Monday, November 12th, 2018
আসছে শুভদিন!
November 12th, 2018 at 9:07 pm
আসছে শুভদিন!

প্রিয় বন্ধু,

কেমন আছো তুমি ? মনে হয় এক যুগ হয় যুগ হয়ে গেল তোমাকে লিখিনা । আজ অনেক দিন পরে লিখছি তোমায়,কোথা থেকে যে শুরু করি। কত কিছু ঘটে গেছে এই আমেরিকাতে, ট্রাম্প নামক যন্ত্রণা রোজ কিছু না কিছু করেই চলছে আমাদেরকে প্রবলেমে ফেলতে। তোমাকে সবই বলব ধীরে ধীরে, আজ কিছু ইতিবাচক কথা দিয়ে শুরু করি। গত সপ্তাহে আমেরিকাতে মধ্যবর্তী নির্বাচন হয়ে গেল ডেমোক্রেটরা হাউজে মেজরিটি পেয়েছে। সিনেট যদিও ট্রাম্প এর দল রিপাবলিকানদের হাতে। আশার কথা হল আগামি দুই বছর ট্রাম্প একচ্ছত্র ক্ষমতায় কোন বিল পাশ করাতে পারবে না। লাল স্টেট কে  নিল স্টেট বানাতে ডেমোক্রেটরা অনেক যে চেষ্টা করেছে, তা নয়। চেষ্টা যা করেছে তা সাধারণ জনগণ। মানুষজন বলাবলি করছে স্মরণকালের সবচেয়ে বেশী ভোটার ভোট কেন্দ্রে গিয়েছে। এইবার আমেরিকার নির্বাচনের আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হল ১০০র উপরে মহিলা পার্থী ছিল, কেন্দ্রীয় নির্বাচনের জন্য তাদের মধ্যে ১০০ মহিলা হাউজে পাশ করেছে। এইবার নির্বাচনে ১০০ মহিলা হাউজে পাশ করেছে যাদের বেশীর ভাগ কম বয়সের নারী । প্রথম বার দুজন মুসলিম দুজন আদিবাসী ও কাল মহিলা হাউজে পাশ করেছে। যদিও ট্রাম্প এর কাছে নির্বাহী ক্ষমতা আর জুডিসিয়াল ক্ষমতা রয়ে গেছে, তারপরেও জনগণের ভোটের পাওয়ার আর নারীশক্তি তার ভীত নাড়িয়ে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয় তার নতুন চাল কি হয়। নির্বাচনের পরের দিনই তার এটর্নিজেনারেল জেফসেসন কে পদত্যাগ এ বাধ্য করেছে কারন জেফসেসন এফ বি আই প্রধান মুলার কে বরখাস্ত করেনি। ট্রাম্প গত দুই বছরের চেয়ে কম সময়ে এত বেশী প্রসাশনিক পদের কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করে যা কিনা বিশ্ব রেকর্ড করে ফেলবে, সে সকাল বেলার টুইটার বার্তার মাধমেও লোকজন কে বরখাস্ত করে।

হিউম্যান কারাভ্যন এর কথা তো শুনছ বন্ধু, সর্বশেষ খবরে জানা গেছে ১৪,০০০ মাইগ্রেন্ট হন্ডুরাস থেকে  এলস্লাভাদর আর মেক্সিকো পাড়ি দিয়ে আমেরিকার বর্ডারের দিকে আসছে রাজনৈতিক আশ্রয় লাভের আশায়। হন্ডুরাসের রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য আমেরিকাই নাকি দায়ী তাই আমরা মনে করি আমেরিকাকে এই মানুষগুলির জন্য উদার হতে হবে। এই ১৪,০০০ মানুষের মধ্যে নারী আর শিশুর সংখ্যা বেশী। ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্ট  ট্রাম্প এই অসহায় মানুষগুলিকে ক্রিমিনাল, ড্রাগডিলার. আতঙ্কবাদী আরও কি কি বলেছে। সীমান্তে সেনাবাহিনী পাঠিয়েছে, তারা পাথর মারলে সে গুলি করার অনুমতি দিবে এমন ইংগিত শুরু করেছে। বন্ধু চিন্তা করে দেখ, যখন রোহিঙ্গারা জান বাঁচাতে বাংলাদেশে আসছিলো তখন আমেরিকা বলেছে তাদের তাদের জন্য বর্ডার খুলে দাও, বাংলাদেশের মত একটি ছোট রাষ্ট্র লক্ষ লক্ষ মানুষের ভার নিবে। যখন অন্য একটা জনগোষ্ঠী একই রকম বিপদে পরে আমেরিকার কাছে আশ্রয় চায়, তখন অস্র নিয়ে সীমান্তে পাহারা দেয়,এদের মানবাধিকারের বুলি শুধুই অন্য দেশের জন্য।

ডেমোক্র্যাটস এন্ড রিপাবলিকানস

বন্ধু, আজ আমেরিকার কথা আর বলব না অনেক কথা আছে পরে বলি। আজ আমার নিজের জীবনের অন্যরকম এক গল্প বলব। তুমি যেমন আমার ভালো বন্ধু, ছোট বেলার তেমন কিছু বন্ধু আছে, যাদের পিছনে ফেলে এসেছিলাম বা হারিয়ে ফেলেছিলাম, তাদের কথা বলব। বন্ধুকেই তো বলা যায় বন্ধুদের কথা। আমি যখন প্রাইমারী পড়ি তখন ছেলে-মেয়ে একসাথে পড়তাম,যেটাকে বলা হয় কো –এডুকেশন,  ক্লাস সিক্সে উঠার পরেই ছেলে বন্ধুরা ডে শিফটে, আর আমরা সকালের শিফটে। বাড্ডা আলাতুননেসা উচ্চ বিদ্যালয় ছিল আমাদের বিদ্যাপীঠ। ছেলেদের মধ্যে রোকন-এর কথা খুব মনে পড়ে, রোকন আমার কানে স্কুলের খাতা পেঁচিয়ে গান শুনাত, “এক হৃদয়হীনার কাছে হৃদয় দাম কি আছে…”। একই এলাকার বাসিন্দা হিসাবে বড় হয়ে রুকন কে যতবার দেখেছি লজ্জায় সে মেয়েদের সাথে কথায় বলতে পারত না। আমার মনে হত, আহারে বন্ধু সেই গান আর এক আইসক্রিম ভাগ করে খাওয়া বন্ধু পর হয়ে গেল শুধু মেয়ে-ছেলের সামাজিক দূরত্বের কারনে । ছেলেদের মধ্যে আরও যাদের কথা এখন মনে আছে তারা হল শাহিন সালাম ও শামিম সালাম, গোলাম সাহিন, আইউব, নমি,মাসুম রব্বানী,পিয়াল, আফসার, এনাম, দনু, বোরহান, জাহাঙ্গির, কাজী জহির, চঞ্চল… অনেকের কথাই ভুলে গেছি । অনেক ছেলে বন্ধুকে নতুন করে ফিরে পেয়ে আবারো চেনার চেষ্টা করছি। মেয়ে বন্ধুরা ছিল বেশী আপন কারণ অনেকের সাথেই একটানা ১০ বছর পড়েছি। তোমাকে রিমার কথা তো আগেই বলেছি, রিমার তুলনা রিমা নিজেই। অনেক পুন্য বা সৎকাজের কারনেই হয়ত ২৫ বছর পরে রিমাকে খুঁজে পেয়েছি। রিমার মতই লুৎফা ছিল আমার ছেলেবেলার সই, সে কখনো হারায়নি, সবসময় যোগাযোগ ছিল। আমার খুব অন্তরের কাছের ছিল পপি আর শিল্পী নার্গিস, তারাও তেমন হারিয়ে যায়নি। বাংলাদেশে থাকা অবস্তায় যোগাযোগ ছিল। হারিয়ে গেছিল সব ছেলে বন্ধুরা, আর আমার খুব কাছের মেয়ে বন্ধু  চিনু, জেবুন্নেছা, মুন্নি, আরিফা, শিউলি, রাবেয়া, মায়েদা নাসিমা, খুকি, নুরজাহান, সুইটি, বিউটি, লায়লা, নুপুর, হাসিনা, নিলুফা, লতিফা আরও অনেকে।

চিনুর সাথে ছিল সেইরকম খাতির, আর তাদের বাড়িতে ছিল অবাধ যাতায়াত, চিনুর বোন মিনুর সাথেও ছিল গভীর সখ্য । চিনুকে যে আমি কত খুঁজেছি, পাইনি। লুৎফার বোন সেলিনার সাথেও বন্ধুত্ব ছিল আমার। রাবেয়া আর মায়েদা দুই বোন আমাদের সাথে পড়ত, রাবেয়ার সাথেও ছিল সেইরকম খাতির, ৩৪ বছর ওদের খোঁজ পাইনা। আরিফা আর ওর ছোট বোন ও হারিয়ে গেল তাদের ও পাই না প্রায় ২৭ বছর। জেবুন্নেসার কথা খুব মনে পরত, ছোট বেলায় একটা দুর্ঘটনায় ওর মা মারা যায়, তারপর থেকে আমার বন্ধুটির চেহারাটি কেমন যেন কষ্টে ছেয়ে থাকতো, ওর সেই মায়াভরা মুখটি কখনো ভুলিনি। জীবনে হাজারো কাজের মাঝে বন্ধুদের স্মৃতিগুলো উকিজুকি দিয়ে যেতো, কখনো দীর্ঘশ্বাস, কখনো হাসি পেত পুরানো দিনের কথা মনে করে। তোমার মনে আছে, বন্ধু রিমাকে শাহিনকে ফেইসবুকের মাধ্যমে খুঁজে পেয়েছিলাম, শাহিনের মাধ্যমেই খুঁজে পাই ওর ভাই, আরেক বন্ধু শামিম, আরেক শাহিন, মাসুম রাব্বানী আর নমিকে।

ফেইসবুকেই খুঁজে পাই নুরজাহান কে। তারপরের গল্প অকল্পনীয়, নমি যেন আমাদের অনেকের জীবনে আর্শিবাদ হয়ে দেখা দিল, ফেইসবুকে সে বাড্ডা আলাতুনেসার ৮৪র ব্যাচ নামে গ্রুপ বানাল সেই গ্রুপে অ্নেক ছেলে বন্ধুদের সাথে এড হলাম। এর মধ্যে মাসুম আমেরিকা ঘুরে গেল, আমি আর শাহিন শামিম দেখা করলাম। আমি বাংলাদেশে গিয়েছিলাম ৬ দিনের জন্য, তখন মাসুম, জাহাঙ্গীর, আর বোরহানের সাথে দেখা হল। আমাদের স্কুলের ৫০ বছরপূর্তি উপলক্ষে আমাদের বন্ধুরা ছোট ও বড় ভাই এরা অনেক বড় করে অনুষ্ঠান করবে বলে ফেইসবুকে বড় গ্রুপ বানালো। নমি আমাকে লিঙ্ক পাঠাল সেই গ্রুপে এড হতে গিয়ে মনে হল বয়স ৩৫ বছর কমে গেছে। গতমাসে তারা প্রি-অনুষ্ঠান এর বড় আয়োজন করেছে ফেইসবুকে ৮৪র গ্রুপকে দেখে মনে হল উড়ে চলে যাই। নমিকে আমি বললাম, সবাইকে তো খুঁজে দিলে চিনু আরিফা আর নাসিমার সাথে কথা বললাম; কিন্তু রাবেয়া আর জেবুন্নেসা কই তাদের কে খুঁজে দাও । একদিনের মধ্যেই পেয়ে গেলাম রাবেয়ার ফেইসবুক লিঙ্ক; কথা বললাম সে নিউ ইয়র্কেই থাকে। একই শহরে আমি আর সে অথচ জানিই না। ফাইনালি ফেইসবুকে জেবুকে খুজে পেলাম,জেবুর সাথে কথা বলে মনে হল মনের টান থাকলে কি না হয়।গত দুই সপ্তাহ এজমা নিয়ে হসপিটালে ভর্তি হয়েছিলাম, ফেইসবুকে কি কারণে যেন লিখেছিলাম সেই কথা। আমার বন্ধুরা সুদূর বাংলাদেশ থেকে কল করে খোঁজ নিত। পপির বড় জেলি আপা আর ডলি আপা আমাকে অনেক আদর করত প্রায় ২০ বছর পরে জেলি আপাও আমার খোঁজ নিল।  আমার অনেক বান্ধবী ফেইসবুকে একাউন্ট করেছে আমাদের খুজে পেতে, ছেলে মেয়েদের বলছে আমাকে একাউন্ট করে দাও, বন্ধুদের খুজব। মানবাধিকারে কাজ করি বলে আমার কাছে ফেইসবুকের গুরুত্ব অনেক, আজ মনে হচ্ছে এই সোশ্যাল মিডিয়ার গুরুত্ব আমার কাছে হাজার গুন বেড়ে গেছে। জীবনের পড়ন্ত বেলায় একঝাক বন্ধুদের পেয়ে ৩৪ বছর পিছনে ফিরে গেছি। মনে হয় মৃত্যুর পূর্বে সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে এ আমাদের অনেক বড় উপহার পেলাম। সবচেয়ে মজার বিষয় হল আমাদের মাঝে এখন ছেলে আর মেয়ে প্রাইমারী আর হাই স্কুলের ব্যবধান নাই, উঁচু আর নিচু পদ আর পদবীর ব্যবধান নাই। আমরা এখন বন্ধু শুধুই বন্ধু, জীবনের বাকি সময়টুকু একে অপরের প্রতি মমতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ায়ার প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ ও সুখ দঃখ ভাগ করে নেওয়ার অঙ্গিকার করা বন্ধু। ধন্যবাদ ফেইসবুকের আবিষ্কারক মার্ক জুকেরবার্গ! আমার বন্ধু নমিকে, মাসুমকে, শাহিনকে, নুরজাহান আর নার্গিসকে এরা না হলে আমরা সবাই একসাথে হতে পারতাম কি না জানি না। বেঁচে থাক আমার বন্ধুরা আমার চে’ বেশি কাল বেঁচে থাক,ভাল থাক আর সুস্থ থাকো। তোমরা আছো বলেই জীবন এখন অনেক সুন্দর, বেঁচে থাকা আনন্দময়।

নিউ ইয়র্কে এখন অনেক রাত ঘুমাতে হবে আগামিকাল অনেক কাজ। ভাল থাক বন্ধু ভাল থাকুক দেশ ও দেশের মানুষেরা।

ইতি

তোমার বন্ধু যাকে তুমি কোন নামেই ডাকোনা

লেখক: কাজী ফৌজিয়া, মানবাধিকার কর্মী


সর্বশেষ

আরও খবর

আমাদের ঝালমুড়ি দাদা ও গরীবের শ্রেণী সংগ্রাম

আমাদের ঝালমুড়ি দাদা ও গরীবের শ্রেণী সংগ্রাম


জন্মভূমির টান মানসিক কষ্টে ফেলে দেয়

জন্মভূমির টান মানসিক কষ্টে ফেলে দেয়


‘মুসলিম সমাজের বিভাজন বন্ধ করুন’

‘মুসলিম সমাজের বিভাজন বন্ধ করুন’


আজ জুইস-মুসলিম এক কাতারে দাঁড়িয়েছে

আজ জুইস-মুসলিম এক কাতারে দাঁড়িয়েছে


সর্ব পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে

সর্ব পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে


ভাবতেই কষ্ট হয় আমিও বাঙালি

ভাবতেই কষ্ট হয় আমিও বাঙালি


‘তুরস্ক টিকবে তো?’

‘তুরস্ক টিকবে তো?’


মক্কা থেকে…

মক্কা থেকে…


সুবিধাবাদী নেতারা অবহেলিতর কথা বলে না

সুবিধাবাদী নেতারা অবহেলিতর কথা বলে না


‘এই পৃথিবী শিশুদের নিরাপত্তা দিতে অক্ষম’

‘এই পৃথিবী শিশুদের নিরাপত্তা দিতে অক্ষম’