Wednesday, February 7th, 2018
ঈদুল খালেদা, স্টকহোম সিনড্রোম ও মজনু জনতা
February 7th, 2018 at 6:22 pm
ঈদুল খালেদা, স্টকহোম সিনড্রোম ও মজনু জনতা

মাসকাওয়াথ আহসান: একটি মামলার শুনানি চলাকালে মামলার রায় নিয়ে যে কোনো আলোচনা আদালত অবমাননা। আইনের পরিভাষায় একে বলা হয় সাব-জুডিস ম্যাটার।

বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চলমান একটি দুর্নীতি মামলার রায় নিয়ে বিএনপি নেতা ও সমর্থকদের নানারকম আলোচনা শোনা গেলো; মামলার রায়ে খালেদার জেল হলে তারা কী করবে সে সম্পর্কে।

আওয়ামী লীগ ও তার সমর্থকরা খালেদা জিয়ার জেল হয়ে গেছে; এমন বিজয় উদযাপনের ছলে বিএনপিকে কীভাবে প্রতিহত করবে তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করলো।

প্রতিহতের জন্য সরকারের পুলিশ বিএনপি কর্মীদের গণগ্রেফতার শুরু করলো। জনমনে ‘এগুলো গ্রেফতার বাণিজ্য কীনা’ এ নিয়ে সন্দেহের উঁকিঝুঁকি শুরু হলো।

মিডিয়া রীতিমত কীভাবে জেলখানা প্রস্তুত হচ্ছে তার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দেখিয়ে দিলো। টকশোতে খালেদা জিয়ার মামলার এই সাবজুডিস ম্যাটার নিয়ে রীতিমত বিচার-বিশ্লেষণ শুরু করলো।

টান টান উত্তেজনা নেমে এলো ছা-পোষা মানুষের জীবনে। ৮ ফেব্রুয়ারি মামলার রায়ে খালেদার জেল হবার পর কী হয় কী হয় তা নিয়ে শুরু হলো কানাকানি, ফেসবুকাবুকি।

সরকার ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে র‌্যাপিড একশান ব্যাটালিয়ন জড়ো করলো; কেউ খালেদা জিয়ার জেল হবার পর “ঢাকা এটাক” করতে আসছে কীনা তা ঢাকাগতদের ভ্যানিটি ব্যাগে খুঁজে দেখতে।

মিডিয়া ঢাকার সবকয়টি প্রবেশপথ থেকে সরাসরি টিভির চারটি উইন্ডোতে দেখিয়ে দিতে থাকলো র‌্যাবের তল্লাশি অভিযান।

৮ তারিখ বৃহস্পতিবার; অফিস হয় কীনা-না হলেই ভালো-সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে একটা এক্সট্রা দিন পাওয়া গেলো। গৃহকত্রীরা নির্দেশনা দিচ্ছেন, অতিরিক্ত বাজার করে আনতে; কে জানে ৮ তারিখে কী হয়।

উপলক্ষটা ক্রমশই ঈদুল খালেদা হয়ে উঠতে শুরু করলো যেন। অথচ খালেদার বিরুদ্ধে একটি মামলার রায় প্রদানকে ঘিরে ঘটা প্রতিটি পদক্ষেপই আদালত অবমাননা। আদালতের রায়কে প্রভাবিত করতে পারে এমন যে কোনো বক্তব্য; ঘটনাই আদালত অবমাননা। এই অবমাননা বিএনপির নেতা-সমর্থক, আওয়ামী লীগের নেতা সমর্থক, মিডিয়া, সরকার সবাই করে চলেছে। আদালতের এখতিয়ারকে কীভাবে পায়ে মাড়িয়ে গেলো সবাই।

পেশাদার মিডিয়া হলে, ৮ তারিখ সামনে রেখে, জনমনে ভীতিসঞ্চারী কাভারেজ একেবারেই করতো না। কেবল এ বিষয়টিকে অন্যতম শীর্ষ সংবাদ হিসেবে একটি করে প্রতিবেদন প্রচার করতো প্রধান বুলেটিনগুলোতে।

কারণ চলমান রাজনীতির প্রধান মূলধন ভীতিসঞ্চার। এই জুজুর ভয় দলীয় পিকেটাররা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখিয়ে সাধারণ মানুষের অবজ্ঞাই পেয়ে আসছে। মূলধারার মিডিয়ায় ভীতিসঞ্চারী কাভারেজ প্রকারান্তরে ভীতিসঞ্চারী দলীয় ক্যাডার, পুলিশ, র‌্যাবদেরই উপকৃত করে।

দক্ষিণ এশীয় ফ্যাসিস্ট ও ক্ষমতামুখী রাজনীতিতে মামলা, জেল, জামিন খুব স্বাভাবিক ঘটনা। আর দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ যার হাতে জিম্মী হয় তার আনুগত্যে ভালোবাসায় নিপতিত হয়। দলীয় লোকের বাইরের মানুষকেই জিম্মী করে ক্ষমতার কুস্তি লড়ছে রাজনৈতিক দলগুলো। দীর্ঘদিন এদের হাতে জিম্মী থাকতে থাকতে এদের প্রতি ভীতিজনিত আনুগত্য সৃষ্টি হয়েছে সাধারণ মানুষের মনে। জিম্মীকারীর প্রতি জিম্মী হওয়া মানুষের আজগুবি এই ভালোবাসাকে স্টকহোম সিনড্রোম বলে।

ফলে কোনো শীর্ষনেতা জেলে গেলে বা নির্যাতিত হলে স্টকহোম সিন্ড্রোমে আক্রান্ত মানুষ তার প্রতি প্রেমময় হয়ে ওঠে। আবার কোনো শীর্ষ নেতা ক্ষমতায় থাকলে জনগণের মধ্যে তার প্রতি ভালোবাসা লোপ পায়। কারণ তিনি তখন সরকারের দায়িত্বে; ব্যবস্থাপনায় প্রতিদিনের অনাচারের দায় তার। ফলে কারাগারগামী বা নির্যাতিত প্রতিপক্ষের শীর্ষ নেতার প্রতি সহানুভূতির পারদ চড়তে থাকে। এই কারণে এতদঞ্চলে যে সব রাজনৈতিক নেতা কালেভদ্রে জেলে যান; তারা এতে লাভবানই হন।

কাজেই এইসব পুনরাবৃত্তিকর দৃশ্যপটের প্রতিটি পর্বে উতলা হওয়া যে নেহাত সময়ের অপচয়; তা এরিমাঝে জিম্মী জনতার বুঝে ফেলার কথা ছিলো। শিক্ষা-ব্যবস্থায় শিশুদের অর্বাচীন প্রজা করে রাখার সমস্ত অপকৌশল অপরাধীরা প্রয়োগ করে চলেছে; জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ কীভাবে ব্যাংক থেকে লুন্ঠন করছে দুর্নীতিবাজরা; দেশের বাইরে এতো মুদ্রা পাচার হয়ে গেলো; ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের ২০০৮ সালের ব্যক্তিগত সম্পদ, লাইফ স্টাইল আর ২০১৮ সালের ব্যক্তিগত সম্পদ, লাইফ স্টাইলের পার্থক্যটা দেখে বুঝতে হবে; কোন রাষ্ট্রবাস্তবতায় বসবাস করছে জনগণ।

সর্বদলীয় জিম্মীকারীরা সুকৌশলে তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকার ও ক্ষমতায় যাবার কুস্তিতে জিম্মীজনতাকে ব্যস্ত রেখে নিজেদের আখের গুছিয়ে নেয়। অথচ জিম্মীজনতা রয়ে যায় স্টকহোম সিন্ড্রোমে। জিম্মিকারীদের প্রতি এমন অপার সহানুভূতি আর প্রেমের উপাখ্যান যেন লাইলী-মজনুর প্রেমগাথাকেও ছাড়িয়ে গেছে। মজলুম জনতাকে তাই মজনু জনতা বলাই শ্রেয়। মজনু জনতা জীবন দিয়ে বুঝতে পারছে এ প্রেম আত্মঘাতী; তবু নিজেকে রুখতে পারছে না।

লেখক: ব্লগার ও প্রবাসী সাংবাদিক


সর্বশেষ

আরও খবর

পেঁয়াজের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ড

পেঁয়াজের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ড


মিরপুরে খালে পড়ে নিখোঁজ ব্যক্তিকে ৬ ঘণ্টা পর জীবিত উদ্ধার

মিরপুরে খালে পড়ে নিখোঁজ ব্যক্তিকে ৬ ঘণ্টা পর জীবিত উদ্ধার


কুমিল্লার ঘটনায় কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না: প্রধানমন্ত্রী

কুমিল্লার ঘটনায় কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না: প্রধানমন্ত্রী


ফেসবুকে কিডনি বেচাকেনা, চক্রের ৫ সদস্য গ্রেপ্তার

ফেসবুকে কিডনি বেচাকেনা, চক্রের ৫ সদস্য গ্রেপ্তার


সেই ভুয়া অতিরিক্ত সচিবের বিরুদ্ধে মামলা করবেন মুসা বিন শমসের

সেই ভুয়া অতিরিক্ত সচিবের বিরুদ্ধে মামলা করবেন মুসা বিন শমসের


হাসপাতালে ভর্তি হলেন খালেদা জিয়া

হাসপাতালে ভর্তি হলেন খালেদা জিয়া


শান্তিতে নোবেল পেলেন দুই সাংবাদিক

শান্তিতে নোবেল পেলেন দুই সাংবাদিক


কিউকমের প্রতারণায় গ্রেপ্তার আরজে নীরব ১ দিনের রিমান্ডে

কিউকমের প্রতারণায় গ্রেপ্তার আরজে নীরব ১ দিনের রিমান্ডে


আফগানিস্তানে মসজিদে বোমা বিস্ফোরণে আহত শতাধিক

আফগানিস্তানে মসজিদে বোমা বিস্ফোরণে আহত শতাধিক


পাকিস্তানে ভূমিকম্পে কমপক্ষে ২০ জন নিহত

পাকিস্তানে ভূমিকম্পে কমপক্ষে ২০ জন নিহত