Thursday, July 21st, 2016
উপমহাদেশের প্রথম রঙ্গমঞ্চ
July 21st, 2016 at 9:59 pm
উপমহাদেশের প্রথম রঙ্গমঞ্চ

ঢাকা: রঙ্গমঞ্চ স্টার থিয়েটার। ১৩৩ বছর আগে বাংলার অভিনয়, নাটক ও সিনেমা শিল্পকে সঙ্গী করে জন্ম নেয় এই থিয়েটার। যার নাম শুনবার সঙ্গে সঙ্গেই মনে পরে যায় ‘বিনোদিনী দাসী ও গিরিশ্চন্দ্র’র কথা। যাদের হাত ধরে যাত্রা শুরু করে উপমহাদেশের প্রথম থিয়েটার।

রঙ্গমঞ্চ স্টার’র জন্মকথা ও বিনোদিনী-গিরিশ্চন্দ্র’র লড়াই

গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারকে ১৮৮৩ সালের দিকে নতুন করে স্টার থিয়েটার নামে গড়ে তুলেন গিরিশচন্দ্র। কারণ গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারের মালিক ছিলেন একজন অবাঙ্গালী ব্যবসায়ী প্রতাপচাঁদ জহুরী। যিনি থিয়েটারকে ব্যবসা হিসেবেই দেখতেন। তাই তার অধীনে কাজ করা গিরিশ এবং বিনোদিনী কারো পক্ষেই সহজ ছিল না। এই থিয়েটার প্রতিষ্ঠায় গুরমুখ রায় নামে এক ব্যবসায়ী অর্থ সাহায্য করলেও তার থিয়েটার অনুরাগের অনেক খানিই যেন ছিলো বিনোদিনীকে ঘিরে। গুরমুখ রায় বিনোদিনীকে ৫০ হাজার টাকায় কিনে নিতে চেয়েছিল যাতে সে অভিনয় ছেড়ে দেয়। যদিও সে প্রস্তাবে আংশিক রাজী হন বিনোদিনী। কারণ তিনি অভিনয় ছাড়তে রাজী ছিলেন না। অভিনয় না ছাড়ালেও গুরমুখ রায়ের রক্ষিতায় পরিণত হন বিনোদিনী।

Girishchandra

এই ঘটনায় তার পূর্ববর্তী মালিক ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং তিনি লাঠিয়াল দিয়ে নতুন থিয়েটার ভেঙ্গে দিতে চেষ্টা করেন। সেই ধনী জমিদার তলোয়ার হাতে বিনোদিনীর শোবার ঘরে প্রবেশ করে তাকে খুন করতে উদ্যত হন। কিন্তু বিনোদিনীর উপস্থিত বুদ্ধির জোরে সে যাত্রা বেঁচে যান। ১৮৮৩ সালের ২১ জুলাই অবশেষে গিরিশচন্দ্রর লেখা নাটক ‘দক্ষযজ্ঞ’ দিয়ে উদ্বোধন হয় প্রেক্ষাগৃহটি। তবে কয়েক বছর পরে পারিবারিক চাপে গুর্মুখ থিয়েটারের স্বত্ত্ব ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। পরে মাত্র ১১ হাজার টাকার বিনিময়ে স্টারের মালিক হন অমৃতলাল বসু, অমৃতলাল মিত্র, হরিপ্রসাদ বসু ও দাসুচরণ নিয়োগী।

অবশ্য স্টারের দলেই থেকে গেলেন বিনোদিনী। তার জীবনের সেরা অভিনয়গুলো ওই থিয়েটারে মঞ্চস্থ হলেও দলাদলি ও অপমানের কারণে তিনি অবসর নেন সেখান থেকে। ১৮৮৭’র ১ জানুয়ারি ‘বেল্লিকবাজার’ নাটকে রঙ্গিণীর ভূমিকায় অভিনয় করে বঙ্গ রঙ্গমঞ্চ থেকে বিদায় নেন তিনি। বিনোদিনী অভিনয় ছেড়ে দেয়ার অল্প দিন পরে স্টার থিয়েটারও প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। মালিকপক্ষ তখন ৩০ হাজার টাকায় তা বিক্রি করে দেয় ধনকুবের গোপাললাল শীলকে। ওই প্রেক্ষাগৃহে ‘এমারেল্ড থিয়েটার’ নামে নতুন নাট্যদল গঠন করে গোপাল লাল। সেটিও অবশ্য বেশি দিন চলেনি। পরে নানা হাত বদলের মধ্যে দিয়ে এক সময়ে তার নাম হয় ‘মনমোহন থিয়েটার’।

গিরিশ্চন্দ্র কে ছিলেন

গিরিশচন্দ্র ছিলেন এক বাঙ্গালি সংগীতস্রষ্টা, কবি, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যপরিচালক ও নট। বাংলা থিয়েটারের স্বর্ণযুগ মূলত তারই অবদান ১৮৭২ সালে তিনিই প্রথম বাংলা পেশাদার নাট্য কোম্পানি ন্যাশানাল থিয়েটার প্রতিষ্ঠা করেন। গিরিশচন্দ্র প্রায় চল্লিশটি নাটক রচনা করেছেন এবং এরও বেশি সংখ্যক নাটক পরিচালনা করেছেন। জীবনের পরবর্তী ভাগে তিনি রামকৃষ্ণ পরমহংসের এক বিশিষ্ট শিষ্য হয়েছিলেন।

বিনোদিনী’র প্রতিভা 

বিনোদিনী বারবণিতার পরিবেশ থেকে একেবারে ছোট বয়সে বাংলা মঞ্চে অভিনেত্রী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। তার প্রথম অভিনয় ছিল ১২ বছর বয়সে মাত্র মাসিক দশ টাকা বেতনে গ্রেট ন্যাশন্যাল থিয়েটারে শত্রুসংহার নাটকে দ্রৌপদীর সখীর ছোট্ট ভূমিকায়। বেঙ্গল থিয়েটারে প্রথম অভিনেত্রী গ্রহণ করা হয় ১৮৭৩ সালে । এর একবছরের মধ্যেই বিনোদিনী সাধারণ রঙ্গালয়ে যোগ দেন। নাচগানে পারদর্শী বিনোদিনী খুব তাড়াতাড়ি অভিনয়ে দক্ষ হয়ে ওঠেন এবং একজন প্রথম শ্রেনীর অভিনেত্রী হিসাবে খ্যাতি লাভ করেন। ১৮৭৪ থেকে একটানা ১২ বছর তিনি অভিনয় করেছিলেন।  ১৮৮৬ খ্রীষ্টাব্দের ২৫ ডিসেম্বর তিনি শেষবার অভিনয় করেন। এর আগে পর্যন্ত ৫০টি নাটকে তিনি ৬০টিরও বেশি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। কখনো বিষবৃক্ষের কুন্দনন্দিনী কখনোবা সধবার একাদশীর কাঞ্চন। সকল চরিত্রেই ছিলেন দুর্দান্ত।

আরো কিছু গল্প

বাংলা পেশাদারি থিয়েটারে সেই সময়টা ছিল খুবই প্রতিযোগিতামুখী। এখনকার মতো সে যুগেও দর্শক টানবার জন্য থিয়েটার দলগুলি নানা চমক দিত। তেমনই এক চমক দিল অর্ধেন্দুশেখর মুস্তফির মিনার্ভা থিয়েটার। ৩১ জানুয়ারি ১৮৯৭-এ অভিনয়ের পরিবর্তে দেখান হল মিস্টার সুলিভানের ‘animatograph’। বাংলা থিয়েটারে সেই প্রথম বায়োস্কোপের প্রদর্শন। মিনার্ভার দেখাদেখি অমরেন্দ্রনাথ দত্তের ক্লাসিক থিয়েটারও বায়োস্কোপ দেখানো আরম্ভ করে ১৮৯৮-এর ১৯ মার্চ থেকে। আর ২৯ অক্টোবর ১৮৯৮ থেকে সিনেমা দেখানো আরম্ভ করে স্টার থিয়েটার। এই ধারা বজায় ছিল দীর্ঘ কাল। বাংলা রঙ্গমঞ্চের ধারাবাহিক অভিনয় বর্ণনা পাওয়া যায় ১৯১৯ সাল পর্যন্ত। ওই তালিকা থেকে জানা যায় যে ওই সময়ে স্টার থিয়েটারে মাঝে মধ্যেই বায়োস্কোপ প্রদর্শিত হত। প্রেক্ষাগৃহটি তৈরি হয়েছিল পেশাদার থিয়েটারের প্রয়োজনে। গিরিশ ঘোষের ‘নসীরাম’ থেকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘ঘটক বিদায়’ পর্যন্ত প্রথম পর্বের একশো তিন বছরের ইতিহাসের পুরোটাই পেশাদারি থিয়েটারের ইতিহাস। এই শতাধিক বছরে ৮০ বা তারও বেশি বিশিষ্ট নাট্যকারের লেখা প্রায় ২৫০টি নাট্যপ্রযোজনা মঞ্চস্থ হয়েছে স্টার থিয়েটারে।

শেষের শুরু

গত শতকের কুড়ির দশকে (১৯২৫-৩০) ‘নয়া রাস্তা’ সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ (বর্তমানে ওই অংশটির নাম যতীন্দ্রমোহন অ্যাভিনিউ) তৈরির সময়ে ভাঙা পড়ে প্রেক্ষাগৃহটি। থিয়েটার চত্বরে একটি শিবের মন্দির ছিল। রাস্তা তৈরির সময়ে শিবলিঙ্গটিকে রাস্তার পাশে স্থাপন করা হয়। আজও সেটি আছে ওই থিয়েটারের চিহ্ন হিসেবে। ১২ অক্টোবর, ১৯৯১ সালে ভয়াবহ এক অগ্নিকাণ্ডে ভস্মীভূত হয় কলকাতা শহরের ঐতিহ্যমণ্ডিত এই প্রেক্ষাগৃহ। কলকাতা পুরসভা সেটিকে আবার নতুন করে গড়ে তোলে। প্রায় তেরো বছর পর পুনর্নির্মিত স্টার থিয়েটারের দ্বিতীয় পর্ব আরম্ভ হয় ২০০৪-এর অক্টোবরে। পরিকাঠামোর অভাব ও অন্যান্য কারণে সেখানে নিয়মিত ভাবে নাটক মঞ্চস্থ করতে না পারায় শেষমেশ সিনেমা প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নেয় পুর-কর্তৃপক্ষ। সিনেমা দেখানো শুরু হয় ১ নভেম্বর, ২০০৬ থেকে।

নিউজনেক্সটবিডি ডটকম/এসএনডি/টিএস


সর্বশেষ

আরও খবর

বিদায় কিংবদন্তি যুদ্ধ সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক

বিদায় কিংবদন্তি যুদ্ধ সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক


মুজিববর্র্ষে লন্ডনে জয় বাংলা ব্যান্ডের রঙ্গিন ভালবাসা

মুজিববর্র্ষে লন্ডনে জয় বাংলা ব্যান্ডের রঙ্গিন ভালবাসা


গণমাধ্যম, স্বাধীনতা এবং মিডিয়া মালিকানা

গণমাধ্যম, স্বাধীনতা এবং মিডিয়া মালিকানা


তাসের ঘর : দুর্দান্ত স্বস্তিকায় নারীমুক্তি?

তাসের ঘর : দুর্দান্ত স্বস্তিকায় নারীমুক্তি?


অ্যাসাঞ্জকে সতর্ক করল ব্রিটিশ আদালত

অ্যাসাঞ্জকে সতর্ক করল ব্রিটিশ আদালত


অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি সংবাদপত্র শিল্প

অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি সংবাদপত্র শিল্প


করোনায় সাংবাদিক আবদুস শহিদের মৃত্যু

করোনায় সাংবাদিক আবদুস শহিদের মৃত্যু


সংগীতের ভিনসেন্ট নার্গিস পারভীন

সংগীতের ভিনসেন্ট নার্গিস পারভীন


বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ হোসেনের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী সোমবার

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ হোসেনের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী সোমবার


স্বপ্ন বাঁচলেই বাংলাদেশ বাঁচবে

স্বপ্ন বাঁচলেই বাংলাদেশ বাঁচবে