Saturday, April 11th, 2020
করোনাভাইরাস: সভ্যতার প্রস্তুতিই সভ্যতার বিপর্যয় ঠেকাতে সক্ষম
April 11th, 2020 at 6:20 pm
এই করোনাভাইরাস যেহেতু পৃথিবীর আগামী; সবসময় কোন না কোন সিজনাল ফ্লু আঘাত হানবে; তাই বদলে যাওয়া পৃথিবীর নিউ নরমাল জীবন কেমন হবে; কীভাবে তার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে; তা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন ওসব দেশের চিন্তকেরা।
করোনাভাইরাস:  সভ্যতার প্রস্তুতিই সভ্যতার বিপর্যয় ঠেকাতে সক্ষম

মাসকাওয়াথ আহসান

করোনাভাইরাস মোকাবেলায় পৃথিবীর সব দেশ অসহায় এমনটা নয়। যেসব দেশ কল্যাণরাষ্ট্র, যারা জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ করে রাষ্ট্র হবার যোগ্যতা অর্জন করেছে; যারা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে; তারা করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সফল হয়েছে।

জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো, ক্যানাডা, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো করোনাভাইরাস প্রতিরোধে তাদের রাষ্ট্রিক সামর্থ্য তুলে ধরেছে।

এই দেশগুলোতে সুশাসন আছে, সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পাকাপোক্ত ব্যবস্থা আছে, জন-অভিমতের স্বাধীনতা আছে, মিডিয়াগুলো কোন রকম বাধার মুখে নেই। সরকারের সমালোচনার কারণে নাগরিককে ‘গুজব-প্রচারকারী’ বলে গ্রেফতার ও উইচহান্টিং-এর অসভ্যতা সফল রাষ্ট্র-ব্যবস্থাগুলোতে একেবারেই নেই।

সেখানে মানুষের জন্য দেশ ও সমাজ। ব্যবসা-রাজনীতি-প্রশাসন-পুলিশ-সেনার ক্ষমতাকাঠামোর ‘অমুক ভাই তমুক ভাইয়ের’ জেলখানায় বন্দী নয় সাধারণ মানুষ। ক্ষমতাবান জনগণের সেবক সেখানকার ব্যবসা-রাজনীতি-প্রশাসন-পুলিশ-সেনা তথা সেবা-ব্যবস্থাপনা কাঠামোর লোকেরা। মানবাধিকারকে এই দেশগুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়।

এসব দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা পরিবেশ ও প্রকৃতিবান্ধব। গ্রামগুলোকে শহরে রূপান্তরের দক্ষিণ এশীয় মডেলের বিপরীতে শহরগুলোকে গ্রামে রূপান্তরের চেষ্টা দৃশ্যমান এই দেশগুলোতে।

এরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়া দেশ। এরা জানে ঘৃণা-বিদ্বেষের রাজনীতি দিয়ে টেকসই সভ্য সমাজ গড়া যায়না। এরা ধর্মতন্ত্র, রাজতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদী গণতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্রের ইতিহাস পড়ে অনুধাবন করতে পেরেছে; সামাজিক জনতন্ত্র ছাড়া মানুষের মুক্তির পথ নেই।

পৃথিবী সৃষ্টির আদি থেকে মানুষের একমাত্র আকাংক্ষা তার মুক্তির আকাংক্ষা। যে রাষ্ট্র মানুষের মুক্তির আকাংক্ষা পূরণে কাজ করে; সেই মানুষের জীবনে প্রাসঙ্গিক থাকে। নইলে রাষ্ট্র হয়ে পড়ে করোনাভাইরাসের মতো মানব ঘাতক।

করোনা প্রতিরোধে সফল রাষ্ট্রগুলো যেহেতু জনগণের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-স্বাস্থ্য-ইন্টারনেট চাহিদা পূরণ করে; ফলে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে লক-ডাউন ঐ দেশগুলোতে খুব সহজ হয়েছে।

ওসব দেশের প্রতিটি শিশুই শিক্ষা চাহিদা পূরণের সুযোগ পায়। সুতরাং গৃহবন্দী থাকাই করোনা প্রতিরোধ এই সহজ বার্তাটি বুঝতে তার সমস্যা হয়না।

ওসব দেশে যেহেতু যোগ্যতাই আনন্দময় জীবন যাপনের একমাত্র শর্ত; ফলে ওখানে শিশুরা ব্যবসায়ী-রাজনীতিক-প্রশাসক-পুলিশ-সেনা বা সরকারের সহমত ভাই হয়ে জীবন বিকাশের সুযোগ খোঁজে না। দক্ষিণ এশীয় গ্রাম্য ভি আইপি কালচার না থাকায়, মানুষ যে কাজ করে আনন্দ পায়; ঠিক তাই করে। যেহেতু সব পেশার মানুষের সমান মর্যাদা ও গুরুত্ব সেখানে; ফলে সমাজে কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, চিকিতসক, গবেষক, বেকার, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, প্রশাসক, পুলিশ, সেনা, সরকার দলীয় কর্মী, পথের শৌখিন গায়কসহ প্রতিটি নাগরিক মর্যাদা নিয়ে বাঁচে; তাই পারস্পরিক শ্রদ্ধা বোধ বেঁচে আছে সেখানে। ফলে মানবতা বেঁচে আছে সেখানে।

মানুষ যে কাজে আনন্দ পায়; সে কাজ করার সুযোগ থাকায় ঐ দেশগুলোতে গবেষক হবার সুযোগ অবারিত। ফলে করোনাভাইরাস-এর প্রতিষেধক উদ্ভাবনে অনেক গবেষক সেখানে নিরলস কাজ করছেন। এই করোনাভাইরাস যেহেতু পৃথিবীর আগামী; সবসময় কোন না কোন সিজনাল ফ্লু আঘাত হানবে; তাই বদলে যাওয়া পৃথিবীর নিউ নরমাল জীবন কেমন হবে; কীভাবে তার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে; তা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন ওসব দেশের চিন্তকেরা।

এই দেশগুলো তাদের সমাজে কট্টর জাতীয়তাবাদ, কট্টর ধর্মপন্থা, দেশপ্রেম ও ধর্ম নিয়ে অতি মাতামাতিকে কঠোরভাবে দমন করে। তারা জানে এগুলো জনমনকে বিষাক্ত ও বিভাজিত করে দুর্নীতি ও লুন্ঠনের রেসিপি।

এই দেশগুলো তাদের প্রবাসী নাগরিকদের ফিরিয়ে এনেছে, তাদের কোয়ারিন্টিনে রেখেছে; কাউকে কাউকে হোম কোয়ারিন্টিনে পাঠিয়েছে। সবাই নিয়ম মেনেছে। কারণ ছোটবেলায় স্কুল থেকেই তাদের নিয়ম মানার ও মানুষের জীবন বাঁচানোর শিক্ষা দেয়া হয়েছে।

দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় বা যোগ্যতা মূল্যায়নের প্রতিকূলতা ও স্বজনপ্রীতিতন্ত্রের বাধায় কাজ করতে না পেরে বিদেশে কাজ করতে বাধ্য হওয়া অসহায়-ভাগ্যহত নাগরিক তারা যে নয়।

তারা বিশ্বনাগরিক। তাদের দেশে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের ‘কাইটা ফালামু, মাইরা ফালামু, এই সরকার পছন্দ না হইলে বিদেশে চইলা যাও’ টাইপের দেশের মালিকানা জাহিরের কূপমণ্ডুকতা না থাকায়; তারা কাজের ও ভিন্ন সংস্কৃতির বৈচিত্রের আনন্দ পেতে পৃথিবীর যে কোন দেশে যেতে পারে। ওসব দেশের প্রবাসীদের জীবন বাঁচাতে তাদের সরকারগুলো তাদেরকে দেশে ফিরে আসার আহবান জানিয়ে; দেশে নিয়ে গেছে।

আসলে সভ্যতার জন্য প্রস্তুত যারা তারা করোনার মতো সভ্যতার বিপর্যয় ঠেকাতে সক্ষম।

চীন-দক্ষিণ কোরিয়া-সিঙ্গাপুরের মতো কিছু দেশ করোনা প্রতিরোধে সফল হচ্ছে। চীনের মিডিয়ার স্বাধীনতা না থাকায়; এর সাফল্যের দাবি কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য তা যাচাইয়ের দাবি রাখে। তবে এশিয়ার এইদেশগুলোও নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণের চেষ্টা করে; তা উল্লেখের দাবি রাখে।

লেখক: ব্লগার ও প্রবাসী সাংবাদিক


সর্বশেষ

আরও খবর

বর্ণবাদ নিপাত যাক

বর্ণবাদ নিপাত যাক


এ দেশে কেবল মানুষ বাস করে!

এ দেশে কেবল মানুষ বাস করে!


করোনার দুঃসময়ে চাকরিরত সবাইকে বেতন দিয়েছে ইউসেট

করোনার দুঃসময়ে চাকরিরত সবাইকে বেতন দিয়েছে ইউসেট


এসএসসির ফল প্রকাশ ৩১ মে

এসএসসির ফল প্রকাশ ৩১ মে


করোনার শহর

করোনার শহর


নারীর শত রূপে পুনরুজ্জীবন

নারীর শত রূপে পুনরুজ্জীবন


সেভেন ডেডলি সিনস

সেভেন ডেডলি সিনস


কাঁকড়া সংস্কৃতির বলি বিদ্যানন্দের কিশোর

কাঁকড়া সংস্কৃতির বলি বিদ্যানন্দের কিশোর


“পার্টি পোয়েট রেপিড টেস্টিং কিট”

“পার্টি পোয়েট রেপিড টেস্টিং কিট”


অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী আর নেই, রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর শোক

অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী আর নেই, রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর শোক