Thursday, December 8th, 2016
‘এই পৃথিবী শিশুদের নিরাপত্তা দিতে অক্ষম’
December 8th, 2016 at 10:28 pm
‘এই পৃথিবী শিশুদের নিরাপত্তা দিতে অক্ষম’

প্রিয় বন্ধু,

কেমন আছ তুমি? আশা করি ভাল আছ, আর ভাল থাক এই কামনাই করি। বন্ধু তোমাকে লিখতে দেরি হয়ে গেল। মনটা খুব বিক্ষিপ্ত। কিছুতেই একত্রিত করতে পারছিলাম না তাই ল্যাপটপ হাতে নিয়েও রেখে দিয়েছি। ছোট বেলায় আমাদের বাসায় ১২ ইঞ্চি সাদা কাল টেলিভিশন ছিল যা ব্যাটারি দিয়ে চলত। সন্ধ্যা বেলায় যখন অনুষ্ঠান শুরু হত আমি টিভি খুলে বসতাম, আম্মা বকা দিত আর বলত হাত মুখ ধুয়ে পড়তে বস, টিভিতে এখন কিছু নাই।

আমি জানি শুরুতে নাটক বা গানের অনুষ্ঠান নাই। শুরুটা এই জন্য দেখতাম কারণ কোরআন তিলওয়াত হতো, এরপর হতো গিতা বা ত্রিপিটক পাঠ। কোরআন তিলওয়াতের পর তখন বাংলা অর্থ বলা হত না তাই কি বলছে বুঝতাম না। বাকি ধর্ম গ্রন্থ বাংলা অর্থসহ বলত আর শেষে বলত জগতের সকল প্রাণী শান্তি লাভ করুক, আমাদের ইসলাম ধর্মের সালাম’র অর্থও আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হউক। আমি কোন ধর্মের সাথে ইসলামকে মিলাচ্ছি না শুধু এইটুকু বলব ওই কম বয়সে একটা বিষয় বুঝে গেছিলাম, কোনো ধর্ম প্রাণীকুলের অশান্তি চায় না।

আজ যখন মায়ানমার থেকে রোহিঙ্গা মুসলিমদের নির্যাতন করে তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তাদের নির্মম ভাবে হত্যা করা হচ্ছে, আমি বৌদ্ধ ধর্মকে দোষ দিতে পারছি না। এত কথা এই জন্য বললাম কারণ সোশ্যাল মিডিয়া সয়লাভ শুধু বৌদ্ধ ধর্মকে দোষারোপ করে। আমি মানি যারা হত্যা করছে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বা বিতারিত করছে তারা বৌদ্ধ। তারপরও বলব ধর্ম তাদের বৌদ্ধের অহিংসা বানী শিখিয়েছে আর অন্যায় অনাচার তারা নিজেরা শিখেছে। তাই যারা অত্যাচার করে তাদের পরিচয় ধর্ম দিয়ে নয়, তাদের পরিচয় তারা অত্যাচারী। যেমন আইএস শুধু আতঙ্কবাদী, তাদের পরিচয় মুসলিম নয়।

আমাদের সমস্যা হল নিজের বেলায় আমরা যতটা বুঝি অন্যের বেলায় নয়, নিজেদের সুরক্ষা করতে আইএস বা তালিবানকে মুসলিম বলে মানি না। আমরা ভুলে যাই মায়ানমারের রোহিঙ্গা বিষয়ে পুরা বৌদ্ধ জাতিকে দোষারোপ করলে, সাধারণ বৌদ্ধদের নিরাপত্তা নষ্ট হতে পারে, বিশেষ করে বাংলাদেশে। গত বুধবার ৩০ শে নভেম্বর আমরা বাংলাদেশীরা গিয়েছিলাম মায়ানমার কনস্যুলেটের সামনে ঘেরাও কর্মসূচি আর প্রতিবাদ জানাতে। অনেক বক্তা আমেরিকার হস্তক্ষেপ চাচ্ছিল এই বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে, কেউ ট্রাম্পকে আহ্বান জানাচ্ছিল রোহিঙ্গাদের রক্ষা করতে। আমার মনে হচ্ছিল বিলাপ করে কাঁদি! ট্রাম্প! রিয়েলি! যে লোক ক্ষমতায় আসার পূর্বেই মুসলিমদের, রিফিওজিদের বের করে দেওয়ার হুমকি দেয়, তাকে অনুরোধ করে রিফিওজি সমস্যা সমাধানের!

আমাকে কথা বলার জন্য অনুরোধ করেই যাচ্ছিল, আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না কি বলব! অবশেষে গেলাম বলতে। আওয়াজ উপরে তুলে বললাম দুঃখিত আমি আপনাদের মত আমেরিকাকে ব্যবস্থা নিতে বা ট্রাম্প অনুরোধ করতে পারছি না। দুনিয়াতে যত রিফিউজি আছে তার  জন্য দায়ী আমেরিকা, আর সিই আমেরিকা করবে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান!

দুনিয়ার সবচেয়ে বড় অকর্মা সংগঠন জাতিসংঘকে বলছি নিজেদের জন্মকালীন প্রতিজ্ঞাতে ফিরে যেতে আর রোহিঙ্গাদের জন্য কিছু করতে। অনেকে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছিল বর্ডার খুলে দিতে। আমার নিজেরও প্রশ্ন যদি ১৯৭১ সালে ভারত তাদের বর্ডার খুলে না দিত তবে অনেকেই আমরা মারা যেতাম, তবে কেন আজ বাংলাদেশ সরকার এমন নিষ্ঠুর আচরণ করছে?

তোহাইত এর মৃতদেহের ছবি দেথে অনেকেই কাঁদছে। অনেকেই বলছে এই ছবিও সিরিয়ান বেবি আইলান এর মতো, তবে আজ কেন দুনিয়া নীরব?আজ কেন ইয়োরোপ নেতারা রোহিঙ্গা রক্ষার কথা বলছে না। অনেকে বলছে এতো আমার বাচ্চা হতে পারত, অনেকে বলেছে আমার আপনজন হতে পারত। আমার বুকটা কষ্টে ফেটে যাচ্ছে, এ কেমন দৃশ্য! কেমন কষ্ট আমাদের পেতে হচ্ছে! আমার শুধু মনে হচ্ছে ১৯৭১ সালে যদি ভারত সীমান্ত খুলে না দিতো, ইট কুড বি এনি অফ আস হু বর্ন দ্যাট টাইম। আমার নিজের, পরের, বন্ধুর, শত্রুর, কারো সন্তানের এমন মৃত্যু দেখতে চাই না। তোহাইত তুমি ভাল থেকো। তোমার মৃত্যুর জন্য আমরা ক্ষমাপ্রার্থী। এই দুনিয়া তোমাদের নিষ্পাপ শিশুদের জন্য নয়, এই দুনিয়া শিশুদের নিরাপত্তা দিতে অক্ষম। ক্ষমা কর তোহাইত, ক্ষমা কর।

কি বলব বন্ধু এত এলোমেলো মন নিয়ে গুছিয়ে কিছু বলা যায় না।এই দেশে ঘৃণা বিদ্বেষ এর কারণে মুসলিমদের উপর হামলা বেড়েই চলেছে। নিউ ইয়র্কের মত ডেমোক্রেট স্টেটে গত এক সপ্তাহে ঘটে গেল অনেক ঘটনা। গত সপ্তাহে ম্যানহাটন ৬ ট্রেনে ইয়াসমিন নামক ১৮ বছরের হিজাবি মুসলিম মেয়েকে কতগুলি সাদা মাতাল লোক হিজাব ধরে টান দিয়েছে, গালি দিয়ে বলেছে ট্রাম্প বলেছে তোরা আতঙ্কবাদী এই দেশ ছেড়ে চলে যা। তারপর ৪৫ বছর বয়সের সালমা নামক ইজিপ্ট আমেরিকান মহিলা যিনি কিনা নিউ ইয়র্ক মেট্রোতে কাজ করেন, তাকে গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল স্টেশনে সাদা লোক আক্রমণ করেছে। সেও বলেছে তোরা আতঙ্কবাদী, তোদের কোনো অধিকার নেই সিটির জন্য কাজ করার। এখানেই শেষ নয়। এলসকেরি নামক এক মুসলিম হিজাবি অফিসার আর তার ছেলেকে আক্রমণ করেছে ব্রুকলিনের আরেক সাদা, তার বক্তব্যও একই। আজ দিনে মেয়র প্রেস কনফারেন্স করেছে এলসকেরিকে নিয়ে, মেয়র বলেছে আমার অফিসার কোথাও যাবে না, এইটা তার শহর, এইটা তার দেশ। ২০১৪ সালে এই অফিসার সাহসিকতার সাথে ২ জন মানুষের জীবন বাঁচিয়ে মেয়রের কাছ থেকে হিরো উপাধি পেয়েছিল। আজ এই অফিসারের দেশ আমেরিকা নয়! আমি নিজেও একজন হিজাবি, কখন কোন সাদা আধিপত্যবাদীদের শিকারে পরিণত হব কে জানে!

বন্ধু, হাত পা গুটিয়ে সন্ত্রাসীদের শিকার হওয়ার ভয়ে ভীত নই আমরা। আমরা বসে নেই, কাজ করছি রাতদিন, শুধু আত্মরক্ষার জন্য নয়, জনগনের ক্ষমতায়নের জন্য। গত কয়েকদিন পূর্বে আমাদের সদস্যদের সাথে নিয়ে আলোচনা শুরু করি কি করা যায়? সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেই আমরা ঘৃণা মুক্ত অঞ্চল গড়ে তুলব। ঠিক করি ২ ডিসেম্বর আমরা জ্যাকসন হাইটস সাউথ এশিয়ান পাড়া থেকে সমাবেশ ও মিছিল করে এই ঘোষণা দিব যে, এই এলাকা ঘৃনামুক্ত অঞ্চল। দেখতে দেখতে ১০০টিরও বেশী সংগঠন আমাদের সাথে যোগ দেয়। মেয়র অফিসসহ সব সিটি কাউন্সিল সম্মতি ও সংহতি জানাতে এগিয়ে আসে।

আমরা স্টিকার আর পোস্টার ফ্লায়ার এর মাধ্যমে তুলে ধরি কিভাবে প্রতিটা মানুষ এই অবস্থান নিতে পারবে যে এই জায়গা ঘৃনামুক্ত অঞ্চল। প্রায় ২ হাজারের উপর মানুষ শীতের রাতে সমাবেশ এ যোগ দিয়েছে। আমাদের সাথে মিছিল করেছে। ট্রাম্পের সময়ে নির্যাতিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে এমন কোনো গ্রুপ বা জনগোষ্ঠী নেই যারা আসেনি। বন্ধু, আমরা জানি এখানেই শেষ নয়, আমরা আমাদের কাজ শুরু করেছি মাত্র। আমাদের সার্থকতা এখানেই আমরা বিনা লড়াইয়ে জায়গা ছেড়ে দেওয়ার দলে নাই। আমরা অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অটল থাকাদের দলে।

বন্ধু, আমেরিকান আর্মি ঘোষণা দিয়েছে নর্থ ডেকোটা পাইপ লাইন ঘুরিয়ে নিবে, এটি মিসৌরি নদীর উপর দিয়ে আর যাবে না। আজ নর্থ ডেকোটায় তুষার ঝড় শুরু হয়েছে, ভিডিওতে দেখলাম তুষার ঝড়েও হাজার হাজার মানুষ অটল দাড়িয়ে আছে। আন্দোলনকারীরা সরকারের ঘোষণা এখনও বিশ্বাস করছে না, যতক্ষন না তারা নির্মাণ সামগ্রী না সরিয়ে নেয়। সিওক্স উপজাতি আর তাদের মিত্ররা আমাদের আবার দেখিয়ে দিল জনগনের ক্ষমতা কাকে বলে। শুনেছি ওই কর্পোরেশনে সাথে ট্রাম্পের অনেক বড় বিনিয়োগ ছিল। তাই জনগনের বিজয়ের সাথে শুরু হবে ট্রাম্প এর ক্ষমতা গ্রহণ। নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর জয় হউক।

আমি দুঃখিত এই চিঠি শেষ করার পূর্বেই সোশ্যাল মিডিয়ায়র মাধ্যমে আরেকটি মৃত্যু সংবাদ পেলাম। আমি জানি না তুমি শাকিল সাহেবকে চিনতে কি না, তবে আমি তাকে নামে চিনি। নিউইয়র্কের অনেকের প্রিয় পরিচিত মানুষ উনি। রাজনীতি করা মানুষের খারাপ ভাল দুইটি দিক থাকে সেটাই স্বাভাবিক। আমি ওইসব বিষয় নিয়ে কথা বলছি না, শুধু বলব তার শেষ সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টটি দেখে মনে হয় মানুষটি কাউকে ভালবেসে ভীষন কষ্টে ছিল। হয়ত জীবনটাও এই কারণেই দিল বা গেল। কেমন যেন সমব্যাথা অনুভব করছি। বন্ধু, তাই বলে ভেব না ভালবাসার মত তুচ্ছ কারণে আমি মরব! আমি যেন মানুষের কল্যাণের জন্য মরি।

ভাল থাক বন্ধু ভাল থাকুক দেশ ও দেশের মানুষেরা।

ইতি
তোমার বন্ধু যাকে কোনো নামেই ডাকো না

Kazi Fouziaলেখক: মানবাধিকার কর্মী


সর্বশেষ

আরও খবর

আসছে শুভদিন!

আসছে শুভদিন!


আমাদের ঝালমুড়ি দাদা ও গরীবের শ্রেণী সংগ্রাম

আমাদের ঝালমুড়ি দাদা ও গরীবের শ্রেণী সংগ্রাম


জন্মভূমির টান মানসিক কষ্টে ফেলে দেয়

জন্মভূমির টান মানসিক কষ্টে ফেলে দেয়


‘মুসলিম সমাজের বিভাজন বন্ধ করুন’

‘মুসলিম সমাজের বিভাজন বন্ধ করুন’


আজ জুইস-মুসলিম এক কাতারে দাঁড়িয়েছে

আজ জুইস-মুসলিম এক কাতারে দাঁড়িয়েছে


সর্ব পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে

সর্ব পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে


ভাবতেই কষ্ট হয় আমিও বাঙালি

ভাবতেই কষ্ট হয় আমিও বাঙালি


‘তুরস্ক টিকবে তো?’

‘তুরস্ক টিকবে তো?’


মক্কা থেকে…

মক্কা থেকে…


সুবিধাবাদী নেতারা অবহেলিতর কথা বলে না

সুবিধাবাদী নেতারা অবহেলিতর কথা বলে না