Friday, July 3rd, 2020
করোনাকালঃ ওল্ড নরমালে প্রত্যাবর্তন
July 3rd, 2020 at 12:49 pm
করোনাকালঃ ওল্ড নরমালে প্রত্যাবর্তন

মাসকাওয়াথ আহসান:

গ্লোব বায়োটেকের করোনা ভ্যাক্সিন ট্রায়ালের খবরটা অনেকদিন পর ঠিকঠাক একটা আনন্দের খবর।

ব্যাপারটা এইজন্য আনন্দের যে; সাধারণত যে খবরগুলোকে আমরা এতোদিন সাফল্যের খবর বলে জেনে এসেছি; ওগুলো যে আশার ছলনে ভুলি ফেইকানন্দ সংবাদ; তা আমরা ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে শিখেছি।

আমাদের এই উপলব্ধির শিক্ষক করোনা। গোটা পৃথিবীর ক্লাসরুমে অখন্ড সিলেবাসে ক্লাস নিয়ে চলেছে এই শিক্ষক। দেশে কমপক্ষে বারোরকম সিলেবাসে এবড়ো থেবড়ো শিক্ষার নামে যে সৌভাগ্যের বরের টোপর পরে কনভোকেশান হয়; বাচ্চারা সেই কবে অক্সফোর্ডে মাথার ওপর ডিগ্রীর টোপর ছুঁড়ে ছবি তুলেছিলো; সেইভাবে ছবি তুলে ফেসবুকে ‘জীবন গড়ে ওঠার আগেই” অযুত আত্মজীবনী শুনি আমরা। তার অন্তঃসারশূণ্যতা প্রমাণ করেছে করোনা বিশ্ববিদ্যালয়।

দেশে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার নামে সরকারি আর কর্পোরেট অফিসের জন্য কেরানি তৈরি; আর দেশের সবচেয়ে বড় বড় দুর্নীতির নেতা ও ফুটসোলজার তৈরি করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে নিযুক্ত উপাচার্য ও তার কথাকলির আসরের প্রোক্টর; কনট্রাক্টররা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মান উন্নয়নের নামে; ক্যান্টনমেন্টের উন্নয়ন মডেলে দেয়ালে ও গাছে চুনকাম করে। যেখানে একটি সাদাকালো সাইনবোর্ডে বিভিন্ন বিভাগের নাম লেখা থাকতো; সেইখানে ফুল-ফল-লতা-পাতার ডিজিটাল বোর্ড লাগালেই দলীয় শিক্ষার কনট্রাকটর মনে করে শিক্ষার মান বেশ উন্নত হলো।

উপাচার্য সারাক্ষণ যুবলীগের দায়িত্ব নিতে আগ্রহী থাকায়; বিশ্ববিদ্যালয়ের যুবকদের নিয়ে ভাবার সময় নেই তার। এইসব লীগীয় শিক্ষা উন্নয়নের মাঝেও যে গুটি কতক শিক্ষক শিক্ষার মান নিয়ে সতত চিন্তা করেন; তাদের দিকে হেলমেট পরে তেড়ে আসে দলীয় বুনো ষাঁড়; কারণ ষাঁড়েরা জানে; যে যত বেশি জানে; তত কম মানে।

সেদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শ্রদ্ধেয় শিক্ষক বলছিলেন, উনি ছাত্রদের মাঝে গবেষণার প্রতীতী দেখেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটের সবচেয়ে উপেক্ষিত খাত হচ্ছে গবেষণা। আর সমাজ; সে-ও গবেষককে জিজ্ঞেস করে, ক্যারে বা-ও চাকরি বাকরি কিছু পাও নাই এখনো।

ঘরে থাকুন

সমাজের কাছে চাকরি মানেই বেনজির পুলিশ কিংবা মশহুর প্রশাসক; চাকরি মানে রোজার ঈদে বড় গাড়ি নিয়ে গ্রামে আসা; কুরবানির ঈদে সবচেয়ে বড় গরুটি কিনে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার সামনে পেড়ে ফেলে সাফল্য উদযাপন। গবেষক ছেলেটি এইসব সামাজিক মচ্ছপে ‘অপরাধী’র মতো লুকিয়ে থাকে; গ্রামে আগত সওদাগরি অফিসের সিক্স ডিজিট দাদা যখন পাড়ার মোড়ে গর্বিত বখতিয়ার খিলজি হয়ে বসে থাকে; গবেষককে তখন লক্ষণ সেনের মতো পাড়ার পেছনের গলি দিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়।

গবেষণা শব্দটি গো ও এষণা থেকে এসেছে। পার্টির গো আর চাঁদাবাজির এষণাতে সমাজ গবেষণাগার এতো সব উন্নয়ন উদ্ভাবন করে যে; সেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ি আমরা।

আমার এক বন্ধুর বড় ভাই বি এ পরীক্ষায় ক্রমাগত ডাব্বা মেরে তার বাবার চক্ষুশূল হয়েছিলো। তাই সে প্রতিদিন বাড়ি ফিরতো একটি চমকপ্রদ সংবাদ নিয়ে। চমকের এই ডেভিড ফিল্ড প্রতিদিন মা-বোনকে তাক লাগিয়ে দিতো; তার রিক্সাওয়ালাকে চড় মারা থেকে এলাকার এমপির সঙ্গে বসে দাবা খেলার সৌভাগ্যের গল্পে।

ফেসবুকে সেই বড় ভাইকে দেখি, বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেবার বারোরকম গল্প নিয়ে হাজির হতে। কোনদিন জিডিপি আটের ঘরে ফাল দিয়ে ওঠার গল্প; কোনদিন বখাটে ছেলের চুল কেটে দেবার বেনজির পুলিশি সাকসেস স্টোরি নিয়ে; কোনদিন ইউএনও আপা পার্কে গিয়ে ছেলে-মেয়েদের ধরে প্রেম না করার থ্রেটের গল্প। আর পদ্মা সেতুর স্প্যান বসানোর গল্প তো আছেই।

করোনাকাল না এলে জানাই হতো না; এই সাকসেস ব্রডকাস্টাররা সেই ভালুকের গল্পের স্বার্থপর বন্ধুটির মতো; যে বন্ধুকে করোনা ভালুকের মৃত্যু মুখে রেখে চার্টার্ড প্লেনের গাছে উঠে পড়ে; সেকেন্ড হোমের সুইমিংপুলে গিয়ে কাতলা মাছের মতো মুখ করে ভেসে থাকে।

করোনাভাইরাসঃ মৃত্যের সংখ্যা বেড়ে ৫৬৩

করোনা এমন একটি সমন্বিত সিলেবাস দিয়েছে যে; কল্যাণ রাষ্ট্র গড়তে ডাব্বা মারা ছাত্রদের প্রতিদিনের চমকের গল্পের স্ট্যাম্প ভেঙ্গে উন্নয়নের বগির খেলোয়ারদের উইকেট পড়ছে টপাটপ।

তাই বিপুল বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখি; মানুষ আজ একটি গবেষণা সাফল্যের ট্র্যায়ালের দিকে আকুল চোখে তাকিয়ে থাকে। এইটুকু বোধ জারিত হওয়াটাই তো অনেক বড় শিক্ষা।

তবে এক শ্রেণীর লোক আছে, ইনবক্সে ক্ষমতাসীন দলের কোন নেতার সঙ্গে কথা হলেই; তখন স্বর্গের হাওয়া দোল দেয়; মন কী যে চায় বলো; যারে দেখি লাগে ভালো; এমন একটা মাদকতায় সে বাস্তব জ্ঞান বিবর্জিত স্তবগান জুড়ে দেয়। গ্লোব বায়োটেকের গবেষণা সাফল্যটিকে জাতীয়তাবাদের পানদানিতে পেশ করে; পতাকার ঘোমটা দিয়ে; দেশপ্রেয়সীর মুদ্রায় সে নেচে বেড়ায়; যা কিছু বিগ; তার সঙ্গে লীগ।

ইউনিভার্সিটি ড্রপ আউট হলেই তো বিলগেটস হয় না; স্কুল পালালেই রবীন্দ্রনাথ হয় না; তাই ফেসবুকে যখন ড্রপ আউট ভাইয়া এসে সব কিছুর সঙ্গে রাজনীতি মেশানোর হালিম রান্না করে; তখন তাকে বোঝাতে হবে; করোনার সঙ্গে-গবেষণার সঙ্গে-শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে-শিক্ষা-বিজ্ঞান ক্রীড়া; লিবেরেল আর্টসের শাখাগুলোর সঙ্গে রাজনীতি না মেশালেই ওগুলো বেঁচে যাবে।

রাজনীতি মানে কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ার প্রক্রিয়া; ইজমের আস্তিন পরে টেকাটুকা লোপাট আর আদর্শের ঠোঁট সেবা নয়।

গ্লোব বায়োটেকের মতো অসংখ্য স্বপ্নচারী প্রতিষ্ঠান-গবেষক অযত্নে অবহেলায় কাজ করে; ৭২ ঘন্টা একটি গবেষণা উদ্ভাবনের চমকে আপ্লুত হয়ে; তিয়াত্তরতম ঘন্টায় গিয়ে আবার শুরু হয়; সহমত ভাইয়ের দলীয় ইতিহাসের বস্তাপচা গল্প আর এশিয়া ও পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম হয়ে পড়া গ্রাম্য বোলচাল।

হিংসুটে সমাজ; আমলাতন্ত্রের লাল-ফাঁস আর হেলমেট ভাইদের হাতুড়ির আঘাতে গবেষণার মৃত্যু হয়; হিন্দি ছবি ‘এক ডক্টর কী মৌত’ (এক ডাক্তারের মৃত্যু)-এর ট্র্যাজেডির মতো।

করোনাকালের মানুষ; সমাজের সোনালি যুগের মূল্যবোধের কাছে ফিরে যাবার শিক্ষা পেয়েছে; সাদাসিধে যে জীবনে পলান সরকার বাউসা গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বই বিতরণ করেন, মহেশ্বর চান্দা গ্রামের কৃষক গবেষণা করে বাম্পার ফলনের রহস্যভেদ করেন; কবি কিংবা গাতক তার নতুন গীতিকবিতা নিয়ে কখন আসবে; সে অপেক্ষায় বসে থাকে চা খানার আকুল শ্রোতারা। নিউ নরমাল নয়; করোনা ওল্ড নরমাল জীবনেই প্রত্যাবর্তন।

মাসকাওয়াথ আহসান

সর্বশেষ

আরও খবর

পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ

পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ


‘গণতন্ত্রের ঊষর মরুতে ক্যাকটাস’

‘গণতন্ত্রের ঊষর মরুতে ক্যাকটাস’


ফিরে দেখাঃ এরশাদ

ফিরে দেখাঃ এরশাদ


এরকম ভীতিপ্রদ সমাজে নারী নির্ভয়া হবে কী করে

এরকম ভীতিপ্রদ সমাজে নারী নির্ভয়া হবে কী করে


গুড বাই গোল্ডেন ফাইবার!

গুড বাই গোল্ডেন ফাইবার!


ব্যবসায়ী লতিফুর রহমানের প্রয়াণ ও গণমাধ্যমের সংবাদ পর্যবেক্ষণ

ব্যবসায়ী লতিফুর রহমানের প্রয়াণ ও গণমাধ্যমের সংবাদ পর্যবেক্ষণ


বাংলাভাষীর আপোষের খনি

বাংলাভাষীর আপোষের খনি


মুছে ফেলো দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের বিভাজন রেখা

মুছে ফেলো দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের বিভাজন রেখা


প্রসঙ্গঃ গ্রাম্যতার সংকট

প্রসঙ্গঃ গ্রাম্যতার সংকট


ভালোবাসার বাতিঘর

ভালোবাসার বাতিঘর