরু করি একটা কবিতার কয়েকটি লাইন লিখেছি আশা করি মাইক্রো ক্রেডিট আর আমার ঋণের দায় মুক্ত হতে দেশ ছেড়ে চলে আসার সাথে কবিতাটির মিল খুজে পেয়েছ। ভাল থাক বন্ধু ভাল থাকুক দেশ ও দেশের মানুষ।

ইতি

তোমার বন্ধু যাকে তুমি কোন নামেই ডাকো না

Kazi Fouzia

 

লেখক: মানবাধিকার কর্মী


সর্বশেষ

আরও খবর

নিউ ইয়র্কের চিঠি- ৩৭

নিউ ইয়র্কের চিঠি- ৩৭


মানবিক হও!

মানবিক হও!


সহমর্মিতার জয় হোক

সহমর্মিতার জয় হোক


মহামারীর এই সময়ে মানুষের পাশে থাকুন

মহামারীর এই সময়ে মানুষের পাশে থাকুন


আসছে শুভদিন!

আসছে শুভদিন!


আমাদের ঝালমুড়ি দাদা ও গরীবের শ্রেণী সংগ্রাম

আমাদের ঝালমুড়ি দাদা ও গরীবের শ্রেণী সংগ্রাম


জন্মভূমির টান মানসিক কষ্টে ফেলে দেয়

জন্মভূমির টান মানসিক কষ্টে ফেলে দেয়


‘মুসলিম সমাজের বিভাজন বন্ধ করুন’

‘মুসলিম সমাজের বিভাজন বন্ধ করুন’


আজ জুইস-মুসলিম এক কাতারে দাঁড়িয়েছে

আজ জুইস-মুসলিম এক কাতারে দাঁড়িয়েছে


সর্ব পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে

সর্ব পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে