Monday, October 31st, 2016
কখনো আমার মাকে
October 31st, 2016 at 10:56 am
কখনো আমার মাকে

(লেখাটা বাংলাদেশ ও ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলকে উৎসর্গ করলাম)

মা সাজ সজ্জা করতেন না। মায়ের সাদা সিধা বেশবাস আমার ভাল লাগত না। আমি চাইতাম মা সুন্দর করে সাজুক, চুল বাঁধুক, গহনা পড়ুক। আমি মাকে কানের দুল, হাতের চুড়ি, গলার চেইন, শাড়ি এসব এনে দিতাম। মা বলত এসব আইনো না। আমি রেগে যেতাম। মা সবকিছু লুকিয়ে লুকিয়ে অন্যকে দিয়ে দিত। মা ঢাকা এসে আমার কাছে থাকুক, মাকে বেড়াতে নিয়ে যাব। শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ, বধ্যভূমি, ৩২ নম্বর রোড, চিড়িয়াখানা, রমনা পার্ক। কতকি মা দেখেনি। মা কোনোদিন টরন্টো দেখেনি, প্যারিস দেখেনি, লন্ডন দেখেনি, নিউইয়র্ক দেখেনি। মাতো কিছুতেই বরিশালের বাড়ি ছেড়ে কোথায় যেতে চাইত না। মা সারাজীবনে মাত্র তিনবার আমার ঢাকার বাসায় এসেছে। কয়দিন গেলেই বলত, জসিম আমারে বাড়ি দিয়া আসো। আমি বলতাম মা আর কয়টা দিন থাকেন। মা বলত তোমারা সবাই অফিসে চইলা যাও আমার ভাল লাগে না। বাড়িতে মা ইচ্ছেমতো চলাফেরা করতে পারে। ঢাকায় বন্দী জীবন। আবার আমি বাড়িতে গিয়ে মায়ের সাথে থাকতে পারি না।

মায়ের গন্ডিটা ছিল খুব ছোট। মা যে বাড়িটায় শেষ দিন পর্যন্ত ছিলেন ওই বাড়িতে আমার বাবাও থাকতেন। মৃত্যুর আগে বাবা ওই বাড়িটা আমাকে দিয়ে যান। বাড়িটা ছিল পুরনো, টিনের। আমি একসময় ঢাকা চলে আসলাম পড়তে । মা ওই বাড়ি ছাড়া অন্য কোথাও থাকবেন না। তাই আমার মেঝভাইর সাথে বন্দোবস্ত করলাম, তিনি এই বাড়িতে মাকে নিয়ে থাকবেন। পাকা বাড়ি করবেন। মায়ের জন্য আমি আমার ভাইয়ের সাথে জায়গা এক্সচেঞ্জ করলাম। মা যতদিন বেঁচে ছিলেন ওই বাড়িতেই ছিলেন। ওই বাড়িতেই মা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।

বাড়িতে মায়ের জন্য একটা ঘর ছিল। এখনও ঘরটা ওভাবেই আছে। মায়ের সেই সুটকেস, দেয়ালে পুরনো ক্যালেন্ডার, মায়ের পানের সরঞ্জাম, বিছনার চাদর, বালিশ, সিলিং ফ্যান, বেতের সোফা, টেবিল, লাল রঙের টেবিল ক্লথ, জানালার পাশে সতেজ পেয়ারার ডাল সবই আছে একই রকম। শুধু মা নেই। যখনই বাড়িতে যেতাম এই ঘরটায় মায়ের পাশে বসে থাকতাম, মায়ের পাশে শুয়ে থাকতাম, মা কত কি বলত, পারস্পর্যহীণ তাও আমি মন দিয়ে শুনতাম। শেষের দিকে মা যখন খুব অসুস্থ্য তখন শুধু চেয়ে থাকত আমার দিকে। আমি যে সুদুর কানাডা থেকে এসেছি মা তা বুঝত না। বলত তুমি জসিম না! আমার ময়না পাখি। তোমারেতো আমি দেখি না! তুমি কোথায় থাক!

সামান্য কারণেও মাকে কাঁদতে দেখেছি। কারো একটা বিপদ হয়েছে- মা কাঁদত। মানুষের জন্য ছিল অসম্ভব দরদ। একটা সামান্য ফলও নিজে খেতো না। বাড়িতে যাকে মনে চাইত তাকে ডেকে ফলটা দিত। সামান্য একটা পেয়ারা তাও রেখে দিত। আমি বাড়ি গেলে ডাবের পানি খেতে দিত। মা জানত আমি ডাব পছন্দ করি। যা যা পছন্দ করি তাই আমার ভাইকে বলত নুরু বাজার থেকে জসিমের লইগ্যা ছোট মাছ নিয়া আসিস। সীম, লাউশাক আর ধুন্দল আনবি। বাইলা মাছ আনতে ভুলিস না। মায়ের হাতে ছিটা পিঠা তো থাকতই। অনেকদিন দেখেছি নিজের পাতের খাবারটাও অন্যকে দিয়ে দিতে। আমি বলতাম মা আপনিতো ঠিকমতো খান না। না খেলে শরীর ভেঙ্গে পড়বে। আমাকে বলতেন, জসিম তুমি খুচড়া টাকা দিয়ে যাবা। আমি পাঁচ টাকা, দশ টাকার বান্ডিল করে দিতাম মাকে। আমি বাড়িতে আসলেই গরীব মানুষরা মায়ের কাছে আসত। এ রকম মানবিক মানুষ আমি আর দেখিনি। সামান্য একটা গান শুনে বা টিভিতে নাটকের দৃশ্য দেখেও যিনি চোখের পানি ফেলতেন। মা যেনো একজন মাদার তেরেসা ছিলেন।

মায়ের জীবনটা ছিল খুব সাধারণ। আমি ছিলাম তার সাধারণ সন্তান। কিন্তু আমাদের স্মৃতিগুলো ছিল অসাধারণ। শামসুর রাহমানের কবিতার মতো বলতে হয়.. “কখনো আমার মাকে কোনো গান গাইতে শুনিনি সেই কবে শিশু রাতে ঘুম পাড়ানিয়া গান গেয়ে আমাকে কখনো ঘুম পাড়াতেন কিনা আজ আর মনেই পড়ে না। যখন শরীরে তার বসন্তের সম্ভার আসেনি, যখন ছিলেন তিনি ঝড়ে আম-কুড়িয়ে বেড়ানো বয়সের কাছকাছি হয়তো তখনো কোনো গান লতিয়ে ওঠেনি মীড়ে মীড়ে দুপুরে সন্ধ্যায়, পাছে গুরুজনদের কানে যায়। এবং স্বামীর সংসারে এসেও মা আমার সারাক্ষণ ছিলেন নিশ্চুপ বড়ো, বড়ো বেশি নেপথ্যচারিনী। যতদূর জানা আছে, টপ্পা কি খেয়াল তাঁকে করেনি দখল কোনোদিন। মাছ কোটা কিংবা হলুদ বাটার ফাঁকে অথবা বিকেলবেলা নিকিয়ে উঠোন ধুয়ে মুছে বাসন-কোসন সেলাইয়ের কলে ঝুঁকে, আলনায় ঝুলিয়ে কাপড়, ছেঁড়া শার্টে রিপু কর্মে মেতে আমাকে খেলার মাঠে পাঠিয়ে আদরে অবসরে চুল বাঁধবার ছলে কোনো গান গেয়েছেন কিনা এতকাল কাছকাছি আছি তবু জানতে পারিনি। যেন তিনি সব গান দুঃখ-জাগানিয়া কোনো কাঠের সিন্দুকে রেখেছেন বন্ধ ক’রে আজীবন, এখন তাদের গ্রন্থিল শরীর থেকে কালেভদ্রে সুর নয়, শুধু ন্যাপথলিনের তীব্র ঘ্রাণ ভেসে আসে।”

টরন্টো, ৩০ অক্টোবর ২০১৬ (আমার মা গন্থ থেকে। প্রকাশিত হবে ২০১৭ বইমেলায়)

capture

লেখক: জসিম মল্লিক


সর্বশেষ

আরও খবর

মহামারী, পাকস্থলির লকডাউন ও সহমতযন্ত্রের নরভোজ

মহামারী, পাকস্থলির লকডাউন ও সহমতযন্ত্রের নরভোজ


ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করুন

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করুন


নাচ ধারাপাত নাচ!

নাচ ধারাপাত নাচ!


মাতৃভাষা বাংলা’র প্রথম লড়াই ১৮৩৫ সালে হলেও নেই ইতিহাসে!

মাতৃভাষা বাংলা’র প্রথম লড়াই ১৮৩৫ সালে হলেও নেই ইতিহাসে!


তারুণ্যের ইচ্ছার স্বাধীনতা কোথায়!

তারুণ্যের ইচ্ছার স্বাধীনতা কোথায়!


সমাজ ব্যর্থ হয়েছে; নাকি রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে?

সমাজ ব্যর্থ হয়েছে; নাকি রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে?


যুদ্ধ এবং প্রার্থনায় যে এসেছিলো সেদিন বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই আমাদের স্বাধীনতা থাকবে

যুদ্ধ এবং প্রার্থনায় যে এসেছিলো সেদিন বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই আমাদের স্বাধীনতা থাকবে


বঙ্গবন্ধু কেন টার্গেট ?

বঙ্গবন্ধু কেন টার্গেট ?


আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…

আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…


শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি

শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি