Sunday, May 31st, 2020
এ দেশে কেবল মানুষ বাস করে!
May 31st, 2020 at 2:04 pm
এ দেশে কেবল মানুষ বাস করে!

নাভিদ সালেহ;

আত্মমগ্নতা মানুষের একটি আদি স্বভাব। জলে নিজের প্রতিচ্ছবি দর্শনে বিমোহিত হওয়া থেকে নিজের ধর্ম, গোত্র, এমনকি বর্ণ পরিচয়কে পর্যন্ত অক্ষুন্ন রাখাতেই যেন মানবজন্মের সার্থকতা। সেফিসাসের শিকারী সুপুরুষ পুত্র নার্সিসাসকে দুষলেই চলবে কেন? কোন জাতি এ আত্মরতিতে লিপ্ত হয়নি? আদিম যাযাবর গৌষ্ঠীর নিজেকে প্রতিরক্ষার চেষ্টা, কিংবা ফেরাউন অথবা চেঙ্গিস খাঁনের নিজ সাম্রাজ্য বিস্তার–এ সবই তো এক প্রকার আত্মমেহন।

নিজেকে নিয়ে, নিজের গৌষ্ঠীকে নিয়ে এ স্বজাত তৃপ্তির নেশাকে কেবল ছেলেখেলা বলে ভাবলে হবে কি?

নিজেকে বড় করার ভেতর তেমন অমঙ্গলকর কিছু না থাকবারই তো কথা। তবে, স্বপ্রশংসার এই ক্রমাগ্রসরণে যখন অন্য জাতি বা অন্যের বর্ণ বা ধর্মকে খাটো করবার প্রয়োজন পড়ে, তখনই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। রচিত হতে শুরু করে মোটা লাল দাগে বিভাজনরেখা টানা; প্রতিবেশীতে পার্থক্য, মানুষে-মানুষে বিভাজন। মানুষ তার সুকোমল বৃত্তিকে আড়াল করতে পারে অনায়াসে। নিষ্ঠুর, নির্মম পন্থা বেছে নিতে পারে নিজের শ্রেষ্টত্ব প্রচারের চেষ্টায়।

আজ থেকে ১৪ সহস্রাব্দ আগে প্রথম মানব কিন্তু তার আবাসভূমি হিসেবে খুঁজে নিয়েছিল পূর্ব আফ্রিকাকে। আজ কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের এই মহাদেশকে আমরা বিষ্ঠা-গহবর বলে তিরস্কার করি। তাঁরা অচ্ছুৎ, নমঃশুদ্র। পশ্চিমের অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল দেশগুলোতে বাসরত আমরা কুলিন, অভিজাত, ব্রাহ্মণ। কে দাঁড় করিয়েছে এ মানদণ্ড? কার গজকাঠিতে মেপেছি সভ্যতা? কে দিয়েছে আমার প্রতিবেশীকে খাটো করে দেখবার অধিকার?

জর্জ ফ্লয়েড

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্ম এবং বেড়ে ওঠার পরিক্রমা একটি নিখুঁত চিত্র ফুটিয়ে তোলে। কলোম্বাস এই অদেখা ভূমে পৌঁছবার আগের পনের শতকের পৃথিবী ছিল উত্তাল ইউরোপের যুদ্ধে। লেখা হচ্ছিল জোয়ান অব অর্কের বীরত্বগাঁথা, ইতালির গৃহযুদ্ধ-কথা, আর অটোমান সাম্রাজ্য-এর ন্যুব্জ হয়ে পড়ার ইতিহাস।

বিশ্বব্যাপী এ চরম অশান্তির সময়ে যুক্তরাস্ট্রে এক অদ্ভূত সহাবস্থান বিরাজ করছিলো। আদি আমেরিকান গোত্রের মাঝে লড়াই যে বাঁধতো না এমনটি বলা যাবে না। তবে, স্থানীয় গোত্রভিত্তিক সমাজ পথ চলছিল অকপটে। যখন ইতালীয় পরিব্রাজক কলম্বাস জাহাজ ভেড়ান ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে, ইউরোপের অস্হিরতা তখনও স্পর্শ করেনি এ অঞ্চলকে। শতাব্দী পেরোতেই যখন ব্রিটিশ রাজ উপনিবেশ গড়ে এখানে, তাঁরা যেন বর্ণবাদের অসুখ নিয়ে আসেন এ বিশাল মানচিত্রে। উন্নত ইউরোপীয় শাসকদের দিন চালাতে দরকার হয় অর্ধমানবদের, দাসের। কালো অর্ধমানবেরা পণ্যের মতো ক্রিত-বিক্রিত হতে থাকেন। এ দেশে, বর্ণ হয়ে দাঁড়ায় সামাজিক বিভাজন আর শোষনের নতুন অস্ত্র।

মার্কিন সংবিধান লিখবার সময় ওয়াশিংটন আর জেফারসন যদিও দাস প্রথাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন, বর্ণবৈষম্যের ইতিহাস, এ দেশে বেশ দীর্ঘ। সতেরো শতকের শেষের দিকে সুতি শিল্পের উর্ধ্বগতির সাথে সাথে কৃষিপ্রধান আমেরিকার দক্ষিনাংশে দাসদের চাহিদা বাড়ে দ্রুত। দাসপ্রথার নির্মম রীতি যখন অসহনীয় হতে শুরু করে, ন্যাট টার্নার ১৮৩১-এ সফল দাস-বিপ্লব ঘটান। আমেরিকার উত্তরের দাসেরা মুক্ত হতে থাকে। হ্যারিয়েট টাবম্যান-এর মতো এবলিশনিস্টরা দক্ষিণের দাসদের মুক্ত করতে লেগে পড়েন। ১৮৬১-র গৃহযুদ্ধ আর emancipation-এর মধ্য দিয়ে নতুন সকাল দেখতে শুরু করে আমেরিকা। কিন্তু আমেরিকার দক্ষিণাংশে segregation আরো জোড়ালো ভাবে দানা বাঁধে। ১৯২০-র হারলেম রেনেসাঁ যখন শিল্পকলায় উন্নত করে তোলে দক্ষিণের কৃষ্ণাঙ্গদের, দুদশক পরেই তাঁদের প্রয়োজন পড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সৈনিক হিসেবে। কৃষ্ণাঙ্গরা বর্ণের বোঝা, জীবন ত্যাগের মধ্য দিয়ে ঘোচাতে থাকেন যেন। ১৯৫৪ সালের সুপ্রিম কোর্টের শিক্ষা বিষয়ক রায়ে যখন অলিভার ব্রাউন শিক্ষায় সম-অধিকার ছিনিয়ে আনেন, সেদিন সত্যি যেন নব-রবির উদয় হয় গণতন্ত্রের এ মহামন্দিরে। বিক্ষোভের এ প্রহরে দাঁড়িয়ে ইমমেট হিলকে জীবন দিয়ে হয়, রোজা পার্ককে গর্জে উঠতে হয় তাঁর সমঅধিকারের জন্যে। বদলে যেতে শুরু করে

আমেরিকা। “মানুষ বলতে মানুষ শুধু”–বুঝতে থাকে এদেশের সকলে। প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতিও নির্বাচন করে দেশটি।

সত্যি কি গণতন্ত্রের বাতিঘর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্ণবৈষম্যের শেষ দেখেছে ২০০৮-এর ৪-ঠা নভেম্বর? প্রকৃত অর্থেই কি মুক্ত হয়েছে এদেশের মানুষ? সকল মানুষই কি সমান আজ? তবে কি করে ঘটে এমন অমানবিক পুলিশি নির্যাতন? কেন কৃষ্ণ মানুষদের অকারণে জীবন দিতে হবে? কি করে এতো ঘৃণা দানা বাঁধে কারো মনে?

কেন জর্জ ফ্লয়েডদের আত্মত্যাগের পর মিছিলে মিছিলে গর্জে উঠতে হবে বাঁচবার অধিকার প্রতিষ্ঠায়? আমরা মহাবিশ্বে মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করছি, উচ্চস্বরে ঘোষণা করছি যে মানুষ আজ সভ্য হয়েছে। অথচ ক্রোধাগ্নিতে জ্বলছে শহর থেকে শহরান্তর। একেই কি বলে মানবতা? এই কি সভ্যতা? এদেশ কি গণতন্ত্রের সেই আকাঙ্খিত বাতিঘর?

তোমাকে রুখতে হবে। তুমিই হবে মানবতাবাদী। তুমিই ভাঙবে ধর্ম, বর্ণ, আর সামাজিক ব্যবধানের দেয়াল। তুমিই হবে আরেকজন রোজা পার্ক। তুমি আবার অলিভার ব্রাউন হয়ে জন্ম নেবে। তুমিই আবার গর্জে উঠবে “I have a dream” বলে। তুমিই দেখাবে “audacity of hope”। এটি তোমার সড়ক, তোমার শহর, তোমার দেশ। এ দেশে কেবল মানুষ বাস করে।

নাভিদ সালেহ, সহযোগী অধ্যাপক
সিভিল, আর্কিটেকচারাল, এন্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং
ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস এট অস্টিন,
অস্টিন, যুক্তরাষ্ট্র

সর্বশেষ

আরও খবর

এরকম ভীতিপ্রদ সমাজে নারী নির্ভয়া হবে কী করে

এরকম ভীতিপ্রদ সমাজে নারী নির্ভয়া হবে কী করে


গুড বাই গোল্ডেন ফাইবার!

গুড বাই গোল্ডেন ফাইবার!


করোনাকালঃ ওল্ড নরমালে প্রত্যাবর্তন

করোনাকালঃ ওল্ড নরমালে প্রত্যাবর্তন


ব্যবসায়ী লতিফুর রহমানের প্রয়াণ ও গণমাধ্যমের সংবাদ পর্যবেক্ষণ

ব্যবসায়ী লতিফুর রহমানের প্রয়াণ ও গণমাধ্যমের সংবাদ পর্যবেক্ষণ


বাংলাভাষীর আপোষের খনি

বাংলাভাষীর আপোষের খনি


মুছে ফেলো দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের বিভাজন রেখা

মুছে ফেলো দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের বিভাজন রেখা


প্রসঙ্গঃ গ্রাম্যতার সংকট

প্রসঙ্গঃ গ্রাম্যতার সংকট


ভালোবাসার বাতিঘর

ভালোবাসার বাতিঘর


মানুষঃ অসীম ক্ষমায় আর সম্ভাবনায়

মানুষঃ অসীম ক্ষমায় আর সম্ভাবনায়


বর্ণবাদ নিপাত যাক

বর্ণবাদ নিপাত যাক