Sunday, May 20th, 2018
আরব্য রজনীর আলেয়া
May 20th, 2018 at 11:12 pm
প্রতিবেদক জিজ্ঞেস করে, আপনি নিজেও তো আজ ওদের মতো ট্র্যাজেডিতে পড়তে পারতেন। নারী কর্মকর্তা ভ্রু নাচিয়ে বলেন, না না না তা হবে কেন! আমার দাদা জমিদার ছিলেন।
আরব্য রজনীর আলেয়া

মাসকাওয়াথ আহসান

বাতেন সাহেবের মেয়ে রাজকন্যা হার্ভার্ডে পড়তে যাবে; মেয়েটি নিরাপদে থাকবে কীনা তা ভাবতে ভাবতে রাতে ঘুমাতে পারেন না। এরপর অফিসে দুপুরের দিকে ঝিমুনি এলে; ঘুম ঘুম চোখে স্বাক্ষর করেন ফাইলে।

গরীবের মেয়েরা সৌদি আরব গিয়ে দুটি কাঁচা-পয়সার মুখ দেখবে; বৈদেশিক অর্থ আয় করে দেশে পাঠাবে; সেই ফাইলটাতে ঘচাং করে স্বাক্ষর করে দেন; জুলেখা-সুফিয়া-আলেয়ার নিরাপত্তার কথা ভাবার সময় কোথায়; বাতেন সাহেবের মনটা আচ্ছন্ন হয়ে আছে তার রাজকন্যার বস্টন যাত্রার দুঃশ্চিন্তায়।

আল-মনসুর ট্রাভেল এজেন্সির দালালেরা ছড়িয়ে পড়ে সুন্দরপুরে; জুলেখা-সুফিয়া-আলেয়াদের স্বপ্ন দেখাতে। এজেন্সির মোটিভেশনাল স্পিকার দুলাল একটা টেবিলের ওপর স্মার্টফোন রাখে; তার পাশে রাখে জুলেখা-সুফিয়া-আলেয়ার পুরোনো বোতামওয়ালা কয়েকটি ফোন। এরপর গম্ভীর হয়ে বলে, রিয়াদ কিংবা দাম্মাম শহরে এইসব ফোন চলে না; নিজের স্মার্টফোন হাতে তুলে নিয়ে বলে, স্মার্ট হইতে গেলে স্মার্ট ফোন কিনতে হবে।

আলেয়া বলে, ছোট ভাই বইনের ইস্কুলে যাওনের জামা ছিঁইড়া গেছে; হেইডা কিইনা দিবার পারিনা; স্মার্ট কিনুন কেমতে।

দুলাল স্মার্টফোনে স্পর্শ বুলিয়ে আর্তনাদ করে, আহা আর তোমাদের ছেঁড়া খ্যাতার গল্প শুনতে চাইনা। এইগুলি এনজিও আপাদের বলবা; তোমাগো ছেঁড়া খ্যাতার ছবি দেখাইয়া হ্যারা বিদেশ থিকা ভিক্ষা নিয়া আসবো। এই কইরা কইরা দ্যাশটার মানসম্মান কিছুই রাখে নাই। আরে আলেয়া, চিন্তা করো তো দাম্মাম শহরের হাসপাতালে কাম কইরা তুমি কত দিরহাম কামাইতে পারবা! শ্যাওড়াতলার জব্বইরা সৌদি আরবে কাম কইরা দোতলা দালান তুলছে; এইটা দেখছো না। কর্মের মর্যাদা বুঝতে তুমার আমার কাছে আসতে হবে কেন! এই পুরা এলাকায় যতগুলি দালান আছে অর্ধেক তার করিয়াছে সৌদি শ্রমিক; অর্ধেক করিয়াছে পার্টির বনিক।

জুলেখা হেসে বলে, দুলাল ভাই যে কবি হইয়া গেছেন।

–আমি তো তোমার কবিই ছিলাম জুলেখা; তুমি বুঝলা না দেইখা আল-মনসুরের কবি হইলাম। কী কমতি ছিলো আমাতে; আমি তো বুজলাম না।

জুলেখা বিরক্ত হয়, পুরান প্যাচাল রাখেন দুলাল ভাই; কামের কথা কন।

দুলালের মুখটা সিরিয়াস হয়ে যায়, আগে চুপে-চাপে মাইয়াগো সৌদিতে নিয়া যাওয়া কঠিন আছিলো। কিন্তু উন্নয়নের সরকার সৌদি গভমেন্টের সঙ্গে চুক্তি করার পর মাইয়ারা উইড়া উইড়া সৌদি যাইবো; দিরহাম উইড়া উইড়া আইসা পড়বে দ্যাশে। সুফিয়া কোন কথা বলে না কেন!

সুফিয়া হেসে বলে, শুনি আপনের উরাধুরা স্বপ্নের কথা।

দুলাল অত্যন্ত বিব্রত হয়ে বলে, আমি তাইলে আজ উঠি। তোমাদের পাসপোর্ট করাইতে হবে; অনেক কাজ। সব খাটনি আমারই পড়বে; কিন্তু সৌদি থিকা ফিরে আমাকে তো চিনতেই পারবে না জুলেখা।

আলেয়া উত্তর দেয়, ব্যাজার হন কেন দুলাল ভাই; আপনার নাম সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে।

রাতে খাবার টেবিলে মুখ ভার করে থাকেন বাতেন সাহেব। বাতেন সাহেবের স্ত্রী দিলশাদ বলেন, তুমি এতো ভাবছো কেন; নাহার আপা তো বস্টনেই থাকেন; উনি দেখে শুনে রাখবেন রাজকন্যাকে। রাজকন্যা গাল ফুলিয়ে বলে,

–আমি আগেই বলতেসি আমি নাহার আন্টির অত্যাচার সহ্য করতে পারবো না। শি ইজ সো ইরিটেটিং; ফোনে কথা হলেই উনি বলেন, তোমার জন্য পাত্র দেখতেসি। আমি কী পড়তে যাইতেসি না বিয়ে করতে যাইতেসি!

মাঝরাতে বাতেন সাহেব মেয়ের ঘরে আসেন। মেয়ের কপালে হাত রাখেন। মেয়েকে প্রতিদিন স্কুলে নামিয়ে দিয়ে তবেই অফিসে যেতেন বাতেন সাহেব। স্মৃতিরা তেড়ে আসে। নীল ফ্রক পরে দৌড়ে আসে রাজকন্যা। একটা কিটক্যাট হাতে ধরিয়ে দিলে সে কাঠবেড়ালির মতো লাফাতে লাফাতে সি স খেলতে যায়।

দিলশাদ বাতেন সাহেবকে মেয়ের ঘর থেকে নিয়ে যান , ওকে ঘুমাতে দাও; ভোরে ফ্লাইট। এয়ারপোর্টে আগে থেকে বলে রেখেছো তো; আমার মেয়ে ভি আইপি গেট দিয়ে ঢুকবে।

বাতেন সাহেব দিলশাদকে থামিয়ে বলেন, আমরা তো ওর সঙ্গে এয়ারপোর্টে যাচ্ছি; এতো চিন্তা কীসের তোমার!

জুলেখা-সুফিয়া-আলেয়াকে সুন্দরপুরের স্নেহের নাড়ি ছিঁড়ে দুলাল নিয়ে আসে এয়ারপোর্টে। নদীর ধারে নৌকায় তুলে দিয়ে বাড়ির সবাই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলো; সে যেন শেষ যাত্রার কান্না। দুলাল ধমক দিয়ে বলে, কান্দাকাটি করে যারা; উন্নয়নের শত্রু তারা। আরে জুলেখা-সুফিয়া-আলেয়া সম্মানজনক কাজ করে দেশ ও দশের মুখ উজ্জ্বল করবে। এতো দিরহাম পাঠাবে যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ঝুড়ি উপচাইয়া পড়বে। বোঝে না তো কিছুই; খালি ফ্যাচ ফ্যাচ কইরা কান্দে।

জুলেখার মা বলেছিলো, দেখে শুনে থাকিসরে মা। উপরে আল্লাহ নীচে মায়ের দোয়া।

দুলাল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছিল, তা কেন হবে, ঐখানে আমাদের এজেন্সির লোক আছে; দূতাবাসের কর্তাবাবুরা আছে; দেইখা-শুইনা রাখবে।

প্লেন থেকে সৌদি আরবে নামার পর তিনজনকে তিন দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। কারো ভাষা বোঝা যায় না। মাথা ঝিম ঝিম করতে থাকে জুলেখার। তিনতলা বাড়ি ধোয়া-মোছার কাজে লাগিয়ে দেয়া হয় তাকে। কাজ শেষ হলে একটা শুকনো রুটি দিয়ে যায়। নিজেরা রাজসিক খাবার খায়। আর মিসকিনের দেশের জুলেখার জন্য শুকনো রুটি। ভেজা কাপড়েই ঘুমিয়ে পড়ে জুলেখা।

সুফিয়াকে একটা প্রাসাদসম বাড়ির বাসন পরিষ্কারের কাজে লাগিয়ে দেয়। কাজ শেষ হলে শুকনো রুটি দেয়। সুফিয়ার মনটা আনচান করে একটু ভাতের জন্য।

আলেয়াকে আরব্য রজনীর গল্পের ফিনফিনে একটা পোশাক দিয়ে বলা হয় পরে নিতে। আলেয়া এক-আধটু ইংরেজি জানে। সে জিজ্ঞেস করে, আমার তো হাসপাতালে কাজ করার কথা। আমি এইখানে কেন!

একটা লোক ঘ্যোত ঘ্যোত করে বলে, এইটা হাসপাতালই; এখানে রাতে রোগি আসে। অপেক্ষা করো।

সুফিয়া অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে এজেন্সির ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সে অনেক কষ্টে একটা ফোন করে দূতাবাসে। কে একজন ফোন ধরে বলে, স্যারেরা গ্র্যাজুয়েশান সেরেমনিতে গিয়েছেন; আমরা উন্নয়নশীলতার যোগ্য হয়ে উঠেছি তো; তাই স্যারদের খুব ব্যস্ততা যাচ্ছে। সেমিনার-ডিনার এইসব আর কী!

ওদিকে বস্টনে নাহার আন্টি রাজকন্যার লোকাল গার্জেন হয়ে উঠেছেন। রাজকন্যা একটা ছোট এপার্টমেন্ট খুঁজতে চায়। কিন্তু নাহার আন্টি বাদ সাধেন। তার নিজের ছেলে-মেয়ে ১৮ বছর বয়েস হতেই আলাদা থাকে; নাহার আন্টি তাদের পাত্তা তুলতে পারেন না। এখন রাজকন্যাকে পেয়ে আবার একটা খেলার পুতুল পেয়েছেন যেন। তার অতিরিক্ত কেয়ারে হাঁপিয়ে ওঠে রাজকন্যা।

এরমধ্যে হার্ভাডে “এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট মিরাকল” নামে একটা সেমিনার হয়। রাজকন্যা দু’একজন বক্তার অতিরিক্ত বিশেষণ শুনে খানিকটা বিরক্ত হয়; আবার আনন্দও পায়। মনে মনে ভাবে, ঢাকায় থাকলে দেশের উন্নয়নের এতো কথা জানা হতো না। ভাগ্যিস বস্টনে এসেছিলো সে।

অনেক কষ্টে মানবাধিকার কর্মীদের সাহায্য নিয়ে কোন মতে জীবন নিয়ে ফিরে আসে জুলেখা-সুফিয়া-আলেয়া। লোকলজ্জার ভয় তারা আর করে না; অনেক হয়েছে; বেঁচে থাকতে হবে; দেশে পরিশ্রম করে অন্ততঃ দুটো ভাত তো জুটে যায়। পত্রিকায় তাদের দাসের জীবনের ট্র্যাজেডি নিয়ে প্রতিবেদন আসে।

একজন নারী সরকারি কর্মকর্তা ঝেড়ে অস্বীকার করে, এদের বেশির ভাগ কথাই মিথ্যা। সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এ বিষয়ে কথা হয়েছে। আমাদের বাসার বুয়ারাও চলে গিয়ে কত দুর্নাম করে!

প্রতিবেদক জিজ্ঞেস করে, আপনি নিজেও তো আজ ওদের মতো ট্র্যাজেডিতে পড়তে পারতেন। নারী কর্মকর্তা ভ্রু নাচিয়ে বলেন, না না না তা হবে কেন! আমার দাদা জমিদার ছিলেন।

মাসকাওয়াথ আহসান

মাসকাওয়াথ আহসান: ব্লগার ও প্রবাসী সাংবাদিক


সর্বশেষ

আরও খবর

রিজভী-দুলুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি

রিজভী-দুলুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি


অপারেশনের পর সুস্থ আছেন খালেদা জিয়া: ফখরুল

অপারেশনের পর সুস্থ আছেন খালেদা জিয়া: ফখরুল


কুমিল্লার মূল অভিযুক্ত পালিয়ে বেড়াচ্ছে, দ্রুতই গ্রেপ্তার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

কুমিল্লার মূল অভিযুক্ত পালিয়ে বেড়াচ্ছে, দ্রুতই গ্রেপ্তার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী


দেবীগঞ্জের অগ্নিকাণ্ড নিছক দূর্ঘটনা: ইউএনও

দেবীগঞ্জের অগ্নিকাণ্ড নিছক দূর্ঘটনা: ইউএনও


ওয়েবসাইট বন্ধ করে দিয়েছে ইভ্যালি কর্তৃপক্ষ

ওয়েবসাইট বন্ধ করে দিয়েছে ইভ্যালি কর্তৃপক্ষ


মিরপুরে খালে পড়ে নিখোঁজ ব্যক্তিকে ৬ ঘণ্টা পর জীবিত উদ্ধার

মিরপুরে খালে পড়ে নিখোঁজ ব্যক্তিকে ৬ ঘণ্টা পর জীবিত উদ্ধার


ফেসবুকে কিডনি বেচাকেনা, চক্রের ৫ সদস্য গ্রেপ্তার

ফেসবুকে কিডনি বেচাকেনা, চক্রের ৫ সদস্য গ্রেপ্তার


সেই ভুয়া অতিরিক্ত সচিবের বিরুদ্ধে মামলা করবেন মুসা বিন শমসের

সেই ভুয়া অতিরিক্ত সচিবের বিরুদ্ধে মামলা করবেন মুসা বিন শমসের


শান্তিতে নোবেল পেলেন দুই সাংবাদিক

শান্তিতে নোবেল পেলেন দুই সাংবাদিক


তিন দিনে ১ লাখ ২৫ হাজার অবৈধ মুঠোফোন শনাক্ত

তিন দিনে ১ লাখ ২৫ হাজার অবৈধ মুঠোফোন শনাক্ত