Saturday, November 5th, 2016
এফবিআই’র আরো একটি নাটক
November 5th, 2016 at 6:53 pm
এফবিআই’র আরো একটি নাটক

প্রিয় বন্ধু,

কেমন আছ তুমি, চিরদিন ভাল থাক বন্ধু। আমি আজকের দিনটা ভালই কাটালাম, সকাল থেকে কতক্ষণ রূপচর্চা, বাড়ি ঘর পরিষ্কার তারপর ফ্রেস হয়ে ব্রুকলিন গেলাম মেম্বেরশিপ মিটিং ছিল। নভেম্বর মাস এসে গেল কিন্তু আবহাওয়া ছিল চমৎকার মনে একটা ফুরফুরে ভাব ছিল। কেন এত আনন্দ লাগছিলো নিজেও জানি না, শুধু বুঝলাম সুখ বড় আপেক্ষিক জিনিস, কখনো অনুভূত হয় কখনো হয় না, কেন এমন হয় কিছু বুঝি না। আমাকে সবাই খুব কট্টর আমেরিকা বিরোধী ভাবে। আমি সারাক্ষণ আমেরিকার সমালোচনা করি। তাই ভাবছি কিছু ইতিবাচক কথাও বলা দরকার, ট্রেনে বসে ভাবছিলাম কি বলা যায়। কথায় বলে না- ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া’ আমার হয়েছে সেই অবস্থা। ট্রেনে আমার ডানে বামে সামনে পিছনে বসে আছে বিভিন্ন দেশের মানুষ সাদা, কাল, হিস্পেনিক, চাইনিজ, এশিয়ান, আফ্রিকা, ইন্দো ক্যারিবিয়ান, আরবিয়ান, রাশিয়ান আর কত দেশের মহাদেশের মানুষ। তাদের কালচার, পোশাক, গায়ের রঙ ও চুলের বিচিত্রতা সব আমাকে মুগ্ধ করে। মানুষের চেয়ে সুন্দর কিছু আমার চোখে নেই আর এত বৈচিত্র আর কোথাও দেখিনি, তাই আমেরিকার এই সৌন্দর্য অবশ্যই আমাকে মুগ্ধ করে, বন্ধু তুমি যদি কখনো আস আমেরিকা আমি তোমার হাত ধরে পুরা নিউ ইয়র্ক চষে বেড়াব তোমাকে মানুষ দেখাব। আজ তোমাকে বড় দেখতে ইচ্ছা করছে কিন্তু কি করব চাইলে তো আর হয় না, জীবনের আর অনেক ইচ্ছার মত এটাও অপূর্ণর তালিকায় পাঠিয়ে দিলাম।

বন্ধু আজ ছিল এখানে হ্যালোইন। রাস্তায় বাচ্চাদের ভিড়, ভুত প্রেত সেজে ভয় দেখিয়ে চকলেট আদায় করার দিন। চারদিকে এত সাজসজ্জা আর আনন্দের ছড়াছড়ি দেখে ভালই লাগে আর বাচ্চাদের ইমোশনকে কাজে লাগিয়ে বেনিয়া ব্যবসায়ীদের মুনাফা ও চোখে পড়ে। আর ব্যক্তিগত ভাবে আমার এই কোমলমতি বাচ্চাদের ভুত প্রেত ড্রাকুলা সাজা ভাল লাগেনা। তবু বাবা মায়েরা এই দিনটা তাদের বাচ্চাদের খুশির জন্য রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় চকোলেট কুড়াতে এটা মন্দ না। আজকের এই পুঁজিবাদের যুগে শিশুরাই সবচে বেশী অবহেলার শিকার।

আজ কথা বলব একটা কেস নিয়ে, কেসটার নাম হল নিউবার্গ ফোর ব্রনক্স টেরোরিজম কেস। নিউবার্গ একটি ছোট শহর। নিউ ইয়র্ক থেকে ৬০ মাইল দুরে অবস্থিত। শহরটিতে বাড়িঘর গায়ে গায়ে লাগানো। ওই শহরের চিত্রে পরিস্কার ফুটে উঠে তার দারিদ্রতা। শহরের বেশীর ভাগ মানুষ দুমুঠো খাবার আর মাথার উপরে ছাদ জোগাড় করতে হিমশিম খায়। একদিন শিকারের খুঁজে ঐ শহরে আসে পাকিস্তানি নাগরিক শাহিদ হুসাইন। বন্ধু তোমার মনে আছে মহাম্মেদ হুসাইন আর আরেফ এর কেসের গুপ্তচর মালিক ওরফে হুসাইন মালিক’র কথা? এই সেই শাহিদ হুসাইন ওরফে মালিক। এফবিআই’র গুপ্তচর আলবেনি মসজিদ সালাম কেসের পরে ২০০৯ সালে নিউ বার্গে আসে ও মসজিদ আল ইখলাককে টার্গেট করে।

শাহিদ হুসাইন কখনো মার্সিডিজ কখনো বিএম ডাব্লিও নিয়ে মসজিদে আসত আর লোকজনকে দেখাত সে খুব বড়লোক। নামাজ পড়তে এসে সে নিজেকে পরিচয় দিত পাকিস্তানের কোটিপতি সে, আমেরিকায় এসেছে ব্যবসার কাজে। গরিব লোকজনকে খাওয়ার জন্য ৫০ ডলার দান করত। ফলে সে সহজেই গরিব অভাবী লোকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়। মসজিদের সব মানুষকে সে জিহাদের কথা বলত, কেউ তার কথায় কান দেয়নি কারণ সবাই জানত সে ইনফরমার বা গুপ্তচর। তখন সে মানুষকে পার্কিং লটে বা রাস্তায় পেলে জিজ্ঞাসা করত জিহাদ সম্পর্কে তারা কি ভাবে। এই ভাবেই একদিন পার্কিং লটে কথা হয় জেমস রেমিটির সাথে, জেমস কাল কমিউনিটির মানুষ। সারাজীবন অভাবের সাথে বসবাস করা ছোটখাট ড্রাগ ডিলারের কাজে জড়িত ছিল। রেমিটি নাইট শিফটে কাজ করত ওয়ালমার্টে। হুসাইন এর টাকার ঝলক সহেজেই তাকে প্রভাবিত করে, ফলে সে হুসাইনের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে বসে।

টানা এক মাস ধরে হুসাইন জেমসের মগজ ধোলাই করে। তারপর সময় আসলে হুসাইন জেমসকে বলে একটি কাজের জন্য ৩ জন মানুষ জোগাড় করতে হবে। বিনিময়ে সে অনেক টাকা পাবে। জেমস নিজেকে এই কাজের যোগ্য প্রমান করতে মিথ্যা বলা শুরু করে যে অনেক বড় বড় অপরাধ করেছে। এরপর গুপ্তচরের নিউবার্গের একটি ভাড়া বাড়িতে গোপন ক্যামেরা দেখতে পেয়ে জেমস কিছুদিন তার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। এপ্রিল ২০০৯ সালে জেমস আবার গুপ্তচরের সাথে দেখা করে। গুপ্তচর জেমসকে ২৫০,০০০ ডলার অফার করে আর রিভারডেল জুইস চার্চে আক্রমণের প্লান করে। ওয়াদা অনুযায়ী জেমস অয়ান্তা উইলিয়াম, ডেভিড উইলিয়াম লাগুরি পাইনকে জোগাড় করে আনে। ডেভিড উইলিয়াম জেমস এর মত ছুটকা ড্রাগ ডিলিং করে জেল খেটেছে। লাগুরি হাইতি থেকে আসা ইমিগ্রেন্ট ছোট অপরাধে একবার জেল খেটে বাইরে এসে কারো সাথে এক রুমের বাসা নিয়ে থাকছিল। সোশ্যাল সার্ভিস এর টাকা পেলে খায়, নইলে ডেলিভারির কাজ করে খাওয়ার টাকা যোগাড় করে।

এই চারজনের মধ্যে লাগুরি সবচে কম বুঝে ও কিছুট অসুস্থ। জেমসের প্রস্তাব গ্রহণ করা এদের সবার জন্য স্বাভাবিক। ডেভিডের ছোট ভাই এর লিভার টিউমার হয়েছিল, ক্যান্সারও হতে পারে ডাক্তার অপারেশনের জন্য অনেক টাকা চায়, যা ডেভিড এর পরিবার যোগার করতে পারছিল না, তাই সে এই ফাঁদে পা দেয়।

পরিকল্পনা হয় তারা জুইস চার্চ ছাড়াও নিউ বার্গ এর কাছে এয়ার বেসে হামলা করবে। অবশেষে মে ২০০৯ এ গুপ্তচর এই চার জনকে ড্রাইভ করে ক্যানেকটিকা নিয়ে যায় রকেট লাঞ্ছার ও বম্ব সাপ্লাই নেওয়ার কন্টাক্ট করতে, সেখানে এফবিআই এর তরফ থেকে নকল সব কিছু তাদের দেখানো হয়। মে মাসের ২০ তারিখ ২০০৯ সালে যেদিন অপরাধকে বাস্তবায়ন করা হয়, গুপ্তচর তাদের আবার ড্রাইভ করে কানেক্টিকা নিয়ে যায়। তারা ডেলিভারি নিয়ে আসে তারপর তাদের ব্রঙ্কস জুইস চার্চ এ নিয়ে আসে, পরিকল্পনা মত তারা একটি ব্রিফকেসে ডিভাইস সেট করতে চেষ্টা করে, জেমস ভুলে যায় কিভাবে সেট করতে বলা হয়েছিল। হুসাইন সব সেট করে দেয়, জেমস ব্রিফকেস ভর্তি প্লাস্টিক ডিভাইস রেখে চার্চ এর সামনে একটি গাড়িতে রেখে আসে। আর বাইরে শয়ের উপর এফবিআই ও পুলিশ অপেক্ষা করে থাকে বম্ব ডিফিউজ করার টিমসহ, যেখানে তারা আগে থেকেই জানত সব নকল।

আমরা টিভি নিউজে আবারো হলিউডের সিনেমার মত বিখ্যাত সন্ত্রাসীদের দেখলাম। পুলিশ প্রধান রে কেলি, মেয়র ব্লুমবার্গ ও সিনেটর চাক সুমার’র পুলিশ ও এফবিআই এর গুন কীর্তন করতে দেখলাম। এই চারজন জিহাদ এর ‘জ’ও জানে না, তারা কেউ গুড মুসলিমও না, গুপ্তচরের সাজানো খেলার প্লেয়ার এরা, যেখানে একটি প্রাণীরও ক্ষতি হয়নি। তারপরও মার্চ ২০১০ সালে সবাই গিল্টি সাব্যস্ত হয়। জুন ২৯, ২০১১ সালে চারজনের ২৫ বছরের সাজা হয়। আদালতে প্রমান হয় সাজানো তারপরও সাজা? হ্যাঁ তাদের মগজে ছিল আমেরিকার ক্ষতির চিন্তা অনেক কষ্টে লক্ষ ডলার খরচ করে তাদের ফাঁদে ফেলে আগে ভাগে ধরে ফেলা হয়েছে একি চাট্টিখানি কথা!

এইচবিও(HBO) নিউবার্গ স্টিং নামে এফবিআই’র রিলিজ করা ভিডিও নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি বানিয়েছে যা বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। যেদিন এই চারজনের সাঁজা হয় আমরা মিছিল করে ফেডারেল কোর্টের সামনে ২০ ফুট ব্যনার ধরে দাড়িয়ে ছিলাম, ২ ঘন্টা পর খবর আসে বিচারক জানে এটা সাজানো তারপরও ২৫ বছর এর সাঁজা হয়। আজও ডেভিড এর মা খালাকে দেখলে কষ্টে বুক ফেটে যায়, রোগ-শোকের সাথে লড়াই আর ন্যায় পাওয়ার লড়ায় করে যাচ্ছে। বন্ধু আমি তোমাকে ডকুমেন্টারি মুভি টির লিঙ্ক দিলাম সময় পেলে দেখ।

আমার মনটা কেমন ভারাক্রান্ত হয়ে গেল তোমাকে নিউ বার্গ কেস এর কথা বলতে বলতে। আজ শুনলাম ঐ শহিদ হুসাইন আরেকটি নতুন কেস বানিয়েছে, আমাদের এত সাবধানতার পরেও কিভাবে এরা মানুষ শিকার করে? সভ্য দেশের এই অসভ্য ব্যবস্থার সাথে আর পারি না। বন্ধু চারদিকে নির্বাচনী হাওয়া, বাংলাদেশী মানুষেরাও পিছিয়ে নেই। মুসলিম ডেমোক্রেট নাম দিয়ে হিলারির প্রচার প্রচারণা চলছে। সাংবাদিক সমাজের বহু সাংবাদিক বাংলাদেশ থেকে এসেছেন নির্বাচন কভার করতে। চারদিকে একটা উৎসব উৎসব ভাব, বাংলাদেশী সমাজের মানুষেরাও ভালই আছে, তাদের সোসাইটির নির্বাচনও হয়ে গেল গত সপ্তাহে। ভাল থাক বন্ধু ভাল থাকুক দেশ ও দেশের মানুষেরা।

ইতি
তোমার বন্ধু যাকে কোন নামেই ডাকোনা

Kazi Fouzia লেখক: মানবাধিকারকর্মী


সর্বশেষ

আরও খবর

মানবিক হও!

মানবিক হও!


সহমর্মিতার জয় হোক

সহমর্মিতার জয় হোক


মহামারীর এই সময়ে মানুষের পাশে থাকুন

মহামারীর এই সময়ে মানুষের পাশে থাকুন


আসছে শুভদিন!

আসছে শুভদিন!


আমাদের ঝালমুড়ি দাদা ও গরীবের শ্রেণী সংগ্রাম

আমাদের ঝালমুড়ি দাদা ও গরীবের শ্রেণী সংগ্রাম


জন্মভূমির টান মানসিক কষ্টে ফেলে দেয়

জন্মভূমির টান মানসিক কষ্টে ফেলে দেয়


‘মুসলিম সমাজের বিভাজন বন্ধ করুন’

‘মুসলিম সমাজের বিভাজন বন্ধ করুন’


আজ জুইস-মুসলিম এক কাতারে দাঁড়িয়েছে

আজ জুইস-মুসলিম এক কাতারে দাঁড়িয়েছে


সর্ব পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে

সর্ব পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে


ভাবতেই কষ্ট হয় আমিও বাঙালি

ভাবতেই কষ্ট হয় আমিও বাঙালি