Tuesday, May 28th, 2019
এই কষ্ট হাসিমুখে মেনে নিন!
May 28th, 2019 at 4:14 pm
এই কষ্ট হাসিমুখে মেনে নিন!

মাসকাওয়াথ আহসান:

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন করা। তার এ স্বপ্ন বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। ফলে বাংলাদেশে দিন দিন দুর্নীতি কমছে।

২৭ মে সোমবার অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশনের (ইউএনসিএসি) বাস্তবায়ন পর্যালোচনা পর্বের দশম অধিবেশনে বক্তৃতাকালে তিনি এসব কথা বলেন।


আনিসুল হক

আইনমন্ত্রী বলেন, ইউএনসিএসি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশের নিজস্ব অনেক আইন আছে। ইউএনসিএসিতে তিনি দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭; দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ (২০১৩ সালের সংশোধনীসহ); সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯; তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯; মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২; সরকারি ক্রয় আইন, ২০০৬ সহ বিভিন্ন আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উদাহরণ তুলে ধরেন। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশন গঠনসহ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল প্রণয়ন করার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এ ছাড়া দুর্নীতি প্রতিরোধে ব্যাপকভাবে সচেতনতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশের নয়টি মেট্রোপলিটন শহর, ৬২টি জেলা এবং ৪২১টি উপজেলায় নাগরিক সমাজের মধ্যে স্বচ্ছতা ও সততা কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং এ ধরনের কমিটি সারা দেশের স্কুল, কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গঠন করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার গল্প শুনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই যুদ্ধ ঘোষণার বাংলাদেশ মডেল সম্পর্কে অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে পড়ে। পৃথিবীর নানাদেশ কীভাবে এই যুদ্ধ ঘোষণা করা যায়; সে সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে চেষ্টা করে।

প্রথমেই দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭-এর সুফলভোগীদের খোঁজ-খবর করে। লন্ডনের একটি ভিলায় বসবাস করেন দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭-এর সুফলভোগীর নাতি। একজন বৃটিশ সাংবাদিক দেখা করলে ৪৭-এর নাতি বলে, তোমরা বৃটিশরা বাংলাদেশে অনেক দুর্নীতি করেছো। আমার দাদা বৃটিশ দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্বদেশী আন্দোলন করে বৃটিশ তাড়িয়েছিলো।

বৃটিশ সাংবাদিক ১৯৪৭-এর নাতির বিশাল ভিলা দেখে বলে, বৃটিশরা উপনিবেশ গড়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেই বৃটেনের কিছু দেশপ্রেমিককে ভিলা উপহার দিয়েছিলো।

১৯৪৭-এর নাতি বলে, যুগে যুগে দেশপ্রেমিকেরাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করে; ফলে তারা ভিলা উপহার পেয়েছে। বৃটিশ উপনিবেশ সরিয়ে পাকিস্তান কায়েম করাতে ২২ টি দেশপ্রেমিক পরিবার ভিলা পেয়েছিলো। আমার এক খালাতো ভাই পাকিস্তানের পশ্চিম খণ্ডের পাঞ্জাবে এর চেয়েও বড় ভিলায় থেকে। ওর দাদাও বিরাট দেশপ্রেমিক ছিলেন। বৃটিশের দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ভিলা অর্জন করেছিলেন।

সাংবাদিক পাকিস্তান আমলের ২২ টি দেশপ্রেমিক পরিবারের গল্প শুনে অবাক হয়। কারণ বর্তমান বাংলাদেশে প্রায় ৭৫ হাজারটি দেশপ্রেমিক পরিবারের হিসাব পাওয়া যাচ্ছে।

সাংবাদিক লন্ডনের আরেকটি ভিলায় ১৯৭১ সালের নাতির কাছে যায়। নাতি বলে, পাকিস্তান স্বাধীন হবার পর সে স্বাধীনতার সুফল কুড়িয়েছে গুটিকতক পরিবার। পাকিস্তানিদের উন্নয়নের বালিশ উপহার পেয়েছে তারাই। আর সেসময়ের পূর্ব পাকিস্তানের কৃষক আর শ্রমিককে বঞ্চিত করে অর্থ লুন্ঠন করেছে পশ্চিম পাকিস্তানিরা। ফলে কৃষক-শ্রমিক সর্বোপরি দেশ বাঁচাতে আমার দাদুকে মুক্তিযুদ্ধ করতে হয়েছিলো।

সাংবাদিক খোঁজ করে দেখেছে, ১৯৪৭-এর বেশিরভাগ দেশপ্রেমিকের ভিলা নির্মিত হয়েছে পাকিস্তানে। এখন দেখা দরকার বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত যে পঁচিশ হাজার দেশপ্রেমিক ভিলা নির্মাণ করেছে তারা কারা।

লন্ডনের আরেক ভিলায় গিয়ে সাংবাদিক খুঁজে পায় ১৯৭৫-এর নাতিকে। সে বলে, বাংলাদেশে ভারতপন্থীদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিপ্লব করেছিলেন আমার দেশপ্রেমিক দাদা। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত এই বিপ্লবের সুফল কুড়িয়েছি আমরা। ১৯৯৬ থেকে ২০০২ পর্যন্ত আবার কুড়িয়েছে ভারতপন্থীরা।

–বাংলাদেশে ভারতপন্থী মানে!

–ঐ একটা নাম তো দিতে হয় শত্রুকে চিহ্নিত করতে; ভারতপন্থীরা যেমন আমাদের পাকিস্তানপন্থী বলে শত্রু চিহ্নিত করেছে। সাংবাদিকের মাথাটা চক্কর দিতে থাকে। ভিলা বানানোর জন্য শত্রু চিহ্নিত করার এমন খেলা সত্যিই তুলনাহীন।

দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর যুদ্ধটি যারা করেছিলো এবার তাদের কাউকে খুঁজতে থাকে। পেয়েও যায় ২০০৪-এর এক পুত্রের ভিলা। পুত্র বলে, আমি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের দেশপ্রেমিকের সন্তান। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ভীষণ যুদ্ধ করেছেন আমার বাবা। সাংবাদিক ভিলাটার আলিশান ব্যাপার স্যাপার দেখে দেশপ্রেমের আলিশানতা ঠাহর করে। বুঝতে পারে ২৫ হাজার ভিলা উপহার পাওয়া দেশপ্রেমিকের একটি বড় অংশ এসেছে এই “বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের” দেশপ্রেম থেকে। ২০১০ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত যে বাকি ৫০ হাজার দেশপ্রেমিক ভিলা উপহার পেয়েছে তাদের জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে গভীর আগ্রহ তৈরি হয়।

এক ভিলার সামনে লেটেস্ট মডেলের স্পোর্টসকার থেকে নামে ২০১০ সালের পুত্র। সাংবাদিক তার সঙ্গে কথা বলতে গেলে; সে বলে, আমার বাবা দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে জেল-জুলুমসহ অনেক কষ্ট পেয়েছেন। দেশের জন্য উনার ত্যাগের কথা ইতিহাসে লেখা থাকবে।

সাংবাদিক জিজ্ঞেস করে, তা উনি ভারতপন্থী না পাকিস্তানপন্থী; উনার শত্রুরা উনাকে কীভাবে চিহ্নিত করে।

২০১০ সালের পুত্র ক্ষেপে যায়, বাংলাদেশপন্থী; আমার বুকের মধ্যে বাংলাদেশ, নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে বাংলাদেশ।

–তাও একটু কোন জাতীয়তাবাদের দুর্নীতি বিরোধী যুদ্ধের সারথি যদি জানান।

–অবশ্যই বাঙালি জাতীয়তাবাদ। উন্নয়নের একমাত্র ঠিকানা।

–তা এতো যে উন্নয়ন হলো, তবু কৃষক ধানক্ষেতে আগুন দিচ্ছে; অনাহারি মা সন্তানদের নিয়ে একসঙ্গে আত্মহনন করছে, রেললাইনের পাশে পাওয়া যাচ্ছে তরুণ সাংবাদিকের লাশ, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আমলে পা হারানো সাংবাদিক; যে শহীদ মুক্তিযোদ্ধারও সন্তান; তার পরিবারকে নিজগৃহ থেকে উচ্ছেদ করেছে বাঙালি জাতীয়তাবাদের আমলের সৈনিকরা।

২০১০ সালের পুত্র সাংবাদিককে একটি বালিশ উপহার দিয়ে বলে, এসব উন্নয়নের শত্রুদের অপপ্রচার। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ (২০১৩ সালের সংশোধনীসহ); সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯; তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯; মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২; সরকারি ক্রয় আইন, ২০০৬ সহ বিভিন্ন আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের সুফল শীঘ্রই মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে।

–কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন করে এ কোন উন্নয়ন!

–আপনি একটু ছা-ছপ-ছমুছা খান। আর ভুলে যাবেন না, চীন-জাপান ও এমেরিকার উন্নয়নকালেও সাধারণ মানুষের একটু কষ্ট হয়েছিলো। হাসিমুখে এই কষ্ট মেনে নিলে; এই উন্নয়নের ট্রাফিক জ্যামকে উপভোগ করতে শিখলেই বাংলাদেশ উন্নয়নের এভারেস্ট স্পর্শ করবে।

Bangladesh writer
লেখক: ব্লগার ও প্রবাসী সাংবাদিক

সর্বশেষ

আরও খবর

সবকিছুর সঙ্গে ‘রাজনীতি’ মেশানোর ঘৃণাজীবীরা

সবকিছুর সঙ্গে ‘রাজনীতি’ মেশানোর ঘৃণাজীবীরা


‘ডাক্তার’ আমাদের কাছের আত্মীয়

‘ডাক্তার’ আমাদের কাছের আত্মীয়


আস্থাহীনতা এবং গুজব !!

আস্থাহীনতা এবং গুজব !!


রাঙ্গা-ভাষার পাতকূয়া প্রদাহ

রাঙ্গা-ভাষার পাতকূয়া প্রদাহ


মুক্তিযোদ্ধা বাদল-খোকার চলে যাওয়াঃ মিলনই মৌলিক

মুক্তিযোদ্ধা বাদল-খোকার চলে যাওয়াঃ মিলনই মৌলিক


ঠগীদের সাথে বসবাস

ঠগীদের সাথে বসবাস


ধর্ম: প্রশ্নই জগতের প্রাণপ্রবাহ

ধর্ম: প্রশ্নই জগতের প্রাণপ্রবাহ


অপকর্মের উৎস মাদরাসা!

অপকর্মের উৎস মাদরাসা!


কর্মমুখী শিক্ষার বিকল্প নেই

কর্মমুখী শিক্ষার বিকল্প নেই


অবরুদ্ধ সভ্য চিন্তার স্রোত !

অবরুদ্ধ সভ্য চিন্তার স্রোত !