Monday, April 6th, 2020
করোনার ক্রান্তিলগ্নে দাড়িয়ে বিশ্ব, আসলে দায় কার?
April 6th, 2020 at 8:16 pm
করোনার ক্রান্তিলগ্নে দাড়িয়ে বিশ্ব, আসলে দায় কার?

শামীম আহমেদ :

মানুষ কি চরম স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক প্রাণী? নাকি মানুষ পরোপোকারী ও সামাজিক প্রাণী? নাকি মানুষের মধ্যে দুই-ই আছে? এর উত্তর হাজার বছর ধরেই খুঁজেছে মানুষ। নানা যুক্তির ভিত্তিতে নানা উত্তর তুলেও ধরা হয়েছে। এসব উত্তরের সবটা আমার জানা নেই। তবে আমার কাছে মনে হয়েছে মানুষ যে পরিবেশ পেয়েছে সেই পরিবেশের সাথে সহজে খাপ খাওয়াতে যে ধরনের সাড়া দেয়া প্রয়োজন মনে করেছে সেভাবেই আচরণ করেছে। সেক্ষেত্রে মানুষ কখনো হয়েছে চরম স্বার্থপর আবার কখনো হয়েছে পরোপোকারী। তাই মোটা দাগে মানুষ কেমন তার উত্তর দেয়া হয়তো কষ্টসাধ্য।

করোনায় আতঙ্কিত, উদ্বিগ্ন আজকের মানুষের সামনে এমন গুরুগম্ভীর আলোচনা তোলা মোটেই সমীচীন। তবুও করি যদি প্রাসঙ্গিক মনে হয়। গ্রাম দেশের প্রচলিত কথা- 

“পিঠে ঘুষি কয়টা নিতে পারবি? একটাও না। আর হাত পা বাইন্ধা দিলে? – যে কয়টা মন চায়”

তার মানে মানুষের আচরণ নির্ভর করে আসলে কি পরিবেশে তাকে বাধ্য করা হয়। পুঁজিবাদী অর্থনীতির স্বপ্নদ্রষ্টা এডাম স্মিথের একটা কথা এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজন বোধ করছি।

“It is not from the benevolence of the butcher, the brewer, or the baker that we expect our dinner, but from their regard to their own interest.” –Adam Smith

এই দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে মনে হচ্ছে মানুষ আসলে যা কিছু করে নিজের স্বার্থের জন্যেই করে। তার এ কথার অবশ্যই ভিত্তি আছে। তবে আমার কিছুটা দ্বিমত আছে। সেটা কেন ইতোমধ্যে হয়তো বুঝে গেছেন। মানুষের অস্তিত্বের নিরাপত্তা দিলে হয়তো একজন দক্ষ কফি মেকার আপনাকে এমিনিতেই এক কাপ কফি বানিয়ে খাওয়াবে। সে অবশ্য আপনার প্রতিটি সকালের কফির দায়িত্ব নিবে বলছি না। আমার বক্তব্য হচ্ছে মানুষ আসলে তখনই উপকারী হবে যখন তার চারিপাশটা পরার্থপরতার পরিবেশের হবে। আমি জানি এখনো একটা কিন্তু খুঁজছেন। সেটাতে আসছি।

আজকের বিশ্ব দাঁড়িয়ে আছে এ পুঁজিবাদী ধ্যান ধারণার উপর। যেখানে মানুষের প্রচেষ্টা উৎপাদনের আর বাকি উপাদানের মতোই একটি উপাদান। মূলধন, যন্ত্রপাতি যেমন উৎপাদনের একটি উপকরণ। মানুষের শ্রম ও শ্রমের ইচ্ছা একই ধরণের উপাদান। তাই আপনার আমার শ্রমকে কিনে নেয়া যাচ্ছে অর্থের বিনিময়ে। আপনার আমার যেদিন শ্রমের ক্ষমতা শেষ সেদিন থেকে আপনি আমি রাষ্ট্রের বোঝা। সক্ষম শ্রমিক এসে আপনার জায়গা দখল করবে। আপনার ভাত আপনার অস্তিত্ব নির্ভর করবে দেশের সরকারের সামাজিক নিরাপত্তার বাজেটের উপর। এতে আসলে সমস্যা কি? 

পৃথিবীতে বিরাজমান অর্থনীতির আরেকটি বিশ্বাস হচ্ছে মানুষকে যদি উৎপাদনের স্বাধীনতা দেয়া হয় এবং সেখান থেকে মুনাফার স্বাধীনতা দেয়া হয় তবেই পৃথিবীতে সর্বোচ্চ উৎপাদন সম্ভব।

তবেই সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ সম্ভব। আর সেই সাথে যদি সম্পদ,পুঁজি এবং প্রযুক্তির অবাধ আদান প্রদান অর্থাৎ যে কোন দেশে যে কোন সময় কোন রকম বাধাহীন উৎপাদনের উপাদানের প্রবেশাধিকার দেয়া যায় তবেই সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত সম্ভব। এমনই মনে করেন আজকের মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রবক্তরা। আর এ বিশ্বাস ধ্যান ধারনার উপর নির্ভর করে বিশ্ব আজ বিশ্বায়নে। তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার ও ব্যবহার পুরো বিশ্বকে আজ একটি গ্রামে পরিণত করেছে। যা পরিচিত বিশ্বগ্রাম নামে। কিন্তু যদি এমনই হয় তবে সমস্যা কি? 

জিডিপি গ্রোথ বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অথবা মাথা পিছু আয় আজকের বিশ্বের সবচেয়ে উচ্চারিত শব্দ। সব রাষ্ট্র, রাষ্টের প্রধান, রাষ্ট্রের অর্থনীতির নীতি নির্ধারকদের ঘুম হারাম এসব সূচকের হিসাব কষতে কষতে। এর কারণ এগুলো দিয়ে মাপা হচ্ছে রাষ্ট্র কতটুকু উন্নতি করল। প্রবৃদ্ধি নেগেটিভ হলে মাথায় হাত। পজিটিভ হলে আরো গ্রোথ চাই। যে কোন মূল্যে আরও গ্রোথ চাই। এগুলোর উপর নির্ভর করে রাষ্ট্র গরীব না ধনী। আপনি আমি কেউই নিশ্চয়ই গরীব রাষ্ট্রে বসবাস করতে চাই না। তাহলে সমস্যা কি?

এখন এই যে উৎপাদন, প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় এসব একটা দেশে নিশ্চিত করে কারা? দেশের জনগণ। আর কিভাবে করতে হবে ঠিক করে দেয় কারা? দেশের নীতি নির্ধারক বা পলিসি মেকারস। তার মানে রাষ্ট্র যখন তার প্রবৃদ্ধি ঠিক রাখতে অন্যান্য দেশের সাথে প্রতিযোগিতা করছে তখন আপনি প্রতিযোগিতা করছেন আপনার স্বাজাতির অন্য মানুষের সাথে। ফলে এ অর্থনীতির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে প্রতিযোগিতা।

অর্থাৎ উৎপাদনের প্রতিযোগিতাই বিশ্বব্যাপী সর্বোচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত করবে। আর এ প্রতিযোগিতাই আজকের অর্থনীতির ভিত্তি। তার মানে হচ্ছে আপনি আপনার পাশের জনের সাথে প্রতিযোগিতা করে আপনার জীবিকা নির্বাহ করবেন। আমি আমার পাশের জন্যের সাথে প্রতিযোগিতা করে জীবিকা নির্বাহ করব। এভাবে আমাদের সামগ্রিক প্রতিযোগিতাই আমাদের রাষ্ট্রের অন্য রাষ্ট্রের সাথে প্রতিযোগিতা। প্রতযোগিতা করে রাষ্ট্র তথা বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হলে সমস্যা কি?

একটা রাষ্ট্রের সব মানুষের সক্ষমতা সমান না। সব মানুষের পুঁজিও সমান না। তাহলে আপনার যার সাথে প্রতিযোগিতা হবে সে যদি আপনার কাছ থেকে কিছু উপাদান নিয়ে এগিয়ে থাকে অথবা আপনি এগিয়ে থাকেন তবে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র কি সমান হলো? কিন্তু সমাজে আপনার সম্মান, ক্ষমতা, অবস্থান সবই নির্ভর করছে আপনি কেমন প্রতিযোগী। সেখানে আপনার সক্ষমতা কতটুকু তার বিচার কেউ করবে না। ফলে আপনি কি করবেন? নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যে যে করেই হোক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে চাইবেন।

এই “যে করেই হোক” আজকের বিশ্বের প্রধান সমস্যা। রাষ্ট্র যে করেই হোক উৎপাদনে এগিয়ে থাকতে চাইছে। সেক্ষেত্রে তার দেশের জনগন, তার পরিবেশ বা বিশ্ব পরিবেশ কোনটাই সে অর্থে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠছে না। সেক্ষেত্রে শুধু জিডিপি বাড়ছে কিনা তাই চিন্তার কেন্দ্র বিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এই মাথাপিছু আয় হিসাব করা হয় কিভাবে? 

ধরেন একটা রাষ্ট্রের অধিবাসী দুইজন। একজন আপনি আরেকজন জনাব আব্দুল এফ রহমান। দেশের যে সম্পদ আছে আপনি আর আব্দুল এফ রহমান ব্যবহার করে মানুষের ব্যবহার উপযোগী পণ্য উৎপাদন করে আয় করবেন। কিন্তু সম্পদ আপনাদের সমভাবে ভাগ করে দেয়া হবে না। আপনার সীমিত কারণ আপনার বাবা গরীব ছিলেন কিন্তু আব্দুলের বাবা ধনী তাই তার সম্পদ বেশি। অথবা দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে যে করেই হোক বেশি পেয়েছে।

এখন আপনার এক বছরের আয় এক লক্ষ টাকা আর আব্দুলের আয় বছরের এক কোটি টাকা হলো। তাহলে দেশটির ইকোনোমি দাঁড়াবে ১ কোটি ১ লক্ষ টাকা আর মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে ১০১০০০০০/২= ৫০৫০০০০ টাকা। এর অর্থ রাষ্ট্র যখন মাথাপিছু আয় দেখবে তখন আপনার আয়ও দাঁড়াবে ৫০ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা।

তাহলে এমন আয়ের হিসাবে যদি রাষ্ট্র দেশের অর্থনীতির উন্নতি দেখায় আপনি কি মানবেন? নাকি বলবেন আমার ৪৯ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা কই? তাহলে দেখা যাচ্ছে সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার বা সর্বোচ্চ উৎপাদনই একটা দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি না। যদিও এখানে আরও অনেক ফ্যাক্টর হিসাবে থাকে তবে আজকের পত্রিকার যে নিউম্যারিকেল অর্থনৈতিক উন্নতি তা এমনই। কাগজে কলমে দিন দিন এমন সংখ্যা বৃদ্ধিই আমাদের আপ্লুত করে। আমরা গর্বিত হই।

এভাবে ধনী আরও ধনী হচ্ছে গরীব থেকে যাচ্ছে গরীব। সরকারের নানা উদ্যোগে কিছু জনগন দারিদ্য সীমা থেকে বেরিয়ে আসবে। কিন্তু সম্পদের পার্থক্যটা ততদিনে হয়ে যাবে ব্যাপক।   

বহু তত্ত্ব কথা শুনলেন। এবার একটা কোম্পানি নিয়ে ছোট্ট উদাহরণ দেই। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপলের এ বছরে মূলধনের পরিমাণ দাড়িয়েছে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের উপরে। আর পুরো বাংলাদেশের জিডিপি ৩৪৭ বিলিয়ন ডলার। বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে পৃথিবীর ২৬৩ টি দেশের জিডিপি ডেটা নিয়ে হিসেব করে দেখা গেছে এর মধ্যে ২১৩ টি দেশের জিডিপিই ১ ট্রিলিয়ন ডলারের নিচে। এমন দেশের তালিকায় ভাবছেন আফ্রিকার গরীব দেশ আছে? উত্তর না। এমন দেশের তালিকায় আছে সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, মেক্সিকো, তুরস্ক এমনকি সৌদি আরবও। যাদের জিডিপির আকার ১ ট্রিলিয়ন ডলারের নিচে।

আসুন খোদ আম্রিকার সাথে তুলনা করি। বিশ্বের পরাশক্তি সকলের মাতব্বর আমেরিকার জিডিপির আকার ২০.৫ ট্রিলিয়ন ডলার আর তার দেশের একটা কোম্পানির মূলধনই ১ ট্রিলিয়ন ডলার। আসুন পৃথিবীর সাথে তুলনা করি। পুরো বিশ্বের জিডিপি ৮৫.৯ ট্রিলিয়ন ডলার আর তার বিপরীতে শুধু অ্যাপলের ১ ট্রিলিয়ন ডলার (তথ্যসূত্র-বিশ্বব্যাংক)। কথা হচ্ছে এমন কোম্পানির কাছাকাছি কি আর কোন কোম্পানি নাই? তাইলে একটু ডেটা দেখেন-

কোম্পানিগুলোর মূলধণের আকারঃ সৌদি আরামকো- ১,৮৮০ বিলিয়ন ডলার। অ্যাপল ইনকর্পোরেশন- ১,৩৯৭ বিলিয়ন ডলার। মাইক্রোসফট ইনকর্পোরেশন – ১,২৭৪ বিলিয়ন ডলার। আলফাবেট (গুগল) ইনকর্পোরেশন – ১,০২০ বিলিয়ন ডলার। এমাজন ইনকর্পোরেশন- ৯২৪  বিলিয়ন ডলার। ফেসবুক – ৬৩৩ বিলিয়ন ডলার । আলিবাবা- ৬১০ বিলিয়ন ডলার । বার্কশায়ার হাথওয়ে ইনকর্পোরেশন – ৫৬২.৩৯ বিলিয়ন ডলার । টেনসেন্ট – ৪৯২.৯ বিলিয়ন ডলার । ভিসা – ৪৪১.৬১ বিলিয়ন ডলার। (বিশ্বব্যাংক)

এখন পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থায় এই যে আমরা সম্পদের সর্বোচ্চ উৎপাদনের কথা বলছি। এইটা কাদের জন্যে? হাতে গোনা কয়েকটা কোম্পানির জন্যে। এই যে বিশ্বায়ন, মুক্তবাজার অর্থনীতি এর সবই হচ্ছে বিশ্বের সম্পত্তি মুস্টিমেয় কোম্পানির হাতে কুক্ষিগত করার জন্যে। আর এ কোম্পানিগুলো যেসব দেশের, উপকৃত হচ্ছে সেসব দেশই। সেখানেও বৈষম্য আছে। এই যে কোম্পানিগুলোর আয় যখন দেশের জাতীয় আয়ে যোগ হচ্ছে দেশ হয়ে যাচ্ছে সংখ্যায় উন্নত। আসলে টাকা না রাষ্ট্রের না জনগনের। টাকা শুধু গুটি কয়েক ধনী পরিবারের।

পৃথিবীর হিসাব বাদ দিয়ে আসুন নিজেদের হিসেব কষি। কোথায় আমাদের অবস্থান। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার আরও একটি দিক হচ্ছে ভোগবাদ। এই যে এতো এতো উৎপাদন। কার জন্যে? আপনি আমি ভোগ না করলে তাদের ধনী হওয়া চলবে কিভাবে? তাই পুরো পৃথিবীকে বানিয়ে নেয়া হয়েছে একটা ভয়ানক ভোগবাদী সমাজ। যারা শুধু শ্রম দেয় আর ভোগ করে। যে যত বেশি ভোগ করে সে সমাজে তত বড় এলিট। টেলিভিশন, বিজ্ঞাপন, ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম প্রতিটা প্লাটপফর্মই কি বার্তা দিচ্ছে। খালি ভোগ কর। যা আয় তাই ব্যয়। প্রয়োজনে ব্যয় অপ্রয়োজনে ব্যয়। যে যতো ব্যয় করছে সে তত সম্মানি। সে তত বড় সেলিব্রেটি। সমাজের মধ্যমণি। আমাদের প্রতিযোগিতা ভোগের মধ্যে। আমাদের প্রতিযোগিতা জ্ঞানে নয়, গর্বে। ভোগের গর্বে। দামি মোবাইল, দামি গেজেট, দামি ঘড়ি, দামি প্রসাধনী, দামি জামা, দামি গাড়ি এসব যখন হয়ে যাচ্ছে সমাজে সম্মানের সূচক তখন বাজারের চাল, ডাল, গম যারা উৎপাদন করছে তাদের আর মূল্য কোথায়? যে দিনের পর দিন গবেষণা করে নতুন থিওরি দিচ্ছে তার মূল্য কোথায়? যে বিনিদ্র রজনী খেটে একটি গান একটি কবিতা একটি বই লিখছে তার মূল্য কোথায়? ৫০০ টাকা দিয়ে একটি বই কিনে পড়তে গায়ে বাধে। লেখককে বলি ডাকাত। অথচ বার্গার খেয়ে ১,২০০ টাকা ব্যয় করি। আবার তার ক্ষতি চিন্তা করে আরো ৫০০ টাকা খরচ করে এভাকাডো সালাদ খাই। আর বলি সমাজটা যাচ্ছে কোথায়? আগের মতো মেধাবী মানুষ আর নাই।

একেই কি বলে সভ্যতা? আধুনিকতা? কে শিখাচ্ছে এসব? ঘরে ভাত নেই এমন গরীব আছে এখন, কিন্তু কোমড়ে মোবাইল নেই এমন গরীব পেতে কষ্ট হবে। কোন দিকে যাচ্ছি আমরা? এটাই সম্পদের সুষম বন্টন?

এসব কিছু বলার মূল কারণ এখন আসি। এই যে বিশ্বময় আজ করোনায় আক্রান্ত। হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর মিছিল। তার পিছনে আসলে দায়ী কে? সরকার? আমি? আপনি?

দায়ী আসলে আমাদের বিশ্ব অর্থ ব্যবস্থা। সে হিসেবে আমরা সবাই। প্রতিযোগিতার এই অর্থ ব্যবস্থায় মানুষের কোনটা দরকার তার উপর নির্ভর করে উৎপাদন হয় না। কোনটায় প্রফিট বা মুনাফা বেশি তার উপর ভিত্তি করে। তাহলে চাহিদা? বিশ্বব্যবস্থায় এখন চাহিদা সৃষ্টি করা হয়। কার চাহিদা আছে নেই তা বিষয় না। কোম্পানি যদি মনে করে এই পণ্যে প্রফিট আছে তবে তা উৎপাদন করবে এবং কেনাতে বাধ্য করবে চাহিদা সৃষ্টির মাধ্যমে। আর এজন্যেই দেখবেন এক কোটি টাকার গাড়ি থেকে নেমে কারিনা কাপুর ৩০ টাকার সাবানে ২ টাকা ডিস্কাউন্ট দেখে লাফিয়ে উঠবে। বলবে হোয়াও!

এই যে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের আশঙ্কার কথা বলে যাচ্ছেন সেখানে ভ্রুক্ষেপ নেই কেন? কারণ এতে সরাসরি কোম্পানির কোন প্রফিট নেই। তাই দেশের সরকারও তেমন আগ্রহী নয়। যেখানে প্রফিট নেই সেখানে কোম্পানি নেই। কর্পোরেট সোস্যাল রেসন্সিবিলিটির কথা বলছেন? ঐটা তখনই হয় যখন বিজ্ঞাপনের কাটতি থাকে। ভাইরাল হবার সম্ভাবনা থাকে। পরিবেশ, গ্লোবাল ওয়ার্মিং এসব কোনটাই তাদের দেখার বিষয় না। এই অর্থ ব্যবস্থাটাই শুধু উৎপাদন, প্রফিট আর ভোগ। নতুবা বিজ্ঞানীরা অনেক আগেই ইনফ্লুয়েঞ্জা নিয়ে সতর্ক করেছিল। কয়টা দেশ তাতে কান দিয়েছে। বরং যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প সরকার স্বাস্থ্যখাতে গবেষণায় ফান্ড কমিয়ে দিয়েছ সাম্প্রতিক বাজেটগুলোতে। কারণ কি? এতে আসলে প্রফিট নেই। 

বাঙলাদেশের জিডিপির মাত্র ১ শতাংশ খরচ হচ্ছে স্বাস্থ্যখাতে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেখানে স্বপ্ন সেখানে গবেষণা, নতুন নতুন ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের প্রশ্ন তোলা অবান্তর। অথচ আমরা দুইটা সাবমেরিন কিনেছি। স্যাটেলাইট পাঠিয়েছি স্পেসে। শুধু বাংলাদেশ না পৃথিবীর অধিকাংশ দেশই মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ না করে অস্ত্র কেনার প্রতিযোগিতায় নেমে গেছে। চাঁদে মঙ্গলে নবোযান, লোক পাঠাতে ব্যস্ত হয়ে গেছে। এগুলো কিসের আলামত? একমাত্র প্রতিযোগিতা। ঘরে আমার সন্তান না খেয়ে থাক বাইরে ঠাট বজায় চলা চাই। যার দরুণ আজকের এ বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পুরো বিশ্বেরই প্রস্তুতি নেই এমন মহামারী ঠেকানোর।

বলতে পারেন জাতীয় নিরাপত্তার কথা? আপনি জমিতে ফসল লাগালে ফসলের যত্ন রেখে চারিদিকে ভালো করে লোহার বেড়া দেন? নাকি ফসলেরও যত্ন করেন? যদি ফসলের যত্ন না করে বেড়া দেন। বেড়ায় কারুকার্য করেন, ডিজিটাল লকের গেট করেন তবে বুঝা যায় ক্ষেতের ফসলের আপনার দরকার নেই। দরকার জমিটুকু। তাই আজকের বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রযন্ত্রের আসলে মানুষের দরকার নেই। দরকার মানুষ যেটার উপরে দাঁড়িয়ে, সেই মাটির। মানুষ জন্মাবে বছর বছর। মাটি পাবো কই? আর এজন্যেই এতো অস্ত্র কেনার প্রতিযোগিতা। দেশপ্রেমের নামে মাটিকে বাচানোর অদ্ভুত নগ্ন খেলা। এই যদি হয় অবস্থা তবে সে দেশ নিয়ে আপনার গর্ব কিসের? সে দেশের সরকারকে কাগজের মতো ছিড়ে ফেলা এখন সময়ের দাবি।

ডাক দিন নতুন করে ভেঙ্গে গড়ার। যে বিশ্বে আপনি দাঁড়িয়ে, যে দেশের বুকে আপনার চলাফেরা সেখানে কিছুই আপনার জন্যে হচ্ছে না। সেখানের কিছুই পরিবেশের জন্যে হচ্ছে না, অন্যান্য প্রাণের কথা সেখানে ভাবা হচ্ছে না। যদি হতো তবে কেন আজ উন্নত অনুন্নত সব দেশে মৃত্যুর মিছিল। তবে কিভাবে অতি ক্ষুদ্র ভাইরাস আজ আপনার অস্তিত্বের উপর আঘাত হানতে পারছে? অচল করে দিয়েছে পুরো বিশ্বকে? 

এখন আসি একদম প্রথমে ফেলে আসা প্রশ্নের কথা। দেখুন আজকের এই প্রতিযোগিতার বাজারে সবাই তার নিজেকে নিয়ে চিন্তা করছে। নিজের অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তা করছে। কারণ এই অর্থ ব্যবস্থায় আপনাকে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হচ্ছে। আপনাকে আপনার অস্তিত্বের জন্যে লড়াই করতে হচ্ছে। পরিবারকে তিন বেলা ভাতের বন্দোবস্তের জন্যে লড়াই করতে হচ্ছে। সেই  সাথে সমাজে একটু সম্মানের সাথে বাচাঁর জন্যে লড়াই করতে হচ্ছে। কিন্তু এ সমাজে তো সম্মানের সাথে বাঁচতে হলে ব্যক্তিত্বের দরকার নেই। জ্ঞানের দরকার নেই। দরকার ফ্ল্যাগশিপ স্মার্ট ফোনের, ঘরে এসি’র, গায়ে নতুন জামার, নতুন গাড়ির। পেটে খাবার বাধ্যতামুলক না। মুখে হাসি হলেই চলবে।

যেহেতু প্রচন্ড প্রাইভেটাইজেশনের যুগে সরকার শুধু ট্যাক্স নেয়ার ভাগিদার, আপনার চাকরির নিরাপত্তা দেয়ার অংশীদার না তখন আসলে আপনার কি করার আছে প্রচন্ড স্বার্থপর হওয়া ব্যতীত। তাই আপনার যে চরম স্বার্থপরতার আচরণ তা আপনার না। আপনার পরোপোকারের মানসিকতাকে ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। কার্যত আপনাকে মেরে ফেলা হয়েছে সকাল সন্ধ্যা শ্রম ও ভোগের মরীচিকায়। আপনাকে আমাকে করা হয়েছে চরম স্বার্থপর। আর এজন্যেই পুজিবাদী অর্থনীতির প্রবক্তকরা মানুষকে দেখেছে চরম স্বার্থপর হিসেবে। তারা বিশ্বকে চালাতে চায় পুজিবাদের ভিত্তিতে।

কিন্তু আচরণ তখনই মানুষের পালটায় যখন করোনার মতো এমন মহামারী আসে। তখন সরকার, রাষ্ট্রযন্ত্র, মানুষ সবাই হয়ে যায় সোসালিস্ট। একে অপরের। পৃথিবীর প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে সব দেশ সব সমাজ সোসালিস্ট ব্যবস্থার কাছে হাত পেতেছে। এটাই যে মানুষের চরিত্র। বিশ্ব ব্যবস্থায় পরার্থপরতার পরিবেশ দিন দেখুন মানুষ কেমন? চরম স্বার্থপর নাকি পরোপকারী?

একটু ভাবুন। সব শেষ হবার আগে ভাবুন। চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক কুমার ঘটকের ভাষায়- ভাবার প্রেক্টিস করুন।

শামীম আহমেদ, ফ্রিল্যান্স কন্টেন্ট রাইটার। 

সর্বশেষ

আরও খবর

লেটস্ কল অ্যা স্পেড অ্যা স্পেড!

লেটস্ কল অ্যা স্পেড অ্যা স্পেড!


কোভিড: আক্রান্তের সংখ্যা কমলেও সংক্রমণ কমেনি

কোভিড: আক্রান্তের সংখ্যা কমলেও সংক্রমণ কমেনি


শেখ কামাল ‘সব্যসাচী কীর্তিমান বাঙালি তরুণ’

শেখ কামাল ‘সব্যসাচী কীর্তিমান বাঙালি তরুণ’


নতুন ভূ-রাজনৈতিক  বিতর্কে চীন-ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক!

নতুন ভূ-রাজনৈতিক বিতর্কে চীন-ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক!


পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ

পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ


দেশবাসীকে প্রধানমন্ত্রীর ঈদ শুভেচ্ছা

দেশবাসীকে প্রধানমন্ত্রীর ঈদ শুভেচ্ছা


“বিএনপি নেতারা টেলিভিশনে উঁকি দিয়ে সরকারের সমালোচনা করছে”

“বিএনপি নেতারা টেলিভিশনে উঁকি দিয়ে সরকারের সমালোচনা করছে”


আওয়ামী লীগের সঞ্চয় বেড়েছে ৩৫ শতাংশ

আওয়ামী লীগের সঞ্চয় বেড়েছে ৩৫ শতাংশ


সমালোচনা আর মিথ্যাচার বিএনপির চিরায়ত ঐতিহ্যঃ কাদের

সমালোচনা আর মিথ্যাচার বিএনপির চিরায়ত ঐতিহ্যঃ কাদের


স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী মারা গেছেন

স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী মারা গেছেন