Thursday, July 9th, 2020
এরকম ভীতিপ্রদ সমাজে নারী নির্ভয়া হবে কী করে
July 9th, 2020 at 4:48 pm
এরকম ভীতিপ্রদ সমাজে নারী নির্ভয়া হবে কী করে

মাসকাওয়াথ আহসান:

ফেসবুকে কোন নারী তার ছবি দিলে; স্বপ্রণোদিত পর্দা-পুসিদার চেকপোস্ট নেমে এসে নারীর শরীর নিরীক্ষণ শুরু করে; আর “এই নারী তার কাছে অধরা” এই অক্ষমতার গ্লানি থেকে তাকে নসিহত করে, কেমন পোশাক পরা উচিত সে বিষয়ে।

এই করোনাকালে সভ্য জগতের পুরুষ যখন করোনা ভ্যকসিন উদ্ভাবনী গবেষণা করছে; তখন অসভ্য সমাজের পুরুষের গবেষণার বিষয়, নারী শরীর ও নারীর পোশাক।

সভ্য সমাজের পুরুষের মস্তিষ্ক জুড়ে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় চিন্তা; কীকরে সভ্যতাকে আরো সমৃদ্ধ করা যায়; সে গবেষণায় বুঁদ সে; সৃষ্টির নেশার চেয়ে আনন্দময় নেশা আর যে নেই। ফলে কালে ভদ্রে তার স্ত্রী বা প্রেমিকা মনে করিয়ে দিলে ‘যৌনতার স্বাস্থ্যপ্রদ ও প্রয়োজনীয়’ চিন্তা তার মাথায় আসে।

আর অসভ্য সমাজের পুরুষের মস্তিষ্ক জুড়ে যৌনচিন্তা; নারীলোলুপতা; লালসার লালামাখা ‘উত্তরণ বিমুখ’ জীবন যাপন করতে করতে তার মাথাটাই যেন যৌন উপাঙ্গে রূপান্তরিত হয়েছে।

অনলাইনে নারীর ছবি ও ভিডিও-র নীচে যৌন অবদমিত পুরুষের মন্তব্য দেখলেই স্পষ্টভাবে বোঝা যায়; কেন দক্ষিণ এশিয়া আজো সব দিক থেকে এতো পিছিয়ে আছে।

আমাদের ওয়েব পোর্টালগুলো কোন রকম মডারেশন বা সেন্সরশিপের ধার ধারেনা; বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। উপমানবের হিটে এলেক্সার দোলনা দুলে উঠলেই রেটিং বাড়ে; তাই বিকৃত পুরুষের যৌনতাড়িত খিস্তিতে ভরপুর মন্তব্যের ঘর গুলো।

স্কুলে-কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়ে-অফিসে; নারী সেরা ফলাফল করে চলেছে। তার তো বিকৃতির জগত নেই। সে ধরিত্রীর মতো নির্মল। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় অসংখ্য সৃজনশীল নারী প্রতিভার মৃত্যু ঘটে বিকৃত পুরুষ সমাজের তাণ্ডবে।

ওয়েব পোর্টালে-সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গালাগালের শতভাগ সাফল্যের দাবীদার পুরুষ। এই পুরুষ লইয়া আমরা কী করিবো!

যেসব পুরুষ নিজের কাজ নিয়ে থাকে; নারীকে বিব্রত করে না; তাকেও নারী সন্দেহের চোখে দেখে পুরুষ সম্পর্কে তার পূর্ব-সংস্কার থেকে। স্কুলে যাবার পথে পুরুষ তাকে অশ্লীল ইভটিজিং করে, স্কুলে কোন কোন শিক্ষক তাকে ‘নম্বর বেশি দেবার’ লোভ দেখিয়ে পরিমলের ফ্ল্যাটে আসতে বলে, বড় হয়ে কর্মস্থলে গেলে কিছু কিছু বস প্রমোশানের লোভ দেখিয়ে ‘লিটনের ফ্ল্যাটে’ ডাকে।

ফলে পুরুষ জগত সম্পর্কে এক তীব্র বিবমিষা তৈরি হয় নারী মনে। গানের শিক্ষক, আমসিপারা শিক্ষক, সংস্কৃতিমামা, খিলাফত মামা এমনকি গাউছিয়া মার্কেটে গা ছুতে চেষ্টা করা টোকাই, চলার পথে বাস খালি হলে ড্রাইভার আর হেলপার তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে; এরকম ভীতিপ্রদ সমাজে নারী নির্ভয়া হবে কী করে!

সারাক্ষণ নারী চিন্তা করে করেই; পুরুষ কোন কাজের কাজ করতে পারে না। গভীর মনোসংযোগ ছাড়া শিক্ষা-গবেষণা-ব্যবসা-উন্নয়ন কিছুই সম্ভব নয়। সারাক্ষণ পাপিয়ার চিন্তা করলে চুরিদারি ছাড়া জীবনে আর কিছুই করা যায় না।

সামাজিক মাধ্যমে যে লোকটি দুদিন হলো সার্টিফিকেট জোগাড় করে; ফর্সা জামা-কাপড় পরে বিরাট অথরিটি হয়ে নারীর পোশাক নির্ধারণ করতে এসেছে; তার মায়ের হয়তো ব্লাউজ পরার সামর্থ্য ছিলো না; মাথায় কাপড় দিতে গিয়ে পিঠ বেরিয়ে যেতো; সে এসেছে পৃথিবীর অন্যান্য নারীদের পর্দা-পুসিদা শেখাতে।

মোশাররফ করিম “ফইন্নির ঘরের ফইন্নি” বাক্যটি বলেন; মনের দৈন্য বোঝাতে। হঠাত টেকাটুকা হলেও মনের যে দৈন্যটি প্রকাশিত হয় অনলাইন মন্তব্যে ঐটিই ফইন্নির ঘরের ফইন্নিশীলতা।

স্বদেশের অনলাইনে নারীকে পর্দা-পুসিদার জ্ঞান দেয়া লোকগুলোই যখন সোনার হরিণের খোঁজে পশ্চিমে যায়; তখন আর তার সাহস থাকে না ওসব দেশের নারীর বিকিনি দেখে দুটি কথা বলার। তখন আর কী করবে স্বদেশের অনলাইনে এসে “বিকৃত মন্তব্যে”-র মাস্টারবেশন করে।

ভারতে সম্প্রতি একটি ফেইক ছবি বের করে অনলাইনে শিবসেনার মাস্টারবেশন ইউনিট মাতৃসম সোনিয়া গান্ধীকে নিয়ে অত্যন্ত আপত্তিজনক কথা-বার্তা বলে চলেছে। বাংলাদেশে মাতৃসম শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে নিয়ে এরকম বিকৃত আচরণ সহসাই আমাদের চোখে পড়ে। পাকিস্তানে মাতৃসম বেনজির ভুট্টো মারা যাবার পরেও তাকে নিয়ে বিকৃত মন্তব্যের খই ফোটে অনলাইনে। এই হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্ধকার মনোজগত; যা অনলাইনের আয়নায় এখন পুরোপুরি ধরা পড়ে গেছে।

যে সব পুরুষ একটি সভ্য-সুন্দর-সবার জন্য আনন্দপ্রদ সমাজের স্বপ্ন দেখে; তাদের নিষ্ক্রিয়তাতেই এই “যৌনবিকৃতির শয়তান”গুলো অনলাইনের দখল নিয়েছে।

অযথা দুর্নীতিবাজ নেতার সম্মান রক্ষায় সাইবার আইনের অপব্যবহার না করে; নারীর সম্মান রক্ষায় সক্রিয় হতে হবে সাইবার ইউনিটকে। সমাজকে নারীর জন্য অনুকূল করে না তুললে; জনসংখ্যার অর্ধেক শক্তি তাদের সামর্থ্য কাজে লাগাতে পারবে না সমাজ ও দেশপ্রগতিতে।

আগে তো অনেক কিছুই চলতো; খোদ হলিউডের ফিল্মেও অফিসের নারী সেক্রেটারির নিতম্বে থাবা বা প্যাট দিয়ে দিতো চুলে জেল দেয়া হিরোইক বস। কিন্তু এখন ওসব অশ্লীল আচরণ নিষিদ্ধ হয়েছে হলিউডে। “হ্যাশট্যাগ মি টু”-র ধাক্কায় হলিউডের সংস্কৃতি মামাদের যৌন বিকৃতির বটবৃক্ষ উপড়ে গেছে।

অনগ্রসর সমাজে কিছু “সহমত নারী” আছে যারা বিকৃত পুরুষ মনের লালবাতি এলাকার মোক্ষদা মাসী হয়ে; নারীর সঙ্গে শত্রুতা করে। পুরুষের কাছে ভালো হতে এইসব দালাল নারী টকশোতে কলতলার বিচার বসিয়ে দলীয় উদ্দেশ্য সিদ্ধি করে। কিছু যোগ্যতাহীন ফাঁপা নারী; সেক্স-পলিটিক্স করে; বসের সঙ্গে শুয়ে-বসে প্রমোশান নেয়। শিক্ষা-কর্ম ও যাপিত জীবনে মেধা-দক্ষতা-যোগ্যতার মূল্যায়নের সংস্কৃতি প্রচলন করা গেলে; এসব ভ্যাম্প নারীর ভ্যাম্পায়ার ক্রিয়াকলাপের অবসান ঘটবে; সেদিন বেশি দূরে নয়।

মাসকাওয়াথ আহসান

সর্বশেষ

আরও খবর

পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ

পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ


‘গণতন্ত্রের ঊষর মরুতে ক্যাকটাস’

‘গণতন্ত্রের ঊষর মরুতে ক্যাকটাস’


ফিরে দেখাঃ এরশাদ

ফিরে দেখাঃ এরশাদ


গুড বাই গোল্ডেন ফাইবার!

গুড বাই গোল্ডেন ফাইবার!


করোনাকালঃ ওল্ড নরমালে প্রত্যাবর্তন

করোনাকালঃ ওল্ড নরমালে প্রত্যাবর্তন


ব্যবসায়ী লতিফুর রহমানের প্রয়াণ ও গণমাধ্যমের সংবাদ পর্যবেক্ষণ

ব্যবসায়ী লতিফুর রহমানের প্রয়াণ ও গণমাধ্যমের সংবাদ পর্যবেক্ষণ


বাংলাভাষীর আপোষের খনি

বাংলাভাষীর আপোষের খনি


মুছে ফেলো দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের বিভাজন রেখা

মুছে ফেলো দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের বিভাজন রেখা


প্রসঙ্গঃ গ্রাম্যতার সংকট

প্রসঙ্গঃ গ্রাম্যতার সংকট


ভালোবাসার বাতিঘর

ভালোবাসার বাতিঘর