Thursday, July 7th, 2022
আলোচনার আড়ালে গণহত্যার প্রস্তুতি
March 22nd, 2017 at 1:32 pm
আলোচনার আড়ালে গণহত্যার প্রস্তুতি

ডেস্ক: ১৯৭১ সালের মার্চের অগ্নিঝরা দিনগুলো বাঙালি জাতির জীবনের এক সোনালি অধ্যায়। নিরবিচ্ছিন্ন সংগ্রাম আর আন্দোলনের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে একাত্তরের গৌরবময় দিনগুলো অর্জিত হয়েছিল।

একাত্তরের উত্তাল মার্চে একদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দফায় দফায় বৈঠক চলছিল তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার। অন্যদিকে আড়ালে প্রস্তুতি চলছিল ইতিহাসের বর্বরোচিত গণহত্যার।

২০ মার্চ তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান তার ছয়জন শীর্ষস্থানীয় সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে চতুর্থ দফা বৈঠকে বসেন। একইদিন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তার সামরিক উপদেষ্টা জেনারেল হামিদ খান, পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসক টিক্কা খান, জেনারেল পীরজাদাসহ সামরিক বাহিনীর ঊর্ধতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি গোপন বৈঠকে বসেন। এ বৈঠকে তিনি সামরিক প্রস্তুতির পর্যালোচনা করেন।

আরও পড়ুন: অপারেশন সার্চলাইট: ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞ

বৈঠকে শেখ মুজিবের সঙ্গে বৈঠক ব্যর্থ হলে কী করণীয় হবে তা আলোচিত হয়। এসময় প্রতিদিন সিংহল হয়ে একের পর এক ফ্লাইট বোয়িং-৭০৭ বিমানে করে সৈন্য ও রসদ ঢাকায় আনা হচ্ছিল এবং কয়েকটি জাহাজপূর্ণ করে সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র চট্টগ্রাম বন্দরে আনা হচ্ছিল। অসহযোগ আন্দোলন শুরুর দিকে বাংলাদেশে পাকিস্তানের স্থলবাহিনীর শক্তি ছিল এক ডিভিশন, ২০ মার্চ তা এসে দাঁড়ায় দুই ডিভিশনের অধিক।

১৯৭১ সালের ২১ মার্চ অসহযোগ আন্দোলনের ২০তম দিন অতিবাহিত হয়। যথারীতি এই দিনেও পূর্ণ স্বাধীনতার দাবীতে বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত অসহযোগের সমর্থনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গণ সংগঠনের সভা-সমাবেশ, শোভাযাত্রা, বিক্ষোভ মিছিল ও স্লোগানে রাজধানীসহ সারা দেশ প্রকম্পিত ছিল।

এদিন বঙ্গবন্ধু তার বাসভবনের সামনে এক সমাবেশে বলেন, ‘সাড়ে সাত কোটি মানুষের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলনের গতি কোনোভাবেই মন্থর করা যাবে না।’

২১ মার্চ ঢাকায় আসেন পিপলস্ পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো। তিনি সমস্যা সমাধানের জন্য ত্রিপক্ষীয় সমঝোতার কথা বলেন। ঢাকায় পৌঁছানোর সাথে সাথেই সংগ্রামী জনতা তার বিরুদ্ধে তুমুল বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। কড়া সামরিক নিরাপত্তায় তিনি হোটেলে পৌঁছান। ভুট্টোর সাথে ছিল ১৩ জন উপদেষ্টা এবং প্রায় এক ডজন সশস্ত্র দেহরক্ষী। প্রেসিডেন্ট ভবনের ১০০ গজের মধ্যে অবস্থিত হোটেল ইন্টার-কন্টিনেন্টালে অবস্থানরত ভুট্টো জনতার উদ্দেশে হাত নেড়ে অভিবাদন জানাতে গেলে সংগ্রামী জনতা তার প্রতি জুতা নিক্ষেপ করে এবং বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। রাতে ভুট্টো ও ইয়াহিয়া দুই ঘণ্টা স্থায়ী এক গোপন বৈঠকে মিলিত হন এবং ২৫ মার্চের গণহত্যার নীল নকশা রচনা করেন।

বিকেলে চট্টগ্রামে পোলো গ্রাউন্ডে ন্যাপ প্রধান মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এক বিশাল জনসভায় বলেন, “আলোচনায় ফল হবে না। এদেশের হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি থেকে চাপরাশি পর্যন্ত যখন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে মানে না, তখন শাসন ক্ষমতা শেখ মুজিবের হাতে দেয়া উচিত।”

২২ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ২৫শে মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন পুনরায় স্থগিতের ঘোষণা দেন। বঙ্গবন্ধু ধানমন্ডির বাসভবনের সামনে আগত মিছিলকারীদের লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত অহিংস ও অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যাবার আহবান জানান এবং ২১ দিনের অহিংস অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি প্রশংসা করেন।

আরও পড়ুন: কী ছিলো ‘অপারেশন বিগ বার্ড’?

২৩ মার্চ দিনটি ছিল মঙ্গলবার। অসহযোগ আন্দোলনের ২২ তম দিন। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদের আহবানে দিনটি পালিত হয় ‘পাকিস্তান দিবস’ এর পরিবর্তে ‘প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে। বঙ্গবন্ধু ২৩ মার্চ দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেন। তার নির্দেশে ঢাকাসহ সারা দেশের প্রত্যেক বাড়ি, যানবাহন, সরকারি- বেসরকারি সংস্থার ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিষদ ভবন, সুপ্রিমকোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্ট, বঙ্গবন্ধুর বাসভবন, হোটেল ইন্টার-কন্টিনেন্টালসহ সব প্রতিষ্ঠানে কালো পতাকার পাশাপাশি গাঢ় সবুজের মধ্যে রক্তলাল সূর্য এবং তার মাঝে মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন পতাকা উত্তোলন করা হয়। রাজধানী ঢাকা পরিণত হয় পতাকার নগরীতে। প্রেসিডেন্ট ভবন, গভর্নর হাউস এবং ক্যান্টনমেন্ট ছাড়া আর কোথাও পাকিস্তানের পতাকা ওড়েনি সেদিন।

ঢাকায় আগমনের পর এদিনই প্রথমবারের মতো জেনারেল ইয়াহিয়া প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে বের হয়ে সেনানিবাসে যান এবং দীর্ঘ ৫ ঘণ্টা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ভুট্টোও লে. জেনারেল পীরজাদার সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকে মিলিত হন। এসব বৈঠকেই ২৫ মার্চ গণহত্যার জন্য প্রণীত ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নীল নকশাটি চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। বাঙালি গণহত্যার এ নীলনকশাটি পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক প্রধান লে. জেনারেল টিক্কা খান ও সামরিক উপদেষ্টা জেনারেল পীরজাদা প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়াকে অবহিত করেন। পরিকল্পনা অনুসারে এ অপারেশনের মূল লক্ষ্যস্থল হিসেবে পিলখানা ইপিআর ব্যারাক, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রাবাস ও আওয়ামী লীগ এবং স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের বিভিন্ন নেতাকে হত্যার পরিকল্পনা স্থির করা হয়।

আলোচনার নামে কালক্ষেপণ করে পরিকল্পনা মাফিক তড়িঘড়ি করে ঢাকা ত্যাগ করেন ইয়াহিয়া। ইয়াহিয়া খানের করাচি অবতরণের পরপরই শুরু হলো ২৫ মার্চের সেই বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ।

গ্রন্থনা: কাওসার আহমেদ, সম্পাদনা: প্রণব


সর্বশেষ

আরও খবর

জেনারেল ইয়াহিয়া খান ও তার প্রেমিকারা

জেনারেল ইয়াহিয়া খান ও তার প্রেমিকারা


‘ধনীরা এদেশে যুদ্ধ করেনি’

‘ধনীরা এদেশে যুদ্ধ করেনি’


স্বাধীন দেশের পূর্ণ সুফল পায়নি জনগণ

স্বাধীন দেশের পূর্ণ সুফল পায়নি জনগণ


মকবুল হোসেনের সম্মুখ যুদ্ধের যত কথা

মকবুল হোসেনের সম্মুখ যুদ্ধের যত কথা


‘প্রয়োজন হলে আবার যুদ্ধে নামবো’

‘প্রয়োজন হলে আবার যুদ্ধে নামবো’


বিভীষিকার প্রথম শিকার রাজারবাগ

বিভীষিকার প্রথম শিকার রাজারবাগ


কী ঘটেছিল সেই কালরাতে?

কী ঘটেছিল সেই কালরাতে?


যেভাবে গ্রেপ্তার করা হয় বঙ্গবন্ধুকে

যেভাবে গ্রেপ্তার করা হয় বঙ্গবন্ধুকে


‘গণহত্যা দিবস আরো আগেই ঘোষণা করা উচিৎ ছিল’

‘গণহত্যা দিবস আরো আগেই ঘোষণা করা উচিৎ ছিল’


ভয়াল ২৫ মার্চ: জাতীয় গণহত্যা দিবস

ভয়াল ২৫ মার্চ: জাতীয় গণহত্যা দিবস