Monday, August 17th, 2020
ওসি প্রদীপের বিচার ! রাষ্ট্রের দায়!!
August 17th, 2020 at 12:18 am
ওসি প্রদীপের বিচার ! রাষ্ট্রের দায়!!

মোঃ আবদুল কাইয়ুম, নিউ ইয়র্ক

আমি নিই ইয়র্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্টে ইউনিফর্মড এবং সিভিলিয়ান মিলিয়ে ৩ বছর যাবৎ চাকুরীরত আছি। এই তিন বছরে পুলিশের ভিতরের কাজকর্ম, কর্মপন্থা, পুলিশ একাডেমির তিন মাসের প্রশিক্ষণ, সব মিলিয়ে যা দেখেছি, শিখেছি তা বাংলাদশের মানুষের জন্য শেয়ার করতে খুব লোভ হয়। কিন্তু সব তো আর শেয়ার করা যাবে না, আইন আমাকে এলাউ করবে না। তবু নিয়মের মধ্যে থেকে কিছু বলছি।

CPR (Curtesy Professionalism and Respect)

এই সিপিআরের উপর পুরো একটি চ্যাপ্টার পুলিশ একাডেমিতে ট্রেইনি অফিসারদের পড়ানো হয়।একটা কথা বলে রাখি, এখানে এন্ট্রি পয়েন্টই হচ্ছে পুলিশ অফিসার কোন কনস্টেবল পদ নেই।তার পর যার যার যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতা দিয়ে সর্বোচ্চ পদ পুলিশ কমিশনার পর্যন্ত হন।

C=Curtesy : প্রতিটি পুলিশ অফিসারকেই, তিনি যত বড় পদেরই হোন দায়িত্ব পালনকালে, মানে কর্তব্যরত অবস্থায় জনগণ বা যে কারোর সাথেই হোক, সে চোর হলেও কার্টেসি দেখাতে হবে। সোজা বাংলায় ভদ্র ও বিনয়ী ব্যবহার করতে হবে।

P=Professionalism: তাকে অবশ্যই প্রফেশনাল হতে হবে। মানে পেশাদার অফিসার হিসেবে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে। একজন অপেশাদার এবং পেশাদার ব্যক্তির কাজের মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য আছে। তার কাজে সেটা প্রতিফলিত হবে।

R=Respect: দায়িত্ব পালনকালে যে যে ব্যক্তির সাথে তার ইন্টারেকশন হবে সে চোর বা অপরাধি হোক তাকে আগে সম্মান দিয়ে কথা বলতে হবে। কিছুতেই তাকে অসম্মান করা যাবে না। বিচারের দায়িত্ব আদালতের পুলিশের নয়। সে অপরাধি কি না তা প্রমাণ হবে আদালতে।পুলিশের দায়িত্ব তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ করে আদালতে উপস্থাপন করা,বিচার করা নয়।

নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্ট

Curtesy, Professionalism, Respect এই তিনটি শব্দ নিউ ইয়র্ক সিটি পুলিশের প্রতিটি গাড়ির দুই পাশেই বড় করে লিখা থাকে।

পুলিশের কোন অফিসার কাউকে গালি দেয় না। নিজে গালি খেলেও না। পুলিশের কোন কাজে কেউ অসন্তুষ্ট হলে সে সেই অফিসারের নাম এবং ব্যাজ নাম্বার চেয়ে নেয়।কেউ চাইলে তাকে সেটা দিতে বলা আছে। তারপর সেই অফিসারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে। অভিযোগ করলে তা তদন্ত হয়, বিচার হয়। এক বছরে আমার নামে তিনবার অভিযোগ এসেছিল। তদন্ত হয়েছে, দোষী প্রমাণীত হইনি। তবুও অনেক সতর্ক হয়েছি। নিজের কাছেই খারাপ লেগেছে, আমার নামে এত অভিযোগ আসল কেন। দোষ আমার ছিল না, কিন্তু CPR এ কোথায়ও হয়তো ভুল কিছুটা ছিল, সেটা শোধরানোর চেষ্টা করেছি। আর অভিযোগ আসেনি।

কিছুদিন আগে বাংলাদেশে যেদিন সাহেদ ধরা পড়ল তার পরের দিন এক তরুন পুলিশ অফিসার সম্ভবত SI বা ASI হবে, তার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে, “সাহেদ তোর ভাগ্য অনেক ভাল গতকালের অপারেশনে আমি ছিলাম না। থাকলে এতক্ষণে তোর একটা হাত আর একটা পা লুলা হয়ে যেত।” এমেরিকায় হলে ঐ স্ট্যাটাসের জন্য ঐ অফিসারের নিশ্চিত চাকরী চলে যেত। সাহেদ অপরাধী কি না, অপরাধী হলে কতটুকু অপরাধী, তার কি সাজা সবই নির্ধারণ করার দায়িত্ব ও ক্ষমতা একমাত্র আদালতের, কোন অবস্থাতেই পুলিশের নয়। একজন পুলিশ অফিসার কি করে তাকে মেরে হাত পা লুলা করে দেয়ার কথা ভাবতে পারে তার বিচারের আগেই!

বাংলাদেশ পুলিশ

এখন আসি মেজর সিনহা প্রসঙ্গে।

তিনি মেজর পরিচয় দেয়ার পরও কি করে একজন এসআই তাকে গুলি করে হত্যা করে! কি তার অপরাধ ছিল? তিনি যদি সন্দেহভাজন হন তবুও তিনি তো সারেন্ডার করেছিলেন। তাকে গ্রেফতার করতে তো কোন অসুবিধা ছিল না।গুলি করতে হল কেন?

ওসি প্রদীপ টেকনাফে দুই শতাধিক লোককে ক্রসফায়ারে হত্যা করেছে। কই তখন তো কেউ তার বিচার দাবী করেন নি। এখন কেন করছেন? আকরামের মেয়েদের কাঁন্নায় “বাবা তুমি কাঁন্না করছ যে” যখন সারা বাংলাদেশ কেঁদেছিল তখন তো কারোর বিচার করা হয় নি, এখন কেন করা হবে?

হা এখন করা হবে কারন, এখন মেরেছে একজন মেজরকে, মাইনরকে নয়। এখন বিচার হবে কারন এখন মেরেছে একজন এলিটকে, সাধারণকে নয়।এখন প্রধানমন্ত্রী বিচারের জন্য নির্দেশ দিবেন, তখন দেন নি। প্রশ্ন হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তবে কাদের প্রধানমন্ত্রী? তিনি কাদের স্বার্থ দেখেন? বাংলাদেশের সকল মানুষের? মোটেই না। তিনি ধনীদের প্রধানমন্ত্রী গরীবদের নন। তিনি এলিটদের স্বার্থ দেখেন, সকলের নয়।

একটি থানার ওসি ঐ থানার দুই শতাধিক লোককে গুলি করে হত্যা করেছে। এমন নজির কি পৃথিবীর কোন দেশে আছে? একজন ওসির কি এত ক্ষমতা আছে? সে কি তার নিজের খেয়াল খুশিমত এতগুলি লোককে মেরে ফেলেছে? মেরে সে বহাল তবিয়তে আছে? তার উর্ধতনরা কিছুই জানেন না? যার হুকুম ছাড়া বাংলাদেশে গাছের একটি পাতাও নড়ে না, তিনিও কিছুই জানেন না? এত ক্ষমতা এক ওসির? কেউ কি তা বিশ্বাস করেন? যদি না করেন তবে এ দায় কার?

নিশ্চয়ই এ দায় ওসি প্রদীপের নয়।এ দায় সিস্টেমের, এ দায় রাজনীতির, এ দায় রাষ্ট্রের, এ দায় সরকারের। এ দায় রাষ্ট্র এবং সরকার যারা চালায় তাদের।আর প্রধানমন্ত্রীর তো বটেই, যিনি সরকারের প্রধান নির্বাহী।

বাংলাদেশে এখন এটি প্রমাণীত সত্য যে, আইনের চোখে সবাই সমান নয়। বিচার সকলের জন্য নয়। আইন, বিচার, প্রশাসন, রাষ্ট্র, রাষ্ট্রীয় সুযোগসুবিধা সবই ধনী এবং এলিটদের জন্য।সকলের জন্য নয়। এমন একটি রাষ্ট্র খুব বেশীদিন টিকতে পারে না।বাংলাদেশ কি পারবে ?

এমেরিকায় পুলিশের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে। আন্দোলনকারীদের শ্লোগান হচ্ছে, “Black lives matter “ আমি তাদের আন্দোলন নীতিগতভাবে সমর্থন করলেও তাদের শ্লোগানটি মোটেও সমর্থন করি না। Only Black lives are not matter, but every single life is matter. শুধু মেজর সিনহার জীবনই মূল্যবান নয় বরং প্রতিটি জীবনই মহামূল্যবান। এই মহামূল্যবান প্রতিটি জীবনের নিরাপত্তা রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে। না পারলে রাষ্ট্র যারা চালায় তাদের দায়িত্ব ছেড়ে দিতে হবে। অবশ্যই ছেড়ে দিতে হবে।

(মেজর সিনহার মা ও বোনের জন্য গভীর সমব্যদনা। এ শোক সইবার শক্তি যেন তারা পান সেই কামনা।) ভালো থেক প্রিয় বাংলাদেশ। ম্যানহাটান, নিউ ইয়র্ক; আগষ্ট ৯, ২০২০ রবিবার। (আবদুল কাইয়ুম-এর ‘নিউ ইয়র্কের ফুটপাতে’ শিরোনামে লেখা ধারাবাহিকের ১৭৮তম পর্ব)

মোঃ আবদুল কাইয়ুম

সর্বশেষ

আরও খবর

রাজনৈতিক কড়চায় শফী’র মৃত্যু!

রাজনৈতিক কড়চায় শফী’র মৃত্যু!


গণমাধ্যম, স্বাধীনতা এবং মিডিয়া মালিকানা

গণমাধ্যম, স্বাধীনতা এবং মিডিয়া মালিকানা


সীমান্ত জটিলতায় চীন-ভারত  বন্ধুত্ব

সীমান্ত জটিলতায় চীন-ভারত বন্ধুত্ব


প্রসঙ্গ:করোনা কালে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের অমানবিক আচরণ

প্রসঙ্গ:করোনা কালে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের অমানবিক আচরণ


ভোটের ঈমান বনাম করোনার ঈমান

ভোটের ঈমান বনাম করোনার ঈমান


কালের হিরো খন্দকার খোরশেদ

কালের হিরো খন্দকার খোরশেদ


করোনাকালের খোলা চিঠি

করোনাকালের খোলা চিঠি


সিগেরেট স্মৃতি!

সিগেরেট স্মৃতি!


পাঠকের-জনতার ‘মিটেকড়া-ভীমরুল’ এবং একটি পর্ট্রেট

পাঠকের-জনতার ‘মিটেকড়া-ভীমরুল’ এবং একটি পর্ট্রেট


দাদন ব্যাবসায়ী ও মধ্যস্বত্ত্বভোগী ঠেকাও

দাদন ব্যাবসায়ী ও মধ্যস্বত্ত্বভোগী ঠেকাও