Saturday, March 21st, 2020
করোনাভাইরাসঃ আমি কী করব?
March 21st, 2020 at 1:02 pm
গত পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী মৃত্যুর হার ছিল ইবোলাতে (প্রায় ৫০%) আর সবচেয়ে বেশী ছড়িয়েছিল সোয়াইনফ্লু (H1N1)। সোয়াইন ফ্লুতে শুধুমাত্র এক বছরেই (২০০৯ সালে) ১৪০ কোটি মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল, কিন্তু তাতে মৃত্যুর হার ছিল অনেক কম, মাত্র ০.০৩%।
করোনাভাইরাসঃ আমি কী করব?

নাসের শওকত হায়দার;

আমি একটা হিউম্যানিটারিয়ান এনজিওতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করি যেটার আন্তর্জাতিক খ্যাতি আছে নানা দুর্যোগে মানুষের পাশে দাড়ানোর, এমনকি পশ্চিম আফ্রিকার ইবোলা রেস্পন্সেও। একটা দুর্যোগ পর্যুদস্ত দেশে নিয়োজিত আছি বর্তমানে। কিন্তু সেই দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হবার মুখে, অত্যন্ত দুর্বল চিকিৎসা ব্যবস্থা আর যে কোনদিন সব ধরনের ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাবার আশংকায় সেখানকার সব ভিনদেশি কর্মিদের যার যার দেশে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। আমি গত সপ্তাহেই দেশে ফিরেছি।

ঢাকার বিমানবন্দরে শুধু থার্মাল স্ক্যানার দিয়ে তাপমাত্রা মেপে ছোট্ট একটা ফরম ফিলাপ করে সেই ফরমের নিচের অংশে একজনের স্বাক্ষর আর সীল নিয়ে বিদেশ থেকে প্রত্যাবর্তন করা সবাই বের হয়ে এসেছি। এই অংশটাতে এত ভিড় আর কাজের চাপ ছিল যে উনারা কেউ আগতদের সাথে কথা বলার মত অবস্থায় ছিলেন না। ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার সাথে কথা বলার সময় পাওয়া গেছে কারণ এখানে আসার আগেই ভিড় এবং ওখানেই বেশী মানুষ আটকে ছিল। উনাকে জিজ্ঞেস করলাম “আমাকে কি কোয়ারেন্টাইনে নিবে নাকি বাসায় গিয়ে সেলফ-কোয়ারেন্টাইনে থাকব?” উনি আমার পেশার কথা, কোন দেশ থেকে এসেছি জেনে সময় নিয়ে কথা বললেন “শুধুমাত্র লক্ষন যাদের আছে তাদেরকেই কোয়ারেন্টাইনে নেয়া হচ্ছে, বাকিদের বাসায় চলে যেতে বলা হয়েছে। আপনার যেহেতু কোন লক্ষন নাই, বাসায় চলে যান।”

“বাসায় চলে গেলে, তারপর কী করতে হবে?” জানতে চাইলাম।

“কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন”, সরল জবাব।

বুঝলাম এর বেশী উনি জানেন না। না জানলে অবাক হওয়ার কিছু নাই। কয়জন জানে কোয়ারেন্টাই, সেলফ-কোয়ারেন্টাই, স্যোশাল ডিস্টেন্সিং, আইসোলেশন, লকডাউন সম্পর্কে? শুধু ইমেগ্রেশন কর্মকর্তা না, জেলা বা উপজেলা প্রশাসনের কয়জন বিষয়গুলো সম্পর্কে জানেন? অথচ উনাদেরকেই এগুলো  পর্যবেক্ষনের দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। আর বিদেশ থেকে ফেরা মানুষের কথা বাদই দিলাম।  বিদেশ থেকে মানুষের ফেরা কি বন্ধ করা যাবে? আমাদের কয়েক লক্ষ মানুষ নানা দেশে শ্রম দিচ্ছে, তারা কেউ কেউ দুই/চার বছরে একবার ছুটি পায়, কারো বা চুক্তিরে মেয়াদ শেষ, কারো কোম্পানি তাদের দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে নানা কারণে (যেমন আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছে নিরাপত্তার কারণে)। আবার কেউ কেউ ইতালির মত দেশ থেকে ভয়ে চলে আসছেন। সেলফ/হোম-কোয়ারেন্টাইন না মানার জন্য আমরা তাদের দোষ দিচ্ছি, জরিমানা করছি। অথচ তারা জানেই না বিষয়টা কী, পদ্ধতিটাইবা কি!

“কোয়ারেন্টাইন”, “সেলফ/হোম-কোয়ারেন্টাইন”, “স্যোশাল ডেস্টেন্সিং” কেন এবং কিভাবে করতে হবে, “কী করা যাবে, কী করা যাবেনা” এমন প্রচারপত্র তৈরী করা খুব একটা সময়ের ব্যাপার না, চাইলে একদিনেই সম্ভব। সেটাতে লেখার পাশাপাশি ছবিও থাকা দরকার যাতে সব শিক্ষাগত যোগ্যতার মানুষ সমানভাবে বুঝতে পারে। এর একটা কপিতে বিদেশ থেকে আগতরা স্বাক্ষর করে আরেক কপি সাথে করে নিয়ে যাবে। এছাড়া এটা ব্যাপকভাবে প্রচারও করা যায় সবার জন্য। জেলা-উপজেলা প্রশাসনকে এই বিষয়ে প্রশিক্ষন বা ওরিয়েন্টেশন দিতে হবে, এর জন্য স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ভিডিও কলে অথবা একটা ভিডিও তৈরি করে সব কর্মকর্তাদের কাছে পাঠিয়ে দিতে পারেন। ডিজিটাল ব্যাবস্থার যথাযথ ব্যবহার করা দরকার। আর টিভি বা পত্রিকাতেও প্রচার করা দরকার, প্রয়োজনে মাইকিং করে প্রচার করা যেতে পারে।

বাসায় ফিরে আমি নিজে কিভাবে নিজেকে কোয়ারেন্টাইন করছি তা একটু খুলে বলতে চাই। আমার মা’র বয়স সত্তরের উপর, আমি আসার আগেই উনাকে বোনের বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে ১৪ দিনের জন্য। আমি একটা রুমে এসে ঢুকেছি, আমার স্ত্রী বা সন্তানরা আমার কাছে আসছে না। অন্ততঃ ৬ ফিট দূর থেকে কথা বলছে;  জানালার কাঁচের বাইরে থেকে ইশারা করছে কিংবা ভিডিও কলে কথা হচ্ছে। এই অংশটাই আমার জন্য সবচেয়ে  কঠিন, অনেকদিন পরে বাড়ি ফেরা সত্ত্বেও আমার ছোট সন্তানগুলো আমার কোলে আসতে না পেরে খুবই অস্থির হয়ে আছে। কিন্তু তাদের নিরাপত্তার খাতিরেই আমরা তাদেরকে আমার থেকে দূরে থাকতে বাধ্য করছি। আমার জন্য খাবার বা অন্য দরকারি জিনিস এই রুমের দরজার সামনে রেখে যায়, আমি রুমে নিয়ে আসি। খাওয়া শেষ হলে থালা-বাটি দরজার বাইরে রেখে দেই, সেখান থেকে নিয়ে গিয়ে তক্ষনি ধুয়ে ফেলে, আর ধোয়া শেষে সাথে সাথে আবার হাত ধুয়ে নেয়। যেখানে খাবারের ট্রেটা রাখছি, সাথে সাথে সেটিও সাবান পানি বা হেক্সাসল দিয়ে মুছে ফেলা হচ্ছে। ট্রেটা নিয়ে যাবার সময় যদি পর্দা বা জামা কাপড়ের ছোঁয়া লাগে তবে সাথে সাথে সেগুলো বদলে  ডিটার্জেন্ট পাউডারে ভিজিয়ে রাখা হচ্ছে। আমরা সাধ্যমত চেষ্টা করছি সাবধান থাকবার। আমি এই রুমের বাথরুম একাই ব্যবহার করছি। কিন্তু এমন সুযোগ হয়ত সবার নাও থাকতে পারে।

আমাকে যদি বাড়ির অন্যদের সাথে বাথরুম শেয়ার করতে হত, তাহলে আমি বাকিরা ঘুম থেকে উঠার  আগে বাথরুম সেরে আসতাম আর আমি বের হলে বলতাম বাথরুম ধুয়ে তারপর অন্যদের ব্যবহার করতে হত। টাওয়েল, টুথব্রাশ, টুথপেস্ট, টয়লেট পেপার সহ যা যা আমি স্পর্শ করব, সেগুলা আমার রুম  থেকে নিয়ে ব্যাবহার শেষে আবার ফিরত নিয়ে আসতাম। এতুটুকু আমার মনে হয় সবাই করতে পারবে, করতেই হবে এবং এতে খুব বেশি খরচ হবে না, তাই সবার সামর্থ্যের মধ্যেই থাকবে। যা নিয়ন্ত্রন করতে হবে তা হল অবহেলা। এটা অবহেলা করা যাবেনা, তাতে আমার পরিবার সবার আগে আক্রান্ত হবে। ১৪  দিন পার হবার পরে বোঝা যাবে আমি বিদেশ থেকে এই ভাইরাস বহন করে  এনেছি কিনা। কিন্তু যদি পজিটিভ হয় তবে কোয়ারেন্টাইন করার ফলে আমার থেকে আমার পরিবার ও প্রতিবেশিরা নিরাপদ থাকবে।তারমানে এই না যে আমি বাকিদের থেকে নিরাপদ। আমার এক ভাগ্নি ইউরোপে ছিল, পাসপোর্ট চুরি হয়ে গেছে ব্যাগের সাথে, তাই কানাডায় (যেখানে সে থাকে, চাকরী করে) ফিরতে পারিনে, বাংলাদেশে আসতে বাধ্য হয়েছে। সেও মিরপুরে তাদের ফ্ল্যাটে সেলফ-কোয়ারেন্টাইনে আছে সাথে এক খালাকে নিয়ে। সেও সেলফ-কোয়ারেন্টাইনের সব বিধি-নিষেধ পুরোপুরি মেনে চলছে। তাদের যত বাজার সদাই সব কেনাকাটা করে ফ্ল্যাটের দরজার সামনে রেখে আসা হচ্ছে।

স্যোশাল ডিস্টেন্সিং বা সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখা আরেকটা বাধ্যতামুলক কাজ এমন সময়ে। সেটা করার জন্য আমাদেরকে ভিড় এড়িয়ে চলতে হবে, যতটা সম্ভব। বাজারে বা অফিসে কমপক্ষে ৬ ফিট বা ৪ হাত মত দুরত্ব বজায় রাখতে হবে। পার্টি, সমাবেশ, দাওয়াত, আড্ডা বন্ধ করতে হবে।

সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮  (২০১৮ সনের ৬১ নং আইন) এর ২৪ তম ধারাঃ সংক্রামক রোগের বিস্তার এবং তথ্যগোপনের অপরাধ ও দণ্ডঃ

(১) যদি কোনো ব্যক্তি সংক্রামক জীবাণুর বিস্তার ঘটান বা বিস্তার ঘটিতে সহায়তা করেন, বা জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও অপর কোনো ব্যক্তি সংক্রমিত ব্যক্তি বা স্থাপনার সংস্পর্শে আসিবার সময় সংক্রমণের ঝুঁকির বিষয়টি তাহার নিকট গোপন করেন তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

(২) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন কোনো অপরাধ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনূর্ধ্ব ৬ (ছয়) মাস কারাদণ্ডে, বা অনূর্ধ্ব ১ (এক) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

কম শিক্ষিতদের কথা বাদই দিলাম উচ্চ শিক্ষিত কতজন এই আইনটার কথা জানি আমরা?  

কোয়ারেন্টাইন বা সেলফ-কোয়ারেন্টাইন না মানা যে এই আইনের আওতায় অপরাধ, সেটা কি উনারা জানেন?? অপরদিকে এই আইনের আওতায় সংক্রামক রোগের তালিকা ৪ ধারা তে “করোনাভাইরাস” এর নাম নাই, কিন্তু ৪ এর (ভ) তে বলা আছে “সরকার কর্তৃক, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, ঘোষিত কোনো নবোদ্ভূত বা পুনরুদ্ভূত (Emerging or Reemerging) রোগসমূহ।” তাই, করোনাভাইরাসকে “সংক্রামক ব্যাধি” ঘোষনা করে এই আইনের আওতাধীন করতে হলে গেজেট প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে। ডিসেম্বরে চীনে শুরু হবার পরে, জানুয়ারীতে কয়েকটা দেশে ছড়িয়ে পরার পরে বা এমনকি ফেব্রুয়ারীতেও এই প্রজ্ঞাপনটা জারি করা হয়ে উঠে নাই এখনো!

যতদিন এই ভাইরাস পুরোপুরি নির্মুল না হয় ততদিন পর্যন্ত আমাদের ঘন ঘন হাত ধুতে হবে যে কোন  সাবান দিয়ে, বরং কাপড় কাঁচার সাবান হলেই ভালো। নাকে মুখে হাত দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।  এটা করা খুব কঠিন। সারা পৃথিবীর সব মানুষই ঘনঘন নাকে-মুখে হাত দেয়, সমীক্ষায় দেখা গেছে ঘন্টায় কমপক্ষে ৪ বার, গড়ে ২৩ বার একজন মানুষ নিজের নাকে-মুখে হাত দেয়। কিছুদিন আগে আমেরিকার সিডিসির একজন পরিচালক সংবাদ সম্মেলনে “আজ থেকে আমরা শপথ নেই ঘন ঘন হাত ধোয়ার আর  নিজের নাকে-মুখে হাত না ছোঁয়াবার” বলার এক মিনিটের মাথায় নিজেই কাগজ উল্টাবার জন্য আংগুল জিভে লাগিয়েছিলেন। তাই বুঝা যাচ্ছে এই আচরন বদলানো সহজ না। তাই বরং আমাদেরকে ঘন ঘন  হাত ধোয়ার ব্যাপারেই মনযোগ দিতে হবে।

কোয়ারেন্টাইন মানে হল “আশংকায় বা ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের বাকিদের থেকে আলাদা করে রাখা”। এই ভাইরাসটা নতুন, এর স্বভাব চরিত্র এখনও পুরাপুরি জানা যায়নি। কিন্তু এতুটুকু বোঝা গেছে যে এই ভাইরাসে আক্রান্ত (ইনফেক্টেড) হবার ১০ থেকে ১২ দিন পরে এর লক্ষনগুলা দেখা দেয়। তাই বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থা বলেছে ১৪ দিন পর্যন্ত আশংকায় বা ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের কোয়ারেন্টাইন করে রাখতে। ১৪ দিনে বুঝা যাবে তিনি আক্রান্ত নাকি না। না হলে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে। তাই যাদেরকে কোয়ারেন্টাইন করা হচ্ছে, তাদেরকে যখন বাড়ি যেতে দেয়া হচ্ছে তারমনে এই না যে তিনি এখন সুস্থ্য বা তিনি সেরে গেছেন, আসলে তার মানে হল এখন পর্যন্ত তিনি আক্রান্তই হন নাই।

সরকার খুব সহজেই কোয়ারেন্টাইন সেন্টারের মান ও কার্যকারিতা উন্নত করতে পারে। ঢাকা শহরে অনেক আবাসিক হোটেল আছে, তার তালিকা তৈরী করে, কোন হোটেলে কত সংখ্যক আসন আছে তা জানা সরকারের জন্য খুব সহজ। এরপরে আগামি একমাসে আনুমানিক কতজনকে কোয়ারেন্টাইন করতে হবে তার একটা অনুমান করা সম্ভব বিমানবন্দরের পরিসংখ্যান আর এপিডেমিওলজিস্টদের  উপদেশ অনুযায়ি। সেই আনুমান মত কয়েকটা হোটেল মাস হিসাবে ভাড়া নিয়ে নিতে হবে। তারপর সেখানকার স্টাফ দেরকে (ক্লিনার, বেল বয়, সার্ভিস) ডাক্তার ও স্বাস্থ্য কর্মিদের দ্বারা প্রশিক্ষন দিতে হবে। এরপর হোটেলে একজন প্রশাসক নিয়োগ দিতে হবে, এক্ষেত্রে সামরিক পোশাক পরিহিত একজন হলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যাবে বলে আমার মনে হয়। প্রতিটা হোটেলে পালাক্রমে দশজন পুলিশ নিয়োজিত করতে হবে এবং তাদেরকেও প্রশিক্ষন দিতে হবে। খাট, বিছানা সহ অন্যান্য সামগ্রী কিনে  সরকারের সময় বা পয়সা খরচ করার কোন প্রয়োজন নেই, এজন্যই হোটেল ভাড়া নেয়া সবচেয়ে সহজ, অন্যান্য দেশও তা’ই করছে। নিয়োজিত প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে কোয়ারেন্টাইনে আসা সকল নতুন মানুষদের সেন্টারের নিয়ম-নিতি ওরিয়েন্ট করা হবে, রেজিস্টারে তোলা হবে। এরপর প্রতি বেলায় পার্শ্ববর্তি রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার ও পানি আসবে এবংপ্লেট গ্লাস সেন্টারে ধুয়ে রেস্টুরেন্টে ফেরত যাবে। প্রাথমিক ভাবে বিভাগ বা জেলা অনুযায়ি হোটেল বরাদ্দ হোক, কিন্তু পরবর্তিতে, যদি এই ভাইরাস বিশ্বব্যাপি এবং দেশব্যাপি আরও খারাপ দিকে যায় তাহলে বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে হোটেল ভাড়া নেয়ার কথা সরকার ভেবে দেখতে পারে। এই আয়োজন করা হলে বিদেশ থেকে আগত প্রত্যেককে বাধ্যতামূলক ভাবে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইন করে তারপর বাড়ি যাবার অনুমতি দেয়া শুরু করতে পারবে। এই পন্থা অবলম্বন করলে বিদেশ থেকে শখ করে দেশে ফেরা বন্ধ হবে আর যারা বাধ্য হয়ে ফিরছেন, তারা নিরাপদ সে ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে বাড়ি যেতে পারবেন। সারা দেশের মানুষের আতংক ৯৯% কমে যাবে।

করোনাভাইরাস দেশব্যাপি ছড়িয়ে পরার আশংকা আছে কারণ এতদিন দেশে যারা ফিরত এসেছেন  তাদেরকে কোয়ারেন্টাইন না করেই বাড়ি যেতে দেয়া হয়েছে এবং অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতার জন্য তারা জনগনের সাথে মেলামেশা করে বেড়াচ্ছেন। একজন দিনে যদি মাত্র দশজনের সাথে মিশেন, তাহলে সেই দশজন সেই একই দিনে আরও অন্তত দশজনের সাথে মিশেছেন। অর্থাৎ বিদেশ থেকে মাত্র একজনও যদি ভাইরাস নিয়ে আসেন তাহলে প্রথম দিনেই তিনি একশজনের মাঝে সেটা বিলানোর ক্ষমতা রাখেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত মাত্র ১৪ জন সনাক্ত হয়েছে যেটা আশ্চর্য রকম কম! পত্রিকার খবরে যা দেখেছি তাতে তো ধারনা হয়েছিল যে বিদেশ থেকে আসা শুধু আমি আর আমার ভাগ্নি ছাড়া বাকি সবাই মজা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারমানে তারা প্রতিদিন অন্ততঃ পঞ্চাশজনের সাথে মিলিত হচ্ছেন, যাদের প্রত্যেকেই অন্ততঃ অন্য দশজনের সাথে মিশছেন। তারমানে বিদেশ থেকে যদি শুধুমাত্র একজন এই ভাইরাস নিয়ে আসেন, তাহলে প্রথম একদিনেই অন্ততঃ পাচশ লোকের মাঝে সেটা ছড়ানোর কথা। অথচ মাত্র ৩৪১ জনের স্যাম্পল পরীক্ষা করা হয়েছে আর মাত্র ১৪ জনের মধ্যে করোনাভাইরাস পাওয়া গেছে। অতিরিক্ত রকম কম! কেন সেটা বুঝতে পারছি না।

সেলফ-কোয়ারেন্টাইন খুব কঠিন, আর সেটা মনিটরিং করা আরও কঠিন। তাই হোটেলকেন্দ্রিক কোয়ারেন্টাইন সেন্টার চালু করা আসু প্রয়োজন। চিনের সরকার পরিচালনার অনেক বদনাম আছে, কিন্তু তারা তাদের সেই ব্যবস্থাকেই খুব সুন্দর ভাবে করোনা মোকাবিলায় কাজে লাগিয়েছে। আমাদের দেশেও সরকারের দলীয় কর্মীদের স্যোশাল মনিটরিং এর কাজে লাগানো যেতে পারে। প্রতি পাড়ায় মহল্লায় কমিটি গঠন করে তাদেরকে জন সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজে লাগানো যেতে পারে। তাদেরকে দূরশিক্ষনের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত করে নিজেদের নিরাপদে রেখে সংশ্লিস্ট এলাকায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা আর মনিটরিং এর কাজে নিয়োজিত করা যেতে পারে। কোয়ারেন্টাইনের পরে বা সেলফ-কোয়ারেন্টাইনে তাদের এলাকায় কবে থেকে কতজন আছে সেই তালিকা তাদেরকে দিয়ে দিলে তারা বিদেশ ফেরত মানুষগুলোকে তদারকি করতে পারবে, তাদের চলাচল নিয়ন্ত্রন করতে পারবে, তাদেরকে জনসমাগমে না যাওয়ার বিষয়টা নিশ্চিত করতে পারবে। স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে এই বিশাল কর্মিবাহিনিকে গঠনমুলক কাজে নিয়োজিত করা যেতে পারে।

নিশ্চিতভাবে আক্রান্তদের বিশেষ চিকিৎসার জন্য যে আয়োজন সেটা হল “আইসোলেশন”। সেটা বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থা। কিন্তু আমাদের দেশের সকল চিকিতসক আর নার্সদেরও এই ব্যাপারে ভিতি কাটানোর ব্যবস্থা নিতে হবে, যেন করোনার ভয়ে চিকিৎসা দিতে কেউ অস্বিকার না করেন। প্রোটেকটিভ ইউনিফর্ম এখন আমদানি করতে পারবে কিনা জানি না, কিন্তু যে দেশে হাজার হাজার রেডিমেড গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি আছে সেখানে সরকার চাইলে নিজেরাই বানিয়ে নেয়া শুরু করতে পারে। আমাদের শুধু ডিজাইন দিলেই হবে, আশা করি খুব শিঘ্রই আমরা নিজের দেশে সেগুলো উতপাদন শুরু করতে পারব।

যখন একটা এলাকায় ভাইরাস এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে সেটাকে ট্রেস করা যায় না, এত বেশী হয়ে যায় যে সেটাকে আর ছড়ানো না বরং “বিস্ফোরন” বলা যেতে পারে, তখন সেই এলাকায় লকডাউন এর কোন বিকল্প থাকে না। আমরা অবশ্য “কারফিউ” শব্দটার সাথে বেশী পরিচিত। এমন পরিস্থিতিতে একটা এলাকায় (শহর/জেলা/উপজেলা/গ্রাম/মহল্লায়) কারফিউ জারি করতে সরকার বাধ্য হবে। আর সেখানে প্রশিক্ষিত স্বাস্থকর্মী দিয়ে আক্রান্ত ও মুমুর্ষদের বিশেষ হাসপাতালে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করা হবে। কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করেন যেন আমাদের দেশে সেই পরিস্থিতি না আসে।

গত পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী মৃত্যুর হার ছিল ইবোলাতে (প্রায় ৫০%) আর সবচেয়ে বেশী ছড়িয়েছিল সোয়াইনফ্লু (H1N1)। সোয়াইন ফ্লুতে শুধুমাত্র এক বছরেই (২০০৯ সালে) ১৪০ কোটি  মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল, কিন্তু তাতে মৃত্যুর হার ছিল অনেক কম, মাত্র ০.০৩%। তাতেই মোট ৫৭৫,৪০০ মানুষ মারা গেছিল!!! পরিকল্পনার জন্য আমাদের সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্যই প্রস্তুতি নিতে হবে। আমাদের দেশে এখনও ব্যাপকভাবে ছড়ায়নি, কিন্তু যদি ছড়ায় আমরা কি তার জন্য প্রস্তুত আছি? সরকার কি প্রস্তুতি নিবে -সেটা পরে, আগে আমি আপনি কি করব সেটা ভাবুন। আমরা যা করতে পারি তা হলঃ

১) ঘন ঘন হাত ধোয়ার অভ্যাস করতে হবে যেকোন সাবান দিয়ে (কাপড় কাচার সাবান সবচেয়ে ভালো)

২) স্যোশাল ডিস্টেন্সিং বাড়ানো বা সামাজিক মেলামেশা কমিয়ে আনতে হবে; জনসমাগম, পার্টি, আড্ডা, ওয়াজ, কনসার্ট, জামাত, গন পুজা, জমায়েত, ভিড় এড়িয়ে চলতে হবে। কথা বলতে হলে দুরত্ব বজায় রাখুন যেন মুখ থেকে বের হওয়া সুক্ষ লালার ছিটা (অতি ক্ষুদ্র, যেগুলো দেখা যায় না) নিশ্বাসের সাথে ভিতরে না যেতে পারে, অন্ততঃ ৬ ফিট।

৩) হ্যান্ডশেক না করা

৪) বহু মানুষ স্পর্শ করে এবং যার সামনে কথা বলে (কথা বলার সময় মুখ থেকে সুক্ষ লালা ছিটা বের হয়, দেখা যায় না কিন্তু সেগুলো জমা পড়ে আর প্রায় ৯ ঘন্টা পর্যন্ত জীবাণু জিবিত থাকে) এমন জিনিস যেমন অফিসের টেবিল, চেয়ার, দরজার হাতল, কলের মাথা, রেলিং, দেয়াল ইত্যাদি যত কম পারা যায় স্পর্শ করা, করতে হলে দ্রুত হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলা। সাবান দিয়ে ধোয়ার আগ পর্যন্ত হাত দিয়ে নাক-মুখ স্পর্শ না করা।

৫) অফিস, দোকান, আদালত, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বাজার বা আপনার স্থান বা বাসা যেখানে মানুষ আসে সেখানে হাত ধোয়ার বেসিন আর তার পাশে সাবান রাখুন। যে আসবে তাকে বলুন হাত ধুয়ে ভিতরে আসতে। যাবার সময়ও যেন হাত ধুয়ে যায়।

৬) উপরের সবগুলো মেনে চলার পরেও আপনি এই ভাইরাসের সংস্পর্শে আসতেই পারেন, তবে সম্ভাবনা অনেক কম থাকবে। এই ক্ষেত্রে প্রকৃতি বড়ই নির্মম হবে, শুধুমাত্র সর্বোচ্চ সক্ষমরাই বেঁচে থাকবে। সেক্ষেত্রে আপনার শারিরিক সক্ষমতাই একমাত্র আপনাকে বাঁচাতে পারবে। সর্দি-কাশি না হওয়ার জন্য নিজের শরিরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (ইমিউনিটি) বৃদ্ধি করুন। শরিরের যত্ন নিন, ভিটামিন সি গ্রহন করুন, আরও যা যা করতে হয় করুন কিন্তু শরির ভালো রাখুন। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে অর্থাৎ আক্রান্ত হলে, একমাত্র শারিরিক শক্তিই আপনাকে বেঁচে থাকতে সহায়তা করবে।

সরকার যা যা করতে পারে তার মধ্যে আছে জেলা-উপজেলা-ইউনিয়ন, শহর, গ্রাম আর বড় শহর গুলোতে পাড়া মহল্লায়, বা গড়ে প্রতি এক লক্ষ লোকের জন্য দশ/বিশজনের একটা কমিটি গঠন করে জনসচেতনতা ও মনিটরিং এর কাজে লাগানো; জেলা ভিত্তিক হোটেল ভিত্তিক কোয়ারেন্টাইন সেন্টার এবং এই সব কাজে যাদের সংযুক্ত করা হবে তাদের সবার প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করে ফেলা। প্রটেক্টিভ গিয়ার আমদানি বা তৈরীর ব্যবস্থা করা, টেস্টিং কিট আমদানি করা। এইসব প্রস্তুতিতে হাজার কোটি টাকা খরচ হবে না, কিন্তু মহামূল্যবান সময় বাঁচবে। পরিস্থিতি অতটা খারাপ না হলে এই বিনিয়োগে বড় ক্ষতি হবে না।  

নাসের শওকত হায়দার ,

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ,

[email protected]


সর্বশেষ

আরও খবর

শবে বরাতের ইবাদত ঘরে পালনের আহ্বান ইসলামিক ফাউন্ডেশনের

শবে বরাতের ইবাদত ঘরে পালনের আহ্বান ইসলামিক ফাউন্ডেশনের


করোনায় মৃত্যু ছাড়ালো ৬০ হাজার, আক্রান্ত ১১ লাখের বেশি

করোনায় মৃত্যু ছাড়ালো ৬০ হাজার, আক্রান্ত ১১ লাখের বেশি


করোনা আতংকেও ঢাকামুখী মানুষের ঢল, সামাজিক দূরত্বের ধার ধারছে না কেউ

করোনা আতংকেও ঢাকামুখী মানুষের ঢল, সামাজিক দূরত্বের ধার ধারছে না কেউ


হাসপাতাল-ক্লিনিক বন্ধ রাখলে ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর

হাসপাতাল-ক্লিনিক বন্ধ রাখলে ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর


করোনায় নতুন আক্রান্ত ৫, মোট ৬১

করোনায় নতুন আক্রান্ত ৫, মোট ৬১


করোনায় আক্রান্ত ইনডিপেনডেন্ট টিভির ১ সংবাদকর্মী, কোয়ারেন্টিনে ৪৭ জন

করোনায় আক্রান্ত ইনডিপেনডেন্ট টিভির ১ সংবাদকর্মী, কোয়ারেন্টিনে ৪৭ জন


মক্কা-মদিনায় ২৪ ঘণ্টার কারফিউ জারি

মক্কা-মদিনায় ২৪ ঘণ্টার কারফিউ জারি


করোনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ফেসবুকে অপপ্রচার, গ্রেফতার ১

করোনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ফেসবুকে অপপ্রচার, গ্রেফতার ১


সাহায্য বিতরণের আগে জানাতে হবে পুলিশকে

সাহায্য বিতরণের আগে জানাতে হবে পুলিশকে


বাংলাদেশকে ৩ হাজার কোটি টাকা অনুদান দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক

বাংলাদেশকে ৩ হাজার কোটি টাকা অনুদান দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক