Friday, July 22nd, 2016
একদিন ঘরে ঘরে জন্ম নেবে মিতিল
July 22nd, 2016 at 10:17 pm
একদিন ঘরে ঘরে জন্ম নেবে মিতিল

মাহফুজ জুয়েল: ‘আপনারা কি আকাশবাণীতে শিরিন বানুর কথা শুনেছেন?’ তারা বলল যে, ‘হ্যাঁ, আমরা তাঁর কথা শুনেছি৷’ তখন বলা হলো যে, আমাদের সাথে সেই শিরিন বানু আছে৷ সেই সময় আমি খুব সন্দিগ্ধ ছিলাম যে, এতো বড় দলের ভেতরে ছদ্মবেশে একজন মেয়ে আছে, এটাকে তারা হয়তো অন্যভাবে দেখবে৷ কিন্তু আমার পরিচয় জানার পরেই দেখা গেল যে, তারা সবাই আমাকে ঘিরে ধরল৷ তাদের মধ্যে এক বৃদ্ধ পিতা আমার কাছে এগিয়ে এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘মা আমরা আর ভয় করি না৷ আমাদের মেয়েরা যখন আমাদের সাথে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে তখন বিজয় আমাদের হবেই৷’ তাঁর এই কথা শুনে আমি খুব অবাক হয়েছিলাম এবং তখন মনে হয়েছিল যে, সারাদেশের মানুষ কীভাবে স্বাধীনতার জন্য উদ্দীপনা ও উৎসাহ নিয়ে পরস্পরের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে৷

‘মা আমরা আর ভয় করি না৷ আমাদের মেয়েরা যখন আমাদের সাথে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে তখন বিজয় আমাদের হবেই৷’

এটি একটি স্বনামখ্যাত বিদেশি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানু মিতিলের সাক্ষাৎকারের একটি অংশ। পুরুষের ছদ্মবেশে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন মিতিল। ১৯৭১ সালে পাবনা জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভানেত্রী শিরিন বানু মিতিল৷ তাঁর মা সেলিনা বানু বামপন্থী আন্দোলনের প্রথম সারির নেত্রী৷ নানার বাড়ি ছিল এককালে বামপন্থীদের শক্ত ঘাঁটি৷ এমনই রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠেন মিতিল৷

MItil l

মিতিলের দুই চাচাতো ভাই জিন্দান ও জিঞ্জির যুদ্ধের ময়দানে রওনা হয় তাদের মায়ের নির্দেশে৷ এই মায়ের কথা না বললেই নয়৷ তিনি তাঁর ছেলেদের বলতেন, ‘তোমাদের কি মানুষ করেছি ঘরে থেকে অসহায়ভাবে মরার জন্য? মরতে হলে যুদ্ধ করতে করতে মরো৷’ তিনি ছিলেন পাবনা মহিলা পরিষদের আহ্বায়ক কমিটির সভানেত্রী রাকিবা বেগম৷ এমন পরিস্থিতিতে মিতিলও ঘরে বসে থাকেননি৷ শার্ট প্যান্ট পরে কিশোর যোদ্ধা সেজে যুদ্ধে অংশ নেন৷

আজ (২২ জুলাই) সকালে মিতিল আপাকে শেষ শ্রদ্ধা জানালাম আমরা। সম্ভবত ২০০৪ সালে তাঁর সাথে আমার শেষ দেখা হয়েছিল, তাঁর বাসায়। সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম। অডিও রেকর্ডারে তাঁর কথা রেকর্ড করেছিলাম। পরে বাসায় এসে অনেকদিন একা একা সেসব কথা শুনতাম। মনে হতো, আহা! কত কত মানুষ কত কতভাবে এই বাংলাদেশটাকে সম্ভব করে তুলেছিল! কত কত অকুতোভয় শক্তিশালী স্মরণীয় বরণীয় চরিত্র!

Mithil Freedom Fighter

এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, যদি সত্যি সত্যি বাংলাদেশ এক সাগর রক্তের কথা মনে রাখতো, যদি সত্যি মুক্তিযুদ্ধকে বাংলাদেশ শ্রদ্ধা-সম্মান ও গৌরবের বিষয় মনে করতো, যদি সত্যি সত্যি মনেপ্রাণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বর্তমান এবং ভবিষ্যতের পথ ও পাথেয় হিসেবে দেখতে পারতো, তবে এই শিরিন বানু মিতিলও জাতীয় বীর হিসেবে, অসামান্য চরিত্র হিসেবে চিরস্মরণীয় এবং তিনিই বাংলাদেশের সব মেয়েদের আদর্শ হতেন। বাংলাদেশের ঘরে ঘরে সগৌরবে ফ্রেমবন্দি হয়ে থাকতেন। প্রীতিলতার মতো সবাই চিনতেন মিতিলকে। মিতিলের এই শেষযাত্রায় আজ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য রাজপথে ঢল নামতো। দেশজুড়ে শোকাচ্ছন্ন আবহ বিরাজ করতো। তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারের সব মন্ত্রী-এমপি আমলা-কামলা এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও নতশিরে অশ্রুচোখে হাজির হতেন শহীদ মিনারে। কিন্তু দুর্ভাগ্য মিতিলের, সেই বাংলাদেশ হয়নি।

এই বাংলাদেশ মিতিলের বাংলাদেশ নয়, এই বাংলাদেশ ভণ্ড দেশপ্রেমিক আর মুক্তিযুদ্ধ-ব্যবসায়ী সত্যিকারের দেশদ্রোহীদের। কিন্তু আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, এই বাংলাদেশ একদিন মিতিলকে তার যথাযথ সম্মান দেবে। বাংলাদেশ-এর ঘরে ঘরে একদিন নতুন করে জন্ম নেবে এক নতুন মিতিল।

Juwel Mahfuj

লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক


সর্বশেষ

আরও খবর

আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…

আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…


শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি

শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি


বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?


শেখ হাসিনা কতোখানি চ্যালেঞ্জিং এখনো?

শেখ হাসিনা কতোখানি চ্যালেঞ্জিং এখনো?


প্রণব মুখোপাধ্যায় : বিশ্ব-রাজনীতির মহাপ্রাণ

প্রণব মুখোপাধ্যায় : বিশ্ব-রাজনীতির মহাপ্রাণ


দয়া করে ক্রসফায়ারের স্ক্রিপ্টটি ছিঁড়ে ফেলুন

দয়া করে ক্রসফায়ারের স্ক্রিপ্টটি ছিঁড়ে ফেলুন


দক্ষিণ এশিয়াঃ সীমান্তবিহীন এক অবিভাজিত অচলায়তন

দক্ষিণ এশিয়াঃ সীমান্তবিহীন এক অবিভাজিত অচলায়তন


লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ

লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ


লেটস্ কল অ্যা স্পেড অ্যা স্পেড!

লেটস্ কল অ্যা স্পেড অ্যা স্পেড!


পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ

পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ